Search

Loading...

Wednesday, November 28, 2012

আমাগো 'কোবি'!

জীবনানন্দ দাশের 'কবি' নামের কবিতায় আমরা জবুথবু এক কবিকে দেখি। শতকষ্টেও যিনি আমাদেরকে ভরসা দেন: 
"কবিকে দেখে এলাম
দেখে এলাম কবিকে
...
মরুশ্বেত দুটো চুনোমাছ চোখের বদলে কাজ করছে যেন
মরণোম্মুখ ট্যাংরা
পৃথিবীর থেকে আনন্দ সংগ্রহ করছে
সবাইকে ভরসার কথা শোনাচ্ছে।"

আজকালের কবিকূল আমাদেরকে ভরসা দেয়ার জন্য অনেকখানি এগিয়ে আসেন, পাঠকের কাছাকাছি থাকার জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেন। না-না, কেউ উল্টাপুরাণ বুঝবেন না। এও এক আনন্দ সংবাদ কবিকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়ার নাগালে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। আমাদের দেশের প্রধান কবিদের একজন নির্মলেন্দু গুণ। সেই কবে তিনি লিখেছিলেন,

"...এই মাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
পুড়ে যাবে শিশুর মুখের হাসি।
সেই বিকলাঙ্গ পৃথিবীর দিকে কে তাকাবে,
যেখানে 'জীবিতেরা ঈর্ষা করবে মৃতদের?'
..."
(শান্তির ডিক্রি, নির্মলেন্দু গুণ)

তো, ভাল খবরটা হচ্ছে, তিনি ফেসবুকে আছেন। সম্প্রতি বস্ত্রকারখানায় আগুন লাগা নিয়ে ফেসবুক নোটে তাঁর এক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আর আট-দশ জন ফেসবুকিয়ানদের মতই গদ্য বলে এখানে আলাদা করে উল্লেখ করার কিছু নাই। কিন্তু একটা জায়গায় নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, "...ঐ খা...পোলাদের দেখার কি কেউ নেই?"

উৎস (ফেসবুক): Nirmalendu Goon
জানি-জানি, অনেকে সাহিত্যের তেল গায়ে মেখে লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। মিয়া, তিন টাকা দামের কলমবাজ, সাহিত্যের তুমি কী বুঝ... শিল্প-সাহিত্য...কোবি মানু...হেনতেন। রসো বাপু, গালি যে ব্যবহার করা যাবে না এমন তো না। আমি নিজেও কিছু লেখালেখিতে এই কর্মকান্ড করে থাকি। তারও কিন্তু কিছু কায়দাকানুন আছে- চরিত্রের প্রয়োজনে, ঘটনার চাহিদা মাথায় রেখে। এখন গ্রামের একটা বখা ছেলে বা অপ্রকৃতস্থ একজন তো আর শান্তিপুরি পান খেয়ে 'শান্তিনিকেতনি' ভাষায় বাতচিত করবে না!
কিন্তু ফেসবুকের মত সামাজিক একটা জায়গায় এই শব্দের থান ইট কেন? 'ধুম মাচা দে-ধুম মাচা দে, ধুওম ধুওওম', গানটা কারও ভাল লাগলে সে গাইতেই পারে। কিন্তু কোনো ভাবগম্ভির পরিবেশে বা অফিস-আদালতের টেবিলে দাঁড়িয়ে গানটা গাইলে তো হবে না, বাহে! নগ্নগাত্রে যারা ট্রাফিক কন্ট্রোল করে তাদেরকে অবশ্য গোণায় ধরছি না।

তো, থাকতে না-পেরে নির্মলেন্দু গুণের ওই ফেসবুক নোটে একটা মন্তব্য করেছিলাম, অতিশয় বিরক্তি নিয়ে: "নির্মলেন্দু গুণের ভাষার এ এক নমুনা বটে! :( "
ওখানে আমারসহ আরও অনেকেরই মন্তব্য ছিল। গুণদাদা মন্তব্য করলেন, "Giving u Benefit of doubt..."
এই বাণমোক্ষণ কেন! কবি কার প্রতি এই বিজাতীয় শব্দশেল ওরফে শব্দবাণ ছুঁড়লেন কে জানে! সবাই তো এখানে বাংলাতেই মন্তব্য করেছেন তা কবি সাহেব আবার এখানে 'এংরাজি' লিখতে গেলেন কেন কে জানে! 'এংরাজি' লিখতে খুব আরাম, না?

তথ্য ভান্ডারে আমাদের কবি সাহেবের ভাষা দেখছি, British English. আচ্ছা-আচ্ছা, স্বীকার গেলুম ফেসবুক ভাষা পরিবর্তন করার সুযোগ দেয় না কিন্তু কবিবরের এখানে এতো ইংরাজির দাপট কেন?
ওয়াল্লা, আবার দেখি ঘটা করে লিখে রেখেছেন, "I am a writer, poet and a social worker..."। সোশ্যাল ওয়ার্কার? ভাগ্যিস, লিখে রেখেছেন নইলে আমরা জানতেই পারতুম না!

আহা, আহা রে, আমাদের কবি ভুলতে পারেননি ব্রিটিশদের কাছে আমাদের গোলামির কথা! আসলে আমরা কেমন করে ভুলি, ঘোড়ার পাশাপাশি উবু হয়ে থাকতাম আমরা, ইংরেজ সাহেব-মেম আমাদের পিঠে পা রেখে ঘোড়ায় চড়তেন। প্রভুদের ভাষা-চলনবলনের মায়া আমরা এখনও কাটাতে পারিনি,নফেলে আসা অভ্যাস বলে কথা!
"আমরা বাংলা গিয়েছি ভুলি,
আমরা শিখেছি বিলেতি বুলি,
...
আমরা সাহেবি রকমে হাঁটিঁ
স্পীচ দেই ইংরাজি খাঁটি
কিন্তু বিপদেতে দেই বাঙালিরই মত
চম্পট পরিপাটি।"

(বিলাত ফের্তা, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)


ইংরাজিতে খই ফোটাতে না-পারলে আমাদের মাথা কাটা যায় [১] যে। স্বীকার না-গিয়ে উপায় নেই, বিলাতি মানুষ দেখলে আমরা হাঁ হয়ে যাই। আমাদের হাজার-হাজার স্বজাতি মারা গেলেও এদের কুৎসিত রসিকতার মুখেও আমরা অদৃশ্য লেজ নাড়াই। যেমনটা করসো অতি কুৎসিত রসিকতা করে বলেছিলেন,
'তোমাদের দেশ তো খুব ফারটাইল, প্রতিদিন হাজার হাজার মানবসন্তানের জন্ম দিচ্ছ তোমরা। ...ছাউ ফুটানোর কাজটা তোমরা ভালই পার'।
তখন গুণ দাদার গলা দিয়ে স্বর বের হয় না। তিনি চিঁ চিঁ করে বলেন, তুমি ঠিকই বলেছ।" [২] তখন আনিস মিয়ার মত গুণদাদার চামচারা আগ বাড়িয়ে চামচামি করেন [৩]। সঙ্গে আমরাও অবলীলালায় মাথা দুলিয়ে বলি, ঠিক-ঠিক-ঠিক। জ্বী দাদামশাইরা, আপনারা ঠিকই বলেছেন।


ফার্লিংঘেট্টির একটা কবিতা আছে, 'আন্ডারওয়্যার' নামে। গুণদাদার সেই কবিতা নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। তিনি বলছেন:
"কবিতাটি আমার খুব ভাল লেগেছিল। ...মহাত্মা গান্ধীকে আমরা খুব কাছে থেকে জানি, কিন্তু তিনি আন্ডারওয়্যার পরতেন কি না- এই প্রশ্নটি আমাদের কোনো কবির মনে আসেনি।...।"
বেশ-বেশ, কিন্তু আমাদের আজও এটা জানা হলো না, গান্ধী কী রঙের আন্ডারওয়্যার পরতেন? ইশ রে, এটা নিয়ে আমাগো দাদা যদি একটা 'কোবতে' নামিয়ে ফেলতেন...। 'কবিতাবঙ্গসাগর' অমায়িক এক প্রাণ ফিরে পেত। 
সাহেবদের কাছ থেকে সব শিখব আমরা, সব-সব! সাহেবরা কেমন করে উবু হয়ে বাথরুম সারে, বিছানায় অন্তরঙ্গ সময় কাটায় এই সব রপ্ত না-করা পর্যন্ত আমাদের ছাড়াছাড়ি নাই!  
দূর্ভাগা এক দেশ। দেশি সরাইলের কুত্তার এখন আর বাজার নাই। আমাদের বৈদেশি ডোবারম্যান পিনসার, ব্লাড হাউন্ড, বুল ডগ, জার্মান শেফার্ড না-হলে চলেই না।

এই গুণদাদাই, এই তো 'ভাষার মাস' এলে বাংলা ভাষার জন্য এমন কাঁদা কাঁদবেন, দাঁড়ি-কপোল-কপাল সব ভিজিয়ে ফেলবেন। আমি নিশ্চিত, তাঁর কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেলব। হাউহাউ করে কাঁদব। না, হাউহাউ করে কাঁদার নিয়ম নাই, হাউমাউ করে কাঁদব। বুঝলেন, আমার আবার বিচ্ছিরি একটা অসুখ আছে- কাউকে কাঁদতে দেখলে, 'হুদাহুদি' কান্না পায়...


*নির্মলেন্দু গুণের ফেসবুক: Nirmalendu Goon

সহায়ক সূত্র:
১. ভাল ইংরাজি না-জানলে...: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_9242.html
২. করসো...: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_7854.html
৩. চালবাজ...: http://www.ali-mahmed.com/2012/10/blog-post_16.html

3 comments:

Anonymous said...

শুভ ভাই,আসলে কি এটা কবি গুনের ফেসবুক একাউন্ট,আমার তো সন্দেহ হয়? এমন ভাষা.......

শান্ত said...

{কবিতাটি আমার খুব ভাল লেগেছিল। ...মহাত্মা গান্ধীকে আমরা খুব কাছে থেকে জানি, কিন্তু তিনি আন্ডারওয়্যার পরতেন কি না- এই প্রশ্নটি আমাদের কোনো কবির মনে আসেনি।...।} নির্মলেন্দু গুণ এই কথাটা বলেছেন এটা কোথায় থেকে দিলেন?

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

যতটুকু জানি এটা ওঁঁই ফেসবুকই। আর তাঁর পক্ষে এমনটা অবলীলায় সম্ভব। এমন শত-শত উদাহরণ আছে।
আমার আপত্তিটা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের একটা জায়গায় এমনতরো আচরণ! আমার মনে হয়, নগ্ন গাত্র মানুষকে অহেতুক অশ্লীল বলা হয়- এটাকেই অশ্লীলতা বলাটা সমীচীন। @Anonymous

গীনসবার্গের সঙ্গে/ নির্মলেন্দু গুণ, পৃ নং: ১৬, প্রকাশকাল: ১৯৯৪। এখন আপনি শান্ত তো...@শান্ত

Facebook Share