Monday, July 1, 2013

মুক্তিযুদ্ধে, একজন শুয়োর চড়ানো বীর-প্রতীক!

"হাজারি লাল তরফদার। হাজারি লালের পেশা 'কাওরা' (যারা শুয়োর চড়ান)। তিনি নিম্নবর্ণের মানুষ। মানিকের ভাষায় ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোক! কিন্তু এই মানুষটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসের সঙ্গে লড়ে গেছেন। তিনি একজন বীর-প্রতীক!

তাঁর মুখ থেকে খানিকটা শুনি সেই সময়কার কথা:
'...নাভারন, গথখালি, গঙ্গানন্দপুর থেকে অপারেশন করে রাজাকার, আল-বদর ধরে আনতাম। একবার বাঙ্কারের মধ্যে থেকে এক পাঞ্জাবিকে ধরে আনলাম। ...ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন এসেছিলেন সীমান্তের যুদ্ধের পরিস্থিতি দেখতে। ওই খবরটা শুনে আমাকেও দেখতে এসেছিলেন'।

'...মধুখালীর সেগুন বাগানের যুদ্ধের কথা আজও আমার চোখের মধ্যে আলো দেখায়। যুদ্ধে আমারে দেখতে আইছিলেন ক্যাপ্টেন হুদা, পরে মেজর হইছিলেন। ওই দিন আমার ঘাড়ে ক্যাপ্টেনের ফুল পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এখন আমি আর  ক্যাপ্টেন নই। আজ থেকে তুমি ক্যাপ্টেন। ...আমি হইলাম অশিক্ষিত মানুষ, আমি কী করে এই ফুল (ব্যাজ) পরি!
আর পাঞ্জাবির লাশ পড়েছিল ৫৫ থেকে ৫৬ জনের মত।
আরেকটা ঘটনা হইল পাঞ্জাবির লাশ তিরিশ-চল্লিশ হাত উপরে তালগাছের মাথায় উইঠা গেছিল কারণ আমরা মাইন পুঁতে রাখছিলাম। মাইন ফেটে তাদের এই হাল হয়েছিল, এই ঘটনা হইল ঝিকরগাছা থানার মধুখালী গ্রামের'।

'...এরপর আমাদের নিয়ে গেল গরিবপুর ঘাঁটি দখল করতে। এই ঘাঁটিঁ আছিল খুব শক্ত! এখানে সব মুক্তিবাহিনী ফেল মারছে এর আগে। গরিবপুরকেও আমরা শত্রুমুক্ত করলাম। এরপর বাকি থাকল ঘোরপাড়া। পাঞ্জাবি আর রাজাকার মিলায়া ওরা আছিল ৮২ জন। ওইখানেও অপারেশ কইরা মুক্ত করলাম...'।

মুক্তিযুদ্ধে এই আগুনমানুষটিকে সন্ত্রাসীরা তাঁর বসতভিটা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাঁর ভিটাবাড়ি দখল করে নিয়েছে! এখন তিনি জমিহীন একজন মানুষ, অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে দিন চলে তাঁর- দিন আনি, দিন খাই টাইপের!
বছরের-পর-বছর চলে গেছে তিনি এখনও দুস্থ মুক্তিযোদ্ধার ভাতাও পাননি। তিনি ভাতার চিঠির জন্য অপেক্ষায় আছেন। আফসোস, আমাদের দেশে মার্কেজের [১] মত লেখক নাই নইলে আরেক অমর সৃষ্টি হতো, 'নো ওয়ান রাইটস টু হাজারি লাল'।"

(তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না কারণ এরপরও আমরা অসম্ভব আবেগ নিয়ে গাইব, 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।')

*তথ্যঋণ: মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান তুহিন। আরিফুজ্জামান তুহিন নামের এই মানুষটার এই অসাধারণ  কাজের জন্য তাঁর প্রতি অসম্ভব ভাল লাগা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি...।

সহায়ক সূত্র:

১. গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_31.html

No comments: