Tuesday, October 21, 2014

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”!

গতকাল দিনটা শুরু হয়েছিল বড় বাজে রকমের। সকাল-সকাল এক অন্য রকম অতিথি! তাও সুস্থ-সবল হলে একটা কথা ছিল, অসুস্থ-আহত। অতিথি নারায়ন কিন্তু আমি এই অতিথিকে নিয়ে বিরক্ত, চরম ত্যক্ত-বিরক্ত।

ছোট্ট এই জায়গাটায় প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বাস। সবাইকে ছেড়ে আমার এখানে কেন, বাপু। হোয়াই? তোমার শরীরটা ভাল নেই ঠিক আছে, কোনও জায়গা না-পেলে তা গাছে বসে থাকতে সমস্যা ছিল কোথায়? আক্ষরিক অর্থেই বিরক্ত লাগছিল কারণ আমার অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর না। এমতাবস্থায় এদের প্রায় সবারই মৃত্যু হয়েছে। ফাঁকতালে আমার মত অমানুষের ভুবনটা এলোমেলো করে দিয়ে গেছে!
ভাগ্যিস, এদের পরিবার-পরিজন বদ টাইপের না নইলে আমার বিরুদ্ধে মিছে মামলা ঠুকে দিলে বাঁচার কোনও উপায় ছিল না।

আমি লক্ষ করলাম পাখিটা পাখা ছেড়ে দিয়েছে- এমনিতে আমি পাখি চিনি না (আসলে মনে রাখতে পারি না)। শালিক, গো-শালিক, দোয়েল সবই আমার কাছে একই মনে হয়। তবে এটুকু বুঝতে পারছি পাখিটার লক্ষণ খারাপ! এর বাঁচার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। এর ঠোঁট, পায়ের নাগালে যা যা প্রয়োজন রেখে আপাতত খাঁচায় রেখে দেওয়া ব্যতীত উপায় ছিল না।
আমার কিছু ডাক্তার বন্ধু আছেন এদের কি ফোন করব? একবার এক ডাক্তারকে আহত কুকুরের চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলাম তিনি চোখ লাল করে বলেছিলেন, আমি কী কুত্তার ডাক্তার! থাক বাবা, ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। পরে এরা হেন ডিজঅর্ডার, তেন ডিজঅর্ডার নাম দিয়ে আমার চিকিৎসা শুরু করে দেবেন। এমনিতেই যথেষ্ঠ কুখ্যাতি অর্জন করেছি। আমি আতংকিত, একদিন সত্যি সত্যি লোকজনেরা আমার বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে বলাবলি শুরু করবে: চল, পাগল দেইখ্যা আসি।

সন্ধ্যায় যখন খাঁচার ভেতর পিঁপড়ার আনাগোনা বেড়ে গেল তখন প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেল এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে, সময়ের ব্যাপার মাত্র। ক্রমশ এর গা পিঁপড়ায় ভরে যেতে লাগল। পিঁপড়া নিয়ে আমার কষ্টের স্মৃতি আছে। আমার মাকে যখন শুইয়ে দেই তাঁর সফেদ-সাদা কাপড়ে ঢাউস এক পিঁপড়া দেখে এক ঝটকায় ওটাকে ফেলে দিয়েছিলাম। মার সমস্ত শরীর এখানে-ওখানে যে গেরোগুলো দেওয়া ছিল তা একেক করে খুলে দিতে হয়। নিয়ম। এর অর্থ আমি জানতাম। যেন অতি দ্রুত পোকায় শরীরটাকে খেয়ে ফেলে। 

যাই হোক, পিঁপড়ারা বুঝে গেছে পাখিটার আর প্রতিরোধ ক্ষমতা নাই। কিন্তু পিঁপড়ারা সম্ভবত আমার কথা বিস্মৃত হয়েছিল। পাখিটাকে খাঁচা থেকে বের করে সবগুলো পিঁপড়া হঠাতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এতে করে পিঁপড়া যে দু-চারটা মারা পড়ে না এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। প্রকৃতির নিয়মের ব্যতয়- একটা প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যে আরও দু-চারটে প্রাণ যাচ্ছে। পাখিটাকে আর খাঁচায় রাখা যবে না আবারও পিঁপড়া মহাশয়দের আগমণ হবে।
ছোট্ট শরীরটা আমার হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরে রাখতে মোটেও সমস্যা হয় না। ধুকধুক করে এর প্রাণশক্তি এখনও টিকে আছে। একবার মনে হলো সম্ভবত স্পন্দনটা থেমে গেছে। কিন্তু অনুমান ভুল প্রমাণিত করে এ ঠিকই টিকে রইল।

বাঁ হাতে ধরে রেখে অন্য হাতে ফোনে কথা বলি, ভাত খাই। মহা মুসিবত, ব্যাটা যে টিকে আছে! আমার কেন যেন মনে হলো একে এভাবে মুঠোয় আটকে না-রেখে মৃত্যুটা তার মত করেই হতে দেওয়াটাই সমীচীন। থাকুক নীচে, চোখের সামনে। কিন্তু ছাপার অক্ষর বলি, প্রাণবায়ু তো আর বের হয় না। ধুর, মরে না কেন ছাই! একটা তুচ্ছ পাখি নিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকার সময় কোথায় আমার। দেশের কত বড়-বড় সমস্যা এই নিয়ে একটা লেখা না-নামিয়ে ফেললে তো চলছে না। আমি মানুষ পদবাচ্য নই এ সত্য কিন্তু এর যে মৃত্যুযন্ত্রণা এটা চোখে দেখে অমানুষ হওয়া সম্ভব না।

রাত গড়ায়। আমি এর মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি- মরে গিয়ে কখন আমাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। এক সময় এই যন্ত্রণারও অবসান হয়। গভীর রাতে মাটি খুঁড়তে কার ভাল লাগে। বিভিন্ন সময়ে ঝাউ গাছটার নীচে, যেখানে পূর্বেও বেশ অনেকগুলো পাখিকে মাটি চাপা দিতে হয়েছিল, সেখানে।

ভাগ্যিস, আশেপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেই নইলে কে বলতে পারে কোন ধারায় বমাল ধরা পড়তাম। এখন তো আমাদের দেশে নতুন-নতুন আইন হচ্ছে। সংসদে উত্থাপন হলেই এ-প্লাস পেয়ে চোখ বন্ধ করে আইন পাশ হয়ে যায়। ৫৭ ধারা সে তো পুরনো, ৫৮ বা ৮৫ ধারা নামে কখন কোন পশু-পাখি আইন পাশ হয়ে গেছে কে বলতে পারে...।