Friday, March 27, 2015

দুপেয়ে পশু!

রাজুকে আমি চিনি তা বছর দুয়েক হবে [১]। এর মার মাথা এলোমেলো, বাপ নেই। প্রায়ই দেখা হয়। এর বিভিন্ন আবদার থাকে। আমার সঙ্গে এর কোনও প্রকারের সংকোচ নেই, যা বলে সোজাসাপটা। কখনও-কখনও আবার আমাকে টাকা নিতেও সাধাসাধি করে, ‘টেকা নিবা? টেকা লাগবে আমারে বলবা’, বলেই দশ-বিশ টাকা এগিয়ে দেয়।

বিভিন্ন ছল করে একে স্কুলে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। কখনও কখনও মেজাজ খারাপ থাকলে বলবে, ‘আমি খেলুম কিন্তুক পড়ুম না’। যে বাচ্চাদেরকে ছেলেটি পড়ায় তাকে বলা আছে, কাউকে পড়ার জন্য চাপাচাপি না-করতে, বিশেষ করে রাজুকে তো একেবারেই না। কারণ তাইলে আর এদের টিকিটিরও দেখা মিলবে না।
এমনিতে এই স্টেশনের চাঅলা-পানঅলা-হকার সবাই ‘রাজু মস্তান’ নামেই একে চেনে, আমরাও। রাজু দেখা হলে এটা বলবেই, ‘তুমি আমার নাম জানো, আমার নাম কিন্তুক রাজু মস্তান’।

মধ্যে এর সমস্ত গা খোস-পাচড়ায় ভরে গিয়েছিল, তাকানো যায় না এমন।দিনের-পর-দিন গোসল না-করার ফল। ডা. সুমন ভূঁইয়া নামের সহৃদয় মানুষটা এর চিকিৎসা করেছিলেন। মানুষটার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। রাজুর মত, যার পায়ে সর্ষে তার চিকিৎসা করাটা যে কত জটিল এটা বোঝানো মুশকিল। তার উপর সেই রোগ যদি হয় চর্মরোগ!

যাই হোক, ক-দিন ধরে রাজু উধাও। এর সঙ্গের ছেলেমেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে হদিস পাওয়া গেল না। কেবল এটুকুই জানা গেল ওমুক ট্রেনে একে উঠতে দেখা গেছে। রাজু
যখন ফিরে এলো একে দেখে একজন পাষন্ডও বিচলিত হবে, আমি কোন ছার! এর বাঁ দিকের কাঁধের কাছটায় হাড় নড়ে গেছে। এক্স-রে করে দেখা গেল ডান হাতটার কব্জিও ভাঙ্গা (ছবিটায় একটু ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে ডার হাতের কব্জিটা ফুলে আছে )। ডান হাতটাও প্লাস্টার করে ফেললে এর খাওয়ার গতি কী হবে? আপাতত একে কোনও প্রকারেই রাজি করানো গেল না।

এর গুছিয়ে বলার মত বয়স এখনও হয়নি। তবুও এই অবস্থার কারণ ভাসা ভাসা যেটা জানা গেল কেউ একজন একে নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে পিটিয়েছে। কেন, এটা জানতে চাইলে অষ্পষ্ট করে যেটা বলল কারও ব্যাগ ধরে এ নাকি টানাটানি করেছিল। এর গায়ে আমি কিছু ফোসকাও দেখেছি। অনুমান করি, এগুলো সিগারেটের ছ্যাকা। আমার ধারণা এ হয়তো খাবারের লোভে কারও ব্যাগে হাত দিলেও দিতে পারে তবে ব্যাগ নিয়ে যাবে এর পেছনে শক্ত যুক্তি নেই কারণ ব্যাগ নিয়ে গিয়ে কেমন করে ওটা দিয়ে পয়সা পাওয়া যায় এই বুদ্ধি এর এখনও হয়নি।

সমরেশের একটা লেখা আছে এমন: “...মানুষ এবং জন্তুর মূল পার্থক্য হলো, জন্তু চিরকাল জন্তুই থেকে যায়। দু’হাজার বছর আগে একটা গরু যেভাবে ঘাস খেত, দিন কাটাত, আজো সে সেভাবেই ঘাস খায়, দিন কাটায়। কিন্তু মানুষ প্রতিদিন যে জ্ঞান অর্জন করে সেটা সে তার সন্তানের জন্য রেখে দেয়। যে যেখান থেকে শেষ করছে তার সন্তান সেখান থেকে শুরু করে...।
মানুষের সঞ্চিত জ্ঞানই সভ্যতার মূল স্তম্ভ। আমরা আসলেই কী সভ্য হয়েছি? ভাগ্যিস, আমাদের পেটের ভেতরের একপেট আবর্জনা ঢেকে থাকে বিভিন্ন প্রকারের চামড়া দিয়ে আর বাকীটা আমরা ঢেকে রাখি বিভিন্ন আদলের চকচকে কাপড় মুড়িয়ে। নইলে কী ভয়াবহ কান্ডই না হতো তাহলে একপেট আবর্জনা উম্মুক্ত হয়ে যেত। পশু এবং মানুষকে আলাদা করাটা মুশকিল হয়ে পড়ত।

পশু ভাগ্যবান তাকে কাউকে বয়ে বেড়াতে হয় না। মানুষকে সর্বদা কাঁধে করে বয়ে বেড়াতে হয় গা ঘিনঘিনে এক পশুকে। পশু বেচারার কষ্টের শেষ নেই কারণ সে ইচ্ছে করলেই মানুষ হতে পারে না কিন্তু মানুষের যে বাড়তি সুবিধাটুকু সে ইচ্ছা করলেই চট করে পশু হয়ে যেতে পারে। নিমিষেই দু-পা থেকে চার পায়ে রূপান্তর...।

সহায়ক সূত্র:
১. জননী: http://www.ali-mahmed.com/2013/11/blog-post_23.html