Saturday, July 6, 2013

যাত্রার প্রিন্স!

কপালের ফের, আমি যেটাতেই এখন হাত দেই তা কেমন-কেমন করে যেন ভন্ডুল হয়ে যায়, গণেশ উল্টে যায়! সুধিন্দ্রনাথের কবিতা ধার করে বলতে হয়, '...অকস্মাৎ স্বপ্ন গেল টুটি, দেখিনু সরমে চাহি...'।
কী গভীর আগ্রহ নিয়েই না আমাদের দেশের এই প্রিন্সের কথা লিখলাম, 'একজন প্রিন্স, মুসা বিন শমসের!':
https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151504510607335

এরপর জনে-জনে বলে বেড়িয়েছি আমাদের দেশেও প্রিন্স আছে, বাহে। দেশ-বিদেশের লোকজনেরা চোখ বড়-বড় করে অপার বিস্ময়ে স্বীকার যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সমীহের চোখে তাকিয়েছেন। কেন-কেন-কেন, কেন এমনটা হয়? এখন চিঁ চিঁ ব্যতীত আমার গলার স্বর বের হবে কেমন করে! এই পোড়া দেশে যাও একজন প্রিন্স পাওয়া গেল এখন দেখা যাচ্ছে আরেক কাহিনী!

দৈনিক জনকন্ঠ, প্রথম পৃষ্ঠায় এটা ছাপায় ২৪ মার্চ, ২০০১ সালে। ওখান থেকে খানিকটা এখানে তুলে দেই:
"ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার মেয়ে কমলা ঘোষ। সবে বিয়ে হয়েছে তার। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে আটকা পড়ে যান কমলা! একদিন পাকিস্তানি মেজর কোরায়শী ও তিন জন সৈন্যসহ কমলাদের বাড়িতে আসে নুলা মুসা। এরপর যা হওয়ার তাই হয়, পাকিস্তানি সৈন্যরা চরম শারিরীক নির্যাতন করে কমলাকে।
...পরে কমলার স্বামী কমলাকে আর কখনই ঘরে ফিরিয়ে নেয়নি।

...ফরিদপুর শহরের মহিম স্কুলের সঙ্গে এক ধর্মশালা দেখাশোনা করতেন কেষ্টমন্ডল। কেষ্টমন্ডলের চার মেয়ে: ননী, বেলী, সোহাগী ও লতা। নুলা মুসার তত্ত্বাবধানে এই বেলী ও ননী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোরঞ্জনে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে এই চার বোন এবং তাদের মা-র ঠাঁই হয়েছিল ফরিদপুরের পতিতাপল্লীতে।
...কেবল ননী, বেলীই নয় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অর্ধশতাধিক বাঙালি মা-বোনের সন্ভ্রম লুটের প্রধান নায়ক এই নুলা মুসা।

এখন তার নাম ড. মুসা বিন শমশের হলেও সার্টিফিকেটের নাম এডিএম মুসা। কিন্তু একটা হাত খানিকটা বিকলাঙ্গ থাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল, 'নুলা মুসা' হিসাবেই। নিজেকে ডক্টর বলে দাবী করলেও, ১৯৬৮ সালে ঈশান স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়েছিল মুসা। ১৯৮৬ সালে মুসার নামের আগে ডক্টর যুক্ত হলেও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের কোনো প্রমাণ মেলেনি কোথাও!

অভিযোগ আছে, একাত্তরের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ফরিদপুরে ঢোকার ব্যাপারে মানচিত্র এবং পথনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেছে এই মুসা। মেজর আকরাম কোরায়শীর সঙ্গে মুসার গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল! ফরিদপুরে পাকিস্তানি সৈন্য ঢোকার পরদিনই (একাত্তরের ২২ এপ্রিল) ফরিদপুর সার্কিট হাউজে মুসা এবং মেজর কোরায়শীকে খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধা একেএম আবু ইউসুফ সিদ্দিক পাখী।
একাত্তরে মুসা ছিল ফরিদপুরের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা, নারী নির্যাতন একং লুটতরাজ করেছে।
ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ শহরের সমস্ত শহীদ মিনার মুসা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় ভেঙ্গে ফেলে!

মেজর কোরায়শীসহ অনেক পাকিস্তানি সেনা-সদস্যের অবাধ যাতায়াত ছিল মুসার বাড়িতে। মুসার পিতা তথাকথিত পীর শমসের মোল্লা পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল বাড়াতে তাদের গায়ে ফুঁ দিত আর বলত, 'ইন্ডিয়া পাকিস্তান বন যায়েগা'।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডিসেম্বরেই মুসা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ফরিদপুর থেকে পালিয়ে চলে যায় পাবনায়। সেখানে বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করে ঢাকা-চট্টগ্রামে ছুটাছুটি করে। ঢাকার এক অবাঙ্গালিকে পাকিস্তানে পাঠাবার নাম করে তাঁর সহায়সম্পত্তি আত্মসাতের মাধ্যমে একপর্যায়ে ঢাকায় 'শাহবাজ ইন্টারন্যাশনাল' নামে আদম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলে। এরপর বিদেশে লোক পাঠাবার নাম করে উত্তরবঙ্গের কয়েকশ' লোকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে উধাও হয়ে যায়। বছর তিনেক পর ঢাকায় ফিরে 'ড্যাটকো' নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও শুরু করে আদম ব্যবসা! এরশাদ আমলে শুরু হয় তার উত্থান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মুসাকে...।"

*দৈনিক জনকন্ঠে এই প্রতিবেদন ছাপাবার পর প্রতিবাদ দূরের কথা এই প্রতিবেদনটি তৈরীর সময় বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল এমনটাই দাবী এই পত্রিকার।

দৈনিক জনকন্ঠ, (প্রথম পৃষ্ঠা) ২৪ মার্চ, ২০০১

রক্তের দাগ...।

আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, ৭১, ৮১, ৯১, ২০০১, ২০১১ সালে কে খুন, অপরাধ করেছে এখানে সালটা মূখ্য না, আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সেই অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে প্রচলিত আইনে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কি না?

এক নব্য মুক্তিযোদ্ধা এটা নিয়ে অনেক 'ত্যানা' জড়ালেন। আমি নাকি বিচার চাই না বলেই ৭৫-এর কথা উল্লেখ করিনি! শোনো কথা, এদের ব্রেন কী সময়ে-সময়ে ড্রেন হয়ে যায়!
এখানে লম্বা একটা সময় বোঝাবার জন্য ১০ বছর পরপর একটা টাইম-ফ্রেম দাঁড় করানো হয়েছিল। সময়টা এখন ২০২১ হলে, ২০২১-ও এখানে চলে আসত। দাঁড়াত এমন: ৭১, ৮১, ৯১, ২০০১, ২০১১, ২০২১...।

এদিকে আবার অন্য এক মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ওই নব্য মুক্তিযোদ্ধার সেই লেখার 'ত্যানা' ধরে অনেক টানাটানি করলেন- একবার জড়ালেন, একবার খুললেন, আবার জড়ালেন...। তাদের দলবল কেউ-কেউ সেই লেখায় পঞ্চতারকাও প্রদান করলেন। কেউ-বা আবার দাঁত কেলিয়ে হায়েনার হাসিও উপহার দিলেন!
আমি আর কী করব! আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে অল্প জ্ঞান, ওটার উপর ভরসা করে আর বাহাসে গেলাম না। তাছাড়া এদের যে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা! নিমিষেই এরা মানুষকে ছাগলে, ছাগলকে মানুষে রূপান্তরিত করার বিচিত্র ক্ষমতা রাখেন!

যাই হোক, জার্মানিতে কোনো শিশুর নাম 'হিটলার' রাখা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নাৎসি বাহিনী যে ওখানেই কেবল নিষিদ্ধ তাই না, পৃথিবীর যেখানেই নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তাকে ধরে এনে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কারণ সে অপরাধী- কত বছর পূর্বে অপরাধ করেছিল এটা এখানে জরুরি বিষয় না। অপরাধ করেছে, শাস্তি পাবে- এই নিয়ে কারো বাড়তি কোনো কথা নাই।

অথচ আমাদের দেশে ৭১-এ খুন করে দিব্যি যে এরা ঘুরে বেড়িয়েছে এমনই না, কালে-কালে এদের গাড়িতে পতপত করে আমাদের পতাকাও উড়েছে। আফসোস, আমাদের দেশে এখনও পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে মিছিল হয়, বড়ো বিচিত্র এ দেশ!
কখনও এরা বলে, ক্ষমা করা তো হয়ে গেছে। যদিও আমরা জানি সবাইকে ক্ষমা করা হয়নি। তারপরও যে কথাটা থেকে যায়, কে কাকে ক্ষমা করার অধিকার রাখে?

এমনিতে এরা কথায় কথায় ইসলাম ধর্মের বুলি কপচায় কিন্তু ইসলাম ধর্মে নরহত্যা বিষয়ে কোথায় ছাড় দেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে টুঁ-শব্দও করে না!
"...কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি প্রতিশোধ গ্রহনের অধিকার দিয়েছি...। (১৭ সুরা বনি-ইসরাইলঃ ৩৩)
"নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য বদলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে...।" (২ সুরা বাকারাঃ ১৭৮-১৭৯)
মোদ্দা কথা, যাকে খুন করা হলো তার উত্তরাধিকারীর উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্তটা, কোনো রাজা-বাদশার উপর না।

১৯৭১ সালে সাদি মহাম্মদের পরিবারের ২৫ জন মানুষকে খুন করা হয়েছিল। যার বর্ণনা তিনি চ্যানেল আইয়ের একটা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন। কেমন করে একেক করে তাঁর স্বজনদের জবাই করা হয়েছে, কোপানো হয়েছে। কেমন করে বাবাকে ফেলে তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন...। এই সমস্ত তীব্র কষ্টের কথা তিনি বুকে পাথর বেঁধে বলে গেছেন...।
ইচ্ছা ছিল এই লেখাটার সঙ্গে ওই ভিডিও ফুটেজটা এখানে জুড়ে দেওয়ার কিন্তু এটা কোনো কারণে আপলোড করতে পারছি না । এমন একটা ফুটেজ দেখার জন্য যে বুকের সাহস প্রয়োজন তা আমার নাই। আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, এ বর্ণনাতীত!

হতাশায় আমরা নাহয় সব দেখেশুনে মুখ ফস্কে বলে বসি, ওই সব পুরনো জিনিস নিয়ে আর কত...। কিন্তু খুনের বিচার না-হলে আইন কোন কাজের? আইন তো কোনো খুনেরই বৈধতা দেয় না। ৭১ সালের খুন আমরা বিস্মৃত হলে ২০১৩ সালের খুন কী দোষ করল?
আর একজন সাদি মহাম্মদ কেমন করে বিস্মৃত হবেন তাঁর সেই অন্য ভুবনের কষ্ট! তিনি ব্যতীত কার এই ক্ষমতা আছে তাঁর স্বজনের খুনিকে ক্ষমা করার?

আমি যেটা মনে করি, ৪২ বছর গেল নাকি ৪২০ বছর তাতে কী- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না...।