Friday, November 14, 2014

বড় লোভ হে...।

‘আমাদের ইশকুল’ গুটিগুটি পায়ে প্রায় পাঁচ বছরে পড়ল। ২০১০ সালের শুরুতে আমি এবং আমার এক বন্ধু, শুরু হয় এই স্কুলের যাত্রা। করতে চেয়েছিলাম বৃদ্ধাশ্রম। করতে না-পেয়ে শুরু করেছিলাম স্কুল। তখন একসঙ্গে তিনটা স্কুলের কাজ চলত। একটা হরিজনপল্লী যেটার চালু নাম মেথরপট্টি সেখানকার শিশুদের জন্য। অন্যটা ছিল চোখে দেখতে পান না সেইসব মানুষদের সন্তানদের জন্য এবং তৃতীয়টা ছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যাদের অধিকাংশই ছিল পিতা-মাতাহীন।

স্কুলগুলো পরিচালনার জন্য অর্থের যোগানের ব্যবস্থা করতেন তিনি মানে আমার বন্ধু আর অন্য সমস্ত কাজ দেখার দায়িত্ব ছিল আমার। এক বছরের মাথায় কোনও প্রকার আগাম সতর্কতা না-দিয়েই তিনি অর্থের যোগান বন্ধ করে দিলেন। হয়তো কোনও প্রকারের সীমাবদ্ধতা হবে কিন্তু আমাকে না-জানানোটা মোটেও ভাল কাজ হয়নি! আমি পড়লাম পানিতে। এখন কী করি, কোথায় যাই কার কাছে যাই? তিন তিনটা স্কুলের তিনজন টিচারের সম্মানী, তিন তিনটা ঘর ভাড়া তো চাট্টিখানি কথা না আমার জন্য। তখন আবার আমার মাথার উপর বিপদ, ভীষণ বিপদ। বহুজাতিক এক কোম্পানির সঙ্গে লড়াই শুরু করেছি মাত্র। অসম এক লড়াই- যেটা কেবল আমার মত বোকা মানুষের পক্ষেই সম্ভব। গুলতি নিয়ে ডায়নোসরের বিরুদ্ধে লড়াই। আসলে আমি ওই বহুজাতিক কোম্পানিকে বোঝতে চেয়েছিলাম, শ্লা, তোমরা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি না আর আমিও ব্লাডি নেটিভ না। দিস ইজ মাই ল্যান্ড, নো কাউবয় রাইডস হিয়ার।

আমার তখন টাকা-পয়সার বড়ো টানাটানি। কী কষ্টের সেইসব দিন- আহ, একেকটা দিন! এহেন অবস্থায় মাথায় চা চামচের এক চামচ ঘিলু থাকলে আমার যেটা করা প্রয়োজন ছিল সেটা হচ্ছে অতি দ্রুত স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া। পরিচিত লোকজনেরা জানেন ঘিলু জিনিসটা আমার নাই। তবে যেটা অনেকে জানেন না সেটা হচ্ছে মানুষটা আমি বড়ো ‘জিদ্দি’ টাইপের। আমি হাল ছাড়লাম না। আমার অপার সৌভাগ্য আমার কিছু সুহৃদ বিভিন্ন সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন। এঁদের নাম প্রকাশ করলে এঁরা ভারী বিরক্ত হন বিধায় সেপথ মাড়ালাম না। খামাখা পাগল ক্ষেপিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না। আজ এবেলা তাঁদের প্রতি গভীর প্রকাশ করি। পেছনের এই হৃদয়বান মানুষগুলো কেবল ছায়াই হয়ে থাকেন। এ যে অন্যায়, বড়ো অন্যায়!

পরে অবশ্য কৌশল খানিকটা পরিবর্তন করলাম। একেক জায়গার নির্দিষ্ট সময়ে ওখানকার শিশুদেরকে ন্যূনতম শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা। তো, চার নম্বর যে স্কুলটা- যেখানে স্কুলটা চলছিল ওখানকার কাজ শেষ হলো কিন্তু স্কুলটা স্থানান্তর করা যাচ্ছিল না। আমি খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম স্টেশনের কাছাকাছি নতুন স্কুলটা খুলতে কিন্তু জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। রেলওয়ের কতশত জায়গা লোকজনেরা দখল করে রেখেছে অথচ বৈধ কোনও পন্থায় দশ ফিট বাই দশ ফিট একটা ঘরও পাওয়া গেল না!
অবশেষে স্টেশনের কাছে যেটা পাওয়া গেল নড়বড়ে আহামরি কিছু না সেটার জন্য আবার একগাদা টাকা সেলামিও দেওয়া লাগল। তবুও আমার আনন্দের শেষ নেই কারণ ফি-রোজ স্টেশনের চক্কর লাগাবার কারণে আমি এখানকার শিশুদেরকে নিজের হাতের তালুর মত চিনি। কে ড্যান্ডিতে আসক্ত, কার বাপ-মা নেই বিশদ জানার বাকী নেই। এদের সঙ্গে কাজ করাটা যে কতটা জরুরি সেটা বুঝতাম বলেই এখানে স্কুল করার কাতরতা প্রবল ছিল। এখানকার শিশুরা কেউ নিয়মিত ক্লাশ না-করলেও কেবল একদিনের জন্য কাউকে পেলেও কম না। মাথায় যতটা নাড়া দেওয়া যায় আর কী!

কিন্তু শুরুতেই আমি বিপত্তিতে পড়লাম স্কুলের জন্য যে ঘরটা নেওয়া হয়েছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যথেষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু জায়গার টানাটানি! স্টেশনের এই বাচ্চাগুলো পড়তে এতোটা আগ্রহ দেখাবে এটা আমার জন্য অনেকখানি অবাক হওয়ার মত। অবশ্য এখানে এরা যে কেবল পড়তে আসে এমন না, নিয়ম অনুযায়ী পড়ার আগে আধ-ঘন্টা খেলাও।

একজন রাখালবালক থেকে ড. আতিউর রহমান হতে পারলে আমি কেন এই স্বপ্ন দেখব না এই শিশুগুলোর মধ্যে থেকে কেউ একজন বের হয়েআসবে? বড় লোভ হে, বড় লোভ...।

* ’বড় লোভ হে’, কথাটা নাজমুল আলবাবের কাছ থেকে ধার করা। তিনি কোত্থেকে ধার করেছেন এটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি!

No comments: