Sunday, April 14, 2013

ভেঙে পড়ে হুড়মুড় করে, সব...

আগের এক লেখায় বলেছিলাম, আমাদের দেশে জাতীয় ফুল-ফল-পশু যেমন আছে তেমনি 'জাতীয় ভাই' থাকাটাও জরুরি। এটা তাঁকেই দেয়া হবে যিনি দলবাজিতে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন।
কেউ দল করতেই পারেন এটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু দল করতে গিয়ে যখন মানুষটার 'গ্রে মেটার' নিম্নগামী হয় তখন মানুষটাকে এই উপাধি না-দিয়ে উপায় কী!
(একটু আগে একজনের স্ট্যাটাস পড়ছিলাম, দলবাজির কারণে সহপাঠির চাপাতির কোপে কেমন করে বিছানার চাদর লাল হয়ে যায়...!)

তো, বিষাদের সঙ্গে এও বলতে হয়, ওই দলবাজ মানুষটাকে তখন করুণা করতেও করুণা হয়। সেই মানুষটা কয়টা ডিগ্রি, সেলিব্রেটি নাকি হেভিওয়েট-ওভারওয়েট-পেপারওয়েট ফেসবুকার তাতে কী আসে যায়!
আসলে এঁদের দোষ দিয়ে লাভ নাই। যেতে হবে গোড়ায়...। ইশকুলে যখন ঘটা করে শেখানো হয় কেমন করে দলবাজি করতে হয় (সিট পাওয়া, হল দখল, টেন্ডারবাজি, কথায় কথায় লেজ নাড়ানো, হালি-হালি শিশুর বাপ ছাত্রনেতা হয়ে যুগের-পর-যুগ ধরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি)

অন্য একটা উদাহরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক-পিতা হচ্ছেন ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অনেক সময় তাঁর কথাবার্তা, কাজের নমুনা দেখে মনে হয় না তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মনে হয় দলের ভিসি। একটা উদাহরণ দেই:  
বাংলাদেশের সমুদ্রজয়ে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা দেয়ার উদ্দেশ্যে গত বছর, ২৮ এপ্রিল শেরাটন হালের রূপসি বাংলা হোটেলে এক সভার আয়োজন করা হয়।
পত্রিকার কল্যাণে জানা গেল, গণসংবর্ধনা কেমন করে দেওয়া হবে এটা ঠিক করার জন্য ৫০১ জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শেরাটনে এটা নিয়েই ওই সভার আয়োজন। ওই সভায় নাগরিক কমিটির ৫০১ জন সদস্যের মধ্যে একজন, জনাব, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকও ছিলেন!
আমাদের ভিসি সাহেবের একবারও মনে হয়নি গণসংবর্ধনা দেওয়াটা বা দেওয়ার জন্য ৫০১ জনের কমিটি করাটা কতটা হাস্যকর। আর তারচেয়েও কতটা খেলো হচ্ছে, তাঁর মত অতি উঁচুমাপের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসির এই কমিটিতে জড়াজড়ি করে থাকা। এই সব কী তাঁর কাজ! পিতাসম তিনি সন্তানতুল্য হাজার-হাজার শিক্ষার্থীর কাছে কী উদাহরণ সৃষ্টি করলেন?

তো, যেটা বলছিলাম, যেমন অভিভাবক-পিতা তেমনই তাঁর সন্তানেরা হবেন এতে অবাক হওয়ার কী আছে (এখানে সবার কথা বলা হচ্ছে না, কেউ-কেউ, যারা-যারা এই সব পিতাকে অন্ধ অনুকরণ করেন, করবেন)। একটা অংশের এভাবেই শুরু...।
এদিকে নির্বাচনের পরেই, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসামাত্র আমরা জেনে গিয়েছিলাম তিনিই হচ্ছেন ভিসি। বাস্তবে তাই হয়েছিল! আমরা এও জানি, ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলে তিনি আর ভিসি থাকবেন না। সেই ঘুরেফিরে আবারও একই কাহিনী হবে- আমরা একটা বৃত্তে আটকে গেছি! নতুন দলের নতুন কোনো ভিসি আসবেন। এ বি সি ডি কেউ একজন। তিনিও ১০০০ সদস্যের কমিটির একজন গর্বিত সদস্য হবেন।

'চেইন অভ কমান্ড' কেমন করে ধসে পড়ে তার আরেক উদাহরণ। বিডি নিউজে দেখলাম, "ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস ঘেরাও"।

আমার তো মনে হয় এটা 'ভুল ঘেরাও'। উপাচার্য ইচ্ছা করলেই ব্লগারদের মুক্তি দিতে পারবেন না! আইন সম্বন্ধে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে তারা বিষয়টা আঁচ করতে পারবেন এখন এটা আর উপাচার্যের এখতিয়ারে নেই। যেটা তাঁর এখতিয়ারে ছিল, যেটা তিনি করেননি...!

এখন এটা না-করে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ঘেরাও করলে সেটাই যথার্থ হত। কারণ সুব্রত অধিকারী শুভ নামের যে ছেলেটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে গেছেন, তা কোন আইনের বলে? এরা কী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকদের অনুমতি নিয়েছিলেন?
আমি ভুল না-করে থাকলে প্রক্টরের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় এবং তিনি প্রয়োজন বোধ করলে উপাচার্যের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। সুব্রতের বেলায় এখানে কোনো নিয়মই মানা হয়নি।
এটা যে কী ভয়ংকর এক ঘটনা এটার তাৎপর্য বোঝার মত ক্ষমতা কী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নাই! পুলিশ আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি না-নিয়ে একজন ধরে নিয়ে গেছে, কাল কী আদালতের ভেতর থেকে অন্য একজনকে ধরে নিয়ে যাবে? একজন মানুষ হারিয়ে যায় না কারণ অনেকগুলো নিরাপত্তা বলয় কাজ করে। কাউকে বাজার থেকে নিয়ে গেলে বাজারের লোকজনেরা সাক্ষী থাকবে, অন্য কোথাও থেকে ধরে নিয়ে গেলে তার স্বজন অথবা বাড়িওয়ালা, কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধরে নিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক।
খোদা-না-খাস্তা, সুব্রতকে যদি মিডিয়ার সামনে বা আদালতে হাজির না-করা হত তাহলে এই দেশের লোকজনেরা জানতেই পারত না একজন সুব্রত কোথায় হারিয়ে গেল। এমন তো এই দেশে অনেকেই হারিয়ে যান, চিরতরে...।

সুব্রতের বেলায় এই দায় সবটাই উপাচার্যের উপর বর্তায়! তিনি একজন উপাচার্য, একজন পিতার দায়িত্ব পালন করলে এটা নিয়ে মাটি খুঁড়ে ফেলতেন। কিন্তু এটা তিনি করেননি, করতে পারবেন না! কারণটা আমরা জানি, তিনি একজন আওয়ামি লীগের মনোনীত সদস্য...।

খবরের পেছনের খবর।

পূর্বেও আমি লিখেছিলাম, মিডিয়া আমাদেরকে যা খাওয়াবে আমরা তাই খাব, সানন্দেই খাব। আমাদের দেশের ১০টা প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া মিলে যদি ঠিক করে আজ আমরা দেশবাসীকে ইয়ে খাওয়াব, আমরা অজান্তে তাই খাব।
ছবি ঋণ: যায়যায়দিন
আগুন ধরাবার ভাল একটা ছবি কতটা আবেদন রাখে মিডিয়ার কাছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবং আমি নিশ্চিত, কিছু ক্ষেত্রে তা ঘটে ফটোসাংবাদিকের ইন্ধনে। অন্তত এমন কিছু  ঘটনার কথা আমাদের জানা আছে। কিন্তু সেইসব খবরের পেছনের গল্পগুলো সামনে আসে না। আসে না সাজানো ফটোসেশনের গল্প!

যেমন আমরা সাংসদ ফারুকের উপর পুলিশের চড়াও হওয়াটা তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলাম, আমি নিজেও এ নিয়ে কঠিন এক লেখা লিখেছিলাম। কাজটা অতি কুৎসিত এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আজ একটা ভিডিও দেখলাম, যেখানে সাংসদ ফারুক, তিনি যে কী উগ্র একজন মানুষ এবং তাঁর আচরণ কোনো প্রকারেই একজন সাংসদ দূরের কথা, বাজারের নেতারও শোভা পায় না! অন্তত একজন সভ্য মানুষের...।

এই সাংসদ ফারুকের মত প্রথম সারির নেতারা যখন হরতালে নিজ হাতে চলন্ত বাসে ঢিল ছোঁড়েন তখন তা আমরা খুব সমীহের দৃষ্টিতে দেখি। মিডিয়ায় ফটাফট ছবি ছাপা হয়, হরতাল সফল বলে দাবীও করা হয়। আমরা ...রা আবার এর নাম দিয়েছি পিকেটিং। এতে কার চোখ গেল, কোন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পড়ল এটা জানার আগ্রহ আমাদের নাই। একজন গর্ভবতীর মার গর্ভ নষ্ট হলো এতেও আমাদের খুব-একটা কিছু যায় আসে না। আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছে। কেবল মার সেই অদেখা শিশুটি নিভে যাওয়া চোখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়, এই-ই তাহলে গণতন্ত্র!


পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে চলন্ত গাড়িতে ঢিল ছোঁড়াটা গণতান্ত্রিক অধিকারে পড়ে বলে এমনটা অন্তত আমার জানা নাই। হয়ে থাকলেও সেই দেশটাকে আমি সভ্য বলতে নারাজ- সেটা সুইটজারল্যান্ড হোক বা কঙ্গো!
এটা মিডিয়ার কাছেও বছরের-পর-বছর ধরে খুবই প্রিয় একটা বিষয় ছিল, পিকেটিং। কিন্তু পিকেটিং-এ যখন মিডিয়ারই গাড়ির কাঁচ ভেঙে দেয়া হয় তখন আর ভাল লাগে না। তখন মিডিয়াকর্মীর হাহাকারভরা ফেসবুক স্ট্যাটাসও প্রসব হয়, 'উহারা কী মানুষ'!

গতকাল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি একজনের অপক্ষোয়। ওমা, ট্রেন ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়াকর্মীদের ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল। ঘটনা কী! ঘটনা অসামান্য। আজ থেকে রেল ট্রেনে নিরাপত্তা দেবে। ভাল তো, সমস্যা তো নেই।

ছবি ঋণ: প্রথম আলো, ১১ এপ্রিল ২০১৩
তো, এই নিরাপত্তা দেয়া নিয়ে এরা ফটোসেশন করবেন, অধিকাংশ মিডিয়াকর্মীকে খবর দিয়ে এনে জড়ো করা হয়েছে। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে ট্রেনের সামনে বুক চিতিয়ে পোজও দেয়া হলো। আমি হতভম্ব। পুরো বিষয়টার মধ্যেই এক ধরনের চালবাজি কাজ করছে এবং মিডিয়া জেনেশুনে এতে কেবল সায়ই দিচ্ছে না, অন্যায়টা উসকেও দিচ্ছে।

আমি অপেক্ষায় ছিলাম, হয়তো পত্রিকায় এই খবরটা ছাপা হবে না বা দায়সারা গোছের একটা খবর হবে। ওয়াল্লা, আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় দেখছি (অন্য এক স্টেশনের, চট্টগ্রাম) রেলে পুলিশ ভাইয়াদের নিয়ে বিশাল এক ছবি ছাপা হয়েছে। কালের কন্ঠও ছাপিয়েছে তবে পেছনের পাতায়। কিন্তু ছবির ভঙ্গি একই!


চট্টগ্রামে তোলা ওই ছবিটার ভঙ্গিটাই এমন, এই ছবিটা যে আয়োজন করে তোলা এটা অন্তত একটা বাচ্চারও বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা না। এটা দেখে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আগেকার দিনে মৃত বাঘের উপর পা রেখে ছবি উঠাবার একটা চল ছিল। পরে এলো, স্টুডিওতে টেলিফোন উঠিয়ে টেলিফোন করার পোজ, বা খানিক আধুনিক হলে গিটার নিয়ে। অন্য পত্রিকায়গুলো দেখার সুযোগ হয়নি, ওগুলোতেও এমন ছবি ছাপা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এটা যে আয়োজন করে উঠানো একটা ছবি এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নাই। অতি হাস্যকর একটা ছবি! আর এই সমস্ত আবর্জনা-মার্কা ছবি রেলপুলিশের নিজেদের বের করা সাময়িকীতে থাকলেই খানিক মানানসই হত। যেগুলো মানুষ বিনে পয়সায়ও নিতে চায় না। চালু দৈনিকগুলোতে কেন!

ছবিটা দেখে আমাদের কী এমনটা মনে হচ্ছে না, ওটা একটা লোকোমোটিভ (প্রথম আলোর ভাষ্য মতে, ট্রেনের ইঞ্জিন) না, আস্ত একটা ট্যাংক। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে অস্ত্র হাতে যে দু-জন যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, মনে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে আছেন। ঘোর যুদ্ধ চলছে। চারদিকে কেবল গুলির শব্দ, ঠা-ঠা-ঠা।

এই দুই বাহাদুর দুম-দুম করে গুলি ছুঁড়ছেন। কাকে? ফটোসাংবাদিককে কি না, কে জানে! ভাগ্যিস, ছবিটা প্রথম আলোর কোনো ফটো সাংবাদিককে তোলেননি, নইলে তিনি মরলে আর বাঁচতেন না (কারণ ফটোসাংবাদিকের জায়গায় লেখা আছে, ছবি: প্রথম আলো)। প্রবল আশা, প্রথম আলো আসলে কোনো ফটোসাংবাদিকের নাম না। তাহলে? তাহলে আমরা যে এটাও বুঝে উঠতে পারি না ছবিটা কী এই অফিসের চাপরাসি উঠিয়েছেন নাকি সম্পাদক বাচ্চু ভাই নিজে?

ভাল কথা, আমার জানার খুব আগ্রহ, যেভাবে রেল-পুলিশ দাঁড়িয়ে আছেন, এরা কি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এভাবেই দাঁড়িয়ে  থাকবেন? আহা, ভাইজানেরা কী একবারও বসবেন না...

*প্রথম ছবিটা হচ্ছে এমন (যায়যায়দিন ২১.০৬.০৬): ধানমন্ডিতে কয়েকজন পিকেটাররা ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ির পর্ব শেষ করে ফটোসেশন হচ্ছে।