Sunday, September 28, 2014

হর্ষ-বিষাদ!

মাহবুবের সঙ্গে কয়েকটা কারণে দেখা করাটা জরুরি ছিল। একজন, মাহবুব-তানিয়ার জন্য কিছু কাপড়-চোপড় পাঠিয়েছেন। ওইসব দেওয়ার ছিল। অন্য একজন আবার ইনবক্সে জানিয়ে ছিলেন মাহবুব-তানিয়ার পড়াশোনার খরচের দায়িত্ব তিনি নিতে চান। এই সংবাদগুলো যে আমাকে কতটা অভিভূত করে এই সমস্ত মানুষদেরকে কেমন করে বোঝাই! কেমন করে লিখলে খানিকটা বোঝানো যায়- আহা,কেমন করে!

যাওয়াটা তারচেয়েও জরুরি ছিল যেজন্য সেটা হচ্ছে, মাহবুবকে হুইল-চেয়ারটা দেওয়ার সময়, খোলার পরই আমি লক্ষ করেছিলাম, পাদানি বা পা রাখার জায়গাটা বাইরের দিকে। কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছিলাম- পা রাখার জয়গাটা বাইরের দিকে থাকলে তো পা রাখতে সমস্যা হওয়ার কথা। মাহবুবকে নিয়ে লেখাটার সঙ্গে যুক্ত ছবিটা [১] ভাল করে লক্ষ করতে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু ক্যাটালগ দেখেও এর আগামাথা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওটায় সামান্য নাট কিভাবে খোলা হবে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে কিন্তু এই বিষয়ে বিন্দুবিগর্সও লেখা নাই! আজব!

ওখান থেকে ফিরে আসার পর থেকেই কেমন একটা খচখচ করছিল। আজ নাটক-সিনেমার মতই এর সমাধান খুঁজে পাওয়া গেল! পূর্বে যে ছেলেটাকে (হৃদয়) হুইল-চেয়ার দেওয়া হয়েছিল ও আজ সকালে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য চলে এসেছে। ছেলেটা খানিকটা পাগলা টাইপের। ওর বাড়ি থেকে দূরত্ব কম না তবুও হুইল-চেয়ার নিয়ে মাঝে-মাঝেই আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসে। কিচ্ছু না, কোনও কাজ না, এমনি-এমনি। আজ আসার পর আমি লক্ষ করে দেখলাম ওর হুইল-চেয়ারের পাদানিটা কিন্তু ভেতরের দিকেই। জানতে চাইলেই ও সবগুলো দাঁত বের করে আমাকে শিখিয়ে দিল কেমন করে এটা বাইরের দিক থেকে ভেতরে আনতে হয়। ওরে, শেখার যে কোনও শেষ নেই!

যাই হোক, খুব সহজেই মাহবুবেরর সমস্যার সমাধান হলো। ওদিন ওর বাবা-মা ছিলেন না কিন্তু আজ দুজনকেই পেয়ে যাই। আমার ধারণা ছিল, অন্তত মাহবুরের স্কুলে পড়ার খরচ লাগে না। মাহবুরের মত এমন শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন ছাত্রের কাছ থেকে স্কুলের টাকা না-নেওয়ারই কথা। নেবে কেন? আহা, কার না ওকে দেখলে মায়া হবে! আর যে স্কুলের হাজারের উপর ছাত্র-ছাত্রী সেই স্কুলে একজন মাহবুরের জন্য এই সহায়তাটা দেওয়াটা তো বিশেষ কিছুই না।

কিন্তু মাহবুরের বাবা-মার কথা শুনে আমি হতভম্ব। বিষাদে মনটা ছেয়ে গেল। মাহবুরের মা অসম্ভব মন খারাপ করে বলছিলেন, ‘আমার মাইয়াডারে ভর্তি করার সময় সব টেকা দিছি। মাহবুরের বেলায় অনেক দিন লাগায়া ঘুরছি হেড মাস্টরের পিছনে কিন্তুক আমার কাছ থিক্যা এক টেকাও কম রাখে নাই’।  
মাহবুরের মার যে আরও ভয়ংকর অভিযোগ কেবল যে টাকা কম রাখেনি এমনই না হেড টিচার তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও নাকি করেছেন। মাহবুরের মার তীব্র কষ্ট এটাই, মাগনা না-পড়াতে পারলে না পড়াবে কিন্তু তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা কেন?

আমি শুনতে শুনতে বাকহীন হয়ে ছিলাম। এমনিতে সরকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ার খরচের জন্য ‘উপবৃত্তি’ নামে বিস্তর টাকা খরচ করে। এই স্কুলেও উপবৃত্তি চালু আছে। কিন্তু মাহবুরের বোন তানিয়া বা শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন মাহবুব উপবৃত্তির এক টাকাও পেল না। তাহলে কারা পায় এই টাকা? মানুষ এমন হৃদয়হীন হয় কেমন করে, কতটা নষ্ট হলে...!

১. http://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_24.html

No comments: