Sunday, January 12, 2014

হ্যালো বিএটিবি: অন্যায়ের দাগ মুছে ফেলা যায় না

আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি লেখায় কিছু ব্যক্তিগত বিষয় এড়িয়ে চলতে। দুর্বল একজন মানুষ- গুণ থেকে দোষ প্রবল বিধায় কখনও-কখনও এই সমস্ত বিষয় লেখায় উঠে আসে। পূর্বে কিছু লেখায় চলে এসেছিল বহুজাতিক এক কোম্পানির সঙ্গে আমার আইনি লড়াইয়ের বিষয়টা।
এই বহুজাতিক কোম্পানির নামটা বলিনি, আজ বলি। এই কোম্পানির নাম হচ্ছে, ‘বিএটিবি’ (ব্রিটিশ এমেরিকান ট্যোবাকো বাংলাদেশ)। এদের সঙ্গে ছিল দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা পারিবারিক যোগসূত্র। এদের করপোরেট ভাষায়, ‘বিজনেস পার্টনার’।

আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এদের সঙ্গে বিভন্ন সময়ে আমার বনিবনা হতো না- লাগালাগি লেগেই থাকত। চ্যাংড়া-চ্যাংড়া সব ছেলেরা এমবিএ করে এই কোম্পানিতে চাকুরিতে ঢুকেই একেকজন লাটসাহেব হয়ে যেত। এদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিল বড়-বড় আমলা, অসৎ বাবার টাকায় পড়াশোনা করা পোলাপান।
সাধারণ একটা ল্যাপটপ এরা নিজে বহন করবে না। আমার দোতলা অফিস থেকে ড্রাইভারকে ফোন দিলে ড্রাইভার ল্যাপটপ নিয়ে উপরে আসত। ড্রাইভার দরোজা খুলে না-দেয়া পর্যন্ত নিজে দরোজা খুলে নামবে না। আপাদমস্তক একেকটা ফার্মের মুরগি।

তো, আমার মত অন্য যারা ছিলেন, বুড়া-বুড়া মানুষেরা, এরা অবলীলায় এই সমস্ত চ্যাংড়া পোলাপানদেরকে স্যার-স্যার করে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। একবার আমাকে কোম্পানি থেকে ঠারেঠোরে বলার  চেষ্টা করা হলো সবাই কোম্পানির লোকজনকে স্যার-স্যার করে আমি করি না কেন? আমি সাফ বাংলায় উত্তর দিয়েছিলাম, আমি আমার স্কুলের টিচার ব্যতীত অন্য কাউকে স্যার বলা পছন্দ করি না। আর আমি এই কোম্পানির বেতনভুক্ত কমর্চারী না যে কোম্পানির চেলাচামুন্ডাদেরকে স্যার বলব। বা সমস্ত অন্যায্য বক্তব্য মেনে নেব।
আর এই কোম্পানির এমন কিছু দু-নম্বর বিষয় ছিল যাতে আমি সই করতাম না। এ নিয়ে এন্তার ঝামেলা হতো।

আমার আচরণ এদের কাছে আনন্দের ছিল না বিধায় এরা আমার পেছনে লেগেই থাকত। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারত না কারণটা আমার পারফরমেন্স। এভাবে চলে আসছিল।
কিন্তু এরিমধ্যে এক কর্মকর্তা বদলি হয়ে এলেন যিনি আবার একজন অতি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাগিনা। তার এমনই দাপট যে তার বসরাও তাকে ঘাঁটাতেন না। এই মানুষটা আমার জীবনটার ভাজা ভাজা করে ফেললেন। এই পর্যায়ে এসে আমি বড়ো অসহায় হয়ে পড়ি। কারণটা হচ্ছে, এই মানুষটার যে লেভেল সেই লেভেলে নামার কোনো উপায় আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। নিরুপায় হয়ে এই মানুষটার জোচ্চুরি থেকে শুরু করে সব কিছুই আমি এমডিকে চিঠি লিখে জানালাম। এখানটায় এসে কোম্পানি অন্যায় করল, মহা অন্যায়- এই জঙ্গলের মানুষটার পক্ষ নিল।

মানুষটার সম্বন্ধে ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, একবার তার ড্রাইভারে জন্য যে খাবার পাঠিয়েছিলাম তা তিনি নিজের বাসায় নিয়ে যান- ড্রাইভার বেচারা সমস্তটা রাত অভুক্ত ছিল। তো, এমন একজন জঙ্গলের মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাষা চলে না। কিন্তু এভাবে কদ্দিন? একদিন তিনি আমাকে আমার পরিবারের লোকজন জড়িয়ে এমন কথা বললেন যেটা সম্ভব কেবল একজন ‘জঙ্গুলে’ মানুষের পক্ষে।
আমি হিম গলায় বলেছিলাম, ‘যা বলার আমাকে বলেন, আমার পরিবারকে কেন এখানে টেনে নিয়ে আসছেন’!
তিনি আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বললে, কী করবেন আপনি? আপনি জানেন আমার কোম্পানি ক-হাজার কোটি টাকার ট্যাক্স দেয়, সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সরকার চলে আমাদের কথায়’।
আমি বারবার অনুরোধ করেছিলাম, আপনার কথা ফিরিয়ে নিন। তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন। কপাল, তখন যা হওয়ার তাই হয়- জঙ্গলে চলে কেবল জঙ্গলের আইন।

পরে এই কোম্পানির ভুয়া কিছু বিষয় হাতেনাতে ধরিয়ে দিলে কোম্পানি আমার সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করল। অথচ এই কোম্পানির সঙ্গে আমার দ্বি-পাক্ষিক লিখিত চুক্তি ছিল যার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, যে কেউ সরে যেতে চাইলে অন্তত তিন মাস পূর্বে নোটিশ দিতে হবে। এরা আমাকে তিন দিন সময়ও দিল না যার কারণে আমার প্রভূত আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেল। বলা যেতে পারে এরা আমাকে পথে বসিয়ে দিল।

আমি এদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করলাম। গুলতি দিয়ে ডায়নোসরের বিরুদ্ধে অসম লড়াই! এদের বেসুমার টাকা, সীমাহীন ক্ষমতা- সেই তুলনায় আমি সাড়ে তিন টাকা দামের মানুষ! তো, সেটা ২০০৮ সালের কথা এখন ২০১৪ চলছে! মামলা এখনও চলছে। কারণ এরা জানে কেমন করে মামলা ঝুলিয়ে দিতে হয়। এরা জানে এদের সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে একটা সময় এসে আমি হাল ছেড়ে দেব। কোর্টের কাছে এরা একের-পর-এক সময় চাওয়া শুরু করল। অন্তত না-হলেও ত্রিশবার সময় চেয়েছে। একেকবার সময় চাওয়া অর্থ হচ্ছে, মামলার শুনানি দু-মাস পিছিয়ে যাওয়া।

এদের একেকটা সময় চাওয়ার কারণগুলোও বিচিত্র। একবার এরা সময় নিল এই কারণে যে এদের এমডি দেশে নাই। শোনো কথা, এমডি দেশে নাই- এটা অনেকটা এমন, বয়স্ক ভাতার জন্য গেলে কাউকে বলা হলো, প্রধানমন্ত্রী দেশে নাই, এলে পাবেন।

এদের সময়ের-পর সময় চাওয়া নিয়ে এক পর্যায়ে আদালত বিরক্ত হয়ে একবার এদেরকে জরিমানা করলেন। অতি লজ্জাস্কর একটা বিষয় কিন্তু এরা হাসের মত- গা ঝাড়া দিয়ে ময়লা পানি ঝেড়ে ফেলে!
নিয়ম হচ্ছে, জরিমানার টাকাটা বিএটিবি নামের এই কোম্পানি আমাকে পরিশোধ করবে। টাকার অংকটা শুনলে অধিকাংশ মানুষই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবেন। ৩০০ টাকা! আসলে আমাদের দেশের অধিকাংশ আইনই ব্রিটিশদের করা।এই দেশের দূর্ভাগ্য, এই আইনগুলো এখনও পরিবর্তন করা হয়নি! ব্রিটিশ আমলে আমি ৩০০ টাকা পেলে জমিদারি না-হোক ছোটখাটো তালুক কিনতে পারতাম।

বছরের-পর-বছর ধরে আমি দুঃসহ সময় পার করেছি কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমি এদেরকে বোঝাতেই চেষ্টা করছি যে, শ্লা, তোমরাও ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি না আর আমিও ব্লাডি নেটিভ না। যেহেতু বিষয়টা বিচারাধীন তাই এই বিষয়ে আমি বিশদ মন্তব্য করব না।
কবে এই মামলার রায় হবে এটা কেউ জানে না। তবুও...। ওহে বিএটিবি, শোনো বাপু, আমি কিন্তু হাল ছাড়ব না। আমার এই জেদ আমি আমার উত্তরসূরির জন্য রেখে যাব।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেকটা সরে গেছি। বিএটিবি নামের এই কোম্পানি অন্যায় করে করে পার পেয়ে যাবে এমনটাই সম্ভবত ভাবছিল। কিন্তু লেখার শুরুতেই যেটা বলেছিলাম, তার সঙ্গে খানিকটা যোগ করে আবারও বলি, ‘রক্তের দাগ যেমন মুছে ফেলা যায় না’ তেমনি অন্যায় করেও পার পাওয়া যায় না।

সম্প্রতি তথ্য বেরিয়ে এসেছে, বিএটি ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে [১]। এই চোর-চোট্টারা এভাবেই ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাবে এমনটাই মনে করে। কিন্তু ওই যে বললাম অন্যায় করে পার পাওয়া যায় না- চোরের দশ দিন, গেরস্তের...।


*আরেকটা কথা মনে পড়ল সেটা হচ্ছে, এই তামাক কোম্পানির ফ্যাক্টরি আবাসিক এলাকায়! এটা কেবল বাংলাদেশের মত দেশেই সম্ভব। আর আমি যতটুকু জানি জায়গাটা এদের কেনা তালুক না, সরকারি জায়গা। এরা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে রেখেছে...।

সহায়ক সূত্র:
এক. ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি: http://www.dainikamadershomoy.com/archive_details.php?id=120784&&%20page_id=%2015&issue_date=               

No comments: