Friday, January 24, 2014

ও কমান্ডো, এ দিনও দেখার ছিল!



নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়ার ঘরে আগুন দেওয়ার পর তাঁকে  নিয়ে গতকালই লিখেছিলাম, কমান্ডো, খবরদার, তোমার এক ফোঁটা চোখের জল যেন গড়িয়ে না-পড়ে... [১]। শপথ আমার লেখালেখির, আমি কল্পনাও করিনি যে আজ আমাকে এ লেখাটা লিখতে হবে! মাদকসন্ত্রাসীরা আজ কুপিয়েছে এই কমান্ডোকে।

ও কমান্ডো, আমরা ভুলিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর সবাই যেখানে জমা দিয়েছিল, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, মেশিনগান সেখানে তুমি জমা দিয়েছিলে চার-চারটা লিমপেট মাইন! কেবল এমন একটা মাইন দিয়েই উড়িয়ে দেয়া সম্ভব ছিল গোটা এই পৌরসভাকে।
ও কমান্ডো, একটা মাইন বাঁচিয়ে রাখতে পারলে না? তাহলে সব কিছুর সঙ্গে উড়ে যেতাম আমিও। অন্তত তোমার এভাবে এই পড়ে থাকার দৃশ্যটা অন্তত আমাকে দেখতে হতো না। জমা দেওয়া যে কমান্ডো-নাইফটা দিয়ে পেট চিরে ফেলেছিলে হাঙ্গরের সেই কমান্ডো নাইফ দিয়ে ফালা-ফালা করে ফেলতে পারতে এই সমস্ত সন্ত্রাসীদেরকে।

আধপোড়া কাগজগুলো থেকে উদ্ধার হওয়া আরও কিছু কাগজ:
গতকাল তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর আবারও এফআইআর এবং ইউএনওকে লেখা তাঁর কাগজ:
সহায়ক সূত্র:

১. ‘কমান্ডো, খবরদার, তোমার একফোঁটা চোখের জল যেন গড়িয়ে না-পড়ে...’: http://www.ali-mahmed.com/2014/01/blog-post_24.html  

...ইনবক্সে, মেইলে অনেকে আলাদা করে জানতে চেয়েছেন এই কমান্ডোর বর্তমান অবস্থা, এই সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য।
তাদেরকে সবিনয়ে বলি, এই বিষয়টা পোস্টের মন্তব্যে জানতে চাইলে আমার জন্য সুবিধা হতো। কারণ জনে জনে আলাদা করউত্তর দেওয়াটা আমার জন্য অনেকখানি সমস্যা হয়ে পড়ে।


সবার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, এই কমান্ডো এখনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।  তাঁকে এখনও পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না। কারণ তাঁর শরীরের প্রচুর ছুঁরির ক্ষত রয়ে গেছে। তবে ক্রমশ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

তাঁর যে-সমস্ত জরুরি কাগজপত্র পুড়ে গেছে- বিশেষ করে ১৯৭১ সালের দলিলপত্র তা তো আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। তবে বাঁচোয়া, পূর্বেই তাঁকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখির সূত্রে বেশ কিছু কাগজ আমার ব্লগসাইটে রয়ে গেছে।

তাঁর ঘরের অনেকটা অংশ পুড়ে গেছে। এর আশু সংস্কার প্রয়োজন। সবটার কোনো গতি আপাতত না-হলেও খানিকটা চেষ্টা চলছে।
এবং আশার কথা হচ্ছে, প্রশাসন এখন নড়েচড়ে বসেছে। যারা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের উপর হামলা করেছিল তাদের কাউকে-কাউকে ধরে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
আমি বিশেষ করে এখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই যিনি খবর পাওয়ামাত্র ঘটনাস্থলে এবং পরের দিন তাঁকে দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন।

...

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম, গোটা এই দেশের কোথাও এই কমান্ডোর নিজস্ব এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। তিনি যে সরকারি জায়গায় ছাপরা তুলে থাকেন সেটার বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করেছিলেন। সেটা ২০১১ সালের কথা, এখন ২০১৪ চলছে- এখনও কিছুই হয়নি! এই দেশে অনেকগুলো বাড়ি থাকার পরও সাংসদ-মন্ত্রীরা চোখের পলকে বাড়ি-প্লট পেয়ে যান কিন্তু এক টুকরো জায়গার ব্যবস্থা হয় না এই অগ্নিপুরুষের জন্য।
...
২৬ জানুয়ারি: 
তাঁর মত একজন কমান্ডোকে শুইয়ে ফেলা এত্তো সোজা! ঠিক-ঠিক তিনি ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, এখনও হাসপাতালে ভর্তি কিন্তু ক্রমশ সেরে উঠছেন...।
  

‘কমান্ডো, খবরদার, তোমার এক ফোঁটা চোখের জল যেন গড়িয়ে না-পড়ে...’।



অপারেশন জ্যাকপটের নায়কদের একজন, নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়া। যিনি ১৯৭১ সালে বুকে লিমপেট মাইন বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের বিশাল-বিশালসব জাহাজ। এই অপরেশন জ্যাকপটই পাকিস্তানি আর্মিদের মনোবল অনেকটা ভেঙ্গে দিয়েছিল।
তাঁর কাছ থেকেই আমি জেনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র নৌ-কমান্ডোদেরকেই লিখিত আকারে এটা দিতে হতো যে আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। সঙ্গে দেয়া হতো কাফনেরাপড়। তাঁর কাছ থেকে এটাও জেনেছিলাম, আলী আহসান মুজাহিদ কেমন ছলনা করে ৩০ জন নৌ-কমান্ডোকে ১৯৭১ সালে হত্যা করিয়ে ছিলেন।
তাকে নিয়ে আমার অজস্র লেখা আছে। নতুন করে চর্বিতচর্বণ করি না। [১], [২], [৩], [৪], [৫]

গোটা এই দেশে এই মানুষটার নিজস্ব এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। এই বিষয়টা ভাবলেই নিজেকে বড়ো অপরাধি মনে হয়। আমরা চেষ্টা করছিলাম, তিনি যে সরকারি জায়গাটায় ছাপরার মত একটা ঘর তুলে থাকেন সেটা তাঁর নামে বন্দোবস্ত করে দেয়া।
তাঁর নড়বড়ে ঘরটার আশু মেরামতও প্রয়োজন। যথাসম্ভব দ্রুত এর একটা ব্যবস্থা না-করলে জোর বাতাসে উড়ে যাবে এ ঘর। ঘর মেরামত এবং একটা গাভী কিনে দেওয়ার জন্য মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া আমাকে কথা দিয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার কামরুল ভাইয়ের ওখানে ফজলুল হক ভূঁইয়ার যাওয়া স্থির হয়ে আছে।

জনযুদ্ধের গণযোদ্ধার লেখক মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়ার সঙ্গে যখন আমার ফোনে কথা হচ্ছিল তখন এই সহৃদয় মানুষটা ফোনে আমাকে বড়ো কাতর হয়ে বলছিলেন, আমি এখন চোখেও ভাল দেখতে পাই না, শারীরিক ভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছি, কখন...
আমি তাঁর কথা খানিকটা আঁচ করতে পারছিলাম। আমি দৃপ্ত গলায় বলেছিলাম, কামরুল ভাই, আপনার মত মানুষের কখনও মৃত্যু হয় না, খোলস পরিবর্তন হয় মাত্র। জনযুদ্ধের গণযোদ্ধার মত একটা বই-ই আপনাকে অমর করে রাখবে
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার সময় আমি অনেক বারই জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা বইটার রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। এটা আমার নিজস্ব মত, এই বইটা না-পড়লে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানাটা অনেকটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

যাই হোক, নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়াকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যদভবিষ্য [৬]। সেটা ২০১১ সালের কথা। নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়া তখন মাদক ব্যবসায়িদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। কারণটা আঁচ করাটা অতি সহজ- যেখানে তাঁকে পুলিশ পরামর্শ দেয় মাদক ব্যবসায়িদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার জন্য [৭]
এই মানুষটা তখন দ্বারে-দ্বারে ঘুরেছেন। থানায় অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি কশিনার, উপজেলা চেয়্যারমেন থেকে শুরু করে ডিসি, এস.পি কেউ এই তালিকা থেকে কেউ বাদ পড়েননি!
তখনই আমরা আঁচ করেছিলাম এই বিষবৃক্ষ গাছে যথাসময়ে ফল ধরবে।

আজ ২০১৪ সালে এসে ঠিক-ঠিক বিষবৃক্ষ গাছটায় ফল ধরেছে। এই নৌকমান্ডোর বাড়িতে সেই মাদক ব্যবসায়িদের চক্ররাই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কেবল ঘর পুড়েছে এমনই না, পুড়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধে এই মানুষটার অবদানের প্রায় সমস্ত কাগজপত্রই। আমি যখন তাঁর পোড়া ঘরের সামনে স্তুপ করা পোড়া কাগজগুলো দেখছিলাম তখন ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই ডিসির কাছে লেখা, উপজেলা চেয়্যারমেনের কাছে লেখা আধপোড়া কাগজগুলো।

আমি যখন গিয়েছি তখন মানুষটাকে বাসায় পাইনি। তিনি আবারও এর-ওর দ্বারে-দ্বারে ঘুরছেন। ...আমার লেখা এখানে এসে ফুরিয়ে যায়। কেবল শিরোনামের কথাটা দিয়েই শেষ করি, কমান্ডো, খবরদার, তোমার এক ফোঁটা চোখের জল যেন গড়িয়ে না-পড়ে...

*প্রথম ছবিটা দুলাল ঘোষের কাছ থেকে নেয়া। কৃতজ্ঞতা।                 

৬. যদভবিষ্য :  http://www.ali-mahmed.com/2011/07/blog-post_06.html
৭. মুক্তিযোদ্ধাকে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে মিলে চলার পরামর্শ পুলিশ কমকর্তার!: http://bdn24x7.com/?p=13682