Wednesday, December 17, 2014

আমাদের ইশকুল- আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের মুক্তিযোদ্ধা।

পথশিশু সংগঠনের সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন স্কুলে (আমাদের ইশকুল) আমি পড়াবার জন্য কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি। তিনি এটাও জানালেন তারা ‘ইব্রাহিম মেথড’ (দুর্বল স্মৃতি থেকে লিখছি ইব্রাহিম নামটা ভুল হওয়ারা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না) অনুসরণ করেন।
আমি সলাজে বললাম, আমি তো কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি না। ধারণা করি, তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি গোপন করেছিলেন।

যে শিক্ষক এই স্কুলে পড়ান তাকে আমি আগেভাগেই বলে দিয়েছিলাম, এই বাচ্চাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতিতে আমি পড়াতে চাই না। স্কুলে আধ-ঘন্টা এরা বিভিন্ন খেলা খেলবে এরপর আধ-ঘন্টা পড়া। পড়ার সময়টা আমি খুব বেশি সময় রাখতে চাইনি। কারণ তাহলে এরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না।
স্টেশনের অধিকাংশ বাচ্চাকে আমি হাতের তালুর মত চিনি- আমি জানি কে আজ দুপুরে খেয়ে আসেনি, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত! অভুক্ত, স্বপ্নহীন বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা কতোটা কঠিন এটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি।

একদিন এদেরকে বাংলা পড়ানো হয় তো অন্যদিন ইংরাজি। একদিন কেবল গল্প। শিক্ষামূলক কিছু গল্পের সঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প আমি এদেরকে শিখিয়েছি। বড়ো সহজ-সরল একটা গল্প:
এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার ছেলে রাজকুমার। রাজকুমার খুব দুষ্ট ছিল। সে চুরি করত, মিথ্যা কথা বলত। মা-বাবার কথা শুনত না। স্কুলের যেত না। আল্লাহ একদিন তাকে শাস্তি দিলেন। তার গায়ের রঙ কালো হতে থাকত। কালো হতে হতে সে একদিন কাক হয়ে গেল। সে আর মানুষ হতে পারল না। 
গল্পের যে জায়গাটায় কাকের কথা আসে তখন বাচ্চারা কা-কা করে চিৎকার জুড়ে দেয়। এ বলার অপেক্ষা রাখে না এই গল্পটা এদের শেখাবার পেছনে আমার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। 

ওহ, একদিন ধর্ম পড়ানো হয়। একজন স্কুল দেখতে এসে আমাকে নাহক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শ্লেষভরা কন্ঠে বলছিলেন, 'মিয়া, তুমি তো বিশেষ ধর্মকর্ম পালন করো না তাহলে আরবি পড়াবার ব্যবস্থা রেখেছো কেন'?
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, 'আরবি না, একদিন ধর্ম পড়াবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে মুসলমান ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের শিশু নাই থাকলে সে ধর্ম পড়াবারও ব্যবস্থা থাকত'।
ওরে শ্লা...শোনো কথা, এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো নির্বোধ আমি [১]- আমি স্মোক করি বলে কী এদেরকেও স্মোক করা শেখাব!

তো, একদিন থাকে আঁকাআঁকি। আমি দেখেছি বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ আঁকাআঁকিতে। ওদিন স্কুলে উপস্থিতির হারও থাকে বেশি। আঁকাআঁকির কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। যার যেটা খুশি আঁকে। স্কুলে আমি উপস্থিত থাকলে বলি, ভূতের ছবি আঁকো। বাচ্চারা ভূতের ছবি আঁকে। বাচ্চারা অবলীলায় হাস্যকর ভূতের ছবি আঁকে। কারণ একদিন এদেরকে বলে দিয়েছিলাম, ভূত বলে কিছু নেই।

এখানকার শিশুরা হাবিজাবি অনেক কিছুর সঙ্গে এটাও জানে পৃথিবী গোল, তিন ভাগ পানি এক ভাগ মাটি। পৃথিবী স্থির না, কেমন করে দিন-রাত হয়। এরা এটাও জানে কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে জুতা চমৎকার পরিষ্কার হয়, চকচক করে। কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে নিমিষেই দাঁতও পরিষ্কার, ঝকঝক হয়।

স্কুলে মাস্টার মশাইয়ের জন্য আমার তৈরি করা একটা তালিকা আছে। এই তালিকা ধরে-ধরে এদেরকে শেখানো হয়। পড়ান মাস্টার সাহেব- কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই হুটহাট করে আমি হাজির হয়ে যাই। অল্প সময়ে হাবিজাবি বলে আমি উধাও।
দু-দিন পূর্বে মাস্টার মশাই পড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস নিয়ে। আমাদের কাছে শুনতে যত সহজ মনে হোক বিষয়টা এদের কাছে অতি কঠিন। যে বাচ্চাগুলো তীব্র শীতে ঘুমায় স্টেশনে অধিকাংশ সময় অভুক্ত থাকে এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা খুব একটা বোধগম্য বিষয় এটা আমি বিশ্বাস করি না। তো, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে মাস্টার মশাইকে দেখলাম শীতেও গলদঘর্ম হতে। শিক্ষক-ছাত্র কাউকে দোষ দেওয়া চলে না।

আমি অন্য পথ ধরলাম। এদেরকে বললাম, দেখো, স্বাধীনতা মানে হচ্ছে, অনেকটা নিজের বাড়ি আর পরের বাড়ির মত। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে যা খুশি করতে পারবে কিন্তু পরের বাড়িতে পারবে না। যেমন ধরো, তোমাদের অনেকেই স্টেশনে থাকো। সরকারি লোকজন যখন খুশি তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে কিন্তু নিজের বাড়িতে কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না। আলাপচারিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসল কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে কোন প্রকারেই এদেরকে ভাল করে বোঝানো গেল না।

পরের দিন। স্কুলের বাচ্চারা খেলছে। একজন খর্বাকৃতি মানুষ আসলেন বগলে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কান পরিষ্কার করব কি না। আমি বিরক্ত। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে গিয়ে জমে গেলাম। মানুষটার বুকে ছোট্ট একটা ব্যাজ- আমার বোঝার বাকী রইল না মানুষটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি সটান দাঁড়িয়ে গেলাম। বাচ্চাদেরকে বললাম, 'সবাই দাঁড়াও। আমাদের মাঝে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা বসে থাকতে পারি না। যিনি অস্ত্র হাতে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই আমরা একটা পতাকা পেয়েছি, একটা দেশ পেয়েছি। আমাদের মা যে ভাষায় কথা বলেন আমরা সেই ভাষায় অনায়াসে কথা বলতে পারি'। তোমরা মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলে। ইনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
স্কুল থেকে বেরিয়ে আলি আহমেদ নামের এই মানুষটার সঙ্গে কথা হয়। খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যখন তিনি যুদ্ধে ছিলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯! যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পূর্বে মোজাহিদ ছিলেন। তাঁর এলাকা ছিল সালদানদী, কসবা। ছোটখাটো এই মানুষটাই অবলীলায় গুলি ছুড়েছেন ২০ রাউন্ডের এসএলআর দিয়ে। যুদ্ধে তিনি ভয়ংকর রকমের আহত হন। আর্টিলারি শেল দিয়ে সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। এখনও তিনি বহন করে চলেছেন শরীরে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত। মানুষটাকে নিয়ে অন্য একদিন বিশদ লেখা ইচ্ছা রইল। তাঁর তাড়া, আমারও।

কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বাচ্চাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বারবার সংকোচের সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। না-কামানো দাঁড়িভরা মুখটা নেড়ে নেড়ে বলছিলেন, 'আরে না, কী বলেন, আমি কেন'!
আমার অনুরোধ ফেলতে না-পেরে বড়ো সংকোচ নিয়ে দাঁড়ালেন।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই হয়ে গেছে সেই কবেই, দলবাজির বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে। তাই কী, এঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা তুচ্ছ সম্মান পেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর চোখ ভরে আসে...!

সহায়ক সূত্র:
১. নিবোর্ধ মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_7.html 

ম্টেশনে বাচ্চা আর কয়জন পড়বে এটা ভেবে ছোট্ট একটা কামরা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান ভুল ছিল। এমনিতে সবাই একই দিনে উপস্থিত থাকে না কিন্তু তারপরও জায়গার সংকুলান হয় না। এর উপর যেদিন আঁকাআঁকি থাকে সেদিন আমরা বিপদে পড়ে যাই কারণ তখন অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তখন আমাদের দাঁড়াবার জায়গা থাকে না। তবুও সুখ রে সুখ...!