Thursday, October 22, 2015

ভুলে-ভরা জীবন এবং গুছিয়ে রাখা ব্যাগ।

রাজুর [১, ২] বয়স পাঁচ এবং মৌসুমির বয়স চার [৩, ৪], এরা ভাই-বোন। এদেরকে আমি চিনতাম ‘আমাদের ইশকুলে’ পড়ার সুবাদে। এদের বাবা মারা যাওয়ার পর আক্ষরিক অর্থেই এরা ভেসে গেল কারণ অপ্রকৃতিস্থ মা থেকেও নেই। যেদিন এদের মা একেবারেই উধাও হয়ে গেল সেদিন আমিও ভেসে গেলাম কারণ এই দুইটা বাচ্চার স্রোতে ভেসে যাওয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার জন্য যে কঠিন হৃদয়ের প্রয়োজন তা আমার ছিল না।

একদা মৌসুমি মেয়েটার একটা গতি হয়। সহৃদয় একটি পরিবার এই বাচ্চাটির দায়িত্ব নিলে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু ওর ভাই রাজু নামের এই পাজিটার কোনো গতি হবে এমনটা আমি কল্পনাও করিনি কারণ ৫/৬ বছরের এই শিশুটির খোঁজ নিতে গিয়ে সকালে যদি শুনতাম চট্টগ্রামে তো বিকালে জানা যেত পাজিটা ঢাকায়। বেশ কিছুদিন ধরে রাজু উধাও ফিরে আসার পর জানা গেল একা-একা এ ভারতের আগরতলাতে চলে গিয়েছিল। রাজু নামের এই ছেলেটি যে একালের রাম এতে শরৎবাবুর সন্দেহ থাকলেও আমার মোটেও সন্দেহ ছিল না। 
আমি নিশ্চিত,‘রামের সুমতি’ হলেও রাজুর সুমতি হবে না। কালে-কালে এ যে ‘বাইট্টা ছগির’ পেটকাটা রমজানের স্থলে ‘কাইল্যা রাজু’ হয়ে উঠবে না এটা কে বলতে পারে।

আমি হাল ছেড়ে দিলেও আমাদের ইশকুলের শিক্ষক আলী আজ্জম অপু হাল ছাড়ে না।
যে পরিবারের সঙ্গে এখন রাজু আছে সেই পরিবারের লোকজনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই এঁরা কেবল যে রাজুকে পরম মমতায় নিজের করে নিয়েছেন এমনই না এরা আমার দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট করে চেপে রাখা শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমাকে পোকামানব হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
ছবি ঋণ: আলী আজ্জম অপু
রাজুর মাঝে যে পরিবর্তন আমি দেখেছি তা আমার চিন্তারও বাইরে! কখনও কখনও এ এই পরিবারের লোকজনকে হুমকি দেয়, ‘আমি কিন্তুক চইলা যামু’। ওরা হাসি গোপন করে বলে, ‘চইলা যা’, তখন রাজু মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলে, ‘তাইলে আমারে আদর করব কেডা’? আমার কেবল মনে হয় যেন এটা নিয়ে একটা গল্প, একটা উপন্যাস একটা মহাকাব্য লিখে ফেলা চলে।

ভুল! এখন হচ্ছে অগল্প-অপন্যাস-অপকাব্য-অন্ধকারের যুগ। ‘মজার স্কুল’-এর সঙ্গে জড়িত আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, ফিরোজ আলম খান এবং হাসিবুল হাসানকে পুলিশ মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করল, রিমান্ডে নেওয়া হলো। এই নিয়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দা-ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দেওয়া হলো। প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের লোকজনের অবগতির বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা উল্লসিতও হলাম- যাক, এবার তাহলে একটা সুরাহা হচ্ছে।
আমরা পত্রিকায় পড়লাম,‘অবশেষে মুক্তি পেলেন অদম্য বাংলাদেশের চার তরুণ-তরুণী’। বাহ, এই দেশের সমস্ত বিষয়ে যদি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় তাহলে গুচ্ছের টাকা খরচ করে বিপুল বাহিনীর প্রয়োজন কী!

বেশ, কিন্তু আমাদের এটা জানা হলো না সরকার বাহাদুরের চৌকশ গোয়ান্দা এদেরকে গ্রেফতারের পূর্বে এদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের কোনো প্রকারের গন্ধ-দুর্গন্ধও পেল না। মানব তো আর বাদাম না যে পকেটে লুকিয়ে পাচার হয়ে গেল। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যাজিশিয়ানও তো চোখের পলকে একজন মানবকে উধাও করে ফেলার পদ্ধতি রাখেননি! একটা লাশ পচে-গলে যেতেও তো বছর দুয়েক সময় লাগে। তারপরও কোনও-না-কোনও ছাপ থেকেই যায়।
আমাদের এটাও জানা হলো না এক শিশুর চাচা যিনি এই অভিযোগ এনেছিলেন তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো বা যেসমস্ত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এর সঙ্গে জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হলো কিনা?

পত্রিকায় আমরা এটাও পড়লাম, পুলিশ দীর্ঘ এক মাস তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি। …এরপর আদালত তাদের জামিন দেন। এর পূর্বে পুলিশ বলেছিল, এদের কোনো নিবন্ধন নেই, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো সনদও তারা নেয়নি।
খারাপ, খুব খারাপ কথা। ‘আমাদের ইশকুল’ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। তা বছর পাঁচেক তো হয়েই গেল। এই সুদীর্ঘ বছরেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আচ্ছা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমতি পাওয়ার জন্য যে-সমস্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় তার কোনো প্রকার ধারণা কি আছে কারও? দয়া করে কেউ ফরমটা যোগাড় করে খানিকটা চোখ বুলিয়ে নিলে ভাল করবেন। চার পাতার আবেদনপত্রে যে অসংখ্য চাহিদার কথা উল্লেখ আছে তা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে যোগাড় করা অসম্ভব! এটা তাদের পক্ষেই সম্ভব যাদের হাতি-ঘোড়া, লাওলস্কর আছে। যারা বৈদেশ থেকে মোটা অংকের ডোনেশন বাগিয়ে চকচকে গাড়ি হাঁকিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে সমাজ উদ্ধার করেন।

একটি শিশুর লেখাপড়া,নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার জন্য সরকার বাধ্য। এর অন্যথা হলে এর দায়ভাগ সরকার নিজের কাঁধে নিয়ে লজ্জিত হবেন। সরকার যেখানে ব্যর্থ সেখানে সাধারণ লোকজন এগিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। এখন রাস্তায় পড়ে থাকা কলার খোসা সরাবার জন্যও যদি মেয়র মহোদয়ের বরাবর পিটিশন লিখতে হয়, স্যার, হাম্বল রিকোয়েস্ট… তাহলে তো ভারী মুশকিল।
সব মিলিয়ে এখন মনে হচ্ছে একটি শিশুকে পড়াবার, আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করাটা ভুল। যেদিন এদেরকে পুলিশ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল সেদিনই আমি ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি, মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কোনো একদিন শিশু পাচারের অভিযোগে কোমড়ে দড়ি বেঁধে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেলে কেউ-কেউ অবাক হলেও আমি হবো না। ভুল করলে খেসারত দিতে হবে এ আর বিচিত্র কী! আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে সমস্যা তো নেই।
তবুও আমি এমন ভুল করব, বারবার। কপাল আমার, ভুলে-ভরা যে এ জীবন…!

সহায়ক সূত্র:
১. দু-পেয়ে পশু: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_27.html
২. পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন: http://www.ali-mahmed.com/2015/05/blog-post_28.html
৩. একজন দুর্বল মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post.htmls
৪. হর্ষ-বিষাদ, বিষাদ-হর্ষ: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post_20.html