Wednesday, May 20, 2015

‘অস্ত্র করা’ ওরফে অপারেশন...।

আমার চোখে একটা অপারেশন করার প্রয়োজন দেখা দিল। অপারেশনের পূর্বে আমি হালকা চালের একটা লেখা লিখেছিলাম, “...'আবার আসিব ফিরে'। এই অপারেশনে কারও মৃত্যু হয়েছে এমনটা শুনিনি। আমার বেলায় এটা ঘটলে সেটা হবে বিরল ঘটনা!... তবে এই অপারেশনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও তোপ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। অবশ্য এও সত্য, একজন লেখকের জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়াটা মৃত্যুসম। তখন বাঁচা না-বাঁচা সমান...।”
এই লেখাটা যে আমার জন্য ভারী হয়ে দেখা দিতে পারে সেটা তখন বুঝিনি!

ডাক্তার সাহেব বিভিন্ন 'আক্কাড়-পাক্কাড়’, নাট-বল্টুর সহায়তায় আমার চোখ দেখে বললেন, একি অবস্থা! আপনার তো দু-চোখেই অপারেশন লাগবে।
আমি বললাম, জরুরি কোনটা?
ডাক্তার বললেন, দুই-ই সমান। দুইটাই করাতে হবে।
এই বাণীর জন্য আমি ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। সামলে নিয়ে বললাম, কোনটা করানোটা প্রয়োজন...? আপাতত একটাই করাই...।
উঁহু, আপনাকে দুইটা চোখই করাতে হবে।
ডাক্তার সাহেব এই কথাটাই বেশ ক-বার বলার পর এবং যখন উষ্মা নিয়ে বললেন, আচ্ছা, আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো!
ডাক্তারকে কে বোঝাবে যে আমি টাকা ছাপাবার মেশিন নিয়ে ঘুরে বেড়াই না, এটা আমার কাজ না- এই কাজটা আতিউর রহমানের। আমিও গম্ভীর হয়ে বললাম, আপনি কী একটা চোখ ফ্রিতে করে দেবেন?
যেসব ডাক্তারের নামের সঙ্গে এবিসিডিএক্সওয়াইজেড এন্তার ডিগ্রি থাকে তাদের সঙ্গে এমন করে বলার নিয়ম নাই। বলা তো শেষ, কপাল! তাছাড়া যে ডাক্তারের ছুরি-ছুঁচের নীচে আমাকে শুতে হবে তাকে ক্ষেপিয়ে দেওয়াটাও মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না। হয়তো দেখা গেল ডাক্তার সাহেব আমার একটা চোখ তুলে চিমটা দিয়ে ধরে অন্য চোখের সামনে এনে বললেন, ছিঃ, কী ময়লা! এই কে আছিস, শিরীষ কাগজ নিয়ে এটাকে ঘষে পরিষ্কার কর। আর শোন, ব্লিচিং পাউডারে ডুবিয়ে রাখতে ভুলবি না কিন্তু।
আহা, এমনটা করলে আটকাচ্ছে কে!

ডাক্তার সাহেবের রেগে যাওয়ার কথা কিন্তু তিনি রাগ না-করে হাসি-হাসি মুখে বললেন, আচ্ছা, তা কোনটা করাবেন?
আমি হড়বড় করে বললাম, বাম চোখটাই করাই। (দুইটার মধ্যে বেছে নিলে হলে বামটাই সই। বললে বলল লোকজন নাহয়, ‘এক চোখ কানা বুইদ্দার...’।)
এবার ডাক্তার হাসি গোপন করে বললেন, করাতে পারেন। কিন্তু...।
আমি চিড়বিড় করে বললাম, কোনও কিন্তু-টিন্তু নাই। এইটাই ফাইনাল।
ডাক্তার বললেন, আচ্ছা, অপারেশনের পনেরো দিন পর মনে করে চোখটা দেখিয়ে যাবেন।

এখানে দেখি কেবল ডাক্তার না নার্স-টার্স সবাই খুব মাই ডিয়ার টাইপের। ওয়াল্লা, অপারেশনের পূর্বে কেবল আগুনগরম কফিই দিয়ে গেল না সঙ্গে কুকিজও! আমি বিছানায় শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে কফিতে চুমুক দিচ্ছি। ডাক্তার নিয়ম ভেঙ্গে এখানে চলে এসে যেটা বললেন তা শুনে আমার গা হিম হয়ে এলো।
ডাক্তার কষ্টার্জিত গম্ভীর হয়ে বললেন, দেখুন, আপনাকে জানানোটা প্রয়োজন মনে করছি। আপনার হাই মায়োপিয়া। অপারেশনে আপনি কিন্তু ঝুঁকিতে আছেন। ট্রাই মাই বেস্ট, বাকীটা আল্লাহ ভরসা। কি, ভয় করছে?

আমি ভয় চেপে বললাম, না, বলে ভাল করেছেন। তথ্য পাওয়াটা আমার অধিকার। আর অপারেশনটা করবেন আপনি। আপনি ভয় না-পেলেই আমার জন্য মঙ্গল। ইয়ে, আপনারা দেখি রোগির জন্য ভালই খাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। এমনিতে রোগির চেয়ে কিন্তু ডাক্তারের জন্য এটা জরুরি। ক্ষুধার্ত সার্জনের ছুরির নীচে শুতে নেই।
ডাক্তার এবার হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ভাল-ভাল, আপনি ট্রিকটা ধরে ফেলেছেন দেখি! রোগি স্বাভাবিক থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা। আমাদেরকে মাইক্রোসকোপের নীচে কাজ করতে হয়। রোগি ভয় পেয়ে চোখের মনি বনবন করে ঘুরতে থাকলে বড়ো মুশকিল হয়ে যায়, বুঝলেন। পাঁচ মিনিট পর ওটিতে আসেন, কাজটা সেরে ফেলি।

ভাল ভাবেই অপারেশনটা শেষ হলো। মহাআনন্দে আমি বুড়া বাড়িটার কাছে ফিরে এলাম। কিন্তু দু-চোখে দুই রকম দেখি। কী যন্ত্রণা! পনেরো দিন দুঃসহ সময়টা পার করাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। পনেরো দিন পর ডাক্তারকে যখন বললাম, অন্য চোখটাও অপারেশন করে ফেলেন তখন ডাক্তার মুখ ভরে হেসে বললেন, কী বলেছিলাম না...।