Monday, January 26, 2015

ফরমালিনে চুবানো এক শব!

মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগমকে নিয়ে নতুন করে আর চর্বিতর্চবণ করি না। এই অসমসাহসী মানুষটা যে কেবল পাক-বাহিনীকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছিলেন এমনই না নিচিহ্ন করে দিতে অসাধারণ সহায়তাও করেছিলেন। তাঁর কারণে মুক্ত হয়েছিল মুকন্দপুর এবং আশেপাশের বিশাল এক এলাকা [১]

বেশ কিছুদিন পূর্বে তাঁর টিউমার অপারেশনের প্রয়োজন হলে কেবল এই প্রজন্মই না নামকরাসব ডাক্তার বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মমতার হাত। আমি লেখায় সেইসব ডাক্তারদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলাম [২]
আজ মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগম সকাল-সকাল ফোন দিয়ে আমাকে জানালেন তিনি গুরুতর অসুস্থ- চিকিৎসার জন্য মুকুন্দপুর থেকে এখানে আসছেন। তাঁর এলাকার একজন ডাক্তার (যিনি এই হাসপাতালেই কর্মরত) সায়েরা বেগমকে এখানে এসে চিকিৎসা করাবার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে এটাও একটা কারণ।
আমি খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলেছিলাম, যাক, তাঁর এলাকার ডাক্তার যখন তখন আমার কাজ অনেকটা কমে গেল।

'রাজু মাস্তান' এবং তার মা-বোনকে নিয়ে এক উৎকট ঝামেলায় আটকে ছিলাম, পরে কোনও দিন নাহয় এই অভিজ্ঞতার কথা বলা যাবে। তদুপরি সায়েরা বেগমের সঙ্গে এই ডাক্তারের কাছে যখন উপস্থিত হলাম তখন আমি মনখারাপকরা শ্বাস ফেললাম। কারণ রায়হান উদ্দিন ভূঁইয়া নামের এমবিবিএস এই ডাক্তারের লেবাসে, প্রথমদর্শনে দেখে সাধারণ মানুষের কাছে এটাই মনে হবে মানুষটা ধার্মিক, বড়ো সৎ। কিন্তু এই মানুষটার এমনসব কথা আমি জানি যা তার 'চেহারা-ছবির' সঙ্গে যায় না- যার বেশ কিছু অকাট্য প্রমাণও আমার কাছেই আছে।

তবুও আমার প্রবল আশা ছিল যেহেতু তিনি সায়েরা বেগমের এলাকার মানুষ অন্তত এই ভদ্রমহিলার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করবেন। একই এলাকার যেহেতু, মুক্তিযুদ্ধের সময় সায়েরা বেগমের অসামান্য কাজ সম্বন্ধে তার অজানা থাকার প্রশ্নই আসে না- আউট অভ কোশ্চেন। যে এলাকায় ডাক্তারমানুষটা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ে উঠেছে সেই এলাকা মুক্ত হয়েছিল এই সায়েরা বেগমের কারণে এটা তার অজানা থাকার কথা না।

ডা. রায়হান, সায়েরা বেগমকে কিছু টেস্ট করতে দিলেন। কিডনির একটা পরীক্ষা, ইসিজি এবং বুকের একটা এক্স-রে। খুব জরুরি একটা কাজে মাত্র দশ মিনিটের জন্য আমি অন্যত্র গিয়েছিলাম- এরই মধ্যে যা হওয়া তা হয়ে গেল। সায়েরা বেগমের মুখে যেটা আমি পরে শুনেছি। ডা. রায়হান এই টেস্টগুলো করার কথা বলে ব্যবস্থাপত্র সায়েরা বেগমের হাতে দেননি, দিয়েছেন এক ক্লিনিকের দালালের কাছে। সেই দালাল এদেরকে নিয়ে গেছে ডাক্তারের বলে দেওয়া সেই নির্দিষ্ট ক্লিনিকে।

একগাদা টাকার বিনিময়ে পরীক্ষাগুলো সেখানেই করা হলো কিন্তু ডা. রায়হান কেন এমনটা করলেন? উত্তরটা খুব সোজা। কিন্তু সেই উত্তরটা আমি পাঠকের কাছেই ছেড়ে দিলাম।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে এটাও লক্ষ করেছি এই ডাক্তার ব্যবস্থাপত্রে সায়েরা বেগমের নামটা লিখেছে বড়ই হেলাফেলা করে। হিজিবিজি করে লেখা, ‘সায়েরা’, কেবল সায়েরা আর কিচ্ছু না! একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন আগুনমানুষ, একজন সেরাসন্তানের কথা নাহয় বাদই দিলাম বয়স্ক একজন মানুষকে কেউ এমন তাচ্ছিল্য করে লিখতে পারে এটা আমার কল্পনাতেও আসে না।
কোনও চুতিয়া এই কাজটা করলে আমার বিশেষ গাত্রদাহের কারণ ছিল না কিন্তু তাই বলে এমন শিক্ষিত একজন মানুষ কেন এমনটা করবে!

সহায়ক সূত্র:
১. এক অসামান্য মুক্তিযোদ্ধা: http://www.ali-mahmed.com/2013/12/blog-post_16.html
২. ব্যাটন হাতবদল হয় মাত্র: http://www.ali-mahmed.com/2014/02/blog-post_4053.html 

আপডেট, ৩১ জানুয়ারি ২০১৫:
আজ আবারও এই ডাক্তার মহোদয়ের সঙ্গে কথা হলো। আমি তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি এই ভদ্রমহিলার নাম এমন হেলাফেলা করে লিখলেন কেন'?
তিনি উত্তর দিলেন, 'ব্যস্ত থাকি তো'।
বটে রে, এই গ্রহে এই-ই দেখছি বড়ো কাজের লোক অন্যরা সব অকাজের। আরেকটা তথ্য ইনি আমাকে দিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সায়েরা বেগম নাকি তার ফুফু হন। এখন তাহলে আমাকে অতি বিষাদের সঙ্গে বলতেই হয়, আসলে শবটা পচে গেছে বহু পূর্বেই। ভাগ্যিস, শবটা ফরমালিনে চুবানো নইলে অসহনীয় দুর্গন্ধে হড়হড় করে বমি করে দিতাম...।