Wednesday, August 7, 2013

আ রিয়েল হিজড়া!

আমরা যাদেরকে হিজড়া-নপুংসক-ক্লীব বলি, তাঁদের দেখে আমরা বিস্তর আমোদিত হই, অন্য গ্রহের প্রাণীর মতো এঁদের সঙ্গে আচরণ করি- এঁদের কারো-কারো সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। স্টেশনে যে স্কুলটা চালু ছিল ওটায় স্টেশনের অনেক বাচ্চারা স্কুলে যেতে না-চাইলে এঁদেরই একজন, বাচ্চাদেরকে জোর করে স্কুলে পাঠাতেন। এই মানুষটা বাচ্চাদের কানের কাছে অনবরত বকে যেতেন, 'মনা, পড়, পড়- পড়াল্যাহার কুনু বিকল্প নাই'।

ওই মানুষটার এই বিষয়টা আমাকে অসম্ভব মুগ্ধ করত। তাঁকে কাতর গলায় একদিন আমি বললাম, 'আপনার দাওয়াত। আপনাকে একবেলা খাওয়াতে চাই'।
তাঁর সাফ উত্তর, 'না, আমি একা খামু না। খাওয়াইলে আমার লগে যারা আছে হেরারেও খাওয়াইতে হইব'।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল এঁরা মোট ১২ জন। লোকসংখ্যার কারণে টাকা সমস্যা ছিল না কারণ প্রবাসী একজন লোকজনকে খাওয়াবার জন্য বেশ কিছু টাকা আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তবে বড়ো কুৎসিত একটা শর্ত ছিল, কেবল মুসলমানদেরকেই খাওয়াতে হবে। শোনো কথা, আমি কী শ্লা পাকিস্তান আর্মি যে ইয়ে খুলে দেখব কে মুসলমান! আমার যেটা প্রয়োজন ক্ষুধার্ত মানুষ- তাদের পাওয়া নিয়ে কথা...। যাই হোক, সবার  সব কথা শুনতে নাই। এর দায় আমার উপর বর্তালে কী আর করা...।

আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, দাওয়াতের দিন এঁরা অনেক দূর দূরান্ত থেকে ১২ জনই চলে এলেন। একবেলা খাবারের যে দাম আর যে টাকা খরচ করে এঁরা এসেছেন তা খাওয়ার খরচের চেয়ে অনেক বেশিই হবে।
কিন্তু এখানেই ছিল আমার অপার বিস্ময়, আমার শিক্ষাটা- এঁদের একজনের প্রতি অন্যজনের যে মমতা, আবেগ..., এটা।
আরেকবার, ঠিক এই বিষয়টাই খু্‌ব কাছ থেকে লক্ষ করলাম। স্টেশনে জিআরপি এঁদের একজনকে খুব করে মেরে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে এঁরা সবাই দল বেঁধে আমার কাছে এসেছিলেন নালিশ জানাতে। কী অবাক কান্ড! যাকে মেরেছে তাঁর চেয়ে তাঁর সঙ্গে বরং অন্যরা কাঁদছিলেন বেশি।
এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন এক আর্মি অফিসারের সন্তান। কিন্তু তাঁর বাবা-মা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল। আমি সেই অফিসারকেও খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সে অন্য কাহিনী...।

কিন্তু হায়, এঁদের কেমন করে বোঝাই, আমার তো তিন পয়সারও ক্ষমতা নাই! এঁদের এই সব বিষয়টা নিয়ে কঠিন করে বলতে গেলে, জিআরপি ওসি উল্টা আমাকেই বেঁধে রাখবে। যাই হোক, মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত কিছু ছেলেপেলে আছে যারা 'হুদিহুদি' আমাকে পছন্দ করে। এদের বলার পর এরা ঝড়ের গতিতে অসাধারণ কাজ দেখালো! জিআরপি ওসিকে বাধ্য করল, ওই অভিযুক্ত জিআরপিটাকে কঠিন শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে।

তো, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, যাদেরকে আমরা আসলে হিজড়া বলি, কেন বলি, ভুল বলি। আমার ভাষায়, এঁরা হচ্ছেন, 'ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, ভালবাসার সন্তান'! যাদের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নাই।
আমার মনে পড়ে যায় আকিতার মা'র সেই কথাটা [১], তিনি বলেছিলেন:
'তুমি একটা ঘটনার স্বীকার মাত্র। প্রকৃতি তোমার প্রতি অন্যায় করেছে, তাই তুমি এই রোগের সংস্পর্শে এসেছ, যাতে তোমার কোনো হাত নাই!
...এবং, যখন কারো সঙ্গে কথা বলবে, তার চোখে চোখ রেখে কথা বলবে, বিন্দুমাত্র বিব্রতবোধ করবে না! কারণ তোমার প্রতি অন্যায় করেছে প্রকৃতি, লজ্জিত-বিব্রত হলে সে হবে, তুমি কেন?'

তাহলে আসল হিজড়া কারা? আহা এরা, আর কারা; যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই সমস্ত তামাশা দেখে। যখন প্রকাশ্যে রাস্তায় কোনো কিশোরীর গায়ে হাত দেয়া হয় আর আমরা যারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখি বা বয়স্ক একজন মানুষকে যখন অপদস্ত করা হয় তখন আমরা দুঃখের শ্বাস ফেলি, আহা, কেন এই দৃশ্য তার সন্তানকেও দেখানো গেল না। একজন যুবক যখন কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তখন আমরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলি, পপকর্ন নিয়ে গ্যালারিতে বসলুম। আমরা পরিণত হচ্ছি একেকটা তামাশাবাজে...।

বাস্তব জীবনের এই ছাপ পড়েছে ভার্চুয়াল ভুবনেও! এখানেও একই দৃশ্য! যখন এখানে কাউকে অহেতুক বাপ-বাপান্ত করা হয় তখনও আমরা বিমল আনন্দ বোধ করি। যে গালি দেয় সে না-হয় অসুস্থ কিন্তু যারা এটা দেখেও পাশ কাটিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকে তাকে হিজড়া না-বলে উপায় কী!
কিন্তু এই সব হিজড়াদের মধ্যে থেকেও 'মরদ' বেরিয়ে আসেন। সেই মহিলাটি, যিনি, থেঁতলে যাওয়া সেই পুলিশের মাথাটি পরম মমতায় নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন, হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ভার্চুয়াল ভুবনেও যখন এমন-কোনো সাধারণ গৃহিণী এগিয়ে আসার চেষ্টা করেন তখন তাকে ইচ্ছা করেই নিবৃত করা হয়। আহা, তাহলে যে এই সমস্ত 'তামাশাবাজ' হিজড়াদের হিজড়াগিরি করার যে তামাশা, তাদের দেখার যে সুখ- এ অন্যত্র কোথায়...!

১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, ভালবাসার সন্তান: https://www.facebook.com/723002334/posts/10151438990152335