Friday, May 30, 2014

পশুমানব!

এই গ্রহের কঠিন গোমড়ামুখো যে মানুষটি সেও মুখ ভরে হাসবে যদি এমন একটা দৃশ্য দেখে ভারী শরীর নিয়ে কেউ নাচার চেষ্টা করছে। আহা, এমন দৃশ্য দেখে না-হেসে পারা যায় বুঝি? একজন মানুষ অতি ভারী শরীর নিয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার এই অমানুষিক কষ্টে গা দুলিয়ে না-হাসলে কেমন হয়! যেমনটা কেউ পা পিছনে বা চেয়ার উল্টে পড়ে গেলে আমরা হেসে মাটিতে গড়াগড়ি খাই। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেলে পেট চেপে হাসি।

আমি একবার কি যেন একটা অনুষ্ঠান দেখছিলাম কিন্তু একটা জায়গায় এসেআমার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অতি ভারী শরীর নিয়ে একটা মেয়ের নাচ। তুর্কি নাচ, দমবন্ধ করা নাচ! চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে কী অসাধারণ তার প্রাণশক্তি। তার উপর নাচের একটা স্টেপও ভুল করতে দেখিনি।
ভারী শরীরের মানুষদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি, কেন? এর উত্তর জানা নেই আমার। অথচ মামুলি কিছু উদাহরণ ব্যতীত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেটায় তার হাত নেই। শারীরিক ক্রুটি নিয়ে এমন তো অনেক ক্ষেত্রেই অনেকেরই হাত নেই। কারও হাত-পা থাকে না, কারও-বা মাথায় চুল গজায় না। যেমন আমি চশমা ছাড়া দেখি না। তো? এখন এই কারণে আমাকে কী ইলেকট্রিক পোলে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে?

তা, ভারী শরীরের একজন মানুষের কী নাচার ইচ্ছা থাকাটা দোষের বা অন্যরা যা করে সেইসব? ভারী শরীর হওয়ায় একজনের কী অপরাধ? খাদ্যাভাস মূখ্য বিষয় বটে কিন্তু তার জেনেটিক কোডের তথ্যগুলো কী রাবার দিয়ে ঘষাঘষি করে মুছে দেওয়া যাবে? অনেকে বলবেন এতো খায় কেন? বাপু, এও তো মস্তিষ্কের এক খেলা। যেমন কাউকে দোররা মারলেও সিগারেট ছাড়বে না আবার কাউকে চাবুক মারলেও সে সিগারেট খাবে না। মোটা দাগে আমি নিজে যেটা বুঝি, শরীর চাচ্ছে তাই খাচ্ছে। উল্টোটা বললে সবাই এমন খায় না কেন তাহলে? তাকে বাড়তি বা জোর করে খেতে বললে দেখি বমি করে সব ভাসিয়ে দেবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভারী শরীরের মানুষকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকারে মস্তিষ্ক খেলে- সে অসহায় দর্শক মাত্র।


আমি নিজে আন্ডার ওয়েট। আমাকে বিখ্যাত খাদক বলা যাবে না কিন্তু ফ্যাট জাতীয় খাবার হরদম খাই। ফি রোজ বাদামই খাই এক বয়ম। ফলাফল? আজ পর্যন্ত আমার শরীরে ‘চিংগুরাদেশের’ মন্ত্রীদের মাথায় যতটুকু মস্তিষ্ক থাকে তার অর্ধেক ফ্যাটও যোগ হয়নি! দেখো দিকি কান্ড!

জেনে, না-জেনে ভারী শরীরের মানুষদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করেই যাই। হাহাহিহিহোহো-গোলহয়ে তামাশা দেখি। এই পশুমানবের ভিড়ে, ভিড়ভাট্টায় লুকিয়ে থাকাটা মুশকিল, বুঝলেন। কোথাও-না-কোথাও আমাকে, আমার টিকিটি ঠিকই চোখে পড়বে।
একবার আমি শফিক রেহমানকে নিয়ে কঠিন একটা লেখা লিখলাম- এই মানুষটা 'ভিনসেন্ট পিউরিফিকেশনের' নামে বিস্তর ফাজলামি করেছেন। কুখ্যাত স্মৃতিশক্তি আমার। যথারীতি লেখাটার কথা ভুলেও গেলাম। অনেক পরে কেকা ফেরদৌসিকে নিয়েএকটা লেখা লিখেছিলাম [১] । চরম বিরক্তিকর এক মহিলা। এই বিরক্তির রাশ ছিঁড়ে গেল যখন এই ভদ্রমহিলা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ফাজলামি করছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা খিচুড়ির একটা রেসিপি বাতলে যাচ্ছিলেন। লেখাটার এক জায়গায় লিখেছিলাম: 
“ইনি 'স্বাস্থ্য সচেতন রান্না'-এর বই লিখে Gourmand world cook book-এ নাম লেখান। স্বাস্থ্য সচেতন? এটা অবশ্য এই ভদ্রমহিলাকে দেখলেই আঁচ করা যায়!”
ব্যস,আর যায় কোথায়। এক পাঠক ঠিক-ঠিক শফিক রেহমানকে নিয়ে আমার ওই লেখাটা খুঁজে বের করলেন। ওই লেখায় আমি যেটা লিখেছিলাম:
"শিক্ষিত মানুষরা কেন যে কারও শারীরিক ক্রুটি নিয়ে কটাক্ষ করেন, কে জানে- যেটায় তার হাত নাই!"
এটার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাকে শুইয়ে দিলেন। আমি শক্ত কিছু যুক্তি দেখাতে পারতাম কিন্তু সেপথ মাড়ালাম না। সোজা দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জার হাত থেকে নিজেকে বাঁচালাম...।
 
১. মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়িও যখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য! : http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_21.html

No comments: