Monday, August 19, 2013

বাকশাল, সেকাল-একাল!

ছবি ঋণ: আফতাব আহমদ
১৯৭৫ সালে দেশের সকল দলকে বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন করা হয় এবং দেশের সমস্ত সংবাদপত্র সীমিত করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৪টি দৈনিক চালু রাখা হয়েছিল। সাংবাদিকগণও সহাস্যে তাঁদের কলম ফেলে 'বাকশালি' কলম তুলে নিয়েছিলেন।

কে জানে, হয়তো বাঘও তখন ছালের বদলে শাল গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াত। সবই বাকশাল- ভাগ্যিস, তখন এই গ্রহের অন্য দেশের লোকজনেরাও বাকশালি হয়ে যায়নি নইলে সর্বনাশ হয়ে যেত। এই গ্রহের সবই থাকত আপেল গাছ, বরই গাছ আর নাই!
ইটস আ লং লং টাইম এগো- সে তো অনেক কাল আগের কথা! তখনকার কথা এখন চর্বিতচর্বণ। আর সেই সব যে এনালগ যুগের কথা। তখন সবই এনালগ...।

এখন যে ডিজিটাল যুগ! এখনকার সবই ডিজিটাল স্টাইল।
"তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে বা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহলে তার এই কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে। কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।" [১]

এখন এর যে কঠিন প্রয়োগ- এরপর ওয়েবসাইটে কে আর লিখতে চাইবে? আর এমন ঘাড়ে তরবারি রেখে যে সমস্ত লেখা বেরুবে তা হবে বিকলাঙ্গ, পঙ্গু! পড়বেও মস্তিষ্কে বিকলাঙ্গ-পঙ্গু লোকজনেরা! বিচিত্র এ দেশ, এখানে কার যে কী ভূমিকা এটা কেউই জানে না! এই বিষয়ে আমাদের মন্ত্রী বাহাদুরদের বাতচিত শুনেই বোঝা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এই আইনের পরিণতি কী হবে। এই বিষয়ে একজন বনমন্ত্রীও বাঘ্রগর্জন করে উঠেন। ভাবখানা এমন, যেন বাঘরাও আজকাল ওয়েবসাইটে লেখালেখি শুরু করেছে।
আরে বাবা, সবচেয়ে সহজ হচ্ছে, 'বিটিভি ওয়েবসাইট' নামে একটা ওয়েবসাইট চালু করে সমস্ত ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
এনালগ যুগে ছিল চারটা পত্রিকা আর এখন থাকবে একটা ওয়েবসাইট, 'বিটিভি ওয়েবসাইট'।

হায়রে, দেশের 'ডেরাইবারগণ'! ওয়েবসাইটে যারা লেখালেখি করেন এরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখান থেকে এক পয়সা আয় তো দূরের কথা উল্টো আরও নিজের পকেট কাটা পড়ে! ভাতের কষ্ট তারপরও অনেকে লেখেন এবং লেখেন বলেই অনেক তথ্য আমরা নিমিষে জানতে পারি নইলে আমরা সেই এনালগ যুগেই যে পড়ে থাকতাম। সেই সময়, কবুতরগ্রাম, টেলিগ্রাম- টরে টক্কা। পত্রিকার পুরনো কপির জন্য পত্রিকা আপিসে ধর্ণা দেয়া।

এই সব বিষয় এদের মাথায় ঢুকবে না। অবশ্য শাসক পক্ষের কথা লিখলে কোনো সমস্যা নাই- আসতে আজ্ঞা হোক, বসতে আজ্ঞা হোক এই টাইপ লেখা। সরকারি দল নিয়ে জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ করলেই হয়। সমস্যা কেবল সরকারে সমালোচনা করলে, মুর্দাবাদ বললে। তাই চমৎকার বুদ্ধি বার করে কলমের নিব হালে কীবোর্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।
প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে এই আইনের পার্থক্যটা কেউ মিলিয়ে দেখলে অনায়াসে বুঝতে পারবেন।
প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চেয়ে ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসের উপর খড়গ নেমে আসার কারণ প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পেটে চর্বি, মগজেও চর্বি, ভাবনাও চর্বিযুক্ত অথচ এখানকার লোকজনের যে একহারা, চর্বিহীন- নির্মেদ ভাবনা।

আর আইনে যে এক কোটি টাকা অর্থদন্ডের কথা বলা হচ্ছে, ওয়েবসাইটে যারা লেখালেখি করেন এদের কাছ থেকে এক কোটি টাকা আদায় করাটা বেশ মুশকিল হয়ে পড়বে! কারণ এদের পার্টসগুলো যদি খুলে-খুলে বিক্রি করা হয় তাহলেও পুরো বডির দামও এক কোটি হবে কি না এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। আহা, কিডনি, লিভার, ফুসফুস ব্যতীত আর কীই-বা আছে বিক্রি করার? চোখ, বিক্রি হয়? চুল ধরছি না কারণ এটা আর ক-পয়সা হবে? আর নীচের দিকে নামছি না কারণ ওটা বেনাবেচা হয় কি না এটা আমার ভাল জানা নাই।

যে-কেউ ইচ্ছা করলেই যা-খুশি লিখে পার পেয়ে যাবে এটা আমার বক্তব্য না। জবাবদিহিতা থাকতে হবে কিন্তু যেভাবে এই আইন করা হয়েছে, এই আইনের প্রয়োগ করা হচ্ছে, এর যে অপব্যবহার হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর পূর্বেও আমরা দেখেছি ব্লগারদের ধরে ধরে গরুচোরের মত আচরণ করা হয়েছে। মিডিয়ার সামনে ল্যাপটপ, সিপিউ-মনিটর এর মত ভয়ংকর অস্ত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি উঠানো হয়েছে!কারো চেহারা পছন্দ হলো না, ব্যস, দাও শালাকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় আটকে। জেলে ভরে দাও। হায়, কেবল একটা লাইক দেয়ার অপরাধে পুলিশ লোকজনকে ধরে নিয়ে এসেছে।
এই আইনটা অনেকটা আমাদের অতি কুৎসিত কালো আইন ৫৪ ধারার মত। তোমাকে সন্দেহবশত আটক করলাম। যাও, নির্দোষ প্রমাণ করে আসো। আমাদের দেশে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে মানুষের 'লাল সুতা' বেরিয়ে যায়!

আদিলুর রহমানকে যেভাবে গ্রেফতার করা হলো এটা নিয়ে আমার তীব্র-ঘোর আপত্তি আছে। আদিলুর 'বেহেশতের বড়ি পাতা' না যে তাঁর কেশও স্পর্শ করা যাবে না। বিশেষ করে তিনি একটি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমাদের দেশে দল করা অধিকাংশ লোকজনের কর্মকান্ড নিয়ে আমার বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই, শ্রদ্ধাও নেই কারণ এদের মতিগতি বোঝ ভার।
অতি বৃদ্ধ মানুষও নেত্রীর জন্মদিনের পারলে কেকের উপর উঠে বসে থাকেন [২] । বা নেত্রি যখন বলবেন, 'আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম, দুই ঘন্টা লোডশেডিং দেয়ার জন্য যেন লোকজন বুঝতে পারে লোডশেডিং কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি...এখন বলে দিচ্ছি, লোডশেডিং যেন আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়' [৩]
আর যায় কোথায়- দলের লোকজনের টেবিল চাপড়ে তিন উল্লাস! এটা যে কী ভয়াবহ কথা এটা কেউ নেত্রীকে বোঝাতে যাবেন না। কারণ এই দেশে এটার চল নাই!

তো, আদিলুরকে নিয়ে আমার বিশেষ আলাদা কাতরতা নাই কিন্তু তাঁকে যে ভঙ্গিতে আটক করা হয়েছে তাতে মনে হয় ডিজিটাল বাকশাল। ১০ আগস্ট রাতে বিনা গ্রেফতারী পরোয়ানায় তাঁকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ আটক করে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারি ৫৪ ধারায়। এর মধ্যে ৫৪ ধারার কথা পূর্বেই বলেছি! ভাল কথা, তাঁর বেলায় ৫৪ ধারা কেন? একটি প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদককে আটক করার বেলায়ও কী ৫৪ ধারার প্রয়োজন দেখা দেবে? কারণ কী- তিনি কি সব ফেলে ভেগে যাবেন!

আদিলুর যদি ভুল তথ্য দিয়ে থাকেন অবশ্যই এর জন্য তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে এই বিষয়ে আমার কোনো আলাদা বক্তব্য নাই। তবে এই কারণে মামলা দেয়া হলেও আদৌ গ্রেফতারের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি লিখেছিলে ৫ই মে, ২০১৩ সালে মতিঝিলে হেফাজতের কর্মসূচিতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছেন:
"...Fact finding of Odhikar has, to date, found the names of 61 people who were killed and many more injured. However, actual numbers are very difficult to ascertain in the present repressive political situation. The international media, Aljazeera, reported that 50 people were killed..." [৪]
যে কারণে ৫৭ এবং ৫৪ ধারায় তাঁকে আটকানো হয়েছে।
"তাঁকে গ্রেফতার করার পূর্বে সরকার সংস্থাটির (অধিকার) কাছে নিহতদের নামধাম চায়। (অধিকার জানায়),‘তদন্ত কমিশন গঠিত হলে পরেই তার কাছে তালিকা দেয়া হবে। সরকার ওই তালিকা পেলে উল্টো সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লাগবে বলে মনে করে সংস্থাটি।" [৫]
ওরা চেয়েছে বলেই না যেহেতু এই বিষয়টা নিয়ে পানি অনেক ঘোলা হয়েছে তা তদন্ত কমিশন গঠন করতে সরকারের সমস্যাটা কোথায়? ওই যে, স্বচ্ছতা অভাব...। নিজেদের কফিনে পেরেক ঠুকতে হবে না!

তারপরও...বেশ, তর্কের খাতিরে না-হয় ধরে নিলুম আদিলুরের কাজটা খুবই 'খ্রাপ' হয়েছে।
তা, অন্য দলের লোকজনেরা যে তোতা পাখির মত অনবরত বলে এসেছেন, এই অভিযানে হাজার-হাজার মানুষ মারা গেছেন! গায়েবানা জানাজাও করেছিলেন তারা। এসব দেখে সাধারণ মানুষ কেবল বিভ্রান্তই হয়নি, আতংকিতও হয়েছিল। তাদের কী শাস্তি দেয়া হয়েছে? এরা কী দেশে প্যানিক সৃষ্টি করেননি? নাকি এদেরকে ৫৭, ৫৪ ধারায় ফেলা যাচ্ছে না?

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার এই আইনটা, এটা নিয়ে যে-রকম তুলকালাম কান্ড হওয়া প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। প্রিন্ট মিডিয়ার তো সামনেও ছিপি এঁটে রেখেছে, পেছনেও।
একবার পড়েছিলাম, প্রিন্ট মিডিয়ার কারো বিরুদ্ধে মামলা হলে মামলা চলবে কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা হবে না।
আচ্ছা, ভাল কথা, দেখা গেল সরকার যার বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা করবে সেই মানুষটা নিরপরাধ প্রমাণিত হলে, তখন কী হবে! সরকার কি তাকে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেবেন?

*ছবি ঋণ: আফতাব আহমদ। (ছবিতে গণভবনে সাংবাদিকদের বাকশালে আনুষ্ঠানিক যোগদান।)

**এবার ষোলো কলা পূর্ণ হলো! এখন কেউ আর ইন্টারনেটে লেখালেখি করার নামও নেবে না। পুলিশ এখন ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে!
এখন এখানে কি লেখা হবে তা নিকটস্থ থানায় দেখিয়ে নিতে হবে কিনা বিস্তারিত হয়তো পরে জানা যাবে...।  

"তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন)  অধ্যাদেশ-২০১৩-এ শাস্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৭ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ২০০৬ সালে পাস হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছর সাজার বিধান ছিল। এছাড়া ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ এখন এ সংক্রান্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। আগের আইনে এটি উল্লেখ ছিল না।" আমাদের সময়: http://dainikamadershomoy.com/archive_details.php?id=98426&&%20page_id=%205&issue_date=%202013-08-20 




সহায়ক সূত্র:
১. তথ্যপ্রযুক্তি আইন: http://www.kalerkantho.com/print_edition/print_news.php?pub_no=320&cat_id=3&menu_id=85&news_type_id=1&index=0
২. বুড়ো খোকারা...: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10151583307347335&set=a.10151298132117335.465193.723002334&type=1
৩. দুই ঘন্টা লোডশেডিং...: http://us.prothom-alo.com/detail/date/2012-09-05/news/286812
৪. অধিকার ওয়েবসাইট: http://odhikar.org/?p=5714
৫. bdnews24.com