Monday, October 15, 2012

দাস: সেকাল-একাল

সেকালের দাস। অনুভব করলেই চোখে-মুখে অন্ধকার দেখি। কিন্তু তখন দাস-ব্যবসাটাও ছিল অসম্ভব লাভজনক। সেকালে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন অনেক নামকরা ব্যক্তিত্বও। তখন দাস-দাসব্যবসাটাকে খুব একটা খারাপ চোখে দেখা হত না। দাস মানেই কেনা সম্পত্তি! যা খুশি তা করা যায় তার সঙ্গে।
ধর্মগ্রন্থেও এর ছাপ সুষ্পষ্ট! তৌরাত বলছে,
"...প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত, হাতের বদলে হাত, পায়ের বদলে পা, দাহের বদলে দাহ, ক্ষতের বদলে ক্ষত, কালশিরার বদলে কালশিরা।" (তৌরাত শরীফ: ২য় খন্ড: হিজরত, ২১, ২৪-২৫)

কী চমৎকার ন্যায়বিচার মানুষের জন্য! কিন্তু দাসের জন্য আমরা কি দেখতে পাই?
"...আর কেউ তার গোলাম বা বাঁদীর চোখে আঘাত করলে যদি তা নষ্ট হয় তবে তার চোখ নষ্ট হওয়ার জন্য সে তাকে মুক্ত করবে।" (তৌরাত শরীফ: ২য় খন্ড: হিজরত, ২১, ২৬)
যাও বাবা, মুক্ত করে দিলুম। এবার অন্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াও। এমনিতেও অন্ধ মানুষ দাস হিসাবে কীই-বা কাজে লাগবে। বরং একে খাওয়া-পরার জন্য একগাদা অর্থ ব্যয় হবে।


ইঞ্জিলে আমরা দেখতে পাই,
"...তিনি ঈসার বিষয়ে শুনিয়া ঈহুদীদের কয়েকজন বৃদ্ধ নেতাকে ঈসার নিকট অনুরোধ করিতে পাঠাইলেন, যেন তিনি আসিয়া তাঁহার গোলামকে সুস্থ করেন...।" (ইঞ্জিল শরীফ, ৩য় খন্ড: লুক, ৬: ৪৯, ৭: ৩-৪)

কোরান থেকে,
"...(তোমরা) তোমাদের ডান হাতের তাঁবের (অধিকারভুক্ত) দাসদাসীর সাথে সদ্ব্যবহার করবে...।" (৪ সুরা নিসা: ৩৬)
কোরানে দাসমুক্তির কথাও বলা আছে,
"পূর্ব ও পশ্চিমে তোমাদের মুখ ফেরানোতে পূণ্য নেই; কিন্তু পূণ্য আছে...দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করলে...। (২ সুরা বাকারা: ১৭৭)


আমার জানামতে, (সবিনয়ে বলি, আমার জানার পরিধি অতি ক্ষুদ্র) কোনো ধর্মগ্রন্থেই এমন কঠিন নির্দেশনা নেই যে আজ থেকে দাস, দাসব্যবসা নিষিদ্ধ করা হলো। ফ্রি-ড-ম...! আজ থেকে তোমরা সবাই ফ্রি।

তারপরও এই গ্রহে অনেকে লড়েছেন এই অতি কুৎসিত প্রথা রহিত করার জন্য। হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখেছিলেন অসাধারণ সেই ফিকশন, ' 'আঙ্কল টমস কেবিন'। টম, জিম, এলিজা, জর্জ...আমাদের চোখে এরা এখনও ভাসে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে। এই ছোটখাটো ভদ্রমহিলা সমস্ত বিশ্বে কী এক ঝড়ই না তুলেছিলেন!
তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়ে আব্রাহাম লিংকন চোখ কপালে তুলে বলেছিলেন, 'ওহো, আপনিই তাহলে সেই ছোট্ট মহিলা, যার লেখা বই পড়ে আমাদের গৃহযুদ্ধে আমরা অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম'!


আহ, আব্রাহাম লিংকন, আমাদের লিংকন! অতি সাধারণ কিন্তু অসাধারণ একটা মানুষ। একবার আব্রাহাম লিংকন নিজের জুতা পরিষ্কার করছিলেন। সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যে আসা জনৈক আগন্তুকের বিস্মিত প্রশ্ন, 'মি. প্রেসিডেন্ট, আপনি নিজ হাতে জুতা পরিষ্কার করছেন'!
আব্রাহাম লিংকন অবাক হয়ে বললেন, 'কেন, আপনার জুতা কি অন্য কেউ পরিষ্কার করে দেয়'!
এই কুৎসিত প্রথা রহিত করার জন্য যুগের-পর-যুগ এই গ্রহের মানুষ আব্রাহাম লিংকনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।


কিন্তু সত্যিই কি দাস-প্রথা এই গ্রহ থেকে নির্মূল হয়েছে? ভঙ্গিটা কেবল বদলেছে। যেমন আজকাল আমরা সুদকে সুদ বলে না, বলে লাভ, তেমনি...। বাড়ির কাজের লোকের নামে আমরা দাস-দাসিই তো রাখি। স্বীকার যাই না, এই যা।
আর আমাদের 'মগজদাস'! নিম্নবিত্তরা শরীর শানায়, আমরা শিক্ষিতেরা শানাই
মগজ। আমাদের অধিকাংশেরই পড়াশোনা কিসের জন্যে? কীসের আবার, দাস হওয়ার জন্য। ভাল দাস যেন হতে পারি, মাগো। দোয়া করো, মা।
আগে যেমন দাস হওয়ার জন্য শরীরচর্চা, রাগকে পানি করার বিভিন্ন কায়দা-কানুন শিক্ষা দেয়া হত, এখনকার শিক্ষা হচ্ছে, ক্যারিয়ার। 'সামালকে ক্যারিয়ার'।
ছোট্ট এই একটা শব্দেই মধ্যেই আধুনিক দাস হওয়ার সমস্ত কলা-কৌশল লুকানো। আমাদের সমস্ত জ্ঞান অর্জন, মনন সবই চকচকে দাস হওয়ার জন্য। আগেকার দাসেরা পাথরের চাকা টেনে বেড়াত এখন টানে রাবারের চাকা, এই পার্থক্য। সেটা বিএমডব্লিউর চাকা নাকি অডির এটা আলোচ্য বিষয় না।
ছবি ঋণ: কালের কন্ঠ
এই ছবির একটা বিশেষত্ব আছে। প্রবল আশা, আমি ভুল করছি না। ছবিটা বারবার দেখছি, ক্ষীণ আশা, ভুল করছি না তো! আমি ভুল না-করে থাকলে ছবির বিশেষ এই মানুষটাকে সবাই চেনেন। কারো চেনার সমস্যা হলে বক্স করা ছবিটা দেখে নিন। ইমদাদুল হক মিলন (আচ্ছা প্রথম আলো নাকি নামের বাহুল্য অংশ ছেটে ফেলে। এই ব্যাটারা কি 'মিলন' শব্দটাও ছেটে ফেলবে!), এই মানুষটা একজন আধুনিক দাস।
সোবহান মিয়ারা কত সহজেই না এই সব মানুষদের কিনে ফেলেন! এরপর যেমনটা চান, তেমনটা...। পত্রিকার একজন সম্পাদকের তাহলে এই কাজ! দখলকরা জমি বিক্রি হবে তিনি সেখানে তাঁর মালিকের সঙ্গে ফিতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন! আমাদের কাছে এই তথ্যও আছে পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তিনি ঝিম মেরে বসে থাকেন সামিয়ানা গোটাবার অপেক্ষায়।
মিলন কোন ছার, আমি নিশ্চিত, গোলাম আজমও 'মুড়ির ঘন্ট' নামে কোনো পত্রিকা [১] বের করলে ওখানেও চাকুরি করার জন্য সবাই ঝাপিয়ে পড়বে।

মিলন নামের এই মানুষটা চালু একটা পত্রিকার সম্পাদক অথচ নিজের সম্পাদিত পত্রিকায় লজ্জার মাথা খেয়ে নিজের ঢোল নিজেই পেটাতেন [২, ৩]।  তিনি অবশ্য এখনও ঢোল পেটান, কালের কন্ঠের শিলালিপিতে 'সাড়ে তিন হাত ভুমি' নামের কী যেন এক জিনিস নিয়মিত প্রসব করছেন। সামনে বইমেলা। ভূমিকর্ষণের কাজটা এখানে, এখনই সেরে ফেলা। আমি তাঁর এমন নির্লজ্জ প্রসববেদনার জন্য করুণা বোধ করি।

এখন, এই হচ্ছে আমাদের সাহিত্য আর এই হচ্ছেন আমাদের সাহিত্যিক মহোদয়গণ! কিন্তু আমি ছবির এই দৃশ্য দেখে বমি চাপার জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলি না। এমনটাই তো হওয়ার কথা, এর ব্যত্যয় হবে কেন?
এই দেশের মত বিচিত্র দেশ এই গ্রহে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ এই দেশের কোনো স্বপ্ন নেই আসলে দেশটা স্বপ্ন দেখার যোগ্য না, তাই একজন স্বপ্নবাজকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো দায় তার নাই। এই দেশে একজন মেথরও মেথরগিরি করে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন কিন্তু একজন লেখক পারবেন না।

তার উপর এই দেশের অধিকাংশ প্রকাশকেরাই একেকটা চোর, চলমান চোর! এরা অফিসে এসি লাগাবেন, গাড়ি হাঁকাবেন, হজে যাবেন কিন্তু লেখকের সম্মানির টাকা দেবেন না। বই নাকি বিক্রি হয় না তাহলে শ্লা, বই প্রকাশ করার প্রয়োজন কী! নিজেই বই লিখুন, নিজেই ছাপান, নিজেই পড়ুন তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়...। 

এই দেশে লেখক লেংটি পরে উবু হয়ে লিখে যাবেন। লেখা শেষ হলে উঠবেন, চাঁদের আলোয় আচ্ছা করে গোসল করে চাঁদের তেল গায়ে আচ্ছা করে মেখে, কপকপ করে চাঁদের আলো খেয়ে আবারও লিখতে বসবেন। তো, লেখকেরা সোবহান মিয়াদের পাশে এমন ল্যাংটা হয়ে পোজ দেবেন না তো কি পাঠকের বাড়ির গেইটের সামনে দেবেন?

অবশ্য এদিক দিয়ে আমাদের মিলন ভাইয়া ব্যতিক্রম। এই দেশে যে অল্প ক-জন মানুষ বই লিখে যথেষ্ঠ টাকা কামান মিলন তাঁদের অন্যতম। কিন্তু লোভের যে সীমাহীন লকলকে জিব। সোবহান মিয়াদের খপ্পরে পড়ার আগে তিনি 'ফিল্ডার' গাড়ি চালাতেন এখন কি চালান, কে জানে!
তবুও আজ মিলন নামের এই দাসমানুষটাকে দেখে মনটা অসম্ভব খারাপ হয়। আহ, মিলন নামের এই মানুষটাকে যদি মুক্ত দেখতে পেতাম। দাসমুক্তির জন্য অর্থব্যয় নাকি উত্তম।
অধম কাজেই যে আমার জীবনটা নষ্ট হলো এবার উত্তম কাজে অর্থ ব্যয় করলে মন্দ হয় না...।

সহায়ক সূত্র:
১. মুড়ির ঘন্ট...: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_16.html
২. ঢোলবাজ, এক: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_28.html
২. ঢোলবাজ, দুই.: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_29.html

No comments: