Monday, April 28, 2014

লেখার ব্যবচ্ছেদ


হালে ডাক্তারদের নিয়ে একটা লেখার কারণে আলাদা করে ইনবক্সে কেউ-কেউ লিখেছেন। একজন আমাকে ডাক্তার-বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বোঝার বাকী থাকে না যে মানুষটা একজন ডাক্তার।

সব মিলিয়ে ওয়েবে বিচিত্রসব বিষয়, বিচিত্র পেশা, বিচিত্র মানুষ নিয়ে আমার কয়েক হাজার লেখা আছে যার মধ্যে ডাক্তারদের নিয়ে হবে সাকুল্যে বিশ-পঁচিশটা লেখা! এই লেখাগুলোর মধ্যে আবার বেশ কটা লেখা  বিভিন্ন ডাক্তারদের মহানুভবতা নিয়ে। এরপরও ডাক্তার-বিদ্বেষী তকমা পাওয়াটা আমার জন্য দূর্লভ এক অভিজ্ঞতা বটে।

পূর্বের লেখায় আমি বলেছিলাম, অন্য পেশার মতই ডাক্তাররাও এই দেশের, এই সমাজের অংশ। ডাক্তারী পেশায় আছেন বলেই এরা একেকজন চলমান দেবতা হয়ে যাবেন এমনটা আশা করাটা ভুল। আমাদের দেশে অন্য পেশায় যেমন ভাল-মন্দ তেমনি ডাক্তারি পেশায়ও।

অবশ্য আমার মতে গুরুত্ব বিবেচনায় এই পেশার গুরুত্ব অসম্ভব তীব্র। আগেও যেটা বলেছি, আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকা কোনও মুমূর্ষু রোগির কাছে একজন ডাক্তার হচ্ছেন দ্বিতীয় ঈশ্বর- এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যাশিশিয়ান এবং ডাক্তার নামের নকল ম্যাজিশিয়ান, মাঝামাঝি আর কেউ নাই, কিচ্ছু না!

পেশার সুবিধার কথা বললে ডাক্তারদের আছে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নামে আলাদা পয়সা পাওয়ার অসাধারণ সুযোগ, অন্তত সৎ থেকেও। যা এই দেশে শিক্ষক এবং মামুলি দুচারটে পেশা ব্যতীত অন্য কোনও পেশায় নাই। যেমন একজন জাজ, একজন সেনাপ্রধান, একজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কারও নাই। অসৎ হল সে ভিন্ন কথা। তারপরও অনেক ডাক্তার কেমন অনাচার করেন তার একটা ছোট্ট তালিকা করি:

১. অফিস আওয়ারে রোগির কাছ থেকে টাকা নেওয়া।

২. অহেতুক টেস্ট দিয়ে ল্যাবগুলো থেকে ৪০/৫০ পার্সেন্ট কমিশন খাওয়া।

৩. অখ্যাত ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিম্নমানের ওষুধ চালিয়ে দেওয়ার নাম করে মাসোহারা হাতিয়ে নেওয়া।

৪. ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অন্তর্বাস ব্যতীত সব ধরনের উপহার নেওয়া। (অন্তর্বাসের বিষয়ে দুইটা কারণ হতে পারে। প্রথমত মাপ নিয়ে ঝামেলা থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত ওটায় ওষুধ কোম্পানির লোগো থাকলে দেখবেটা কে? ডাক্তার তো আর সুপারম্যান না যে জিনিসটা প্যান্টের উপর পরবেন।)

৫, অপ্রয়োজনে অপারেশনের নাম করে একগাদা টাকা ছিনিয়ে নেওয়া। আইসিউতে একটা রোগি যাওয়া মানে চান্দ-রাইত- ধুম মাচে দে। লাশ আনতে হলেও দু-চার-দশ লাখ টাকা না-দিয়ে উপায় নেই।

৬. রোগিদের সঙ্গে আচরণগত সমস্যা...।

এই সব তো গেল অন্ধকার দিকের কথা। এবার অন্য দিকের কথা বলি। হৃদয়বান অনেক ডাক্তার আছেন যাদের আুছে অন্যদের মতই দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি সীমাহীন আবেগ। কিন্তু এরা আছেন বড়ো কষ্টে। তাঁদের কারও বউ মাস্টারি করেন তো কেউ ডাক্তারি। ছুটি পান না, পেলেও...কোনও উপায় বের করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু বছরের-পর-বছর ধরে ঝুলে থাকেন। বুড়া-বুড়া অধ্যাপক মহোদয়গণ পাস করতে দেবেন না কারণ এই বুড়ারা তাদের ট্যাকাটুকা, পায়ের নীচের মাটি নিয়ে খুবই চিন্তিত। এদের কারও কারও মাসিক আয় অকল্পনীয়!

অন্য দিকে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে কেবল একটার কথা বলি। ডা. সুমন নামের তরুণ একজন ডাক্তার আপ্রাণ চেষ্টা করেন চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষকে যত প্রকারে সম্ভব আরাম দিতে। তাঁর অফিসে যে চেয়ারগুলো সেগুলো নড়বড়ে, কোনটায় গজ-ব্যান্ডেজ বাঁধা। আউটডোরের নামে ফি রোজ রোগি দেখেন ষাট, সত্তুর আশি... কখনও একশ ছাড়িয় যায়! সরকার থাকার জন্য যে আবাসিক ভবন দিয়েছে সেটার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। যথারীতি চুরি হয়। সে নাহয় গেল কিন্তু এরপর থেকে তাঁর পরিবারের লোকজনেরা রাতে থাকেন আতংকে। মুখে ফেনা তুলেও নিরাপত্তা দূরের কথা দরোজা-জানালাও ঠিক হয় না। বাধ্য হয়ে তিনি জেলা শহরে বাসা নেন। এই মানুষটাকেই টানা শতেক রোগি দেখে জরুরি বিভাগেও রাত জেগে কাজ করতে হয়। কাজ শেষ করে বিশ কিলোমিটার ঠেলে শহর যাওয়ার ধকল। আবার পরদিন সময়মতো কাজে ফেরার তাড়া। এই মানুষটার কাজ থেকেই সামান্য ব্যত্যয় দেখলেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব এতে সন্দেহ কী!

অনেকে বলেন সেবার জন্য রোগি বিদেশে চলে যান। এই সবটুকু দায় কী ডাক্তারদের? আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল থাকার পরও যে দেশের প্রেসিডেন্ট সামান্য চেকআপ করার জন্য সিঙ্গাপুর চলে যান সেই দেশের লোকজনকে এটা বোঝাবে এমন সাধ্য কার!

আর পুকুরে গোসল করতে গিয়ে কারও কানে পানি ঢুকেছে ব্যস প্রাণগোপাল দত্তকে দেখাও। তিন মাস পরে ডেট, প্রাণ বাবু দু-মিনিট দেখবেন কি না সন্দেহ কিন্তু কুছ পারোয়া নেহি, তাই সই।  জামাইরে প্রাণগোপাল দত্ত, দীন মোহাম্মদরে দেখাইছি, এটাও আজকাল জাঁক করে বলার মত বিষয় বটে।

এটা আমার কাছে স্রেফ একটা চুতিয়াগিরি মনে হয় লোকজনের কাছে এখন এমবিবিএস ডিগ্রিটা একটা বাদামের খোসা হয়ে গেছে। রোগিরা গাল চুলকাতে চুলকাতে জানতে চায়, তাইনে কি কান বিশেষজ্ঞ? একজন রোগি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সরাসরি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাচ্ছে। এমবিবিএস ডাক্তাররা তাহলে আছেন কেন, ঘাস কাটতে? এরা বছরের-পর-বছর ধরে যে পড়াটা পড়েছেন এটা কী ঘন্টা বাজাবার জন্য? সরকারের হস্তক্ষেপ অতি জরুরি।

যাই হোক, তবলার ঠুকঠাক অনেক হলো এবার গান গাওয়ার পালা। আমার লেখায় কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে আমি কৃতজ্ঞ হই কিন্তু যুক্তিহীন কথা আমার কাছে তরমুজের খোসা। এমননিতর অসঙ্গতি পেলে আমি লিখবই (https://www.facebook.com/723002334/posts/10151961018937335)। সে ডাক্তার-লেখক-মেথর তাতে কী। কারও কারও যুক্তি আমার মনে ধরেছে কিন্তু যে যুক্তিই দেখানো হোক না কেন ডাক্তারদের ধর্মঘট করাটাকে আমি কোনও প্রকারেই সমর্থন করব না, খুনের অভিযোগ আনব। এতে করে কে আমাকে ডাক্তার-বিদ্বেষী বললেন বা মানব-বিদ্বেষী তাতে আমার মোটেও কাতরতা নেই।