Search

Loading...

Tuesday, November 6, 2012

স্যান্ডি এবং স্যান্ডেলের গল্প।

ঈশ্বর-গড-ভগবান এঁদের যন্ত্রণার শেষ নেই! বেচারাদের ঘুমাবার যো নেই। ঘুমাবার যো নেই এটা ভুল বললাম, আসলে হবে চোখে ঘুম নেই। সবারই গোপন ইচ্ছা, কেমন করে তাঁর সন্তান দুধেভাতে থাকবে আর অন্যরা চুনগোলা খাবে [১]। 'সবারই গোপন ইচ্ছা' এটাও ঠিক বলা হলো না- আসলে হবে 'খুল্লামখুল্লা' ইচ্ছা!
এই বিষয়ে সবার রা একই। মোটা দাগে বললে, নিজের সন্তানদের স্বর্গবাস অন্যের সন্তানদের নরকবাস। নিজের সন্তানেরা রসগোল্লা খাক, অন্যরা স্রেফ গোল্লায় যাক।

কার কথা এটা, রবিদাদার? "I love God because he has given me the freedom to deny him."
ভাগ্যিস, এঁরা অন্যের সন্তানদের ব্রেনকে ড্রেন করে দেন নাই নইলে বড় মুশকিল হয়ে যেত। এই গ্রহের ঈশ্বর একজনই থাকতেন- সবাই একজনকেই মান্য করত। এবং নরক গুড়িয়ে দিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে স্বর্গের আয়তন বাড়াবার আবশ্যকতা দেখা দিত কারণ স্বর্গ যে উপচে পড়ত লোকে!

প্রকৃতির আবার এই সব হ্যাপা নেই।  সবাই, সবই তার সন্তান। তার কাছে বাছবিচার নাই। কার বগলে নিউক্লিয়ার বোমা আর কার বগলে নকুল তাতে তার কী আসে যায়! প্রকৃতি চলে তার নিজস্ব গতিতে, নর-মাদা, নর-মাদি নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ কোথায়! 


(এখানে আমেরিকা কেবল একটা উদাহরণ মাত্র) সম্প্রতি স্যান্ডি তছনছ করে দিয়েছে আমেরিকা নামের দেশটা। বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার জলে গেছে কেবল তাই না, দেশটা চোখ গোল গোল করে দেখেছে প্রকৃতির তান্ডব! এরা অবশ্য ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের চরম পরাকাষ্টা দেখাতে পেরেছে বলেই এদের মৃত্যু সংখ্যা অতি নগণ্য। আমাদের একটা লঞ্চ দুর্ঘটনায় এরচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। না-হওয়ার কোনো কারণ নাই।
আর এখনও আমরা যে রুস্তম-হামযা নামের উদ্ধারকারী দুই বুড়া গাধার উপরেই ভরসা করে আছি [২], দুইটা কারণে-
এক: উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ কেনার চেয়ে ফ্রিগেট কেনাটা আমাদের জন্য জরুরি।
দুই: লঞ্চ ডুবে মৃত্যু হলে আমরা ছাগল পাই, রশি ফ্রি। (ছাগল দেয়াটা এখনও চালু আছে কিনা কে জানে। হয়তো দেশে ছাগলের বড় সংকট বলে আপাতত বন্ধ আছে!)
বেচারি এক দেশ! কংক্রিটের বস্তি নামের যে উঁচু ম্যাচবাক্সগুলো বানাচ্ছি আমরা সেখানে আগুন লাগলে আগুন নেভাবার জন্য, নাগাল পাওয়ার মত হাইড্রলিক ল্যাডার আমাদের হাতে নাই [৩]। আমরা যুদ্ধজাহাজ বানাবার ক্ষমতা রাখি কিন্তু সিঁড়ি বানাতে পারি না।

যাই হোক, আমাদের গ্রহপিতা। আমাদের প্রিয় স্বপ্নের আমেরিকা, ওখানকার মেথরদের আন্ডারওয়্যার ধোয়ার জন্যও যেতে পারলেও আমরা বর্তে যাই। আগেও লিখেছিলাম, "এই গ্রহের গ্রহপিতা আমেরিকা কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের গ্রহমাতা বা গ্রহের মা নাই! গর্দভ নাকি গর্বাচেভ আমাদের মাকে হত্যা করেছে..."[৪], [৫]। অমায়িক অভাগা আমরা! মাতৃহারা হলাম, ইয়াতিম হয়ে গেলাম।

'কুত্তিরিনা রাইস' যখন চমৎকার পিয়ানো বাজায়, জুতাবাবা বুশ যখন কবিতা লেখে: “প্রিয়তমা লরা .. গোলাপের রং লাল- ভায়োলেট ফুল নীল...” ।  তখন নতুন করে সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপিত হয় [৬]। এ গ্রহের অঘোষিত ঈশ্বর তো এরাই। সব মুখে বলতে হয় বুঝি! মাত্র কয়েক মাসে রোয়ান্ডায় ১০ লাখ মানুষকে সুপরিকল্পিতভাবে খুন করা হয় অথচ মাত্র ৫ হাজার সৈন্য প্রেরণ করলেই এই খুনগুলো ঠেকানো যেত [৭]। কে ঠেকাবে, জাতিসংঘ...! আমেরিকার পাপোস?

অথচ এই আমেরিকার আদিবাসিরা ছিলেন এশিয়া থেকে আগত। হাজার-হাজার বছর ধরে এই আদিবাসিরা আমেরিকার মূল ভূখন্ডে বসবাস করে আসছিলেন। এরপরে তো ইতিহাস। দো-আঁশলারা আদিবাসিদের মেরেকেটে সাফ করে দিল। দলে দলে পাদ্রির বেশে 'ফিরিঙ্গি' জড়ো হল। পাদ্রিদের হাতে ছিল বাইবেল, আদিবাসিদের জমি। পরিশেষে দেখা গেল, আদিবাসিদের হাতে বাইবেল, পাদ্রিদের জমি। কালে কালে এই দো-আঁশলারাই কেবল দেশটাতেই ছড়ি ঘোরানো শুরু করল এমন না, এই গ্রহের মাথায়ও বনবন করে ছড়ি ঘোরাচ্ছে, আজও। এখন আমাদেরকে মেরেকেটে সাফ করে দিচ্ছে। কারও কিসসু বলার নাই। এমন গ্রহপিতার গোপন কেশ স্পর্শ করে এমন ক্ষমতা কার!

আমেরিকা মুখে বলে, 'ইন গড উই ট্রাস্ট'। কেবল যেটা মুখে বলে না, সেটা বুঝে নিতে হয়, 'আমরাই গড'। এদের যে কেবল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি আছে এমনই না, আছে এই গ্রহের সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের মজুদ। মজার বিষয়, এ গ্রহের সবচেয়ে বেশি কয়েদিও আছে এদের। বলা হয়ে থাকে, এইডস থেকে শুরু করে অধিকাংশ মানবরোগের আবিষ্কারক মার্কিন ল্যাবগুলো।
আর এরাই আমাদেরকে শেখান মানবতা, লেখালেখি, সব-সব! 'ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামের' আওতায় আমাদের দেশ থেকেও লেখক মহোদয়গণ আমেরিকা হিজরত করে লেখালেখি শিখে আসেন। এরপর এরা আমাদেরকে শেখান কি লিখতে হবে, কেমন করে লিখতে হবে।

কৃত্রিম কাঁচের ঘরে এদের সর্বদা বসবাস। এরা কী করে বুঝবে এই গ্রহের আসল লড়াকু কারা! ঘটনাটা ফ্লোরিডায় থাকেন এমন একজন মানুষের কাছ থেকে শোনা। তিনি জুতা কিনবেন। এ-দোকান, ও-দোকান চরকির মত ঘুরপাক খাচ্ছেন কিন্তু পছন্দসই জুতা পাচ্ছেন না। যেটায় একবার দেখে গিয়েছিলেন ভুলক্রমে ওখানেই আবার ফিরে আসলেন। আলাপচারিতার এক ফাঁকে ওই দোকানের সেলসগার্ল অবজ্ঞার হাসি হেসে বলছে, 'তুমি এতো চুজি কেন? তোমরা তো স্যান্ডেলই পায়ে দাও না'। হিহি হাহা।
সেলসগার্লকে চাবকাবার ইচ্ছা পোষণ করাটা সমীচীন হবে না কারণ এ আমাদের দেশকে জেনেছে এভাবেই। যাদের বিভিন্ন সূত্রে এ দেখেছে এঁরা তো সত্যিই জুতা পায়ে দেয় না। এ দেখেছে, অপুষ্টিতে ভোগা খালি পায়ের একজন মা; কোলে হাড়-জিরজিরে দু-একটা সন্তান। যাদের বুকের এক্সরে করার প্রয়োজন পড়ে না।

এদের জানার কিছু উৎসে তো আমাদের হাত নাই। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু চুতিয়া দেশপ্রেমিক আছে এরা পারলে নিজের মাকেও ভাল দামে বিক্রি করে দেবে- মার কিডনি, ফুসফুস, লিভার। ভাল দাম পেলেই হয়। রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে এটা এই শুয়োরের বাচ্চারাই ঘটা করে ছাপায়।
এই চুতিয়া দেশপ্রেমিকদের ছানাপোনারা আরেক কাঠি সরেস। গাঁজা-কফের সিরাপ-ইয়াবা খেয়ে ডকুমেন্টারি বানাবে বা বানাতে সহায়তা করবে। ওখানে আমরা দেখব, ঝড়-তুফান-মাদ্রাসা-খালি পায়ের মা। যেন এর বাইরে আমাদের আর কিছু নাই! বৈদেশে এই দেশের ছবি এরা এমন করেই তুলে ধরেন। অথচ ভুলেও বলেন না এই নগ্নপদ মানুষেরাই হরদম লড়াই করে টিকে থাকেন- এ দেশের প্রাণশক্তি এঁরাই।

অসভ্য এই দেশটা, দেশটার ছাপ এদের লোকজনের মধ্যেও সুষ্পষ্ট। এক বদ্ধউম্মাদ বুশকে আটকাবার ক্ষমতা সেই দেশের লোকদের নাই কিন্তু বেচারা ক্লিনটনকে, মনিকার কারণে ইমপিচমেন্টের ফাঁদে আটকে গিয়েছিলেন প্রায়।
আমাদের দেশের ঘূণিঝড়ে হাজার-হাজার মানুষের মৃত্যু নিয়ে আমেরিকার অতি নামকরা একজন কবি গ্রেগরি করসো কীভাবে হৃদয়বিদারক অতি কুৎসিত আচরণ করেন। আদিরসাত্মক কুৎসিত ভঙ্গি করে বলেন, "তোমাদের দেশ খুব ফারটাইল..."[৮] তখন গুণদাদা লেজ নাড়ান কারণ আমেরিকানদের একটা সার্টিফিকেট তাঁর খুব প্রয়োজন। আবার গুণদাদার এই লেজ নিজের কাঁধে তুলে নেন আমাদের দয়াল আনিস মিয়া [৯]- আমাদের দয়ালবাবা।

তবলার ঠুকঠাক অনেক হলো এবার গলা ছাড়ার পালা। [১০] বুশ-ওবামা-রমনি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মাত্র, আমাদের প্রতি এদের দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা হেরফের হবে না। সাদা বাড়িতে কালো অতিথি [১১]ওবামার পররাষ্ট্রনীতি কী খুব একটা বদলাবে বলে আমরা বোকার মত আশা করব।
আমেরিকা, এ এক দানব। এই গ্রহে দানবকে আটকাবার জন্য বিভিন্ন পদের শেকল রাখা হয়েছে। শিক্ষা-ধর্ম-উত্তরসূরি সমস্ত শেকল যখন একেক করে খসে পড়ে তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল প্রকৃতির শেকল! পূর্বের লেখা থেকে বলি:
"এই সব দাম্ভিক জাতি, এদের ঈশ্বরসুলভ আচরণ দেখে মনে হয়, এরাই বুঝি শেষ কথা। প্রকৃতি, প্রকৃতির সন্তানদের নিয়ে এরা খেলবে ইচ্ছামত, মরা-বাঁচা সবই এদের ইচ্ছায়। আফসোস, প্রকৃতি কখন যে এদের ফেলে দেবে, এরা যখন এটা জানবে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কেবল সময়ের অপেক্ষা। সময়...।"

স্যান্ডি নইলে ক্যান্ডি, তাতে কী- প্রকৃতির বুশশার্টে যে অনেক পকেট! আর এটা এরা বিস্মৃত না-হলেই ভাল করবেন, এই গ্রহে ডায়নোসর নাই, রাশিয়া নাই...

*দ্বিতীবারের মত ওবামা নির্বাচিত হয়েছেন জেনে ভাল লাগছে। এ মন্দের ভালো। মাথা অনেকখানি ঠান্ডা। তার কুফল [১২] না-দেখে আমরা দেখব, বেলের সরবতের সুফল [১৩] :)

সহায়ক সূত্র: 
১. তাঁদের সন্তান থাকুক দুধে-ভাতে: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_06.html
২.  গাধা বনাম ছাগল: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_04.html
৩.  আগুনের সঙ্গে শো ফ্রি: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_15.html
৪.  জয় গ্রহবাবা: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_05.html
৫.  গ্রহ অধিপতি, আভূমি নত হই: http://www.ali-mahmed.com/2011/05/blog-post_18.html
৬.  সভ্যতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html
৭.  রোয়ান্ডা...: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_9297.html
৮.  করসো: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_7854.html
৯.  আনিসুল হক: http://www.ali-mahmed.com/2012/10/blog-post_16.html
১০. বুশhttp://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_25.html
১১. সাদা বাড়িতে কালো অতিথি: http://www.ali-mahmed.com/2008/11/blog-post_06.html
১২. কুফল...: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_20.html
১৩. বেলের সরবতের সুফল: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_289.html

4 comments:

kamrul said...

আপনার সব গুলো লেখাই প্রাই আমি পরেছি, আজ পর্যন্ত কোন মন্তব্য লেখা হয়নি। আপনার লেখা আমার পরতে অনেক ভাল লাগে। আপনাকে আমার হৃদয়ের গবির থেকে ধন্যবাদ জানাই এই রকম লেখা আমাদেরকে উপহার দেয়ার জন্য।

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

আমার লেখা আপনার ভাল লাগে জেনে আমারও ভাল লাগছে। আপনাকেও ধন্যবাদ :) @kamrul

ওয়াহিদ সুজন said...

অসাধারণ লেখা।।

দেশ এখন ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়া লাফাইতেছি।

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

ধন্যবাদ। @ওয়াহিদ সুজন

Facebook Share