Sunday, June 15, 2014

দেশপ্রেমিক (!) এবং...


তিন উল্লাস নামে একটা কথা চালু আছে কিন্তু এ যে দেখি শত উল্লাস! আমাদের দেশপ্রেমিকদের (!) জন্য আজ বড়ো আনন্দের দিন। দেখো দিকি কান্ড, টুকটুক করে হেঁটে সোয়া মাস পূর্বেই ঈদ চলে এসেছে! কী আনন্দ আজি আকাশে বাতাসে! 
ঢাকার মিরপুরের কালশিতে বিহারি নামের যে পশুগুলো (!) মারা গেল এই আনন্দময় মৃত্যু তো হররোজ দেখা মেলে না। কেনই-বা আমাদের এই উল্লাস? কারণ বিহারিগুলো খুব খারাপ। আমাদের দেশপ্রেমিকদের (!) নোট থেকে কয়েকটা উল্লেখ করি। এরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। আমরা কেউ নেইনি, না? গোলাম আযম গং, এরা তো বিহারিই ছিল, নাকি?
আমার সাফ কথা, খুন তো খুনই- সে বিহারি করুক বা বাঙালিযে সমস্ত বিহারি তখন খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল এদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে সমস্যা কোথায়! আমি এই সমস্ত খুনিদেরকেও কাঠগড়ায় দেখতে চাই

নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও  এরা পটকা ফুটিয়ে দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েছে। তাই তো, দেশে আর কোথাও পটকা ফুটেনি তো!

এরা মদ-গাঁজা-ভাং বিক্রি করে। কী সর্বনাশ, দেশের আর কোথাও মদ, গাঁজা বিক্রি হয় না তো! কেবল বিহারিরাই এই কুকর্ম করে থাকে। 

যাই হোক, বিহারি ক্যাম্পের অধিবাসী মো. ইয়াসিন ছুটে গিয়ে দেখতে পান ঘরের ভেতরে আগুন এবং তখন দরজায় তালা লাগানো দেখেনপরিবারের সাত জনের কাউকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। সন্তানের লাশ কাঁধে এই বাবাটাকে একজন ভাঁড়ের মত মনে হয়, না? তাঁর চোখের জল স্যুয়েরেজ পাইপের সঙ্গে মিশে গেলে সমস্যা নেই তো কোনও...।

ভাল কথা, যে শিশুগুলো আগুনে অঙ্গার হয়ে গেল যাদেরকে বিহারির বাচ্চা বলে উল্লাস করে আমোদে যাদের চোখ ছোট হয়ে আসছে সেই সমস্ত দেশপ্রেমিক (!) মহোদয়গণকে আমি কি এটা মনে করিয়ে দেব, আমাদের দেশের আইনের কথা? হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: "দেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের মধ্যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নাবালক ছিল বা এর পরে যাদের জন্ম হয়েছে, তারা বাংলাদেশের নাগরিকসমস্ত নাগরিক সুবিধা তাদের প্রাপ্য"
আমার জানার খুব ইচ্ছা, বিহারের অধিবাসী কোনও এক বাপ-দাদার পাপের ফল তার সন্তান নামের বাংলাদেশের নাগরিককে কেন বইতে হবে! কোন যুক্তিতে? আজ বাংলাদেশের এই নাগরিককে পুড়িয়েছেন কাল নিশ্চয়ই আমাকে পোড়াবেন।

বা এই কথাটা? বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ সনদে সাক্ষর করেছেসেই অনুসারে শুধু বাঙালীই নয়, এই ভূখন্ডের সব শিশুর শিক্ষাসহ সমস্ত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের

অনেক পূর্বে এই সমস্ত বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম, আমাদের কোনও পরিচয় নাই [১]। নতুন করে আর চর্বিতচর্বণ করি না। 

এ সংবাদটা পড়তে গিয়ে একটা বিষয় চোখে পড়ল। প্রথম আলো, মিডিয়া টাইকুন হরদম আমাদের শিখিয়েই যায়। আজও এদের কাছ থেকে শিখছি। সচরাচর আমরা কারও বক্তব্য লিখলে লিখি, তিনি বলেন-জানান বা তিনি বলেছিলেন-জানিয়েছিলেন...। এরা দেখি এখন নতুন এক জিনিস চালু করেছে। যে পরিবারে সাতজন মারা গেছে তার মুখের কথাকেও এরা লিখছে, তিনি দাবী করেন।
কয়েকটা উদাহরণ দেই:
"ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত আসলামের স্ত্রী নাজমার দাবি, ..."।
"বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. শমশেরের দাবি, ..."।
"আদিল আহমেদ দাবি করেন, ..."।
"আগুনে পুড়ে পরিবারের সাত সদস্য নিহত হয়েছে দাবি করে..."।

অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমার পড়ার সময় এমন মনে হচ্ছিল, তিনি দাবী করেন...। যেন এমন...ঠিক না-হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তবুও দাবী করেছেন আর কী।
এই পত্রিকার দাবীমতে, পরিবারের সাত সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবী করেছেন মো. ইয়াসিন। জনাব ইয়াসিনের এই দাবী ধোপে না-ও টিকতে পারে। হতে পারে সাড়ে ছয় বা সোয়া ছয় জন নিহত হয়েছে।

এদের এই নতুন 'ঢং-ঢাং' কেন কে জানে!

১. আমাদের কোনও পরিচয় নাই: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post.html