Thursday, May 28, 2015

পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন!

('বাংলার বান কি মুন' এবং শিশুদের এই লেখাটা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ।)
এর নাম রাজু। একে নিয়ে বেশ কিছু লেখা আছে আমার। শেষ লেখাটা লিখেছিলাম, দুপেয়ে পশু [১]। ওই লেখাটায় লিখেছিলাম, এক পশু রাজুর দুই হাতই ভেঙ্গে দিয়েছিল। প্রয়োজনের সময় রাজুর নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব বিধায় তার হাতের হাড় জোড়া নিয়েছিল বাঁকা হয়ে। কপাল, কিছুই করার নেই! আমার মত যে নপুংশক, যেপর্যন্ত না শিশুদের জন্য আশ্রম করতে পারবে সেপর্যন্ত সে তাকিয়ে তাকিয়ে এই সব দৃশ্য দেখবে, একের-পর-এক।
এর ঘুমাবার ভঙ্গি বড়ো বিচিত্র। স্কুলে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কী ঘুম!
আমার নিজস্ব জটিলতার কারণে স্কুলে নিয়মিত যাওয়া হচ্ছিল না। স্কুলে পড়ায় যে মাস্টার, আলী আজ্জম অপু আমাকে ফোন করেই বলে, স্কুলে আসেন, তাড়াতাড়ি।
আমি খানিকটা বিরক্তি চেপে বলি, কেন কী হয়েছে?
তার তাড়া, আসেন, তাড়াতাড়ি।
আমি স্কুলে গিয়ে দেখি রাজুর গালে বিভৎস দাগ। অনেকটা শুকিয়ে গেছে তারপরও নমুনা দেখে আমি হতভম্ব। আমি রাজুর কাছে জানতে চাইলাম, তোমার গালে কি হইছে?
রাজু বলে, যেই বেডা আমার হাত ভাইঙ্গা দিছিল হে গালে কামড় দিছে।
আমি খানিকটা থমকে যাই। কারণ আমার ধারণা ছিল যে রাজুর হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল তার কোনও হদিস পাওয়া যাবে না কারণ রাজু গুছিয়ে বলতে পারেনি কে তার হাত ভেঙ্গেছিল। আমি উত্তেজনা চেপে রাখি, শেষপর্যন্ত কী লোকটার সন্ধান পাওয়া যাবে?

আমি বলি, তুমি কি এই লোককে চেন?
রাজু খেলা থামিয়ে বলে, হ, চিনি তো। হের নাম জাইঙ্গা। হে আমার হাতের নখও তুইলা লাইছে।
আমি বুঝতে পারি এর নাম জাহাঙ্গির। আমার ভেতরে অজানা এক দ্রোহ পাক খায়। অজান্তেই শ্বাস দ্রুত হয়। খানিকটা সামলে নিয়ে বললাম, তুমি কি এই জাহাঙ্গিরকে চিনিয়ে দিতে পারবে?
রাজু ভয়পাওয়া গলায় বলল, পারুম না। হে আমারে মাইরা লাইব। আমি রাজুকে আশ্বস্ত করি, ভয় নাই। তুমি দূর থিক্যা আমারে দেখায়া দিবা। পারবা না?
রাজুকে কোনওপ্রকারেই রাজী করানো গেল না। সে ভয়ে আধমরা হয়ে আছে। এরপর এই শিশুটির প্রতি অন্যায় চাপাচাপি করতে মন সায় দিল না।

স্টেশনে আমি এবং মাস্টার অপু চক্কর লাগাই। পাওয়া গেল রাজুর মাকে। রাজুর মাকে বললাম, আপনি কি জানেন আপনার ছেলের হাত কে ভেঙ্গেছে?
আগের লেখায় বলেছিলাম রাজুর বাবা নেই এবং রাজুর মা খানিকটা অপ্রকৃতস্থ- স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। তিনি বললেন, হ, জানি তো। জাহাঙ্গিরা রাজুর হাত ভাঙ্গছে। হেরে ডরে কেউ কিছু কয় না।
আমি আশার আলো দেখি। বলি, আপনি কি দূর থেকে জাহাঙ্গিরকে চিনিয়ে দিতে পারবেন? তিনি কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে এই মানুষটাকে চিনিয়ে দেন।
আমি কাছে গিয়ে জাহাঙ্গির নামের এই মানুষটাকে বললাম, তোমার নাম জাহাঙ্গির?
সে হেলাফেলা করে বলল, হ। ক্যান, হি হইছে?
আমি দুর্দান্ত রাগ চেপে বললাম, এখনও কিছু হয় নাই, তবে হবে। তুমি রাজুর হাত ভেঙ্গে দিয়েছ কেন? আবার এর গালে কামড়ও দিয়েছে, কেন? নখ তুলে ফেলেছ!
জাহাঙ্গির আমাকে বলল, তো আপনের কি হইছে, হে আপনের কিছু লাগে?

বলা হয়ে থাকে, যে হাত দিয়ে লেখক লেখে সে হাত নাকি অন্য কোনো কাজে লাগে না। কথাটা রূপকঅর্থে বলা। মোদ্দা কথা, ওই হাত কেবলই লেখালেখির জন্য। কথা হচ্ছে ডান হাত নিয়ে। বাম হাতের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তো, বাম হাত যদি চোখের পলকে উঠানামা করে তাহলে সমস্যা কোথায়?

ক্রমশ ভীড় জমে যায়। একজন কসম কেটে বলেন, তিনি নিজের চোখে দেখেছেন এই জাহাঙ্গিরকে যে চলন্ত ট্রেন থেকে রাজুকে ফেলে দিয়েছিল। চোর ব্যাটা আমার ছবি তোলার সমস্ত উপকরণ নিয়ে গেছে বটে কিন্তু মাস্টার অপুরটা তো বর্তমান। মাস্টার অপু তার সেলফোনে তোলা রাজুর ছবিগুলো গোল হয়ে দাড়িয়ে থাকা জনতাকে দেখাতে থাকে। জনতা কখন যে পুরো বিষয়টা আমার হাত থেকে আলগোছে সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে আমি ঠিক জানি না।

একজন নাদুননুদুস টাইপের মানুষ ‘তবে রে’ বলে জো ফ্রেজিয়ার পাঞ্চ কষিয়ে নিজের হাতই মচকে ফেললেন। পরে এই মানুষটাকেই আমি দেখেছি স্লিং ঝুলিয়ে চলাফেরা করতে। অন্য একজন কোমরের বেল্ট খুলে (এই দৃশ্য পুরনো সময়কার মারকুটে সিনেমায় দেখা যেত। এখনকার সিনেমায় এই দৃশ্য অচল) যে ভঙ্গিতে পেটাতে লাগলেন তা দেখাটা সুখকর না। আমি আস্তে করে এই বৃত্ত থেকে সরে আসি। এখানে এখন আর আমার কোনও কাজ নাই। এই নিয়ে আমার মধ্যে কোনও প্রকারের অপরাধ বোধ কাজ করে না। কারণ মানবের আইন পশুর জন্য না- জঙ্গলে চলে জঙ্গলের আইন।

সময় গড়ায়। বৃত্তের ভেতরের উত্তাপ সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমি ভেবে দেখলাম, এই পশুটাকে মেরে ফেললে তো আরেক ঝামেলা হয়ে যাবে। কিন্তু এখন এই বৃত্তের ব্যূহ ভেদ করা প্রায় অসাধ্য। আমি সেই অসাধ্য কাজটাই করলাম। জাহাঙ্গিরকে রেলপুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলো। জনতা আমার উপর ভারী রুষ্ট। তাদের কথা, পুলিশ একে ছেড়ে দেবে।

মাত্র দুদিন পরই শুনলাম। জাহাঙ্গির ফিরে এসেছে। এবং রাজু ভয়ে কোথায় পালিয়েছে এর খোঁজ কেউ জানে না, তার মা-ও না! বিচিত্র কারণে জাহাঙ্গিরের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না অথচ দেখা হওয়াটা জরুরি...।

সহায়ক সূত্র:
১‌. দুপেয়ে পশু: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_27.html 

*এই লেখার সবগুলো ছবিই মাস্টার আলী আজ্জম অপুর তোলা।