Friday, November 14, 2014

কাঠগড়ায় দাঁড়াও, লালন-নজরুল!

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছেয়ে গেল দেবাশীষ দাস নামের একজন ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন এবং তাকে গ্রেফতার করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। পত্রিকার একটা লিংক: (http://www.jugantor.com/bangla-face/2014/11/06/169648)

এরই রেশ ধরে দেবাশীষের বাড়ি যেটার নাম, ‘দয়াময় শান্তি নীড়’ ভাংচুর করা হয়েছে এবং হিন্দু ধর্মাম্বলীদের লোকনাথ মন্দির, কালীমন্দির, রামঠাকুরের মন্দির, দয়াময় মন্দির, অনুকুল ঠাকুর মন্দিরসহ পাঁচটি মন্দিরে হামলাও করা হয়েছে। রামঠাকুর, দয়াময় এরা কেউই দেবাশীষকে বলেননি, যাও, বেটা মুসলমানদেরকে উসকে দিয়ে এসো কিন্তু ঠিকই এদের মন্দিরে আঘাত এসেছে।

দেবাশীষ অন্যায় করে থাকলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আসবে কিন্তু জোশভরা মুসলিম ভাইয়েরা যে আচরণ করলেন এটার উত্তর খোঁজা বাতুলতা মাত্র। বা এই জোশিলা ভাইজানদের আইনের আওতায় আনা হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করাও! ‘সংখ্যলঘু’ নামে একটা চলমান দানব আছে যার কাঁধে ভর দিয়ে বাংলাদেশে অনায়াসে মন্দির ভেঙ্গে ফেলা যায় আবার ভারতেও ঈদের জামাতে শুয়োরের পাল ছেড়ে দেয়া যায়। বিভিন্ন ছলাকলায় আইন এদের কেশাগ্রও স্পর্শ করার সুযোগ পায় না।

দেবাশীষকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে...আপাততদৃষ্টিতে সব্‌ই সোজাসাপটা। কিন্তু এটা জানা প্রয়োজন যে দেবাশীষ অন্যায়টা করেছিলেন কি? তিনি লালনের একটি গান ফেসবুকে শেযার করেছিলেন। যেটা মোশতাক আহমেদ সম্পাদিত ‘লালন বেদের গোপন খবর’- বইয়ের ১৪১ নম্বরে আছে। লালনের এই গানটি কি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ? উত্তর হচ্ছে, না। তাহলে এটা শেয়ার করে দেবাশীষ কি এমন গুরুতর অপরাধ করেছেন।

তদুপরি ফেসবুকে এই গানটি শেয়ার করার পর ফেসবুকে অনেকে আপত্তি জানালে দেবাশীষ দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “আমি (ইসলাম ধর্মকে) নিয়ে কোনও খারাপ কথা লিখিনি। আমি একজন নিরাকার উপাসক। আমি লালনের একটি গান শেয়ার করেছি। এতে কোনও ভাই কষ্ট পেলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থী”।

দেবাশীষ সাধক মহর্ষি মনমোহন দত্তের অনুসারি। বাড়ির নামের সঙ্গে যেমন দয়াময় যুক্ত আছে তেমনি তিনি নিজের নামের সঙ্গে দয়াময় যুক্ত করেছেন, ‘দেবাশীষ দয়াময়’।
( Masuk Hridoy )  বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যেটা জেনেছেন সেটা এখানে তুলে দেই,
চরলালপুর এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ি মাসুদ রানা বলেন, দেবাশিষ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। তাকে এলাকার মানুষ ভাল ছেলে ও নিরীহ প্রকৃতির হিসেবেই চেনে ও জানে। কোন ধরণের উসকানির উদ্দেশ্যে সে এমন কাজ করেনি।
লালপুর বাজারের একাধিক ব্যবসায়ি বলেন, এলাকার কিছু টেটনা (বদ) দেবাশিষকে ঘায়েল করতে অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে ক্ষিপ্ত করেছে।“
দেবাশীষের মামলার আইনজীবি অ্যাডভোকেট নাসির মিয়া বলেন, ... আর যদি দিয়েও থাকে (লালনের গান) তাহলে এটা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দন্ডনীয় অপরাধ নয়। যেহেতু লালনের গানটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু এটা অবিকৃত অবস্থায় প্রচার করলে তথ্য প্রযুক্তি আইনে এটা অপরাধ নয়। আর যদি এতে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত আসে তাহলে সরকারেরই উচিত এটা নিষিদ্ধ করা। তিনি (আরও) বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি সংক্রান্ত বিরোধে স্থানীয় প্রতিপক্ষের কিছু নেতা কথিত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ছুতোয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় তাকে আসামি করেছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জানালার কাঁচ ও মন্দির ভেঙ্গে ফেলা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অপব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।“ 

এই গান লেখার অপরাধে লালনকে অবিলম্বে তথ্য ও যোগাযোগ আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য জোর দাবী জানাই পাশাপাশি ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!’, এটা লেখার জন্য কাজী নজরুল ইসলামকেও।

* ছবি এবং বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন, Masuk Hridoy। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

**লেখাটা ফেসবুকে শেয়ার করার পর আমার একটা গুরুতর ভুল ধরিয়ে দেন প্রজন্ম ছিয়াশি। ওখানে তিনি মন্তব্য করেন,
"জোশভরা মুসলিম ভাইদের উল্লেখ না করলেই ভাল হতো, কারণ দেবাশিসের আইনজীবী কি বলেছে?

"
...'তিনি (আরও) বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি সংক্রান্ত বিরোধে স্থানীয় প্রতিপক্ষের কিছু নেতা কথিত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ছুতোয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় তাকে আসামি করেছেশুধু তা-ই নয়, তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জানালার কাঁচ ও মন্দির ভেঙ্গে ফেলা হয়তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অপব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি'।

মানে কমিটি নিয়ে ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ ক্যাচাল এটা জোশভরা মুসলিম ভাইদের কথা না বলে ষড়যন্ত্রকারী জোশভরা ছাত্রলীগ ভাইদের কথা বলুন
।"

আমার উত্তর ছিল:
"এই লেখার সঙ্গে জোশভরা মুসলিম ভাইয়েরাথাকাটা কেবল অসামঞ্জস্যই না, অপরাধও বটেএখানে জোশভরা মানুষলেখাই সমীচীন ছিল

এটা আমার অনিচ্ছাকৃত ভুলতদুপরি এর দায়-দায়িত্ব আমার উপরই বর্তায়দায়টা আমার কাঁধে নিয়ে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করিএবং ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতাধন্যবাদ, ভাল থাকুন
"

বড় লোভ হে...।

‘আমাদের ইশকুল’ গুটিগুটি পায়ে প্রায় পাঁচ বছরে পড়ল। ২০১০ সালের শুরুতে আমি এবং আমার এক বন্ধু, শুরু হয় এই স্কুলের যাত্রা। করতে চেয়েছিলাম বৃদ্ধাশ্রম। করতে না-পেয়ে শুরু করেছিলাম স্কুল। তখন একসঙ্গে তিনটা স্কুলের কাজ চলত। একটা হরিজনপল্লী যেটার চালু নাম মেথরপট্টি সেখানকার শিশুদের জন্য। অন্যটা ছিল চোখে দেখতে পান না সেইসব মানুষদের সন্তানদের জন্য এবং তৃতীয়টা ছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যাদের অধিকাংশই ছিল পিতা-মাতাহীন।

স্কুলগুলো পরিচালনার জন্য অর্থের যোগানের ব্যবস্থা করতেন তিনি মানে আমার বন্ধু আর অন্য সমস্ত কাজ দেখার দায়িত্ব ছিল আমার। এক বছরের মাথায় কোনও প্রকার আগাম সতর্কতা না-দিয়েই তিনি অর্থের যোগান বন্ধ করে দিলেন। হয়তো কোনও প্রকারের সীমাবদ্ধতা হবে কিন্তু আমাকে না-জানানোটা মোটেও ভাল কাজ হয়নি! আমি পড়লাম পানিতে। এখন কী করি, কোথায় যাই কার কাছে যাই? তিন তিনটা স্কুলের তিনজন টিচারের সম্মানী, তিন তিনটা ঘর ভাড়া তো চাট্টিখানি কথা না আমার জন্য। তখন আবার আমার মাথার উপর বিপদ, ভীষণ বিপদ। বহুজাতিক এক কোম্পানির সঙ্গে লড়াই শুরু করেছি মাত্র। অসম এক লড়াই- যেটা কেবল আমার মত বোকা মানুষের পক্ষেই সম্ভব। গুলতি নিয়ে ডায়নোসরের বিরুদ্ধে লড়াই। আসলে আমি ওই বহুজাতিক কোম্পানিকে বোঝতে চেয়েছিলাম, শ্লা, তোমরা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি না আর আমিও ব্লাডি নেটিভ না। দিস ইজ মাই ল্যান্ড, নো কাউবয় রাইডস হিয়ার।

আমার তখন টাকা-পয়সার বড়ো টানাটানি। কী কষ্টের সেইসব দিন- আহ, একেকটা দিন! এহেন অবস্থায় মাথায় চা চামচের এক চামচ ঘিলু থাকলে আমার যেটা করা প্রয়োজন ছিল সেটা হচ্ছে অতি দ্রুত স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া। পরিচিত লোকজনেরা জানেন ঘিলু জিনিসটা আমার নাই। তবে যেটা অনেকে জানেন না সেটা হচ্ছে মানুষটা আমি বড়ো ‘জিদ্দি’ টাইপের। আমি হাল ছাড়লাম না। আমার অপার সৌভাগ্য আমার কিছু সুহৃদ বিভিন্ন সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন। এঁদের নাম প্রকাশ করলে এঁরা ভারী বিরক্ত হন বিধায় সেপথ মাড়ালাম না। খামাখা পাগল ক্ষেপিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না। আজ এবেলা তাঁদের প্রতি গভীর প্রকাশ করি। পেছনের এই হৃদয়বান মানুষগুলো কেবল ছায়াই হয়ে থাকেন। এ যে অন্যায়, বড়ো অন্যায়!

পরে অবশ্য কৌশল খানিকটা পরিবর্তন করলাম। একেক জায়গার নির্দিষ্ট সময়ে ওখানকার শিশুদেরকে ন্যূনতম শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা। তো, চার নম্বর যে স্কুলটা- যেখানে স্কুলটা চলছিল ওখানকার কাজ শেষ হলো কিন্তু স্কুলটা স্থানান্তর করা যাচ্ছিল না। আমি খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম স্টেশনের কাছাকাছি নতুন স্কুলটা খুলতে কিন্তু জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। রেলওয়ের কতশত জায়গা লোকজনেরা দখল করে রেখেছে অথচ বৈধ কোনও পন্থায় দশ ফিট বাই দশ ফিট একটা ঘরও পাওয়া গেল না!
অবশেষে স্টেশনের কাছে যেটা পাওয়া গেল নড়বড়ে আহামরি কিছু না সেটার জন্য আবার একগাদা টাকা সেলামিও দেওয়া লাগল। তবুও আমার আনন্দের শেষ নেই কারণ ফি-রোজ স্টেশনের চক্কর লাগাবার কারণে আমি এখানকার শিশুদেরকে নিজের হাতের তালুর মত চিনি। কে ড্যান্ডিতে আসক্ত, কার বাপ-মা নেই বিশদ জানার বাকী নেই। এদের সঙ্গে কাজ করাটা যে কতটা জরুরি সেটা বুঝতাম বলেই এখানে স্কুল করার কাতরতা প্রবল ছিল। এখানকার শিশুরা কেউ নিয়মিত ক্লাশ না-করলেও কেবল একদিনের জন্য কাউকে পেলেও কম না। মাথায় যতটা নাড়া দেওয়া যায় আর কী!

কিন্তু শুরুতেই আমি বিপত্তিতে পড়লাম স্কুলের জন্য যে ঘরটা নেওয়া হয়েছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যথেষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু জায়গার টানাটানি! স্টেশনের এই বাচ্চাগুলো পড়তে এতোটা আগ্রহ দেখাবে এটা আমার জন্য অনেকখানি অবাক হওয়ার মত। অবশ্য এখানে এরা যে কেবল পড়তে আসে এমন না, নিয়ম অনুযায়ী পড়ার আগে আধ-ঘন্টা খেলাও।

একজন রাখালবালক থেকে ড. আতিউর রহমান হতে পারলে আমি কেন এই স্বপ্ন দেখব না এই শিশুগুলোর মধ্যে থেকে কেউ একজন বের হয়েআসবে? বড় লোভ হে, বড় লোভ...।

* ’বড় লোভ হে’, কথাটা নাজমুল আলবাবের কাছ থেকে ধার করা। তিনি কোত্থেকে ধার করেছেন এটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি!