Monday, December 23, 2013

আমাদের ইশকুল এবং...

আমি যে স্কুলগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলাম যেখানে বাচ্চারা সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিনে পয়সায় পড়া-খেলার সুযোগ পেত। সবগুলোর নামই ছিল ‘আমাদের ইশকুল’, এখন যেটা চালু আছে সেটার নামও। তো, এই স্কুলগুলোর স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন, তার নাম এই লেখায় অন্তত উল্লেখ করতে চাচ্ছি না- কেন, সেটার ব্যাখ্য পরে দিচ্ছি। আপাতত নাম তার নাম দিলাম মি, এক্স।

প্রায় ৫ বছর পূর্বে যখন স্কুলগুলো চালু হয় তখন আর্থিক যোগানের ব্যবস্থা করতেন মি. এক্স। দেখভাল, অন্য সমস্ত কাজগুলো করতাম আমি। আমি চেষ্টা করতাম আমার যে অল্প মেধা আছে তার সবটুকু এখানে ঢেলে দিতে।
স্কুল ব্যতীত ‘ন্যানো ক্রেডিট’ এবং আরও অনেক হাবিজাবি কাজও হতো- আমরা ‘পড়শি ফাউন্ডেশন’ নামে একটা প্রতিষ্ঠানও দাঁড় করিয়েছিলাম। যার সদস্য সংখ্যা আমরা দুজনই! মি. এক্স আমাকে বলেছিলেন এটার রেজিস্ট্রেশন করানো প্রয়োজন। রেজিস্ট্রেশন করালে কী লাভ হবে আমি বুঝিনি তবুও আমি বলেছিলাম, আচ্ছা। 

বছর দেড়েক হবে হঠাৎ করে স্কুলের আর্থিক যোগান বন্ধ হয়ে গেল! কেন বন্ধ হলো, সীমাবদ্ধতা কোথায় এই সব আমাকে কিছুই জানালেন না মি. এক্স- জানালে কোনো সমস্যা ছিল না। আক্ষরিক অর্থেই আমি পানিতে পড়লাম। কারণ তখন আমার নিজেরই হাজারোটা সমস্যা- অনেক কটা বছর ধরে একটা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে আমার আইনি লড়াই চলছিল। কারণটা অতি সহজ। আমি এদেরকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম, শ্লা, তোমরাও ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি না আর আমি ব্লাডি নেটিভ না।

এ এক বিচিত্র- বছর খানেক কেমন করে এই স্কুল চলল আমি জানি না! কোনো মাসে টিচারের বেতন বাকী থাকত তো কোনো মাসে ঘরভাড়া!  বই-খাতা-খেলার সামগ্রী কিনতে বড়ো বেগ পেতে হতো। আসলে আমি আর পারছিলাম না। এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম স্কুল বন্ধ করে দেব। ডা. গুলজার নামের মানুষটা বললেন, ‘আলী ভাই, বন্ধ করবেন না, দেখি না, চলুক যতদিন চলে...’। তিনি কেমন-কেমন করে কিছু টাকারও ব্যবস্থা করতেন। এভাবে আরও কয়েক মাস স্কুল চলল। কিন্তু দিন-দিন কঠিন হয়ে পড়ছিল। মাস শেষে আমার নিজের সমস্যাগুলোর সঙ্গে যোগ হতো স্কুলের আর্থিক সমস্যা। আমার উপর খুব চাপ পড়ছিল, আমি এই চাপ নিতে পারছিলাম না।

যেখানে গল্প শেষ হয়ে যায় সেখান থেকেই আবারও একটা গল্পের সূত্রপাত হয়। নিকষ অন্ধকার টানেলের শেষ মাথায় আলোর একটা বিন্দু থাকে, থাকতেই হয়। বেশ ক-মাস আগের কথা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী @Pradip Saha নামের মানুষটা এগিয়ে এলেন। স্কুল চালাবার জন্য তিনি এককালীন এক বছরের টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম! যাক, এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

অনেক দিন পর- একদিন, মি. এক্স আমাকে ফোন করলেন, ‘রেজিস্ট্রেশনের কাজ প্রায় শেষ এখন এর সঙ্গে জড়িত লোকজনের নাম প্রয়োজন। আপনার নাম দিতে চাচ্ছি’। পদটা প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যান এই টাইপের কিছু হবে, আমার মনে নেই। তার এই কথায় আমি হতভম্ব হয়েছিলাম! এই ফাউন্ডেশন...এই স্কুলটা যাদের জন্য তাদের বিষয়ে বা এই স্কুলটা এতো বছর ধরে কেমন করে চলল এই বিষয়ে তিনি আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন না, জানতে চাইলেন না! অথচ...। অদম্য রাগ চেপে আমি বলেছিলাম, ‘আমি চাচ্ছি না আমার নাম এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হোক’। তিনি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘কেন’? আমি শীতল গলায় বলেছিলাম, ‘এর ব্যাখ্যা দিতে আমি আগ্রহ বোধ করি না’। মি, এক্সের সঙ্গে আলাপচারিতার এখানেই সমাপ্তি...।

লেখার বিষয়ে আমার সাফ কথা, অসঙ্গতি মনে করলে আমি আমার আপন বাপকেও নিয়েও লিখব। তাহলে এখানে মি. এক্সের নামটা কেন দিলাম না? মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার মার শরীরে মি. এক্সের রক্ত মিশে ছিল। কী কষ্ট! আমার মার অপারেশনের সময় রক্তের প্রয়োজন অথচ আমরা ভাই-বোন কেউ রক্ত দিতে পারলাম না কারণ রক্তের গ্রুপ ম্যাচ করছিল না। মি. এক্স রক্ত দিয়েছিলেন। রক্তের ঋণ শোধ করা যায় না কিন্তু অন্তত খানিক চেষ্টা তো করা যায়...।

যাই হোক, ক-দিন পূর্বে ইংল্যান্ড প্রবাসী @Fakruddin Shahariar আমাকে কিছু টাকা পাঠালেন। তাঁর সহৃদয় ইচ্ছা স্কুলের বাচ্চারা একদিন ভাল-মন্দ খাবে। আসলে যারা প্রবাসে থাকেন তাদের ধারণা নেই যে দেশে আমাদের খেতে কতো অল্প টাকা লাগে। খাওয়াপর্ব শেষ হওয়ার পরও তাঁর পাঠানো টাকা থেকে আমার হাতে বেশ কিছু টাকা বেঁচে গেল। আমি পড়লাম মুশকিলে। কী করি এই টাকা দিয়ে?
পূর্বের স্কুলগুলোর বাচ্চাদের জন্য স্কুল-ড্রেস ছিল কিন্তু এখানকার বাচ্চাদের জন্য আর্থিক কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি। অথচ বাচ্চাগুলো প্রায়ই বায়না করত, ‘আমাদের স্কুল ড্রেস দেবেন না’? আমি কষ্ট চেপে বলতাম, ‘দেখি’। আমার এই দেখাদেখির পর্ব আর শেষ হয় না! এবার ঠিক করলাম অনেক হয়েছে- এই দেখাদেখির পর্ব আর না কিন্তু এই বেঁচে যাওয়া টাকার সঙ্গে আরও যে টাকার প্রয়োজন।

মানুষের ইচ্ছা আবার অপূর্ণ থাকে নাকি! সুযোগ একটা এসেই গেল। একজন... জেন্ডার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তার নামটা এখানে উহ্যই থাক। তিনি বললেন, ‘শুভ, দেশে আসছি’।
আমি বললাম, ‘বেশ তো, অতি আনন্দের বিষয়’।
এরপর তিনি বললেন, ‘শুভ, তোমার বুকের মাপ কত’?
আমি বললাম, ‘তোমার প্লেন ল্যান্ড করার রানওয়ের মত তো না অবশ্যই। কিন্তু ঘটনা কী’!
মানুষটা রেগে গিয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে শস্তা রসিকতা করবা না। আমি তোমার জন্য একটা ব্লেজার কিনব ঠিক করেছি’।
আমি এবার হাসি চেপে বললাম, ‘দেশে লোকজনেরা শীতবস্ত্র বিতরণ করে ছবি-টবি তোলেন। আমাকেও কী এটা পরে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতে হবে’? মানুষটা এবার সত্যি সত্যি ক্ষেপে গেলেন!

শোনো কথা, কে এই মানুষটাকে এই খবরটা দিয়েছে যে, ব্লেজার গায়ে না-দিলে আমার ঘুম আসে না! পূর্বে বিভিন্ন সময়ে যারা এই জিনিসগুলো আমাকে দিয়েছেন ফি বছর নিয়ম করে এগুলো বের করা হয়, শীত গেলে আবার বাক্সে ঢোকানো হয় কিন্তু পরা আর হয় না কারণ এই সব জিনিস পরলে আমার গা কুটকুট করে! ইয়ের পেটে ঘি হজম হয় না টাইপের আর কী!
তো, আমি বললাম, ‘শোনো, এই জিনিস আমার সহ্য হবে না- জিনিসটা আমার কাছে ভারী অকাজের। এক কাজ করো, যে টাকা দিয়ে এই জিনিসটা কিনবে সেই টাকাটা আমাকে পাঠিয়ে দাও। আমার কাজ আছে’।

সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশি যার নমুনা তিনি দেশে ফেরার পর দেখেছিলাম- সে গল্প থাক। তিনি টাকাটা পাঠাবার পর সব মিলিয়ে বাচ্চাদের স্কুল-ড্রেস হয়ে গেল। অবশ্য 'সেলাই মাস্টার' সাহেব আবার মুখ লম্বা করে রাখতেন কারণ সবগুলো বাচ্চাকে একদিনে কখনই পাওয়া যেত না। বেচারাকে বাচ্চাদের মাপ নেয়ার জন্য কয়েক দিন আসতে হলো। কারণ তিন ভাগের এক ভাগ বাচ্চারাও প্রতিদিন উপস্থিত থাকে না, এদের অনেকেই সারাটা দিন কাগজ-টাগজ টোকায়। যেদিন স্কুলে আসে সেদিন তাদের কাজের সমস্যা হয়।

অনুমতি না-নিয়ে @Pradip Saha এবং @Fakruddin Shahariar নাম এখানে উল্লেখ করেছি বলে মানুষগুলো ভারী রাগ করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু আমার কিছুই করতে পারবেন না। হা হা হা, কারণ সুদূর প্রবাসে থেকে আমার কেশও স্পর্শ করার ক্ষমতা এঁদের নাই...।

 এদের পতাকা বানাবার চেষ্টা:
   

সতর্কবার্তা!

আমি আমার সাইটে (http://www.ali-mahmed.com/) স্পষ্ট করে লিখে রেখেছি, ‘আমার লিখিত অনুমতি ব্যতীত কোনো লেখা কোথাও প্রকাশ করা যাবে না’। তারপরও কেউ-কেউ এখান থেকে অনুমতি না-নিয়েই লেখা ছাপিয়ে দেন। বিরক্তির একশেষ! এদের ভাবখানা এমন, এই সমস্ত লেখা গণিমতের মাল। কোথাও যুদ্ধ হয়েছিল- এরা লুটের মাল ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এই সমস্ত অপদার্থের জন্য এদেশে সাইবার আইন ডিমের খোসা। আমাদের দেশে সাইবার আইন কেবল লেখালেখি করার অপরাধে বিনা ওয়ারেন্ট হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া।

একজন আমার ইনবক্সে জানালেন, ‘আপনার এই সাইটটি খুব ভাল লাগে, তাই আমাদের পেজে আপনার কিছু পোস্ট শেয়ার করেছি এবং পরবর্তীতে আরো শেয়ার করার কথা ভাবছি’।
আমি চরম বিরক্তি গোপন করে উত্তরে লিখলাম, ‘এরপর থেকে আমার অনুমতি ব্যতীত শেয়ার করবেন না। ধন্যবাদ’।
আমার ধারণা ছিল মানুষটা তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবেন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে তিনি লিখলেন, ‘হুম!!!’
আমি লিখতে চেয়েছিলাম, আপনার উত্তর আমার পছন্দ হলো না। ওয়াল্লা, এরপর দেখি এই মানুষটা আমাকে ব্লক করেছেন [১]
এই চুতিয়া যে কালে কালে বড়ো একটা চোর হবে এতে অন্তত আমার কোনো সন্দেহ নাই।
স্ক্রিণশট ১:

ফেসবুকে প্রায়ই এটা লক্ষ করি, অনুমতি না-নিয়েই লেখা ছাপিয়ে দেয়া হয়। অজস্র উদাহরণ থেকে একটা উদাহরণ দেই [২]। এই সাইটটা যারা চালান তাদের কাছে আমি একটা সদুত্তরের জন্য দিনের-পর-দিন অপেক্ষা করেছি। এরা আজও আমাকে একটা সরি বলা দূরের কথা কোনো উত্তর দেননি। অতএব এও আরেক চুতিয়া। 

স্ক্রিণশট ২:
ফেসবুকে সমস্যা হচ্ছে, অনুমতি ব্যতীত লেখা ছাপানো যাবে না এমন সতর্কবার্তা কোথাও দেয়ার সুবিধা নেই। এমনিতে ফেসবুকের শেয়ার বাটন চেপে যেভাবে শেয়ার করার নিয়ম সেটার জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই এ তো আমরা বিলক্ষণ জানি, এটা বরং কোনো লেখকের জন্য আনন্দের। কিন্তু কারো একটা লেখা তাকে না-জানিয়ে ছাপিয়ে দেয়ার মানে কী! এরপর থেকে আমার ওয়েব-সাইট, ফেসবুকের কোনো লেখা আমার অনুমতি ব্যতীত কেউ যে-কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করলে সানন্দে তার নামের সঙ্গে চোর বা চুতিয়া শব্দটা জুড়ে দেব।
বাধ্য হয়ে আমার এই সতর্কবার্তা ফেসবুকের ‘কাভার ফটোতে’ ঝুলিয়ে দিচ্ছি।