Thursday, April 9, 2015

পাজি-অসভ্য-ইতর-দানব-খুনি!

অনেকের কাছে ধর্মটা হচ্ছে কাঁচের বাসন। হাত থেকে ফসকে গেল তো ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। লেখার উত্তর লেখা দিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এদের নাই তাই এরা ঝাঁপিয়ে পড়েন চাপাতি নিয়ে। যারা ধর্মের নামে আইন নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন, প্রকাশ্যে রাস্তায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মানবদেহ ফালা ফালা করছেন তাদেরকে দ্রুত আদালতে বিচার করাটা আবশ্যক। এরা খুনি- খুনির প্রতি প্রচলিত আইন যে আচরণ করে থাকে সেই আইনই এদের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। রাষ্ট্র কখনও নিজ হাতে কাউকে আইন তুলে নিতে দিতে পারে না। প্রচলিত আইন যদি তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে তাও অতি দ্রুত কার্যকর করাটাও জরুরি। এই নিয়ে কোনও প্রকারের দ্বিমত নাই। একটি বিষবৃক্ষ নির্মূল হলো। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

এখান পর্যন্ত লেখাটা বড়ই সরল এবার খানিকটা গরল কথা বলি। কখনও বিষবৃক্ষ গাছ আপনাআপনি হয় কখনও বা কেউ সযতনে পরিচর্যা করে লাগায়। সুদীপ্ত সুজয়-এর বদৌলতে আমার এটা দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। কতিপয় ইতরবিশেষ একটা ইভেন্ট চালু করেছে। ইভেন্টটির নাম, ‘নবীজির উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’। শিরোনাম দেখে অনেকে আপ্লুত হবেন, বাহ, নবীজীর প্রতি কী তমিজ! কিন্তু আসল ঘটনা তা না। এই ইভেন্ট খুলে অতি কুৎসিতসব কথাবার্তা, ততোধিক কুৎসিত গালাগালি করা হচ্ছে। কোনও তথ্য-উপাত্তের বালাই নাই, কোনও যুক্তি নাই!

এই তাহলে জ্ঞানের চর্চা, মুক্তমনের চর্চা? মুক্ত মানে অবাধ, স্বাধীন যা-খুশি বলার অধিকার? কারও মৃত্যুশয্যায় তাকে নিয়ে রঙ্গ করার অধিকার- কোনও ভাবগম্ভীর পরিবেশে, জরুরি আলোচনায় ‘ধুমমাচা দে’ গান গাওয়ার অধিকার? তাহলে এই সমস্ত অসভ্যদের জন্য সভ্যতার সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে। এদেরকে কারা-কারা মুক্তমনা বললেন এ নিয়ে আমার কাতরতা নাই কারণ আমার কাছে এরা স্রেফ ‘ইতরবিশেষ তথাকথিত মুক্তমনা’।
বেচারা ভলতেয়ার, "I do not agree with what you have to say, but I'll defend to the death your right to say it." এটা বলেও তিনি এদের কাছে মুক্তমনা হতে পারলেন না।

তো, এরা যদি ভেবে থাকে আমরা এই সব ইতরবিশেষ মুক্তমনাদের এই সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য ‘শাবাসি’ দেব তাহলে ভুল করবেন। আমরা চাইব এই সব ইতরদেরকেও যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসতে। কারণ এরা দানব বানাবার মেশিন! এরা ঠান্ডা মাথায় একটা খেলা খেলছে। ভযংকর এক খেলা। কোটি-কোটি মানুষের বিশ্বাস-আবেগকে পদদলিত করার খেলা! এরাই তারা, যারা রামুতে বৌদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে লুঙ্গির কাছা মেরে নাচের মুদ্রায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আচ্ছা, এবার অন্য প্রসঙ্গ। কারও প্রিয়মানুষকে, কারও মাকে নিয়ে কেউ কুৎসিত কথা বললে তার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে? এখানে যে জেনেভা কনেভনশন কপচানো পন্ডশ্রম এটা ওই মার সন্তানটাকে কে বোঝাবে! এটা জেনেও যে আইন কিন্তু তাকে, তার আবেগকে ক্ষমা করবে না এবং ঠিকই তার প্রাণটাকেও নষ্ট করে ফেলবে, তারপরও। তখন সে একটা খুনি! কিন্তু তার মত ছাপোষা একজন মানুষ, মানুষ থেকে খুনিতে রূপান্তর; ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’- গ্রেগর সামসার আরশোলায় রূপান্তরকেও হার মানায়।
এ যেন অকল্পনীয় রূপান্তর! কিন্তু এই রূপান্তরের পেছনে যুক্তি কী! কেন সে তার মৃত মার জন্য হিংস্র কুকুরের ন্যায় লড়বে? পুরনো ক-খানা হাড়ে এমন কী আছে যা তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য করবে! হয় মরবে নয়তো মেরে ফেলবে। কেন? আসলে এর কোনও উত্তর হয় না। কিন্তু তাকে খুনি বানাবার এই দুঃসাধ্য কর্মকান্ডটা করল কারা?

ওরাই, যারা ভয়ংকর দানব- খুনি বানাবার একেকটা চলমান মেশিন। এই দানবরা নাস্তিক কি আস্তিক, এটা মূখ্য বিষয় না, বিষয়টা হচ্ছে এরা অপরাধি। নাস্তিক হওয়াটা কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ না এবং কে নাস্তিক হবেন এটা তার নিজস্ব বিবেচনা। কিন্ত এই সব ইতরামি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ । অতি শীঘ্রই এই ইতরদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসাটা আবশ্যক। সেটা কোনও ধর্মের ব্যক্তিত্বকে নিয়ে করুক বা অন্য কাউকে। ‘রামজীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’ নিয়ে ইভেন্ট চালু করলেও আমার বক্তব্য হুবহু একই থাকবে। “তপস্যা করার অপরাধে রামচন্দ্র খড়গ দিয়ে ‘শম্বুক’ নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন” (শম্বুক শূদ্র হওয়ার অপরাধে) -বাল্মীকির রামায়ন। এটা বললে আমি ধৈর্য ধরে শুনব কারণ এর পেছনে তথ্য আছে কিন্তু রামকে নিয়ে ইতরতা করলে আমি ধৈর্যহারা হবো।

মুক্তমনার আভিধানিক অর্থ কি এটা নিয়ে অভিধানে-অভিধানে চালাচালি-খোজাখুঁজি-খোলাখুলি চলতে থাকুক। আমি আমার সাধারণ জ্ঞানে বুঝি, জ্ঞান হচ্ছে সরলরেখা আর জ্ঞানহীনতা হচ্ছে বৃত্ত। মুক্তমনের লোকজনেরা কোনও বৃত্তে আটকে থাকবেন না- কেবল এগিয়ে যাবেন। তাঁর হাঁটার রাস্তায় কাকের কর্কশ রব যেমন থাকবে তেমনি সুকন্ঠী পাখির সুরেলা বোলও। হাস যেমন ঘোলা জল থেকে তার খাবার পানিটা বের করে নেয় তেমনি তিনিও সমস্ত অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে নিয়ে আসবেন।

আমি পূর্বেও বিভিন্ন লেখায় স্পষ্ট করে বলেছি, আমি কোনও বিশেষ ধর্মের অবমাননা বুঝি না আমি বুঝি সমস্ত ধর্মের অবমাননা। মধ্যরাতে ওয়াজের নামে আট-দশটা চোঙ্গা লাগিয়ে যখন হিন্দু ধর্মের ব্যক্তিত্বদের মুন্ডুপাত করা হয় তখন সেটাও ধর্মের অবমাননা। আরজ আলী মাতুব্বর ঘোর নাস্তিক ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের বিপক্ষে প্রচুর লেখা রেখে গেছেন কিন্তু তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে কেউ এটা দেখাতে পারবেন না যে তিনি কোনও ধর্ম নিয়ে কুৎসিত কথা বলেছেন বা গালাগালি করেছেন অথবা অযথা ছোট করার চেষ্টা করেছেন। যেটাই বলেছেন তার যুক্তি দিয়ে বলেছেন কারও আপত্তি থাকলে যুক্তি খন্ডন করুক তাতে কোনও সমস্যা নাই।

গোল্ডা মায়ারের চমৎকার একটা কথা আছে, ‘নিজ হাতে হত্যা করা এবং হত্যা করার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই’। আমি এর সঙ্গে যোগ করি, হত্যা করা বা হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করার মধ্যেও খুব একটা তফাত নাই।

No comments: