Saturday, November 29, 2014

জননী।

স্টেশনে শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন এই শিশুটিকে পূর্বে কখনও দেখেছিলাম সম্ভবত, খুব ভাল খেয়াল নেই! এর সঙ্গের লোকজন চিকিৎসার নাম করে টাকাপয়সা উঠাতো। চিকিৎসার নাম করে টাকাপয়সা উঠিয়ে কারও-কারও রুজিরোজগার মন্দ হয় না।
সোজা কথায় শিশুটি একটি পণ্য, লাভজনক পণ্য। সবই পণ্য, বিক্রির জন্য।

আজ একে দেখলাম প্ল্যাটফর্মে পড়ে আছে, গায়ে একটা সুতোও নেই। ভাতবিক্রেতা মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন এই শিশুটির বাবা একে ফেলে গেছে, উধাও! স্টেশনেরই একজন রোগা-রোগা কালোমতন মহিলা নাকি একে গোসল করিয়েছেন, ভাত খাইয়েছেন। আমার বিস্ময়ের শেষ নেই কারণ এই মহিলাকে আমি প্রায়ই দেখি, এর তো নিজেরই থাকা-খাওয়ার ঠিকঠিকানা নেই। অথচ এই মানুষটাই শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছেন এটা সমস্ত অংক এলোমেলো করে দেয়। এই মহিলা আমাকে বারবার এটা বলতে লাগলেন এর দায়িত্ব নিয়ে তিনি না কোনো প্রকারের ঝামেলায় পড়েন।

স্টেশনে তখন আমি একজন দায়িত্বশীল মানুষের দেখা পেয়ে গেলাম। রেলওয়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তা। মানুষটা অন্য একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যেখানটায় চা খাচ্ছেন, এই শিশুটির কাছ থেকে সামান্যই দূরে। আমি তাকে বললাম একটু এসে এই শিশুটিকে দেখে যেতে। বিস্তর চাপাচাপি করেও এই ভদ্রলোকটার (!) পা ফাঁক করানো গেল না! যদি শিশুটিকে দেখে ফেললে বাড়তি কোনও দায়িত্ব চাপে, তাই। আমাকে পরামর্শ দিলেন জিআরপি ওসির কাছে লিখিত আকারে জানাতে। এই বিষয়ে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা বড়ই তিক্ত। একবার ও-রাস্তা মাড়ালে জীবনটা ভাজা-ভাজা হয়ে যাবে। এমন সব প্রশ্ন করা হবে যেটা আমি তো দূরের কথা শিশুটির বাপও জানে কিনা সন্দেহ।
এই গোয়েন্দাপ্রবরকে দেখে কেবল এই ভাবনাটাই কাজ করছিল রেলওয়ে এদের পোষে কোন কাজে? এরপর আমি অন্য রাস্তা ধরলাম। সেই রাস্তার অলিগলির খোঁজ দিতে চাই না, ‘অসুবিদা’ আছে।

এই সমস্যা সমাধানের পর চটজলদি এই শিশুটির জন্য কিছু গরম কাপড়-টাপড়ের প্রয়োজন দেখা দিল। এহ রে, খানিক ঝামেলা হয়ে গেল। মাসের শেষ, টানাটানি চলছে। উপায় একটা বের হয়, কাজ তো থেমে থাকে না। নাদুসনুদুস একজনকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসতে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। এই মানুষটার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা আছে এবং পূর্বের কিছু ঘটনাও আছে, সে অন্য প্রসঙ্গ।
আমি ঝলমলে মুখে বললাম, ‘আরে-আরে, কি খবর- আমি তো আপনাকেই খুঁজছি’। মানুষটা মুখ একহাত লম্বা করে কষ্টার্জিত হাসি হাসলেন কারণ তিনি এটা বিলক্ষণ জানেন তাকে খোঁজাখুঁজি করার পেছনে আমার কোনও-না-কোনও একটা ঝামেলা জড়িয়ে আছে। আমি আবারও বললাম, ‘আরে-আরে, কী কান্ড, আপনার স্বাস্থ্য যেহারে বাড়ছে...’।
তিনি আমাকে কথা শেষ করতে দিলেন না হাত তুলে থামিয়ে বিরস মুখে বললেন, ‘ব্যস-ব্যস, আর বলতে হবে না। রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে চট করে সরতে পরব না, কোনও একটা গাড়ি চাপা দিয়ে চলে যাবে, এইসব তো। তা আপনার কত টাকা দরকার’?

আমি বিষম চিন্তায় পড়ে গেলাম। জনে-জনে লোকজন যেভাবে আমার চাল বুঝে ফেলছে এ তো বিরাট সমস্যা,ভবিষ্যৎ অন্ধকার! যাই হোক, মানুষটার কল্যাণে এই শিশুটির জন্য কম্বল, গরম কাপড়ের ব্যবস্থা হয়। স্টেশনে যে মহিলা ভাত বিক্রি করেন তাকে বলে নিয়মিত ভাত খাওয়ার একটা ব্যবস্থাও হলো। ফিরে আসতে আসতে আমার মাথায় যেটা ঘুরপাক খাচ্ছিল সব মিলিয়ে নড়বড়ে একটা ব্যবস্থা হলো বটে কিন্তু এটা তো কোনও স্থায়ী সমাধান না। আর এই মহিলাটির কথাও ঘুরে ঘুরে আসে, তার এই মমতার উৎস কী?
এই মহিলার সঙ্গে কখনও বাচ্চাকাচ্চা দেখিনি-তবে কী অদেখা সন্তানের মায়া ঝপ করে নেমে আসে!।

আমাগো জুতাওয়ালা!

ছবি সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ নভেম্বর, ২০১৪
যে ভঙ্গিতে মিডিয়াগুলোয় জুতা এবং বিস্তৃত দন্তরাজিসহ যে ছবি এসেছে, দেখে মনে হচ্ছে, এরা উঠেপড়ে লেগে গেছেন এটা প্রমাণ করতে নিজেদের জুতার কারখানা থেকে যে জুতা প্রস্তুত করেছেন তা বড়ই টেকসই, বিশ্বমানের...।

লতিফ সিদ্দিকীকে আদালতে আইনজীবীরা জুতা দেখিয়েছেন এটাকে কিছু মিডিয়া আবার অনাবশ্যক ভাবে তাদের করা প্রতিবেদনের ঢুকিয়ে দিয়েছে আবার কেউ-কেউ খুব ‘শাবাসী’ দিয়ে ছাপিয়েছে। ভাবখানা এমন, খুব একটা কাজের কাজ হয়েছে, যাহোক! এই সমস্ত মিডিয়ার যুক্তি হয়তো এমন, কোনও পেশার আচরণবিধির কোনও বালাই থাকতে নেই। তাই তো, সন্তানহারা মার মুখের সামনে ‘বুম’ ধরে এরা অবলীলায় জিজ্ঞেস করতে পারেন, আপনার অনুভূতি কেমন?
কে জানে, এরা হয়তো কোনও একদিন অফিসের টেবিলে গামলায় করে বাথরুম থেকে এক খাবলা ‘হলুদ ফুল’ এনে রেখে দেবেন এই যুক্তিতে, আহা, শরীরসংক্রান্ত বিষয় যে ফেলতে বড়ই মায়া লাগে। আমাদের সবচেয়ে আস্থার জায়গাটায় যখন জুতা প্রদর্শনের এমন ঘটনা ঘটে তখন বিমর্ষ হই কিন্তু মিডিয়া যখন এটাকে পজিটিভ ভাবে দেখাবার চেষ্টা করে তখন আতংকিত হই!

এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না আদালতে এহেন ঘটনা কোনো প্রকারেই কাম্য না। সাধারণ মানুষ যখন এটা করে তখন আমরা খানিকটা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি কিন্তু যখন কতিপয় আইনজীবী আদালতে প্রকাশ্যে এই কান্ড করেন তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, শেষ পর্যন্ত ‘আইনজীবীট্রাস’, তুমিও! আদালতের মর্যাদা সমুন্নত রাখাই যাদের কাজ, তাঁরা কেমন করে সচেষ্ট হন আদালতকে এমন অমর্যাদায় ভাসিয়ে দিতে? আমরা ভুলিনি এদের অগ্রজরাই যে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির দরোজায় লাথি মেরেছিলেন? আদালত অন্ধ- এই আইজীবীরাই হাত ধরে ধরে আদালতকে চেনান এটা আলো, এটা অন্ধকার, এটা সত্য এটা অসত্য। অন্ধ আদালত ক্রমশ চোখ মেলে তাকায়। তদুপরি এই আইনজীবীরা কেমন সহজেই বিস্মৃত হলেন তাঁদের শপথের কথা? THE BANGLADESH LEGAL PRACTITIONERS AND BAR COUNCIL ORDER AND RULES, 1972-এর 62(2) এর শপথনামায় বলা হচ্ছে, OATH OF ADVOCATE:
“I, … … … … … … … … … … … … ... DO HEREBY SOLEMNLY TAKE THE OATH OF AN ADVOCATE AS I UNDERTAKE TO UPHOLD AT ALL TIMES THE DIGNITY AND HIGH STANDING OF MY PROFESSION, ... ...I WILL NOT COLLABORATE IN ANY ACTION WHICH VIOLATES THE CONSTITUTION. I WILL ALWAYS BE VIGILANT IN THE PROTECTION OF HUMAN RIGHTS AND THUS WORK TOWARDS BUILDING “A SOCIETY IN WHICH THE RULE OF LAW, FUNDAMENTAL HUMAN RIGHTS AND FREEDOM, EQUALITY AND JUSTICE, POLITICAL, ECONOMIC AND SOCIAL WILL BE SECURED FOR ALL CITIZENS.”[1]
1. Subs. by Gazette Notification dt June 3, 1999

এডভোকেট আচরণবিধি হিসেবে অধ্যায় ১-এ আইনজীবীদের প্রতি আচরণ ১-১১ দফার:
“৭] এডভোকেট নন, মামলা করেন মক্কেলগণ। মামলার পক্ষভুক্ত বাদী-বিবাদীর মধ্যে যত খারাপ সম্পর্কই থাকুক না কেন তা যেন মামলা পরিচালনার সময় আইনজীবীগণের আচরণের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার না করে। আইনজীবীদের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বৈশিষ্টের দিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য রাখা শিষ্টাচারের লংঘন। মামলা নিস্পত্তিতে বিলম্ব ঘটায় ও আদালতে অশালীন বিশৃঙ্খলা জন্ম দেয় এমন কথাবার্তা আইনজীবীদের সচেতনভাবে পরিহার করে চলতে হবে।

আমরা ভুলে গেলেও আইনজীবী মহোদয়গণের এটা ভোলার কিন্তু কোনও উপায় নেই যে লতিফ সিদ্দিকী কিন্তু এখনও অভিযুক্ত, অভিযোগ প্রমাণ হয়ানি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাঁর বিচার হবে, সমস্যা তো নেই তারপরও আদালতে জুতা দেখিয়ে আমাদের আইনজীবী মহোদয়গণ কী প্রমাণ করতে চাইছেন? আপনারা কী আপনাদের শপথের প্রতি, আপনাদের আচরণবিধির প্রতি সুবিচার করেছেন, ডিয়ার 'ফাজিল দোস্ত (হিন্দি)' ওরফে বিজ্ঞ আইনজীবী?