Friday, October 12, 2012

বিশ্বদলিল

­বইখাদক। অনেকের বই পড়ার নমুনা দেখে মনে মনে বেদনার সঙ্গে গভীর শ্বাস ফেলি। অং-বঙ-চং কত ঢঙের বইই না এঁরা পড়েন! কে একজন, একবার ছাপার অক্ষরে এই হাহাকারটা করেছিলেন। বিষয়টা এমন, কোনো-এক গ্রন্থাগারের হাজার-লাখ বইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, আহা, কত-কত বই, এখনও তো পড়াই হল না।

আমার নিজের পড়াশোনা কম। হাজার-লাখ কেন, কোটি-কোটি বইই পড়া হয়নি। আসলে ছাতার তেমন কোনো বইই পড়া হয়নি! আরে, আমি তো আর কচ্ছপ না যে শত-শত বছর আয়ু নিয়ে পানিতে গা ভাসিয়ে বই পড়তে থাকব, পড়তেই থাকব। 'কচ্ছপামি' আমার পিঠে দাঁড়িয়ে থাকে দাঁড়কাক!
কোথাও লিখেছিলাম, আমার পড়ার কোনো আগামাথা নাই- যেটা ভাল লাগে সেটাই পড়ি। তবে...ভিড়ভাট্টায় দাঁড়াতে না-পারলে যেমন কাতর হই না তেমনি অতি বিখ্যাত কোনো লেখকের লেখা পড়তে না-পারলেও অস্থিরতা বোধ করি না। মিলান কুন্ডেরার 'দ্য জোক' বইটা কয়েকবার বুক-ডন দিয়েও শেষ করতে পারিনি! পারিনি তো পারিনি, কী আর করা। আসলে ব্রেন নামের জিনিসটাই নাই আমার- কী আর করা, কপালের ফের! এদিকে নতুন করে ব্রেন গজাবে এই নমুনাও তো দেখছি না।
বাংলাদেশের স্বর্গ (!) নামে খ্যাত ঢাকার বাইরে থাকার সুবাদে ইচ্ছা থাকলেও অনেক বই যোগাড় করা হয়ে উঠে না। তারপরও কোনো কোনো বই পড়ার জন্য অন্য রকম আগ্রহ বোধ করি, ধরাধরি করি। একে-ওকে বলি। কেউ কেউ ভারী বিরক্তও হন। মনে মনে বলেন, ব্যাটা চালবাজ মাগনা বই হাতিয়ে নিচ্ছে।
কাউকে বলবেন না যেন, কানে কানে বলি, কথাটা মিথ্যা না।

সম্প্রতি একটা বইয়ের জন্য যে সুতীব্র আগ্রহ বোধ করছি। এ অভূতপূর্ব, আগে এমনটা আমার মধ্যে কখনও দেখা যায়নি। বইয়ের বিজ্ঞাপনটা পড়েই মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। আঞ্চলিক ভাষায় বলি, 'ব্রেন লইড়া গেছে'। আজ বুঝলুম, ব্রেন কেন উম্মুক্ত থাকে না। ভাগ্যিস, ব্রেন ম্যানহোলের ঢাকনার ন্যায় খোলা থাকে না নইলে এটা গড়াগড়ি খেত।
বইটা হচ্ছে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার একটা বই। 'পাহেলে রোশনি' ওরফে প্রথম আলোতে এই বইটির... আসলে বই বলাটা ঠিক হচ্ছে না; যথেষ্ঠ তমিজ, ইজ্জতের সঙ্গে বলা প্রয়োজন। কারণ বই লেখে আমাদের মত তিন টাকা দামের কলমবাজ। আসল লেখকেরা কি বই লেখেন? উঁহু, এঁরা বই লেখেন না, লেখেন গ্রন্থ। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী লেখেন? এই বইয়ের বিজ্ঞাপনের ভাষায়, 'কালোত্তীর্ণ এক অনবদ্য দলিল'।

এই দলিলের প্রকাশক হচ্ছেন, আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক। মহানুভব একজন প্রকাশক। অক্টোপাসের হৃদযন্ত্র নাকি থাকে তিনটা। শোনা কথা। না ভুল বললাম, শোনা কথা না, পড়েছি। তিনটা হৃদযন্ত্র এটা অবশ্য আমি গুণে দেখিনি। ইচ্ছা করে না এমন না, আসলে সুযোগ ছিল না কারণ কোনো অক্টোপাসের সঙ্গে আমার 'চিনপরিচয়' নাই। তবে আমার মতে, এই গ্রহে সবচেয়ে হৃদয়বান হচ্ছে অক্টোপাস, তিন তিনটা হৃদযন্ত্র! কিন্তু এই অক্টোপাসকেও ছাড়িয়ে গেছেন, আমাদের ওমর ফারুক। তাঁর হৃদযন্ত্র সম্ভবত অক্টোপাসের চেয়ে বেশিই হবে। কেন বলছি...।

প্রথম আলো ওরফে 'পাহেলে রোশনি, দ্য ঢোল'। দ্য ঢোল না-বললে অন্যায় হয়, কারণ...। (এরা পত্রিকা-হকারদের রেইনকোট দিচ্ছে, এই নিয়ে দু-মাস লাগিয়ে একের পর এক নিউজ করে যাচ্ছে। সঙ্গে ফ্রি দিচ্ছে পত্রিকাহকারদের সবাইকে রেইনকোট পরিয়ে ফটোসেশন। পাঠকের জন্য কি কিছুই নেই! পাঠকদের জন্য রশি ফ্রি, গলায় দেয়ার জন্য। এ এক বিচিত্র, এদের ঢোলটা ফাটে না কারণ ওটা সম্ভবত গন্ডারের চামড়া দিয়ে বানানো )
দেখো দিকি কান্ড, আমাদের মত অগাবগা মানুষদের প্রকাশক 'পাহেলে রোশনির' শেষ পৃষ্টা দূরের কথা 'আখেরি রোশনি' নামের কোনো পত্রিকাতেও বিজ্ঞাপন ছাপায় না। অথচ ওমর ফারুক নিজের তালুক বিক্রির টাকায় শত লাইনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।
ঈর্ষা-ঈর্ষা, আমার পেটভরা ঈর্ষা!

যাই হোক, 'রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দর্শন' দলিলটার প্রসঙ্গে আসি। আমরা বিজ্ঞাপন থেকে জানতে পারছি (প্রথম আলো, ১১.১০.২০১২):
"...নেলসন ম্যান্ডেলার উপর গ্রন্থ 'লিভিং উইথ ম্যান্ডেলা' যেমন নেলসন ম্যান্ডেলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আবার পিকাসোর উপর লেখা 'দ্য আর্ট অব পেইন্টিং', পিকাসোকে মহামান্বিত করেছে অনন্তকালের জন্য, ঠিক তেমনি একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দর্শন..."

অবজেকশন। 'অবজেকশন ওভার রুল' হওয়ার আগেই আগেভাগে বলে ফেলি। আমি কেবল মনেই করি না দৃঢ় বিশ্বাস করি, নেলসন ম্যান্ডেলার উদাহরণটা এখানে নিয়ে আসাটা সঠিকই হয়েছে। অবশ্যই সঠিক হয়েছে কারণ ম্যান্ডেলা কি করেছেন? জানি-জানি আপনারা হইহহই করে বলবেন, জেল খেটেছেন! দূর-দূর, জে-এ-ল খেটেছেন! আমাদের দেশে তো আকসার লোকজনেরা জেল খাটেন। আবার জেল থেকে ফুলের মালা গলায় দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়েও আসেন। কেবল বেরিয়েই আসেস না বিজয়ের 'ভি' চিহ্নও দেখান।
আর পাবলো পিকাসো? তিনি কী করেছেন, শুনি? ওরে! আরে বাবা বুঝলাম তো, 'দ্য ব্লু  রুম', 'ওল্ড গিটারিস্ট', 'টু নুডস', 'গোয়ার্নিকা' নামের অসংখ্য বই (!) লিখেছেন। তাও ক্যানভাসে। ছ্যা-ছ্যা!


আমরা আরও জানতে পারছি, "...এই দর্শনের সংগে আছে, শেখ রেহানা, কলামিষ্ট গাফফার চৌধুরী, প্রয়াত কবীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, বেবী মওদুদ এম পি, উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কবি মহাদেব সাহা, অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জামান, ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদ, কবি ড. মুহম্মদ সামাদের লেখা..."
যাদের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের লেখা তো আমরা হরহামেশাই পড়ি। এদের লেখা আর পড়ব কী!


সুদীর্ঘ এক বছর ধরে গবেষক দল গবেষণা করেন (এই গবেষণার টাকা কে যুগিয়েছেন কে জানে! এমনও হতে পারে এঁরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন।)
তো, গ্রন্থটির প্রকাশক ওমর ফারুক বলছেন, "...আমার নেতৃত্বে এই গবেষক দলে ছিলেন, মির্জা আজম এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত, তথ্যকমিশনার ড. সাদেকা হালিম, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ সৈয়দ বোরহান কবীর...। গবেষক দলটি দীর্ঘ প্রায় এক বছর দলে শেখ হাসিনার রাজনীতির উপর গবেষণা করে। এই গবেষণার ফলাফল ছিল ঐতিহাসিক, তাৎপর্যপূর্ণ এবং অসাধারণ...। (এই) গ্রন্থ প্রকাশের কারণে এই দর্শনটি এখন বিশ্বদলিল"

হায়রে বিশ্বদলিল!
আমি ক্ষুব্ধ! আমি ব্যথিত! এই বিশ্বদলিলখানা বের করতে 'দিরং' হলো কেন? এটা আগেভাগে বের করলে কি হত? একে একে সবাই নোবেল বগলদাবা করে হাঁটা ধরছে আর আমরা বিশ্বদলিল মাথায় দিয়ে ঘুমাচ্ছি! হায় ঘুম! আমার ধারণা, এটা বিরোধিদলের একটা চাল। খালেদা জিয়া যেহেতু এখন চীন দেশে আছেন, এতে চীনাদের হাত থাকা বিচিত্র কিছু না। কালো হাত ভেঙে দাও, দিতে হবে, দিয়ে দাও।
নাকি নোবেলের প্রতি আমাদের আগ্রহই নাই?
ওয়াল্লা, তাহলে কী আশরাফ সাহেবের কথাটাই সত্য? চিজ-স্যান্ডিউইচ এবং ওয়াইন খেয়ে সবাই 'হুদাহুদির নোবেল' বাগিয়ে নিচ্ছে! বাদামের খোসার সঙ্গে যেটার আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নাই!

আজকাল হাবিজাবি চিন্তা মাথায় কেমন ঘুরপাক খায়। কেবলই মনে হয়, কিছুই করছি না অথচ মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়। শরীরভরা ঘুম!
কোনো এক রাশিয়ান লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিল অন্য ধর্মের এক গ্রন্থ। তাঁর কোটের পকেটে নাকি এটা পাওয়া গিয়েছিল।
দুম করে আমি যদি মরেই যাই, অখ্যাত বলে কি আমাকে নিয়ে কেউই এলিজি লিখবে না? আমি মাছকে নিয়ে পর্যন্ত এলিজি লিখেছি [১] আর আমাকে নিয়ে লেখার জন্য এই গ্রহের সাতশো কোটি মানুষের মধ্যে কী একজনকেও পাওয়া যাবে না! আরে বাহে, আমি যে একটা জলজ্যান্ত, নাহ, ভুল বললাম 'জলমৃত' (তখন) একটা মানুষ, মাছ না যে আমাকে নিয়ে লিখতে তীব্র অনিচ্ছা...!
এ অন্যায়-এ অন্যায়। কেউ এলিজি না-লিখলে তাহলে তো এটা কারো জানাই হবে না যে আমার বুকে উপুড় করা সেই বইটার কথা। কোন বইটা? বাপু রে, সেই বইটা...। আহা, যে বইটা পড়তে পড়তে অন্য ভুবনে যাত্রা করেছিলুম।

কী মুশকিল, বুদ্ধিমান পাঠকের জন্য কী বইটার নামও বলে দিতে হবে...!

সহায়ক সূত্র:
১. মাছের জন্য এলিজি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_6002.html

No comments: