Monday, July 28, 2014

খোশ আমদেদ, আপনাদের অপেক্ষায়...।


হাবিজাবি ব্যস্ততার কারণে ক-দিন ধরে স্কুলে যাওয়া হচ্ছিল না। কাল যখন স্কুলের পথে হাঁটা ধরলাম রাস্তায় পুঁচকে একটা শিশু সালাম দিলে বুঝতে পারলাম এ আমাদের ইশকুলের ছাত্র। আমার অতি দুর্বল স্মৃতিশক্তির কারণে এই স্কুলে পড়ছে বা এই স্কুল থেকে বের হয়েছে এমন শিশুদের মুখ আমি মনে রাখতে পারি না। সালাম দিলে আমি চট করে বুঝে যাই এ আমাদের স্কুল নামের কারখানার ছাত্র।

 

শিশুটির সঙ্গে আমার কথোপকথন:

শিশু: তুমরা বলে ইছকুলে সেমাই দিবা?

আমি: কে বলছে তুমারে?

শিশু: কও কী, তুমি জান না!

আমি: নাতো, জানি না তো। আগে কও কে বলছে তুমারে?

শিশু: হগ্গলে কইতাছে।

আমি: হগ্গলে কেডা?

শিশু: ইছকুলের হগল পুলাপাইন। 

 

আমি খানিকটা শঙ্কিত হলাম। শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে। এ সত্য গত বছর আমাদের ইশকুলের সবাইকে সেমাই-টেমাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তো এটা সম্ভব না কারণ এই খাতে আমার কাছে বাড়তি কোনও টাকা নাই। আমি মনখারাপ ভাব নিয়ে উল্টো পথে হাঁটা ধরলাম। স্কুলে গেলে বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখিন হব। কী দরকার অহেতুক মনখারাপের পারদ উঁচুতে তুলে।

ফিরে আসতে আসতে চিন্তা করছিলাম কাকে বলা যায়? আমার পরিচিত যারা আছেন তারা বিভিন্ন সময়ে আমার এই সমস্ত অকাজের আবদারে ত্যক্ত হয়ে ভবিষ্যতে আমার মুখদর্শন না-করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

 

কাকে ফাঁদে ফেলা যায় এটা ভেবে-ভেবে সারা। কিন্তু কোনও কূল-কিনারা হয় না! নাকি লটারি করব? রস-কস-শিংগা-বুলবুল-মালেক-মুশতাক... যার নামে শিংগা উঠবে সেই সই? জানি না কেন শেষপর্যন্ত কিছুই করা হয়ে উঠে না। আমার ভেতরের অন্ধকার ঝলমলে দাঁতে বলে উঠে: ওরে, থাকুক না, ঈদের আগে আর স্কুলে না গেলেই তো হবে। ঈদের ক-দিন পর গেলে বাচ্চারা এমনিতেই ভুলে যাবে।

আমিও দেখলাম তাই তো, এ তো মন্দ না।

 

কিন্তু...। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সাজ্জাদ হোসেন নামে একজন ফোন করলেন। তার সঙ্গে আমার কথোপকথন নিম্নরূপ:

সাজ্জাদ হোসেন: ইয়ে, আপনার স্কুলের বাচ্চাদেরকে কাপড় দিতে চাচ্ছিলাম।

আমি: (আনন্দের আতিশয্যে পারলে ফোনেই কিল মেরে বসি। শত-উল্লাস গোপন করে) আরে, তাহলে তো খুব ভাল হয়!

সাজ্জাদ হোসেন: আমি এই অংকের টাকা পাঠাব, কাপড়ের জন্য হবে তো?

(সএসসিতে, আমরা তখন বলতাম মেট্রিক। অংকে আমার ১৩ গ্রেস লেগেছিল অথচ সেই আমিই অতি দ্রুত আঁক কষে ফেলি।)

আমি: এই টাকায় সবার কাপড় তো বেশ হয়ে যাবে। আচ্ছা, সঙ্গে সেমাই দিলে কেমন হয়?

সাজ্জাদ হোসেন: বাহ!

আমি: (হাসি গোপন করে) সেমাইয়ের সঙ্গে চিনিও দিয়ে দেই?

সাজ্জাদ হোসে: কী বলেন, হবে?

আমি: বেশ হবে। আচ্ছা, অল্প কিশমিস না-দিলে কেমন হয় বলুন তো। কিশমিস ছাড়া সেমাই, ধুর! আর শোনেন, দুধ ছাড়া সেমাই রান্না হয় বুঝি! এক প্যাকেট গুঁড়ো দুধও দিয়ে দেই, কি বলেন?

সাজ্জাদ হোসেন: ওয়াল্লা, বলেন কী!

যাই হোক, আজ স্কুলের বাচ্চাদেরকে এইসব দেওয়ার পর্ব শেষ হলো।

স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের মাস্টার-মশাই

 সাজ্জাদ হোসেন নামের মানুষটা আমাকে চমকে দিয়েছেন। কারণটা বলি। এমন না এটাই আমার জীবনের প্রথম ঘটনা। আমার ছোট-ছোট স্বপ্নগুলোর প্রতি বিভিন্ন সময়ে অনেকেই মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাহলে?

সাজ্জাদ হোসেন মানুষটা হুজুর টাইপের। এই অল্প বয়সেই ইয়া লম্বা দাড়ি এমনিতে হুজুর টাইপের লোকজনরা অকাতরে মসজিদ-মাদ্রাসায় হস্ত উপুড় করে দেন কিন্তু স্কুলের বেলায় আকাশপানে তাকিয়ে হস্ত গুটিয়ে নেন।

জানি না এরা কেন এমনটা করেন! যারা আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করেন তারা হয়তো বিস্তর ল্যাকাপড়া করে নিশ্চিত হন তৎকালীন সময়ে আরবদেশে স্কুল নামের জিনিস ছিল না। আর তখন ওখানে স্কুলের মত-মত কোনও জিনিস থেকে থাকলেও সেখানে বাংলা পড়ানো হত না।

(তখন কেন বাংলা পড়ানো হতো না এটা আবার দুম করে আমাকে জিজ্ঞেস করে বসবেন না যেন)

 

এই বিষয়ে অতীতে আমার অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। অসংখ্য ঘটনা থেকে কেবল একটা উল্লেখ করি। হুজুর টাইপের অতি পরিচিত একজন। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য তিনি অতি সামান্য সহায়তা দিতে রাজি হননি অথচ তিনি আমাকে বলেছিলেন মসজিদ-মাদ্রাসা করেন পাঁচ-দশ লাখ যা টাকা লাগে দেব। আমি জানি এটা মুখের কথা ছিল না। তিনি সত্যি সত্যিই দিতেন।

 

যেটা বলছিলাম, সাজ্জাদ হোসেনের বিষয়টা তাই আমাকে অনেকখানি বিস্মিত করেছে। কায়মনে আমি চাই এই মানুষগুলোর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাক...অন্তত আমি এঁদের অপেক্ষায় আছি...।   

Tuesday, July 22, 2014

জাতীয় ফকির: আল্লার ওয়াস্তে একটা পইসা...



আমার বালকবেলায় প্রায়ই চোখে পড়ত এক ভিক্ষুক, অন্ধ মহিলা সুর করে ভিক্ষা করতেন। আল্লারওয়াস্তে একটা পইসা দিবেননি, বাজি। সেই দিন কোথায়- এখন আর কোনও পাগল ভিক্ষুকও ১ পয়সা চেয়ে ভিক্ষা করেন না।

দিন বদলেছে! ভিক্ষায়ও এসেছে বৈচিত্র। আজকাল লোকজনেরা লাইক- ভিক্ষা করেন। এই দেশে এখন জাতীয় এই-জাতীয় সেই, জাতীয় ভিক্ষুকও আছে। নমুনা। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর পক্ষ থেকে লাইক ভিক্ষা চেয়েছেন সাইদুজ্জামান। পূর্বে সম্ভবত ভদ্রলোক লিখতেন দন্তস্য রওশন। এখন লেখেন কেবল দন্তস্য-এর সাইদুজ্জামান। রওশন নিজেই ছেঁটে দিয়েছেন নাকি মতি ভাইয়া এটা বলা মুশকিল। মতি ভাইয়ার আবার নাম ছাঁটাছাটির কুঅভ্যাস-কুপ্রবৃত্তি আছে। নামের আকিকা দেওয়ার বিপুল উৎসাহ আছে আমাদের মতি ভাইয়ার। আকিকার জন্য এতো ছাগল কোথায় পান এ এক রহস্য!

যাই হোক, সাইদুজ্জামানের লাইকভিক্ষাআহ্বান থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে দেই (প্রথম আলো, ২০ জুলাই, ২০১৪):
লেখাটার শিরোনাম, লাইক দিয়েছ? সঙ্গে লাইক লেখা কিছু ডান্ডার ছবি।
এসো, আজ থেকে আমরা বন্ধুসভার ফেসবুক পেজে লাইক দেওয়া শুরু করি। আগামী ছয় মাসে আমরা ৫০ হাজার বন্ধু পেজে লাইক দেব।
প্রতিটি বন্ধুসভার যোগাযোগ ও প্রচার সম্পাদক রয়েছে। তাদের দায়িত্ব হলো লাইকের সংখ্যা বাড়ানো। প্রতিটি বন্ধুসভার বন্ধুদের তারা সচেতন করবে, উদ্বুদ্ধ করবে এ ব্যাপারে। আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে এ কর্মসূচি। যে বন্ধুসভার লাইক-সংখ্যা বেশি হবে, সেই বন্ধুসভার কথা ছাপা হবে।...
প্রতিটি বন্ধুসভার রয়েছে ২৫ জনের একটি কার্যকরী কমিটি। ফেসবুকে লাইক দেওয়া এই কমিটির প্রত্যেক বন্ধুদের জন্য বাধ্যতামূলক।...

আমি অসংখ্য ভিক্ষুক দেখেছি কিন্তু ভিক্ষা নিয়ে এমন ঘ্যানর ঘ্যানর করতে দেখিনি। আহ লাইক! সাইদুজ্জামানের এই লেখাটা পড়ে তো মনে হচ্ছে, বাতাসে দাও কৌপিন উড়াইয়া তবুও একেকটা লাইক নেব কুড়াইয়া।
আচ্ছা, এত্তো এত্তো লাইক নিয়ে এরা কী করবে! লাইক কচকচ করে চিবিয়ে খাওয়া যায় এমনটা তো শুনিনি! নাকি জুকারবার্গ লাইকের জন্য ট্যাকাটুকা দেয়?

প্রথম আলো পত্রিকাটিকে কেউ পছন্দ করুক বা না-করুক এটা অস্বীকার করার উপায় নেই মিডিয়া-টাইকুন এই প্রতিষ্ঠানটি এই দেশে অসম্ভব প্রভাবশালী। দোষ-গুণ একপাশে সরিয়ে রাখলে এরা নিজেরাই নিজেদের আলোয় উদ্ভাসিত। যেখানে এদের নিজস্ব উপায়ে যোগাযোগের অভাব নেই সেখানে ফেসবুকের লাইকের জন্য এদের যে তীব্র হাহাকার এটা যে অমর্যাদার তা এদের কে বোঝাবে। যেমনটা অমর্যাদার আনিসুল হকের মত লেককদের নিজেই নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া [১]

ফেসবুকে লাইকের জন্য অনেককে যে ছাবাল, খেলো, নীচ আচরণ করতে দেখি এতে করে মনে হয় লাইকেন জন্য পারলে এরা অবলীলায় নগ্ন হয়ে যাবে। এই অসভ্যতার কাতারে প্রথম আলো যোগ দিয়ে এটাই প্রমাণ করল এরা লোকজনকে শেখাবে কী, এদের নিজেদেরই তো শেখার অনেক বাকী...।

১. বিজ্ঞাপনতরঙ্গ-লেখকরঙ্গ!: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_21.html         

Friday, July 18, 2014

মানুষটার ছায়া...।



এই মানুষটার নাম মো. নুরুন্নবি। মাটি কাটার কাজ করেন। মাটি কোপাকোপি করে আমার একটা কাজ করে দিচ্ছেন। প্রথম দেখাতেই যেটা আমাকে টেনেছিল মানুষটার মধ্যে বাউল-বাউল একটা ভাব আছে। কাজ করতে করতে এই মানুষটার সঙ্গে আমার টুকটাক কথা হয়। মানুষটার কিছু কথা মজার। একবার আমি বললাম, বাহ, আপনার হাসিটা তো সুন্দর। মানুষটার লাজুক উত্তর, 'ইহ, বেছুলা। একবার ক্লান্ত হয়ে বলছিলেন, মাতাডা হেড হয়া আছে। আরেকবার পাশের লোকটাকে নুরন্নবি বলছেন, হুনো মিয়া, ঔরন্ডি কইরো না। ফাজলামি করারও একটা সিস্টেম আছে

যাই হোক, আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এটা জেনে এই মানুষটা ফি-বছর নিয়ম করে অন্তত দুই বার ভারতে অবস্থিত এক মাজারে যান। খুব অবাক হয়েছিলাম কারণ এমন আয়ের একজন মানুষের জন্য এই খরচটা বিপুল, হুজ্জতও কম না! যদিও পাসোপর্ট ব্যতীত, তবুও!

আমার সোজাসাপটা প্রশ্ন ছিল, কেন যান? কি আছে ওখানে। একজন মৃত মানুষের পক্ষে আপনার জন্য কি করার ক্ষমতা আছে?
তিনি পক্ষে যুক্তি দেন, আমি বিপক্ষে। এভাবে কথা চালাচালি হতে থাকে। আমি ধর্মের উদাহরণ দিয়ে একের-পর-এক কথাসস্ত্র ছুড়ে দেই। মনুষটার মধ্যে কি কোনও ক্ষীণ পরিবর্তন আশা করছিলাম? হবে হয়তো...।

আজ দেখলাম সঙ্গে একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। আমি অনেকখানি বিরক্ত হয়ে বলি, এই বাচ্চাটাকে আনলেন কেন, এ কি মাটি কাটার কাজ করতে পারবে!
নুরুন্নবি ঝাকড়া চুল দুলিয়ে বলেন, আরে নাহ, হে তো বিপদের মানু
আমি কিছুই বুঝলাম না। জানতে চাইলাম, মানে কি?
তিনি বলেন, হের বাপ-মা হেরে ফালাই গেছে
এবার আমার কৌতুহল হয়। বিষয়টা ভিন্ন। যেটা জানা গেল গতকাল ট্রেনে এই ছেলেটা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল বাবা-মার সঙ্গে। নেমেছিল পানি কেনার জন্য। বাবা-মা তখন গভীর ঘুমে। ট্রেন ছেড়ে গেছে। এ উঠতে পারেনি। এখানে রয়ে গেছে। রাতে নুরন্নবি স্টেশনে একে পান। এরপর ভাত খাইয়েছেন। সকাল পর্যন্ত বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। দিশামিশা না-পেয়ে একে সঙ্গে করে কাজের জায়গায় নিয়ে এসেছেন।

এবার আমি নুরন্নবি নামের মানুষটাকে আবারও নতুন করে দেখার চেষ্টা করি। বিভ্রম হয়তো, মনে হচ্ছিল এমন, তাঁর দীর্ঘ ছায়া ছাড়িয়ে যায় আশেপাশের সবকিছু, অবলীলায় আমাকেও।
 
এরপর করার মত আমার বিশেষ কোনও কাজ নেই। চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছলে আমার পরিচিত একজন ছেলেটার দায়িত্ব নেবেন। আজ যখন ছেলেটাকে (এর নাম সোহেল) ট্রেনে তুলে দিয়ে ফিরছি তখনবারও নুরন্নবিকে পেলাম স্টেশনের ওভারব্রিজে। আমি অবাক হয়ে বলি, এতো রাতে এখানে কী!
নুরন্নবি হাসেন, ওয়াল্লা, আমি তো এইখানেই ঘুমাই
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এপাশ-ওপাশ মানুষটার ছায়া খুঁজি- রাতের আধারে ছায়া দেখার ক্ষমতা আমার কোথায়...!

Tuesday, July 15, 2014

দানব!



পুরনো এই লেখায় লিখেছিলাম, জুইশরা কেমন করে দানব হয়ে ওঠে [১]। কেমন করে এরা তাদের শিশুদেরকে দানব বানায় [২]। এই লেখায়ও আমি পুরনো ছবিটাই ব্যবহার করেছি। কেবল এই একটা ছবিই সমস্ত কিছুই বলে দেওয়ার মত ক্ষমতা রাখে।
...ইসলাইলের শিশুরা যে মিসাইলে গায়ে ফানি-মজার মজার কথা লেখে সেই মিসাইলেই আহত হয়, প্রাণ হারায় ফিনিস্তানি শিশু এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই কারণ এদেরকে শেখানো হচ্ছে, মিসাইল, প্রতিপক্ষের শিশু-মৃত্যু এসব হচ্ছে খেলার একটা অংশমজার, শৈশবের খুবই মজার একটা খেলা...

গোটা প্যালেস্টাইন হচ্ছে এদের, বড়দের জন্য খেলার একটা মাঠ। বিষণ্ন বোধ হচ্ছে? যাও, গিয়ে প্যালেস্টাইনের কিছু লোকজনকে মেরে ফেল। শিশু, বৃদ্ধ, নারী হলেও কোনও সমস্যা নাই। খেলা তো খেলাই। ভোটের পূর্বে ক্ষমতা জাহির করতে হবে বা ওবামাকে একটা ম্যাসেজ দেওয়া প্রয়োজন শুইয়ে ফেল যত খুশি প্যালেস্টাইনিদেরকে।
বছরের-পর-বছর, যুগের-পর-যুগ ধরে এই সব খেলা দেখে বিশ্ববাসী তথা আমাদের চোখ সয়ে গেছে।

কিন্তু হালে নতুন একটা ফ্যাশন চালু হয়েছে। এ সমস্ত ফ্যাশনদুরস্তরা বেড-টির বদলে হিটলারের পদোদক পান না-করে দিন শুরু করতে চাইছেন না। এদের কথা হচ্ছে হিটলার ইহুদি নিধন করে অসাধারণ একটা কাজ করেছিলেন। সমস্ত ইহুদিদেরকে মেরে ফেলার সুযোগ পাননি এটা ভেবে চোখের জলে এরা নিজেদের অন্তর্বাস ভিজিয়ে ফেলছেন। অসংখ্য উদাহরণ থেকে এই একটা উদাহরণ দেই। মনোয়ার রুবেল, এ আবার নাকি কন্ট্রিবিউটিং এডিটর! এ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম -এ লিখেছে এই শিরোনামে, হিটলারই কি ঠিক ছিলেন? [৩]
ভেতরে ঠেসে দিয়েছে হিটলারের মতাদর্শ, দানবীয় আচরণের বহিঃপ্রকাশ। হিটলারই কি ঠিক ছিলেন?, এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে লেখার অর্থ হচ্ছে প্রকারান্তরে হিটলারের কাজকে সমর্থন করার চেষ্টা করাই না চতুরতার মাধ্যমে পাঠকের মাঝে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া।
আমার দৃষ্টিতে এরাও দানব তবে তিন নম্বর দানব। দানব তিন প্রকার। ১, বড় দানব, ২. ছোট দানব ৩. চুতিয়া দানব।

এই দানবরা সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছে হিটলার কেবল নারী-বৃদ্ধদেরকেই গ্যাস চেম্বারে ঢোকায়নি, শিশুদেরকেও। যাদেরকে কোন প্রকারেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চলে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, একটা জাতিকে নিচিহ্ন করে দেওয়া যায় না। কুতর্কের খাতিরে তর্ক করলেও যেটা চলে আসে গোটা একটা জাতির মধ্যে কী একটা মানুষও নিরপরাধ, হৃদয়বান থাকেন না? অনেক উদাহররণ থেকে কেবল একটা উদাহরণ দেই। Mira Bar Hillel
…Shaked got what she wanted: the death toll in Gaza is nearing 100, one in four being children. Hundreds more have serious injuries in a place where hospitals have also been bombed and medical essentials are running out…
ইসরাইলে জন্মগ্রহণকারী লেখক হয়েও যিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষনা দিয়েছেন:
...Seeing these angelic faces of evil spouting such genocidal rhetoric, I pick up my Israeli passport and a box of matches. “Not in my name, people. Not in my name! [৪]

এখন আমি প্রশ্ন করতে চাই এই ইসরাইলী লেখক যেটা করে দেখিয়ে দিয়েছেন সেটা আমাদের দেশের সামনে-পেছনে মানবতার চোঙ্গা লাগানো তাবড় তাবড় ঝুলেপড়া গোঁফ আর ঝুলেপড়া ইয়ে লেখকরা লক্ষ-লক্ষ ইরাকিকে আমেরিকা খুন করার অপরাধে- কই, পারলেন না তো কখনও আমেরিকার পাসপোর্টে আগুন ধরিয়ে দিতে, ছিঁড়ে ফেলতে, আমেরিকার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে?
পাগল! পারলে এরা একটা বিচি জমা রেখে হলেও আমেরিকায় ভ্রমণের নামে ওখানে শ্বাস ফেলতে, চিকিৎসা করাতে, উচ্চশিক্ষার জন্য মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটবেন। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা...।

৪. Why I'm on the brink of burning my Israelipassport: http://www.independent.co.uk/voices/why-im-on-the-brink-of-burning-my-israeli-passport-9600165.html

...


লিদিৎস গ্রামের যে সকল শিশুদেরকে হত্যা-খুন করা হয়েছিল তাদের স্মরণে ভাস্কর্য

হিটলার কোনও শাসক, সমরবিদ, রাজনীতিবিদ, চিত্রকর ছিল না- ছিল স্রেফ একটা উম্মাদ, বদ্ধউম্মাদ! তাকে যারা সমর্থন করে এরাও উম্মাদ! অজস্র উদাহরণ থেকে কেবল একটা উদাহরণই যথেষ্ঠ:

“…এই ইতিহাসটি চেকোস্লোভাকিয়ার একটি ছোট্ট গ্রাম লিদিৎসের (Lidice)১৯৪২ সালের ১০ জুন নাৎসী জার্মানীর এসএস সেনাদের নৃশংস হত্যাকান্ড এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছিল  এই গ্রামটির নিরীহ বেসামরিক অধিবাসীরা, শিশু, নারী এবং পুরুষ

জুলাই ২, ১৯৪২, বাকী ৮১ জন শিশুকে গেষ্টাপো অফিসে হস্তান্তর করা হয়, তাদের পোল্যান্ডে চেলনো (Chelmno) নামে এটি স্থানে এক্সটারমিনেশন বা ডেথ ক্যাম্পে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়ধারণা করা হয়, তাদের সবাইকে একই দিনে হত্যা করা হয়েছিল...এর কিছু দিন পরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে লেজাকি (Ležáky) বলে আরেকটি গ্রামে

...(সুখের বিষয়), নিষ্ঠুর গেষ্টাপো প্রধান, লিদিৎসে গণহত্যার প্রধান কার্ল হেরমান ফ্রাঙ্ক মার্কিন বাহিনীর কাছে পরে আত্মসমর্পন করেন, ১৯৪৬ সালে তার বিচার হয় প্রাহাতেপ্রায় ৫০০০ মানুষের সামনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।...
বিস্তারিত জানা যাবে এখানে: http://tinyurl.com/me5qdus
 

Saturday, July 12, 2014

রওশন আরা...



রওশন আরাকে নিয়ে লেখাটায় যেটা লিখেছিলাম [১]:
...তখন রওশন আরাকে যে-প্রকারে বিকচ চৌধুরী বা আহমদ ছফা সৃষ্টি করেছিলেন এতে আমি দোষের কিছু দেখি নাযুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল থাকে যোদ্ধা বা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত মানুষদের উদ্দীপ্ত করার জন্য এও এক কৌশল।...

সাব্বির হোসাইন রওশন আরাকে নিয়ে অসম্ভব পরিশ্রমী এক লেখা লিখেছেন [২] তাঁর এই উদ্যেগকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তাঁর মত, লেখার সঙ্গে আমি সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করি। আমি মনে করি, রওশন আরা চরিত্রটি একটি কাল্পনিক চরিত্র। যেটা আমি পূর্বেও বলেছি। এই প্রসঙ্গে অন্য একজনের লেখার জবাবে আমি তীব্র শ্লেষভরা উত্তর দিয়েছি কিন্তু সাব্বির হোসাইন-এর বিষয়টি ভিন্ন।
যদিও আমি তাঁর সঙ্গে একমত নই কিন্তু মানুষটার প্রতি আছে আমার ভাল লাগা কারণ তিনি কাজটা করেছেন সততার সঙ্গে।
যাই হোক, রওশন আরাকে নিয়ে তখন কেন এমনটা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল? পূর্বেই বলেছি এটাকে আমি দোষের মনে করি না কারণ যুদ্ধের অনেক কৌশলের এটাও একটা। কখনও কখনও এরও তীব্র প্রয়োজন আছে।
যিনি ১৯৭১ সালে রওশন আরাকে নিয়ে প্রতিবেদনটা লিখে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন সেই মানুষটা হচ্ছেন, বিকচ চৌধুরী। এবং রওশন আরা নামের এই চরিত্রটি সৃষ্টির পেছনে যে মানুষটির প্রচ্ছন্ন হাত ছিল তিনি হচ্ছেন আহমদ ছফা। আহমদ ছফার জবানিতে আবারও শুনি:
...আমরা যখন প্রবেশ করলাম রওশন আরার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কলকাতার এক গুণী শিল্পী একটি গান পরিবেশন করছিলেন। গানের কথাগুলো ভারি সুন্দর। ভদ্রলোক তন্ময় হয়ে গাইছিলেন-
শহীদ লক্ষ ভাই ভগিনী শহীদ রোশেনারা
তোমরা তো সব প্রাণের আগুন চোখের ধ্রুবতারা
রোশেনারা বোনটি আমার কোন গাঁয়ে যে ছিল তোমর ঘর...

শিল্পীর কন্ঠে গানটি যেই শেষ হল, এই বীরাঙ্গনা তরুণীর স্মৃতির প্রতি অপার মমতায় উপস্থিত দর্শকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।...
গানের পর কলকাতার সবচেয়ে খ্যাতিমান আবৃত্তিকার বিখ্যাত কবি এবং সমালোচক প্রমথনাথ বিশীর সুললিত ছন্দে লেখা একটি সুদীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করলেন।
তারপরে একজন মাঝবয়েসী মহিলা মঞ্চে এলেন। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে রওশন আরা সম্পর্কিত এপর্যন্ত যে সব সংবাদ তারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, একটি লিখিত বিবরণ পাঠ করলেন।
রওশন আরার বাড়ি রাজশাহী জেলার নাটোর। তার বাবা পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। এবং সম্পর্কে সে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মীয়া। পড়াশোনা করত ঢাকার ইডেন কলেজে। ...বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাঙ্ক নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহীর দিকে এগিয়ে আসছে।...(রওশন আরা) মাথার ওড়নাটা খুলে নিয়ে ভালো করে বুকের সঙ্গে তিনটা মাইন শক্ত করে বেঁধে নিল। ...তারপর প্রাণপন চীৎকারে জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করে, সারা শরীর ট্যাঙ্কের তলায় ছুড়ে দিয়েছিল।

...এটুকু পাঠ করার পর হলের মধ্যে আহা উহু ধ্বনি শোনা যেতে থাকল। কোনো কোনো মহিলা উচ্চৈঃস্বরে রোদন করে উঠলেন।
...তারপর এলেন আরো এক মহিলা। তিনি এপর্যন্ত ভারতবর্ষের নারীসমাজ রওশন আরার আত্মদানে উদ্বুদ্ধ হয়ে কী কী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে, তার একটা আনুষ্ঠানিক বিবরণ দাখিল করলেন। দিল্লিতে শ্রীমতি অরুণা আসফ আলির নেতৃত্বে একটি রওশন আরা ব্রিগেড গঠিত হয়েছে। তাঁরা পায়ে হেঁটে আগ্রা অবধি মার্চ করে গেছেন এবং বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছেন। পাটনায় রশন আরা বিগ্রেডের কর্মীরা নিজের হাতে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আড়াই হাজার উলের সুয়েটার বুনে দিয়েছে। এইভাবে এলাহাবাদ, বেনারস, জলন্ধর, অমৃতসর, মাদ্রাজ, দিল্লি রওশন আরা বিগ্রেড কর্মীদের কর্মসূচীর বর্ণনা দিলেন।...
...বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রাম থেকে এইরকম রওশন আরার মতো বীরকন্যা যদি সত্যি সত্যি জন্ম নিত, তা হলে আমাদের সংগ্রামের অবস্থা কী দাঁড়াত মনে মনে কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম।
(অলাতচক্র, পৃষ্ঠা নম্বর: ১৩১, ১৩২, ১৩৩)

সান জুর Art of war বইটি পড়ল খানিকটা আঁচ করা যায় যুদ্ধ কেবল ছেলেখেলা না- এখানে মস্তিষ্কের কারুকাজের খামতি নেই। তাই রওশন আরা নামের চরিত্রটিও মস্তিষ্কের এক অসাধারণ কারুকাজ সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সংগ্রহ বা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আড়াই হাজার উলের সুয়েটার, ভাবা যায়!
তেমনি বলা চলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এম. আর. আখতার মুকুলের চরমপত্র নিয়ে। তাঁর চরমপত্র তখন কী অসাধারণ প্রভাবই না ফেলেছিল!
এম. আর. আখতার মুকুল ট্যাঙ্ক ধ্বংস করছেন, গানবোট ডোবাচ্ছেন, সৈন্যভর্তি ট্রেনসহ ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছেন, সেনা ছাউনিতে ছাউনিতে ত্রাসের সঞ্চার করছেন। এ পর্যন্ত তিনি যত পাকিস্তানি সৈন্য খুন করেছেন, যত জখম করেছেন, যত ট্যাঙ্ক অচল করেছেন, যত কনভয় ধ্বংস করেছেন, সব মিলিয়ে যোগ করলে যে সংখ্যাটি দাঁড়াবে, তাতে করে একজনও পাকিস্তানি সৈন্য বাংলার মাটিতে থাকার কথা নয়। তার পরদিন সন্ধেবেলা আবার সৈন্য মারতে আসেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবি এত সৈন্য তিনি কোথায় পান?
(অলাতচক্র, পৃষ্ঠা নম্বর: ১২৩)

১. রওশন আরা: বাস্তবকে ছাড়িয়ে যায় কল্পনা! : http://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_24.html

২. ব্যাখ্যাহীন দেশ্রপ্রেম ও রোশেনারা:  http://www.ali-mahmed.com/2014/07/blog-post.html       

Thursday, July 10, 2014

হাহাকার-নিয়তি-অভিশাপ!



ব্রাজিল এবারের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ। এ খবর পুরনো এই বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ওখানকার বিরাট এক অংশের ক্ষোভের শেষ নেই। এই নিয়ে তীব্র ক্ষেভেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
বিশ্বকাপবিরোধী বিশেষ করে নৃ-গোষ্ঠীর আদিবাসী লোকজন প্রচণ্ড বিক্ষোভ করেছিলেন
এঁদের সাফ কথা, জনগণের টাকায় বিশ্বকাপের বিপুল আয়োজন করা ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্রেফ বিলাসিতাব্রাজিলে এখনও অনেক লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সেখানে বিশ্বকাপের জন্য অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ আসলে শ্বেতহস্তীর শামিল

এই নিয়ে অনেক বোদ্ধা সরু চোখেও তাকিয়েছেন। কারণ এদের কাছে শো-টাই বড়, শো-এর পেছনের কান্না দেখার আগ্রহ নেই। কতশত কষ্ট, কত হাজার ঘর উজাড় হলো কয় লক্ষ মানুষ ক্ষুধায় কাতর হলো এই সমস্ত ছোটখাটো বিষয়ে তাদের কী আসে যায়। আদিবাসী যাদেরকে আমি আদিমানুষ বলি এই গ্রহের বিভিন্ন স্থানে এদের অনেককেই আমরা মেরেকেটে সাফ করে দিয়েছি আর যারা অবশিষ্ট আছেন এঁরা পুরোপুরিই কোনঠাসা। নইলে এরা এখনও তির-ধনুক নিয়ে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে বুঝি বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। লাভ কী! এঁদেরকে পরাস্ত করার জন্য রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করবে। বেকায়দায় পড়লে ইউএন মিশনের মোড়কে আমাদের কাছ থেকে মার্সেনারি ভাড়া করবে।

অন্য এক লেখায় লিখেছিলাম, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়াটা জরুরি- খেলা খেলায় ফিরে আসুক। কারণ এই দুইটা দলকে নিয়ে অনেকের অহেতুক চরম মাতামাতি অসুস্থতা [১], [২] । কিন্তু ব্রাজিলের এমন পতন মন থেকে কদাপি চাইনি।

কোথাও কী হাহাকার-ব্লেসিং নিয়েও অন্য রকম খেলা হয়? কী জানি, জানি না। হবে হয়তো, নইলে এমনটা হবে কেন? ব্রাজিল সেমি-ফাইনালে যা করল এটাকে ডিজাস্টার বললে কম বলা হয়। এটা সহ্যাতীত। ব্রাজিল সমর্থক কেউ-কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করলে আমি অন্তত বিস্মিত হব না। এই অবস্থা  ব্রাজিলের ঘোর শক্রও সম্ভবত কল্পনা করেনি। ১১ মিনিটের মাথায় গোলটাকে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু ২৯ মিনিটের মধ্যে যেমন করে অন্য গোলগুলো হলো এটাকে কী বলা চলে! এখানে কেবল সাতটা গোলই শেষ কথা না। মনে হচ্ছিল কোথায় যেন একটা বিষম গোল লেগে আছে যার ব্যাখ্যা ব্যাখ্যাতীত। এমনিতে আরও দু-চারটা গোল দেওয়া জার্মানির জন্য অসাধ্য ছিল না। কেবল দুজন খেলোয়াড়ের জন্যই এমনটা হতে পারে এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না। তাহলে...?

*ছবি ঋণ: রয়টার্স

১. সিক পিপল: http://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_3.html 
২. দ্রুত আরোগ্য কামনায়: http://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_8936.html   

Thursday, July 3, 2014

‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’।



বে-নজির, পূর্বের এই লেখা লিখেছিলাম [১], স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় বলেছিলেন, ...দুনিয়ার কোথাও ছুটির দিনে চিকিৎসক পাওয়া যায় না, কেউ মরে গেলেও চিকিৎসক আসেন নাকিন্তু বাংলাদেশের হাসাতালে ছুটির দিনেও জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু থাকে

পৃথিবীর কিছু-কিছু দেশ সম্বন্ধে জানি না এমন না যে ম্যাজিক নাম্বার মাত্র তিনটে সংখ্যা চাপলেই কেমন করে আলাদিনের চেরাগ এসে হাজির হয়। তারপরও আমার আগ্রহ ছিল একটা দেশে বসবাস করেন এমন একজনের মুখ থেকে শোনা। মন্ত্রী মহোদয় বলে কথা! এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এমনটা বলবেন এ অবিশ্বাস্য।
যাই হোক, বিলেত ওরফে ইংল্যান্ড থেকে জানাচ্ছেFakruddin Shahariar,
...এখানে বছরে ৩৬৫ দিনই দিন রাত ২৪ ঘন্টাই ইমির্জেন্সি সার্ভিস খোলা থাকেযে কোন ইমার্জেন্সিতে শুধু কষ্ট করে আপনাকে ৯৯৯ নাম্বারে ডায়াল করলেই হবে...ম্বুলেন্স, পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিস যেটা বা সবগুলোই দরকার মনে করলে আপনার ঠিকানায় ৫/১০ মিনিটের মধ্যেই পৌছে যাবেখৃষ্টমাসের সময় এদের যখন প্রায় সবকিছুই বন্ধ তখনও এই তিন ইমার্জেন্সি সেবা খোলা থাকে

পূর্বের লেখাটায় (বে-নজির) উদ্বোধনের একটা প্রসঙ্গ এসেছিল। আমাদের দেশের ব্রিজ-কালভার্ট-সেতু-রাস্তা-হাসপাতাল এমন কোনও পাতাল নেই যেটা মন্ত্রী বাহাদুর উদ্বোধন না-করলে চালু হবে। আফ্রিকার এক অভিজ্ঞতা নিয়ে জানাচ্ছেন Sharifus Salekin Shahan :
...I was returning from Capetown and when in the airport we discovered that a few minutes ago that brand new terminal was inaugurated . We got some very good chocolates as gift. I asked the girl behind the Qatar Airways desk - so your president was here to inagurate.
  
যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মানুষ হিসাবে একজন সজ্জন ব্যক্তি। মানুষটা কথা কম, কাজে বিশ্বাসী কিন্তু মন্ত্রী তো! গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের প্রতিবাদ সভায়। বললেন,
...অনেকে সংসদ এবং সংসদের বাইরে পদ্মা সেতুর নাম বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবর নামে করার দাবি জানিয়ে আসছেন। এটা নিছক তাদের আবেগই নয়, যথেষ্ঠ যুক্তিও আছে। কারণ এই মহীয়সী নারী আড়াল থেকে অনেক কিছুই করেছে যা এক নামেই শেষ করা হবে না।...

অতি উত্তম। তারপর বললেন, ...বিএনপি যত হুমকিই দিক...। এখন আষাঢ় মাস। এই জন্যই আমি বলি, তাদের আষাঢ়ের তর্জন-গর্জনই সার।
আষাঢ় মাস বেচারার দোষ কোথায়! তর্জন-গর্জন এরপর কী বৃষ্টি বর্জন করে? কই, এমনটা তো জানি না।

তিনি আসলে কী বলতে চেয়েছেন তা বোঝা মুশকিল। কারণ মন্ত্রীরা তো ভুল করতে পারেন না নইলে বলতাম আমরা পড়ে এসেছি, অসারের তর্জন-গর্জনই সার এটা তো সবার জানা যার ইংরাজি হচ্ছে, “Barking dogs seldom bite. বা  Empty vessels sound much.”

এমনিতে আমাদের রথী মহারথী মহোদয়গণ হেন কোনো বিষয় নেই যা জানেন না এমন কোনও প্রসঙ্গ নেই যেটা নিয়ে বলেন না! বনমন্ত্রী বলেন যুদ্ধাপরাধের আইন নিয়ে তো আইনমন্ত্রী বলে বসেন শেয়ার বাজার নিয়ে - এই চলে আসছে।

পূর্বের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ওমানের রাষ্ট্রদূত এখানে বললেন, দিল মে কুছ কালা হ্যায়। পরে হাসি চেপে অতিথিরা ওটা সংশোধন করে দেন। এই ভিডিওটি যারা না-দেখেছেন [২], এই ভদ্রলোকের বক্তৃতা যিনি না-শুনেছেন তিনি কল্পনাই করতে পারবেন না ভিনদেশে আমাদের রাষ্ট্রদূতরা কেমন করে দেশকে আলোকিত করেন!

.  বে-নজির!: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10152202780782335
২. ওমানের রাষ্ট্রদূত: http://www.ali-mahmed.com/2011/08/blog-post_12.html

Tuesday, July 1, 2014

ব্যাখ্যাহীন দেশ্রপ্রেম ও রোশেনারা



আজকের অতিথি লেখক সাব্বির হোসাইন (https://www.facebook.com/sabbirhossain.uni)। রওশন আরাকে নিয়ে তথ্যবহুল এক লেখা লিখেছেন:
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা দেখতে যেয়ে আবিষ্কার করলাম, সে তালিকায় রোশেনারার (রওশন আরা) নাম নেই দু:খ পেলাম অথচ রোশেনারা যে কাজ করেছিলেন, তা কোন বীরশ্রেষ্ঠ থেকে কম নয় ইতিহাসে আমরা দুজন রোশেনারার (রওশন আরা) সম্পর্ক জানতে পারি

এক.
মুক্তিযোদ্ধারা ভারী অস্ত্র নিয়ে কিশোরী রোশেনারাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল রোশেনারাদের বাড়িতে অস্ত্র রেখেছিল, গ্রেনেড আর মাইন রোশেনারাকে খুব স্নেহ করতেন মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে রোশেনারা মাইন, গ্রেনেড সহ নানান অস্ত্র চালাতে শিখেছিল
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছেই সে শুনেছিল, মাইন দিয়ে বড় বড় গাড়ি, বাড়ি ধ্বংস করা যায়
রাজাকারদের থেকে খবর পেয়ে এক পড়ন্ত দুপুরে রোশেনারাদের গ্রামে ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ করে গ্রামে তখন মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন না, ওঁরা একটা অপারেশানে দূরে কোথাও গিয়েছিলেন
সারা গ্রাম পাকিরা লন্ড-ভন্ড করে মেয়েদের উঠোনে এনে সবার সামনে নির্যাতন করে কুকুর শিকারের মত বাঙালি মারতে থাকে এসব দেখে আর সহ্য হলো না রোশেনারার হঠাৎ কি থেকে যেন কি হয়ে গেল
ছোট্ট শুকনো একটা মেয়ে জয় বাঙলা বলে পাকিদের ট্যাংকের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়লো এরপর, বিকট শব্দ আর পাকিদের আর্তচিৎকার রোশেনারার আত্মঘাতী মাইন-আক্রমনে ধ্বংস হয়ে যায় পাকি ট্যাংক, লাশ হয় কুড়িজনের মত পাকি হায়েনা 

দুই.
২৫ মার্চের আগে থেকেই মুক্তির সংগ্রামের জন্য বাঙালি তরুণ-তরুণীরা গোপনে সামরিক প্রশিক্ষন নিচ্ছিল সেই দলের সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রওশন আরা
২৫ মার্চ, ১৯৭১ এ শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সবচেয়ে বড় গণহত্যা পাকিরা গুলি করে, বেয়নেট চার্জ করে কুকুর মারার মত করে বাঙালি হত্যা করছে সেই রাতেই (২৬ মার্চ, প্রথম প্রহর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যাংক নিয়ে হামলা করে পাকি বাহিনী হঠাৎ করে দানব ট্যাংকের সামনে এসে পড়েন রওশন আরা
তাঁর বুকে মাইন বাঁধা জয় বাঙলা চিৎকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ট্যাংকের নিচে মুহুর্তেই দলিত হয়ে গেল রওশন আরার দেহ আর বিকট বিস্ফোরন বাঙলার মাটিতে ধ্বংস হলো প্রথম পাকি ট্যাংক
... 
পাঠকের কাছে শুধু এই প্রশ্নটুকু রেখে যায়- কতটা দেশপ্রেম, দেশের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে একজন মানুষ পালিয়ে যেয়ে আত্মরক্ষার সুযোগ থাকা সত্বেও আত্মঘাতী হয়ে দেশের শত্রুবধে ব্রত হতে পারেন? দেশপ্রেমের সেই তলহীন গভীরতার কতটুকু আমরা স্পর্শ করতে পেরেছি
রোশেনারাকে (রওশন আরা) নিয়ে বেশ কিছু সাহিত্যও রচিত হয়েছিল

সামসুল হকের কবিতা
রোশেনারা
তোমার বয়স কতো, আঠারো উনিশ?
মুখশ্রী কেমন? রঙ চোখ চুল কী রকম? চলার ভঙ্গিমা?
ছিল কি বাগান, আর তোমার মল্লিকা বনে ধরেছিল কলি?
ছিলে তুমি কারো প্রতিমা?
জানি না 
না, জানি
পৃথিবীর সব মাস সব দিন তোমার হাতের মধ্যে এসে গিয়েছিল,
দুপুরের মতো মুখ, রৌদ্রদগ্ধ চোখ, পায়ে চৈত্রের বাতাস,
তোমার বাগানে- কলোনি স্বদেশে-
ধরেছিল সাড়ে সাত কোটি মল্লিকার কলি,
তুমি ছিলে মুক্তির প্রতিমা
ওই বুকে মাইন বেঁধে বলেছিলে-
জয় বাংলা- মানুষের স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক,
ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলেছিলে-
বর্বরতা এইভাবে মুছে যাক, ধ্বংস হোক সভ্যতার কীট
অন্তিমবারের মতো পথিকেরা পথে এসে দাঁড়িয়েছে, আকাশে উঠেছে ধ্রুবতারা-
ধ্রুবতারা হয়ে গেছে মুক্তির জননী রোশেনারা"

প্রীতিশ নন্দীর কবিতা:
(মূল ইংরেজী রচনার অনুবাদ করেন শিশির ভট্টাচার্য্য; একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা সাময়ীকিতে ছাপা হয়)
একটি মেয়ের মৃত্যু
রোশেনারা মারা গেছে, মনে রেখো

নদীর মেয়ে রোশেনারা, প্রতিহিংসার সূর্য আমাদের, রাত্রির স্তরের ওপর তুষারীভূত দুটো চোখ
রোশেনারার শান্ত চোখদুটোর কথা মনে করো
এরপরও যদি তুমি হিংসার প্রসঙ্গ তোল
তবে আমি তোমাকে ওর চূর্ণ বিচূর্ণ বাহুদুটোর উচ্চারিত ভয়ঙ্কর প্রশ্নটির দিকেই দেখিয়ে দেব
আর তারপর ইবলিস যদি তোমার পথ প্রদর্শক হয়
তবে আমি সেই নীল নিঃস্তব্ধতার দিকেই তোমাকে এগিয়ে যেতে বলব
যা রাত্রির কামনা নিয়ে জ্বলতে থাকে
যখন লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাভ রক্তগোলাপ ওর চোখের সামনেই ঝরে যায়
মনে রেখো আজ রাতে রোশেনারা মারা গেছে
আর নিজের মরা চোখ দুটোই ওর সেই নীরবতা পালন করছে
দূরের গ্রামগুলো যখন বন্দুকের আওয়াজে শব্দিত হয়ে উঠবে
ওর খোঁপায় গোঁজা অঙ্গারীভূত লাইলাক ফুলটা রাতের জাফরিতে বুনে দেবে সাহস
সময়ের সেনানী-সবুজ রূপকথাগুলো রোশেনারার বরণ করা মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করবে না আর
একটা ট্যাঙ্ক একটা জীবনের সমান
হ্যাঁ রোশেনারা ওই দাম ওর
গ্রীষ্মের মূল্য ও শতলক্ষ নিহতের, পর্বতপ্রমাণ ধর্ষণ আর শঙ্খ চিলের মৃত্যুর
আর যদিও সাতটি রাত্রির পৈশাচিক ভীষণতা জুড়ে প্রাচীনতম নদীটি জ্বলছে
ভস্মীভূত বৃক্ষ আর নাপাম বোমাহত পাখিটা নীরবে অপেক্ষামান
যদিও তোমার অন্তহীন প্রশ্নগুলো চুয়াডাঙার জনহীন পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে
পাবনা মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা
সিলেট প্রাণহীন
আর চট্টগ্রাম হলুদ-নদীর অপরপারে অপেক্ষামান
তবু মনে রেখো, রোশেনারা মারা গেছে
আর তার মৃত্যুই চূড়ান্ত

বাউল কবি অমর পালের দুটি গান
এক:
অনলাইনে শুনুন:
http://kiwi6.com/file/imj8hl5kpf
আকাশ কান্দে বাতাস কান্দে যেন মণিহারা,
কান্দিয়া কান্দিয়া অন্ধ হৈল চক্ষু তারা,
তোমার লাগি দেশ কান্দে ওগো রোশেনারা
যতদিন ঐ মাঠে মাঠে বুনবে সোনার ধান,
ততদিন ঐ মাঝির মুখের হৈয়া রইবে গান
তোমার নামে কান্দে ঐ বাউল একতারা,
তোমার লাগি দেশ কান্দে ওগো রোশেনারা
রক্তের অক্ষরে নাম লিখে গেছ হায়,
ঝড়ে জলে বৃষ্টিতে যে ও নাম মোছা দায়
কাহার ঘরের ঘরণী গো ছিলে কন্যা কার,
দেশের লোকে জানে তুমি মেয়ে যে বাংলার
আন্ধার পথের পথিকেরে দেখায়ো পথ শুকতারা,
তোমার লাগি দেশ কান্দে ওগো রোশেনারা

দুই:
অনলাইনে শুনুন:
http://kiwi6.com/file/us0tao48zy
তোরা দ্যাখ আসিয়া রে বাংলা যে হৈয়াছে স্বাধীন,
দুই রঙা যে পতাকা ওড়ে আসিল সুদিন
ও তার জমিনটা যে সবুজ দেশের মাটির কথা কয়,
মধ্যিখানে নতুন দিনের সূর্যের উদয়
শেখ মুজিবের সোনার বাংলা আনল নতুন দিন,
তোরা দ্যাখ আসিয়া রে বাংলা যে হৈয়াছে স্বাধীন
যে দেশেতে জন্ম নিল বীর মুজিব ভাই,
রক্ত দিল রোশেনারা যার তুলনা নাই,
প্রাণ দিয়া মান রেখে গেল রাম ও রহিম,
তোরা দ্যাখ আসিয়া রে বাংলা যে হৈয়াছে স্বাধীন
বাংলাদেশ যে হৈল স্বাধীন কররে এবার পণ,
দেশের তরে আপন স্বার্থ দিয়া বিসর্জন,
সেই পতাকা নবার উপর রাখরে চিরদিন,
তোরা দ্যাখ আসিয়া রে বাংলা যে হৈয়াছে স্বাধীন

সামরিক বাহিনীতে রোশেনারা:
একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর দুটি গোলন্দাজ ব্যাটারির একটি ছিল মুজিব ব্যাটারি এবং আরেকটি ছিল রওশন আরা ব্যাটারিট্যাংক ধ্বংসকারী রোশেনারার (রওশন আরা) প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর একটি গোলন্দাজ ব্যাটারীর নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়
(সূত্র: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী)

ঐতিহাসিকতার দ্বন্দ্ব:
রোশেনারা (রওশন আরা) চরিত্রটির ঐতিহাসিকতা নিয়ে বেশ কিছু বির্তক আছেস্বাধীন বাংলা বেতারের নুরজাহান মাযহারের মতে, চরিত্রটি বাস্তবে ছিল নুরজাহান মাযহারের কাছে অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধার আসল পরিচয় দেয়ার জন্য আমরা ঋণী
রোশেনারা চরিত্রটি সম্পর্কে চার ধরণের মতামত প্রচলিত আছে:
০১. রোশেনারা চরিত্রটি সামরিক কৌশল হিসেবে ভারতীয় বেতারের সৃষ্টি
০২. এম আর আখতার মুকুলের সৃষ্টি
০৩. আহমেদ সফার সৃষ্টি
০৪. চরিত্রটি বাস্তবে ছিলেন

স্বাধীনতার সাড়ে তিন দশক পর রোশনারা চরিত্র সম্পর্কে অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে অগ্রজদের লেখা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনা, মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসবর্ণনের উপর নির্ভর করতে হয়েছেইতিহাস যাচাইয়ের প্রামাণ্য নিয়ম অনুসারে শেষ মতটি বেশি গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নিলাম কারন, এই সংক্রান্ত সবচেয়ে পুরাতন দলিলটি হলো, নূরজাহান মাযহারের মুক্তিযুদ্ধ কথিকা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশিত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর পুস্তিকা; দুটো বইতেই নুরজাহান মাযহারকে বাস্তবের চরিত্র বলে বর্ণনা করা হয়েছে

নূরজাহান মাযহার রোশেনারার (রওশন আরা) ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন নাকি ওঁনার কথা শুনেছিলেন, এই বিষয়ে কোন বর্ণনা কথিকায় নেইতাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধ কথিকায় রোশেনারার বীরত্ব বর্ণনার সময় প্রীতি রানী পুরকায়স্থর নারী মুক্তি ফৌজের কথা উল্লেখ করা হয়এই হিসেবে রোশেনারার বাড়ি সম্ভবত সিলেট অঞ্চলে (আরো স্পষ্টত সুনামগঞ্জ)

রওশন আরার কোন পূর্বপরিচয় জানা যায়নি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছিলসেই পুস্তিকায় ঘটনা- দুইয়ের বর্ণনা পাওয়া যায়এই পুস্তিকায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠনের কথা উল্লেখ আছেরওশন আরাকে এই বাহিনীর সদস্য উল্লেখ করা হয় সম্ভবতএই একই বাহিনীর কথা ষোলখন্ডে প্রস্তুতকৃত স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে উল্লেখ আছে

২০১৩ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থার উদ্যোগে নারী মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলামওই অনুষ্ঠানে পাবনার বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় রোশেনারার (রওশন আরা) বীরত্বের বর্ণনা করেনএই একই অনুষ্ঠানে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী একাত্তরে তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি নারী মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর কথা বলেন এবং তিনিও রোশেনারাকে (রওশন আরা) নিয়ে বীরত্বের বর্ণনা করেন

একটি কথা না বললেই নয়, এই লেখাটি মূলত রোশেনারার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা রোশেনারা সম্পর্কে একটি বর্ণনামূলক লেখারোশেনারা মিথ নাকি বাস্তবতা, তা প্রমাণ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়রোশেনারা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি যে দুইটি বইতে পাওয়া যায়, তার দুটোই রোশেনারাকে বাস্তবের একটি চরিত্র বলে অভিহিত করছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের মতামতটুকু গ্রহণ করেছি

তথ্যসূত্র:
০১ মুক্তিযুদ্ধ কথিকা, নূরজাহান মাযহার
০২ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর একটি পুস্তিকা
*রোশেনারার (রওশন আরা) উপর রচিত কবিতা, গান ও গানের অডিও সহ তথ্য দিয়ে এবং নানানভাবে বিশেষ সহযোগীতা করেছেন: শ্রদ্ধেয় এমএমআর জালাল ভাই