Friday, May 24, 2013

বোতল-ব্যবসা এবং...!

[এই লেখাটা এখানে আগেও পোস্ট করা হয়েছে কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় জুড়ে দিতে হচ্ছে]
আগাম সতর্কতা: (অতি সূক্ষ রুচির লোকজনেরা, রুচিবাগীশ, যারা অল্পতেই  গা দোলান বা মনিটেরের পর্দা নড়লেই যাদের গা গুলায় তারা লেখাটা না-পড়লেই ভাল করবেন।)

পত্রিকার একটা খবর ছিল এমন, "ঢাকায় ৫৫ লক্ষ মানুষের জন্য ৪৫টি পাবলিক টয়লেট"
আমি অংকে বড়ো কাঁচা! তবুও একটা আঁক কষি, আনুমানিক ১ লক্ষ মানুষের জন্য প্রায় ১টা টয়লেট। ঢাকায় আমি যদি মূত্র-বিসর্জনের গোপন ইচ্ছা নিয়ে লাইনে দাঁড়াই তাহলে ক-দিন পর উক্ত কর্ম সম্পাদন করিতে পারিব? যারা অংকে ভাল তারা যদি দয়া করে আমাকে এই হিসাবটা করে দিতেন তাহলে সুবিধে হতো। কারণ ঢাকায় একবার মুত্রবিসর্জন করার জন্য আমাকে ক-দিন ঢাকায় থাকতে হবে সেই মতে আমার গাট্টি-বোঁচকা গোছাতাম আর কী!

ঢাকার মানুষেরা মূত্র বিসর্জন দেন কোথায় এই নিয়ে গভীর চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদের 'নরমূত্র' লেখাটা পড়ে খানিকটা ধারণা হয়েছিল ঢাকার লোকজনেরা কেমন বেতমিজ! উহারা নাকি প্রকাশ্যে রাস্তায় মূত্র বিসর্জন করে। রাম-রাম! ঢাকা শহরের 'লুকজন এতো 'খ্রাপ'! মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসনে 'নরমুত্র' লেগে গেলে উপায় আছে!
এ অন্যায়-এ অন্যায়! সৈয়দ আবুল মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসন বাঁচাতে গোটা ঢাকা শহর এই সাইনবোর্ড লাগিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে 'এখানে প্রস্রাব করিবেন না' নইলে যে ঢাকা শহর মূত্রে ভেসে যাবে! চুজ হেলথ অর টব্যাকো- এখন থেকে ঢাকায় ভাসবে হয় এমন সাইনবোর্ড যে 'এখানে মূত্রবিসর্জন করিবেন না'। সোজা কথা, ঢাকা ভাসবে এই সাইনবোর্ডে নইলে মূতে।

যাই হোক, অচিরেই ঢাকার লোকজন যদি বহুতল ভবনের ছাদে উঠে এই কর্ম করা শুরু করে দেন এতে অন্তত আমি অবাক হব না। ঢালিউডের বৃষ্টির একটা গতি হবে বটে কিন্তু মূত্রবৃষ্টিতে ভিজে এই সব দৃশ্য অবলোকন করে সূক্ষরূচির লোকজনের ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গেলে এর দায় কার উপর বর্তাবে? নাহ, এ চলতে দেয়া যায় না। এর একটা উপায় বের না-করলে চলছে না আর।

ভাবছি... দেখো দিকি কান্ড, আজকাল আমার মত লোকজনেরা ভাবাও শুরু করে দিয়েছে! আচ্ছা, এই নিয়ে একটা ব্যবসা ফাঁদলে কেমন হয়? আরে না, পাবলিক টয়লেটের ব্যবসা না। লোকজন বেরুবার পর জিজ্ঞেস করতে হবে, ভাইজানের কি বড়োডা, না ছোডোটা? ওই ব্যাটা ফাঁকি দেতে চাইলে এই নিয়ে কিছু কায়দা-কানুন করে তাকে হাতেনাতে ধরতে হবে। ছ্যা-ছ্যাঁ!

চিন্তা করছে, এখন থেকে 'বঙ্গাল'-দের অভ্যাস খানিকটা বদলাবার চেষ্টা করতে হবে। এই যে এক হাতে বা বগলে পানির বোতল, এই 'কলচর'টা আর কদ্দিনের? ক-বছর হলো লোকজনেরা পানির বোতল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? আমরা তো চাপাকলের মুখে মুখ লাগিয়েই পানি খেয়ে-খেয়েই বড়ো হলুম। কিন্তু এখন হাতে একটা পানির বোতল না-থাকলে কেমন ফাঁকা-ফাঁকা, নিজেকে কেমন অরক্ষিত-অরক্ষিত মনে হয়! অহেতুক গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়!
কালে কালে এটা একটা ভাবও হয়ে গেছে বটে। কোনো গোলটেবিল, ত্রিকোনা টেবিলের আলোচনায় পানির বোতল না-থাকলে আলোচনা আর জমেই উঠে না! শ্লা, 'মাম' তো মিনিস্টারের পানি হিসাবে খ্যাতি পেল!

যাগগে, আমার প্ল্যানটা হচ্ছে, এক হাতে পানির বোতল নাহয় থাকল কিন্তু অন্য হাত তো মুক্ত। ওই হাতে আরেকটা খালি বোতল ধরিয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, বাপু! কারও সূক্ষ রূচি আহত হলে বোতলের রঙ কালো করে দিলুম নাহয়! মনে হয় না বাংলাদেশের আইনে আটকাবে। আরে বাহে, যেখানে নিষেধ থাকার পরও আমাদের মিনিস্টার সাহেবরা গাড়িতে কালো কাঁচ ব্যবহার করেন সেখানে 'নরমূত্রবোতল' কালো হলে পুলিশ লাঠি মেরে মাথা বা বোতল ফাটাবে এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না। আর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ 'নরমূত্রবোতল' বাজেয়াপ্ত করলে চাইলে তাদের সঙ্গে হুজ্জতে যাওয়ার প্রয়োজন কী, বাপু; 'নরমূত্রবোতল'-টা দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
যাই হোক, তাহলে আর মুত্র বিসর্জন নিয়ে বাড়তি কোনো চাপ নেই। ঢাকাবাসী গাড়িতে থাকুক বা খেলার মাঠে, পার্কে, ফেসবুকে মুত্র বিসর্জনে আটকাচ্ছে কে!

আরেকটা জরুরি বিষয়। কেবল সরকারকে গালি দিয়ে লাভ নাই। আমরা নিজেরা কী! কলা খেয়ে রাস্তায় কলার খোসা ফেলি, বাড়ির সমস্ত আবর্জনা ফেলি। আবার এই আমরাই রাস্তা নোংরা কেন এই নিয়ে সরকার, মেয়রের ফরটিনথ জেনেরেশনের বাপ-বাপান্ত করি!
আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, আমাদের দেশে কোটি টাকা খরচ করে ঝাঁ চকচকে একটা মার্কেট করবে কিন্তু একটা টয়লেট রাখবে না। খোদা-না-খাস্তা টয়লেট থাকলেও তা থাকবে তালাবদ্ধ।

এ আমার বড়ো দূর্ভাগ্য, ড্রেনটা রাস্তার মাঝখানে চলে আসে, বিনা নোটিশে। এই বিষয়ে আমার বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ওয়শরুম যথারীতি তালাবদ্ধ। আমি অনেক যন্ত্রণা করে স্টেশন মাস্টারকে খুঁজে বের করলাম। বাড়িয়ে বলছি না, ঠিক এই বাক্যটাই বলেছিলাম, 'আপনার বাড়িতে চলেন, আমি পেসাব করব'।
তিনি চোখ লাল-টাল করলেন, তাতে আমার বয়েই গেছে। পরে যেটা বললেন, বদনা নাকি চুরি হয়ে যায়। শোনো কথা, একটা প্লাস্টিকের বদনা চুরি হয়ে যায় এই অজুহাতে টয়লেটে তালা সেরে রাখবেন!

একবার হলো কি, গ্রামে ঘুরছি। ব্লাডার খালি করা আবশ্যক। গেলাম এক মসজিদের এস্তেঞ্জাখানায়। কাজ সেরে ফিরে এসেই পড়লাম বাঘের মুখে! আমার জিন্স, লেবাস দেখে ইমাম সাহেব ভারী গলায় বললেন, 'আপনে কি ওখন নোয়াজ পরবেন'।
আমি অমায়িক ভঙ্গিকে বললাম, 'জ্বে না, আমি একজন মুসাফির মানুষ। এখনই চলে যাব'।
তিনি এবার বললেন, 'এইটা মুসুল্লিদের জন্য, সবার জন্য না'।
আমি শুরু করলাম, 'আচ্ছা হুজুর, আপনে কি জানেন, একবার এক বদু মসজিদের কোনায় বসে পেসাব করছিল। নবীজী তখন বয়ান করছিলেন। সাহাবিরা ক্ষেপে গেলেন, পারলে গলা কেটে ফেলেন। কিন্তু নবীজী পেসাবে বাঁধা না-দেওয়ার জন্য নিষেধ করলেন। পরে বদুকে বুঝিয়ে দিলেন। বদু তার ভুল বুঝতে পারল। পরে তিনি নিজেই সেই পেসাব পানি এনে পরিষ্কার করলেন।...তা নবীজী যেখানে এই রকম মায়া দেখিয়েছেন সেখানে আপনি এমন কঠিন আচরণ করছেন কেন। কাজটা কি ঠিক, হুজুর...'।

আরেকবার। এটা ঢাকার ঘটনা। নামকরা এক ফোন কোম্পানির সার্ভিসিং সেন্টার। 'পশ' একটা অফিস। ওয়ারেন্টি ছিল তাই আমার ফোন সার্ভিসিং করাতে এসেছি। আমি এদের জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি একটু...'।
এরা বললেন, 'সরি স্যার, আমাদের এখানে তো ওয়শরুম নাই'।
আমি চিন্তা করলাম, এরা তো সারাদিনই অফিসে থাকে তাহলে ব্যাটারা যায় কোথায়? এটাই যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন আমাকে জানালো, স্টাফদের জন্য আলাদা ওয়শরুম আছে।
এবার আমি অসহ্য, অদম্য রাগ সামলে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। হঠাৎ করেই শান্ত গলায় বললাম, 'ইয়ে, আচ্ছা, আপনাদের ছাদে যাওয়া যায়'?
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, 'যায় তো, এভাবে গেলেই যেতে পারবেন। কিন্তু কেন?
আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, 'মুতব'।

এই হচ্ছে আমার নিয়তি, এই 'মুতামুতি' নিয়ে একটা-না-একটা ঝামেলা বাঁধবেই, কপালের ফের। ... 
...
অন্যত্র এই লেখাটা দেওয়ার পর একজন রসিকতা করে মন্তব্য করলেন, মেয়েদের বেলায় কী হবে? এর উত্তরে আমি লিখেছিলাম:
"লেখাটা আসলে আমি লিখেছিলাম ফান করে। কিন্তু বিষয়টা আসলে ফানের না। এ এক অন্যায়, ভযাবহ অন্যায়- মানুষের শারীরিক কষ্ট! আমরা জাতি হিসাবে বড়ো অভাগা, এই সমস্ত ছোট-ছোট অথচ ভয়ানক বিষয়গুলোর সমাধান দূরের কথা, ভাবতেও চাই না।

আমার ধারণা, এই দেশের অধিকাংশ নারী ইউরিন ইনফেকশনে ভোগেন কেবল ওয়শরুমের স্বল্পতার কারণে। আমি ডাক্তার নই বলে বলতে পারছি না এই যে দিনের-পর-দিন, বছরের-পর-বছর, যুগের-পর যুগ ধরে ইউরিন ইনফেকশনে ভোগার কারণে একজন নারীর উপর কতটা প্রভাব ফেলে?
আমি এও অনুমান করি, ঝামেলা এড়াবার ভয়ে অনেক নারী পর্যাপ্ত পানিও পান করেন না! তাঁর কিডনি বা অন্যান্য উপসর্গের কারণে তার উপর এর কতটুকু প্রভাব পড়ে, এই নিয়ে ভাবার সময় কোথায় আমাদের! কারণ আমাদের সব ধরনের চেষ্টা থাকে কেমন করে এই জাতিকে একটা বিকলাঙ্গ জাতি হিসাবে পরিণত করা যায়...।"

No comments: