Saturday, May 21, 2016

আবদুন নুর তুষার, 'গোলমালেষু'...

আবদুন নুর তুষার নামের মানুষটার মধ্যে কোথায় যেন একটা অমায়িক গোলমাল আছে। বিজয় এবং অভ্রের সমস্যার সময় আমরা যখন জব্বার ভাইয়ার লোভের লকলকে জিব দেখে আঁতকে উঠে তীব্র প্রতিবাদ করি তখন তুষার সাহেব কোনও এক বিচিত্র কারণে আজব এক যুক্তি দেন, ‘"…যদি সফটওয়্যার দিয়ে বাংলা লিখতে গেলে সেই সফটওয়্যারটি ফ্রি হতেই হবে, এটি আমরা বলি, তাহলে কলম দিয়ে বাংলা লিখতে গেলে, সকল কলম ফ্রি করে দেয়া উচিত৷..."[১]
এরপর এই মানুষটাকে আমার স্রেফ একটা ভাঙ্গাচোরা রোবট মনে হয়। যার কাছে ভাষা, দেশ এই সব আবেগের স্থান নেই।

মানুষটার মধ্যে ভারী গোলমাল মনে হয়েছিল বহু বছর পূর্বে তখনই যখন ‘শুভেচ্ছা’ নামের নিজের অনুষ্ঠানে পথশিশুর কথা বলে ভেউভেউ করে কান্না করছিলেন। দৃশ্যটা রগরগে নাটককেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আহা, কেউ কী আবেগপ্রবণ হবে না? হবে, হবে না কেন! কিন্তু অনুষ্ঠানটা লাইভ ছিল না যে কেউ ফোনে বলল, আপনাকে … করতে চাই আর নিরুপায় দর্শক হাঁ করে শুনল।

প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে যখন খুন করা হলো তখন বুদ্ধিজীবী তুষার ফেনিয়ে-ফাপিয়ে বলা শুরু করলেন দীপন কেমন-কেমন করে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করতেন। বাহ, যেন ধর্মীয় অনুশাসন পালন না-করলে একজন মানুষকে খুন করলে বিশেষ সমস্যা নেই!

যাই হোক, উনি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন শিক্ষককে কুৎসিত অপমান করার পর যারা নিজের কানধরা ছবি দিচ্ছেন তাদের তীব্র সমালোচনা করে। কেন রে বাপু, সমস্যা কী! প্রতিবাদের ভাষা একেকজনের কাছে একেক রকম। নির্মেলেন্দু গুণের মত কেউ তাকে পুরস্কার না-দিলে লাজহীন মানুষের মত হইচই করেন [২] আবার কেউ বা প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে না-খেয়ে অনশন করেন। অবশ্য তুষার স্যার না-খেয়ে অনশনের ধার ধারবেন না কারণ এটা তার গা-গতরে সইবে না।
জনাব তুষার তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, "…একজনকে নগ্ন করা হলো,তার প্রতিবাদে সবাই যদি নগ্ন হয়,তাহলে নগ্নতার যে লজ্জা বা মানসিক যন্ত্রনা সেটা কমে যায়।…"
ওহো, আপনি তো দেখি ‘বাত কা বাতাঙ্গার’ বানিয়ে ফেলছেন। কথা হচ্ছিল উপরের অংশ নিয়ে আপনি সরাসরি নীচের অংশে চলে গেলেন- একেবারে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। আর আপনি যে এই অংশটুকু লিখেছেন, "…শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা বিষয়ে গোটা দেশ বিশেষ করে নেট ব্যবহারকারী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রত্যেকের কানধরা ছবি পোষ্ট করা হচ্ছে…।"
শোনো কথা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রত্যেকে- কেউ কি বাদ নেই? অন্তত আমি যে নেই এটা বলতে পারি। তো,আক্ষরিক অর্থে এই কথাটা গ্রহণ করলে মশিয়ে তুষারকে বুরবাক বলাটাই সমীচীন।

তুষার মহোদয় লিখেছেন, "…ছিনতাই নিয়ে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে কৌতুক করা হয়। (আমি কখনো শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে এটা করি নাই। শুধু তাই না, বুয়া , দারোয়ান, রিকশাওয়ালাদের নিয়েও কোন কৌতুক করি নাই)…।"
এই নিয়ে আপনার পোঁ ধরা কেন, বাপু? ছিনতাই নিয়ে কৌতুক থাকলে কৌতুক করতে ‘অসুবিদা’ কোথায়, স্যার! আমার এক পরিচিত মানুষ রিকশা করে যাচ্ছিলেন। বাচ্চা কোলে। বাচ্চা কাপড় নষ্ট করে দিয়েছে। নতুন কাপড় ফেলতে বড়ো মায়া তাই একটা পোঁটলায় ঢুকিয়ে ফেললেন। ছিনতাইকারী পোঁটলা নিয়ে উধাও। এই নিয়ে রসিকতা করলে কারও রস শুকিয়ে যাওয়ার তো কথা না।
আর আপনি যে বললেন, আমি কখনও শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে বুয়া, দারোয়ান, রিকশাওয়ালাদের নিয়েও কৌতুক করি নাই- জ্বী, আপনি বড়ো ‘ভালু লুক’! আপনার দয়ার শরীর- ইয়ে, কৌতুকের কথা বলছেন, আহা, শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে আপনার ভেউভেউ করে কান্নার চেয়ে বড়ো কৌতুক আর কী হতে পারে!

তুষার মহাশয় আরও লিখেছেন, "…বোন ধর্ষিত হলে কি আমরা সবাই ধর্ষিত হয়ে ছবি পোস্ট করব?..." আপনি আসলে হরেদরে সব সমান দেখেন বলেই বোধহয় ন্যায়-অন্যায় গুলিয়ে ফেলেন। তাই কী অতি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান থেকেও ‘চেহারাবেচার’ টাকা অবলীলায় নেন?
ওহো, এতো মুশকিল হলো দেখি! কেউ লিখল, ‘পিতা, তোমার শবযাত্রায়…[৩]। ব্যস, ডাগদর সাহেব, শিক্ষক শ্যামল কান্তির গা টিপেটুপে ডেভিডসনের বই ঘাঁটাঘাঁটি করে বিমল আনন্দে মাথা দুলিয়ে বলবেন, ‘ইউরিয়া’, মানুষটা এখনও জীবিত। বটে, কত বুদ্ধি ঘটে!
বা হেলাল হাফিজ যখন লেখেন, "…এক জীবনে কতটা আর নষ্ট হবে/ এক মানবী কতটা আর কষ্ট দেবে…।" তখন পন্ডিতবর তুষার ক্ষেপে যাবেন। ক-ক্ক-ক্কী, এক জীবন মানে? আমাদের আবার কয়টা জীবন, হে? আমরা কী হিন্দু যে আমাদের অনেক জীবন? হাফিজ ব্যাটা…। ব্যস, এরপর হয়তো তুষার স্যারের চেলা-চামুন্ডা বাহিনী এই নিয়ে গ্রহ মাতাবেন। হেলাল হাফিজকে ধর্মীয় ট্যাগ লাগিয়ে দিলে আটকাচ্ছে কে।

অন্যত্র মহাত্মন তুষার লিখেছেন, "…জর্জ বুশকে যদি জুতা মারা যায়,তাহলে অপমানকারীকে জুতা দেখানো যাবে না কেন? তার কানধরা কুশপুত্তলিকা বানানো যাবে না কেন? তার কুশপুত্তলিকায় চড় মারা যাবে না কেন?...নিজের নাক কেটে অপমানে সমান নয় বরং অপমানকারীর নাক বরাবর মুষ্টি প্রয়োগ করেন।"
এই মানুষগুলো যে কোন ভুবনে বাস করেন! যেন অন্য গ্রহ থেকে ভূর্জপত্র গাত্রে ভূর্লোকে তসরিফ গ্রহন করেন। এই দেশের বুদ্ধিজীবী টাইপের মানুষগুলোর বিকট এই এক সমস্য। এরা চোখে কালোর চশমা লাগিয়ে অন্ধ সেজে থাকেন। তখন অমায়িক ভঙ্গিতে সাদাকে কালো-কালোকে সাদা বলতে পারেন। ‘নাক বরাবর মুষ্টিঘাত’, এই সব শব্দশেল পড়তে ভালই লাগে। যে সংসদ সদস্য এই কর্মকান্ড করেছেন তার সম্বন্ধে আগুনমানুষ তুষারের কী কোনও প্রকারের ধারণা আছে?

এই সংসদ সদস্য সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা পাওয়া যাবে এক সাংবাদিকের সঙ্গে ফোনালাপের অডিও ট্র্যাকটা শুনলে, আহ, মধু-মধু! আর এই সংসদ সদস্য কোন পরিবারের এটা কি তার জানা আছে? ইতিপূর্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই পরিবার সম্বন্ধে কি বলেছেন এটা কি বিস্মৃত হয়েছেন, হের তুষার? "...রাজনৈতিকভাবে ‘হেয়’ করতে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে দাবি করে সে বিষয়ে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।..."
এরপর আমাদের মত সাধারণ মানুষের দাঁড়াবার আর জায়গা থাকে না। 'সজাগ' থাকতে থাকতে আমাদের মধ্যে তীব্র হতাশা কাজ করে বুকের গহীন থেকে অক্ষমতার হাহাকার বেরিয়ে আসে। তখন আমরা নিজের কান ধরব, নাকি ...!


কোন দেশে যে তুষারের মত লোকজনরা বসবাস করেন! যে দেশের ঘটনা রগরগে মুভিকেও হার মানায়। ফরিদপুরের যুবলীগ নেতা আসলামের ফাঁসির আয়োজনের সমস্ত কাজ সমাপ্ত। মাত্র একদিন পূর্বে সাজা মওকুফ করা হয় রাষ্ট্রপতির দয়ায়। প্রথমবার নাকচ হলেও দ্বিতীয়বার তা মঞ্জুর করা হয়! আমরা হতভম্ব বাকহীন হতেও ভুলে যাই। মিয়া, গ্যলারিতে পপকর্ন নিয়ে খেলা দেখে চ্যাটাং চ্যাটাং বাতচিত করা খুবই সোজা। যান না, নারায়নগঞ্জে গিয়ে দুম করে একটা ঘুষি মেরে আসুন না। আমরাও হাত খুলে লিখব, ওই আসে অগ্নিপুরুষ।
ওহে অগ্নিপুরুষ, তোমারই অপেক্ষায়…। 

সূত্র:
৩. পিতা, তোমার শবযাত্রায়: http://www.ali-mahmed.com/2016/05/blog-post_18.html

No comments: