Tuesday, September 15, 2015

একজন দুর্বল মানুষ।

মৃত্যুদন্ড নিয়ে আমার একটা বক্তব্য ছিল, একটা মানুষের প্রাণ নষ্ট করার অধিকার কোনও মানুষের থাকাটা সমীচীন না। রাষ্ট্রেরও না। কিন্তু এমন বক্তব্য আসলে মানুষের জন্য, দানবের জন্য না। যেমন রাষ্ট্র যদি জাহাঙ্গির নামের এই মানুষটাকে মেরে ফেলে তাহলে আমি বিন্দুমাত্র কাতর হব না। এই দানবের দেহাত্যয়ই একমাত্র সমাধান।

হালে নিজের জাগতিক সমস্যার কারণে এখন আমি আর বাড়তি চাপ নিতে চাই না। ‘অকাজের’ পাল্লা ভারী হয়ে গেছে মনে হয় এমনটা। চারপাশে এতো এতো কেজো লোকের সঙ্গে দলছুট হয়ে থাকাটা কোনও কাজের কাজ না। তাই এখন নির্ভার সময়- যাক, এতো দিনে তাহলে আমার একটা গতি হচ্ছে। কালে কালে কাজের লোক হচ্ছি বলে…। শান্তিতেই ছিলাম। কিন্তু ঝামেলা আমার পিছু ছাড়বে কেন। কপাল!
মৌসুমি এবং রাজু
পূর্বে জাহাঙ্গির নামের এক দানবকে নিয়ে লিখেছিলাম। আমাদের ইশকুলে রাজু নামের চার-পাঁচ বছরের যে শিশুটি পড়ত এ সেই রাজু শিশুটির দুই হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল [১]। এই রাজুরই একটা বোন আছে মৌসুমী নামে। এ-ও এই স্কুলে পড়ত। এই স্কুলের শিক্ষক আমাকে জানিয়েছিল মৌসুমী অনেক দিন ধরেই স্কুলে আসছে না। আমি শুনেও না-শোনার ভান করেছি কারণ এরা এমনই। স্কুলে এদের-কেউ নিয়মিত আসবে এমনটা আশা করাটাই বোকামী।

ফি-রোজ স্কুলে যাওয়া হয় না আমার। এই স্কুলের যে শিক্ষক, আজম- এ কেবল পড়াবার জন্যই পড়ায় না স্কুলের বাচ্চাদের জন্য এর আছে প্রগাঢ় মমতা। খুব সমস্যা না-হলে আমাকে বিরক্ত করে না। ফোন করে আমাকে যখন জানালো মৌসুমি ফিরে এসেছে কিন্তু সেই জাহাঙ্গির এরও দুই হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। নরসিংদী না কোথায় যেন সে এই বাচ্চা সমেত ধরা পড়ার পর ওখানে লোকজনেরা খাতিরযত্ম করে জাহাঙ্গিরের পা ভেঙ্গে দিয়েছে। ওখানকারই কোনও সহৃদয় মানুষ মৌসুমির মুখে এখানকার কথা শুনে মৌসুমিকে এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে।
তখন আক্ষরিক অর্থেই আমি বিরক্তি গোপন করলাম। আমার শান্তিতে থাকার দিন শেষ। এবং এর পরের অংশটুকু চোখ বন্ধ করে আমি আগাম বলে দিতে পারি। এখন জনে জনে ঝামেলা হবে।
মৌসুমি এবং শিক্ষক আজম
কপাল, যা ভেবেছিলাম তাই! দুই হাত ভাঙ্গার পাশাপাশি মৌসুমির শরীরে অসংখ্য কামড়ের দাগ ছিল, হাতের একটা নোখ উপড়ানো। আমার মনে হয়েছিল একজন গাইনিকে দেখানোটা অতি জরুরি। পরদিন একে নিয়ে যখন হাসপাতালে গেলাম কোনও গাইনিকে পাওয়া গেল না। শ্লা, কপাল আমার, ড্রেন রাস্তার মাঝখানে চলে আসে! এই হাসপাতালের প্রধান যিনি, এখন আমাকে তার কাছে যেতে হবে। এই ভদ্রলোককে নিয়ে একদা একটা লেখা লিখেছিলাম,‘সম্ভাব্য মৃত্যু’ [২]। তাই এর কাছে আমি বিশেষ প্রিয় পাত্র নই! কী আর করা।
তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন গাইনি ভদ্রমহিলা ট্রেনিং-এ আছেন। আমি জানতে চাইলাম, এই হাসপাতালে গাইনি ক-জন? তিনি জানালেন, তিন জন। আমার পাল্টা প্রশ্ন ছিল, তিন জন হলে এক জন ট্রেনিং-এ, অন্যরা? তিনি হড়বড় করে বললেন, এই তো চলে আসবে। ট্রেনে আছে।
বেলা বাজে তখন বারোটা। আমি রাগ চেপে বললাম, বাচ্চাকে তো আর ট্রেনে নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারব না।

যাই হোক, পরদিন গিয়ে একজনকে পাওয়া গেল। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আশার বাণী শোনালেন যে এই সংক্রান্ত জটিলতা থেকে এই শিশুটি মুক্ত। এবার অর্থোপেডিকস ডাক্তার মহোদয়ের কাছে যাওয়া। ইনি আবার কেবল বিশেষ বিশেষ দিনেই হাসপাতালে আসেন। ভাগ্যক্রমে এই দিনটাই বিশেষ দিন। এক্সরে দেখে তিনি জানালেন, শিশুটির হাত ভাঙ্গা হয়েছিল বেশ ক-দিন পূর্বেই এখন জোড়া লাগা শুরু হয়ে গেছে বিধায় আপাতত করণীয় কিছু নেই।
বেশ! হোয়াট নেক্সট, এরপর? এই শিশুটির বাবা নেই মা-ও খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ, স্থির হয়ে দাঁড়াতেই পারেন না। তার উপর ভয়ংকর যে খবর সেটা হচ্ছে এই মহিলা বেশ কিছুদিন ধরে উধাও। ফিরে আসবেন এমনটা ধারণা করি না।
এখন এই শিশুটির গতি কী। স্টেশনে রেখে এলে ঝামেলা চুকে যায়? এটাই সহজ সমাধান কিন্তু এর জন্য যে সাহস প্রয়োজন তা আমার নাই। একজন দুর্বল মানুষের এমন সাহস কোথায়...।

সহায়ক সূত্র:
১. পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন!: http://www.ali-mahmed.com/2015/05/blog-post_28.html
২. সম্ভাব্য মৃত্যু: http://www.ali-mahmed.com/2013_10_16_archive.html