Thursday, April 2, 2015

রাজার মুরগি, বুশ এবং নাড়িছেঁড়া এক গল্প!

রাজার মুরগির বিষয়টা আগে বলি। রাজামশাই যখন ভ্রমণে মুরগি খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন তখন তার পেয়াদা বাহাদুররা সাত গ্রাম তছনছ করে মুরগির ব্যবস্থা করে।
আমাদের জুনিয়ার বুশ আরেক কামেল মানুষ। তাকে মেঝে উঁচু করার কথা বললে সে অল্প সময়েই এটা করে দেবে। সব মেরে সাফ করে কবর বানিয়ে।
এই মানুষটার চোখের জল শুকিয়ে গেছে কারণ আজ সাত দিন তার একমাত্র সন্তানের খোঁজ নেই। যেদেশে নামকরা লোকজনেরা উধাও হয়ে যায় সেদেশে স্টেশনে যার বাসস্থান এমন একজন মানুষের সন্তান উধাও হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু না। এই মানুষটার নাম আমি জানি না। সবাই বলে জান্নাতের মা, আমিও বলি জান্নাতের মা।
বাঁদিকের মেয়েটা জান্নাত। গতবছর পহেলা বৌশাখে তোলা। দানে পাওয়া ঢলঢলে এই পোশাকেই তার আনন্দের শেষ নেই।
তার মেয়ে জান্নাত ‘আমাদের ইশকুল’ নামের স্কুলটায় বছরখানেক ধরে পড়ে। স্টেশনের কাছটায় এই স্কুলটায় প্রতিদিন নিয়ম করে আসে ছেলেপেলেরা আসে এই সংখ্যা খুবই কম। জান্নাতও মাঝেমধ্যে আসত না কারণ ও একটা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। ওখান খেকে যে খাবার পাওয়া যেত এতে মা-মেয়ের হওয়ার কথা না কিন্তু হয়ে যেত নিশ্চয়ই। এদের পেটপুরে খেতে হবে এই দিব্যি কে দিয়েছে।
তো এই কারণে জান্নাতের কখনও-কখনও স্কুলে আসা হতো না। কিন্তু ঝাড়া ছয় দিন অনুপস্থিত থাকার পর আমি স্কুলের মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলে সে জান্নাত বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারল না।

আজ জান্নাতের মার কাছে যেটা শুনলাম তাতে কিছুই স্পষ্ট হলো না। পুলিশ নাকি জান্নাতকে ধরে নিয়ে গেছে। কোথায়? জান্নাতের মা জানে না! আশেপাশের অন্যরাও তেমন সদুত্তর দিতে পারল না। ১০/১২ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়েকে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে যাবে? রেলওয়ে পুলিশের এক এস,আই আমাকে যেটা বলল এটা শুনে আমি জীবনে এতো হতবাক কমই হয়েছি। সরকারী একটা সংস্থার (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) লোকজনেরা ভাসমান কিছু পতিতাতে ধরে নিয়ে গেছে। এদের মধ্যে জান্নাতও ছিল। একপ্রসঙ্গে এ আমাকে জোর দিয়ে এটাও বলেছে, জান্নাত...। হা ঈশ্বর! এই অপদার্থ এই সব কী বলছে!
অবশ্য জিআরপি ওসি যথেষ্ঠ সহায়তা করলেন। এখানে কাজের তথ্যগুলো পাওয়া গেল।

সহৃদয় @Shahadat Hossain যখন এই কেন্দ্রে (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) যান তখন এরা পতিতাদের ধরে এনেছেন এটা অস্বীকার করেন। চমৎকার-চমৎকারসব কথা বলেন। সাহাদাতের কাছে শুনে আমি নিজেও মুগ্ধ (!)।
অথচ আমি দেখছি এখানে এরা লিখেছে: “...পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে নানাহ কারণে বঞ্চিত হয়ে অসামাজিক তথা দেহ ব্যবসার মত ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত রয়েছে।...
আচ্ছা, সেই তো দেখছি ঘুরেফিরে দেহ ব্যবসা! আরও লেখা আছে, "...এখানে আসন সংখ্যা ১০০ জন হলেও বর্তমান নিবাসীর সংখ্যা ১৬ জন। বাকী ৮৪টি আসন শূন্য থাকায়..."
ওরে, এই তাহলে ঘটনা! শূন্য স্থান পূরণ করো, শূন্য আসন...। আর পারিবারিক বন্ধনের কথা যে বলা হচ্ছে এই জান্নাত মেয়েটির পারিবারিক বন্ধন আছে কী নেই এই বিতর্কে নাহয় গেলাম না কিন্তু একজন মার কাছ থেকে তার সন্তানকে পাইক-পেয়াদা দিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে আটকে রেখে কী দেশ উদ্ধার করবেন আপনারা? এই ছয় দিন ধরে মা জানত না তার সন্তান কোথায় -সন্তান জানত না তার মার খোঁজ! এই ক-দিনে মা-মেয়ের চোখ গড়িয়ে কত জল ভেসে গেছে তার খোঁজ রাখার আদৌ প্রয়োজন কী আমাদের!
এখন এরা বলছে, বেশ, জান্নাতকে ধরে এনে নিবন্ধন করে ফেলা হয়েছে তাই একে এখন এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইলে তার অভিভাবকের এই-এই কাগজ লাগবে। এই-এই কাগজ যেমন জন্মনিবন্ধন পৌর মেয়রের সনদ ইত্যাদি ইত্যাদি লাগবে। এই ইত্যাদি এবং ইত্যাদি কাগজপত্র জান্নাতের বা জান্নাতের মার কখনও ছিল না ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ। অতএব...। জান্নাতের এখন কেবল জান্নাতে(!) যাওয়ার অপেক্ষা। তা কেন রে বাপু, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় মা-র খোঁজের, কাগজের প্রয়োজন হয় না, এখন কেন?

রাজার মুরগি খাওয়ার গল্পটা শুরুতে বলেছিলাম এই কারণেই বা বুশ...। সরকারের সদিচ্ছা অতি উত্তম কিন্তু তার বাহিনী সেই মুরগিখাওয়া লাঠিয়াল বাহিনীর মতই...। বিস্তর সহায়তা করেছেন, Shahadat Hossain এবং Masuk Hridoy । তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
...
আপডেট: ৫ এপ্রিল, ২০১৫

সরকারের উদ্যোগটা কিন্তু চমৎকার কিন্তু লোকজনের কাজ করার ভঙ্গিটায় ঝামেলা আছে! জান্নাতকে নিয়ে আসতে সময় লাগবে। জান্নাতকে ওখানেই রেখে দেওয়া যায় কিনা এটাও ভাবা হচ্ছে...
আপাতত যে কাজটা করা গেছে- আজ জান্নাতের সঙ্গে জান্নাতের মার দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।  




গত বছর জান্নাতকে নিয়ে লেখাটা: