Friday, February 3, 2012

হাসপাতাল পর্ব, তেরো: মানবিকতা

আমি আগের এক লেখায় লিখেছিলাম, পেপার বিছানার কথা [১]। রাতে পেপার বিছিয়ে আরামে ঘুমিয়ে পড়তাম। প্রথম দিনই একটা ভজকট হয়ে গেল। সেলফোনে সকাল সাতটায় এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সম্ভবত সাড়ে ছটা পৌনে সাতটা হবে, ঘুমের মধ্যে শুনছিলাম কে যেন বাঁজখাই গলায় চেঁচাচ্ছে, এই-এই, এইডা কেডারে, কেডা? ওই, ওই-ই ওইত...।
আমি চোখের সিকিভাগ খুলে ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। এরইমধ্যে একজন আমার কপালে ধাক্কা মেরে বলছে, উঠেন-উঠেন।

আমি উঠে বসে
ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। ঘটনাটা বোঝা গেল। ঝাড়ুদার এসেছে। অল্পবয়সের এক ছেলে। মেঝে পরিষ্কার করবে। আমার মত একজন পোকামানব এর কাজে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এই ছেলেটাই হইচই করছিল, এই ছেলেটাই আমার কপালে সজোরে ধাক্কা মেরেছে! আমি হতভম্ব হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। অদম্য রাগ চেপে তাকে কেবল এটুকুই বলেছিলাম, কেউ কি ঘুমের মানুষকে এভাবে জাগায়!
ছেলেটা উল্টো তর্ক জুড়ে দিল। আমি এর সঙ্গে কথা বাড়ালাম না। কেউ যদি আজ আমাকে বলে, কি মিয়া, ডরাইছিলা? তাঁদের সঙ্গেও তর্ক না-করে ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলব, হ, ব্রো, ডরাইছিলাম।
আসলে আমার যেটা মনে হয়েছিল, এ সত্য এটা ঘুমাবার জায়গা না, আমি নিজেই নিয়ম ভঙ্গ করেছি। তাছাড়া একে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ গুছাতে হবে। এই পর্যন্ত সমস্যা নাই। সমস্যাটা যেটা সেটা হচ্ছে এর ভঙ্গি। আমরা অনেক 'নেকাপড়া' জানা মানুষরাই ভঙ্গি শিখিনি আর প্রায় অশিক্ষিত এই ঝাড়ুদারকে খুব একটা দোষ দেই কেমন করে?

আগেও উল্লেখ করেছিলাম, এই হাসপাতালের প্রত্যেক তলার মাঝখানে প্রচুর জায়গা ফাঁকা থাকে। যেখানে রোগির সঙ্গে আসা লোকজনেরা নিশিযাপন করে। এমন না এখানে না-ঘুমালে আমার চলত না। ঢাকায় আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব বা নিদেনপক্ষে হোটেল নেই এমন না কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না রাতে মার কোনো সমস্যা হলে, জরুরি প্রয়োজন হলে আমার সুখনিদ্রার কারণে কোনো অঘটন ঘটে যাক। একরাতে তো পেথিডিন ইঞ্জেকশনের জন্য রাত দেড়টা-দুইটায় ওষুধের দোকান খুঁজে বের করার জন্য চরকির মত পাক খাচ্ছিলাম।

আমার মা যে তলায় থাকতেন ওটা খানিকটা ব্যতিক্রম কারণ ওখানে মাঝখানটার ফাঁকা জায়গার অনেকটা জায়গা দড়ি দিয়ে ঘিরে নামাজের জায়গা করা হয়েছিল। যারা যারা নামাজ পড়েন তাঁরা এখানে ওয়াক্তের নামাজ সেরে ফেলেন। এখানে নিয়ম করে, সময় ধরে আজানও দেয়া হয়। আমি মনে করি, বুদ্ধিটা মন্দের ভাল। যারা ওয়াক্তের নামাজ ঘড়ি ধরে পড়েন তাঁদেরকে মসজিদের জন্য বাইরে ছুটাছুটি করতে হলো না। অবশ্য অজু করার জায়গা কোথায় এটা আমাকে জিগেস করবেন না এর সদুত্তর দিতে পারবেন এই হাসপাতালের মহাপরিচালক [২]

আমার ঘুমাবার জায়গা ছিল এক কোনে কিন্তু অনেকেই রাতে নামাজ পড়ার জন্য ঘিরে রাখা এই চত্বরেই ঘুমাতেন। অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক মানুষ। একদিন দেখি সাদা দাড়িওয়ালা একজন মানুষ নামাজ পড়ার ওই জায়গাটা পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, তিনি জায়গাটার পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। পরে বিষয়টা জানা গেল তিনি এই জায়গাটা ইচ্ছা করে ভিজিয়ে দিচ্ছেন যেন কেউ রাতে এখানে ঘুমাতে না পারে।

এখানে রাতে ঘুমান এমন কয়েকজন বয়স্ক মানুষকে দেখলাম এঁরা নিচুস্বরে গজগজ করছেন। কিন্তু স্বরটা এমন যেন যে মানুষটা এই অপকর্ম করছে তিনি যেন শুনতে না পান। আমি সাদা দাড়িওয়ালা ওই মানুষটাকে শান্ত গলায় বললাম, চাচা, এইটা কি করছেন? লোকজনেরা এখানে ঘুমালে সমস্যা কি!
তিনি তীব্র স্বরে বললেন, এইটা মসজিদ। ঘুমানের জায়গা না।
মানুষটার গলার তীব্রতায় আমার মেজাজ খারাপ হয়। আমি রাগ চেপে বলি, তাই বলে আপনি মানুষের ঘুমের সমস্যা করবেন?
মানুষটা গলার তীব্রতা আরেক ধাপ উঁচুতে, এইটা মসজিদ। মসজিদে ঘুমাইব ক্যান!
আমি এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, এই-ই আমার নিয়তি! ড্রেন রাস্তার মাঝখানে চলে আসবে। কি আর করা নিয়তি বলে কথা! হায়...। কপাল!

আমি এবার শুরু করলাম, ঘুম জিনিসটা কি আপনের কাছে পোলাপাইনের খেলা মনে হয়, হ্যা? আপনে তো দেখি বহুত বড়ো আল্লাওয়ালা হইছেন। আপনে কি এইটা জানেন, কোনো মানুষ ঘুমায়া থাকলে জোরে কোরান পড়ার জন্য নিষেধ করা হইছে। কন, জানেন? আর আপনে মসজিদ-মসজিদ করতাছেন ক্যান! এইটা তো মসজিদ না, নামাজ পড়ার একটা জায়গা করা হইছে। মসজিদ-মসজিদ করেন, মিয়া, ফিমেল ওয়ার্ডের সামনে মসজিদ বানাইছেন আবার লম্বা-লম্বা কথা কন!

বিচিত্র কারণে আশেপাশের লোকজনেরাও, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরাও দেখি আমার সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন। ওই সাদা দাড়িওয়ালা মানুষটার গলার তাপ খানিকটা কমে এসেছে। তিনি এবার বললেন, আপনে বুঝেন না ক্যান, রাতে ঘুমাইলে কাপড় ঠিক থাকে না। হেরা জায়গাটা নাকাপ কইরা ফেলে।
আমার মেজাজ আরও খারাপ হয়, আচ্ছা, কাপড় ঠিক থাকে না। এইটা কি আপনে রাইতে আইসা দেইখা গেছিলেন? আর তবলীগের লোকজনেরা গাট্টি নিয়া মসজিদে মসজিদে ঘুইরা বেড়ায় হেরা রাতে কই ঘুমায়, হোটেলে না মসজিদে! মসজিদে ঘুমায় না? ওইখানে গিয়া বাধা দেন না ক্যান?

ক্ষেপেছে, এইবার জনতা ক্ষেপেছে। ওই মানুষটা আস্তে করে কেটে পড়েন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওই মানুষটা ওয়ার্ডে খাবার ভাগ করে দেয়ার দায়িত্বে আছেন। খুব দাপুটে একজন মানুষ, কেউ সহজে ঘাঁটায় না! আমি খানিকটা ভয়ে ভয়েও ছিলাম। এ না আবার লোকজন নিয়ে এসে আরেক ঝামেলা বাঁধায়, তাহলে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে।
তবে পরের দিন দেখেছিলাম লোকজনেরা মসজিদ নামের জায়গাটার ভেতরেই ঘুমাবার আয়োজন করছে। আমি কেবল বলেছিলাম, দেখেন, আজকে না আবার পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়? জনতা দেখি মহা ক্ষেপে আছে। প্রত্যেকের গলা দৃঢ, জড়তাহীন, আজ, ...ভাই আসুক। ডাইরেক্ট মাইর।
­
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি, মানুষটা আজ আবারও না-এসে পড়েন। মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে একটা। আমি বিড়বিড় করি, হে ড্রেন, আর রাস্তার মাঝখানে এসো না, বাবা।

প্রথম তিন-চার দিন ভালই কেটেছিল। হাসপাতাল কেমন ফাঁকা-ফাঁকা। ঈদের ছুটি চলছিল বলে আমরা বুঝতে পারিনি। ওয়ার্ডের বাইরে ভাঙ্গা বেঞ্চিতে বসে আমরা ভাই-বোন মিলে হোটেল থেকে নিয়ে আসা খাবার খাই। যথারীতি সকালের নাস্তা নিয়ে বসেছি। ওয়াল্লা, নটা বেজেছে মাত্র, মনে হচ্ছিল ইশকুল খুইলাছে রে মাওলা-ইশকুল খুইলাছে। শীতের পাখীরা যেমন ঝাঁকে ঝাঁকে আসে তেমনি দল বেঁধে এপ্রোণ চাপিয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা আসা শুরু করল।
একেকটা ওয়ার্ডে এরা ঢোকে দল বেঁধে, একের পর এক দল। এই পর্ব চলছিলই। ওয়ার্ডের ভেতর হিহি-হাহা-হোহো। রোগি তীব্র ব্যথায় অস্থির হয়ে আছে, দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সামলাবার চেষ্টা, তাতে এদের কী! কী হাসি, কী তামাশা একেকজনের! একজন অন্যজনের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। এদের অনেকের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল এরা পিকনিকে এসেছে।
রাখাল যেমন মাঠে পালে পালে গরু ছেড়ে দেয় তেমনি আমার মনে হচ্ছিল এদের শিক্ষকরাও অবিকল রাখালের কাজটাই করেছেন- একদঙ্গল পঙ্গপাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবুও যাহোক রাখালের দায়িত্ববোধ অনেকখানি প্রবল, গরু কারো কলাটা-মুলোটা না খেয়ে ফেলে, কারো ক্ষেতের অনিষ্ট না-করে ফেলে এই দিকে তাঁর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ! কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের তাঁদের দায়িত্বে পালনের তিলমাত্র নমুনা ছিল না, যে এরা রোগিদের কাছে গিয়ে কি করছে? আমার কাছে মনে হচ্ছিল, এদের কাছে রোগিরা স্রেফ গিনিপিগ।
আহ জুতো! এদের জুতো নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই কারণ আগের এক লেখায় লিখেছিলাম, ডাক্তারদের জুতোর তলায় মাখন থাকে। সেই মাখনে ইনফেকশন ছড়াবার কোনো ভয় নাই।

অনেকে আমাকে বলবেন, রে পাপিষ্ট, এটা তো কেবল হাসপাতালই না, মেডিকেল কলেজও; তাই বলে কি এই অবোধ পোলাপানগুলো হাতেকলমে শিখবে না? অবশ্যই শিখবে, শিখবে না কেন! ব্যতিক্রম যে ছিল না এমন না, ওটা না-বললে যে অন্যায় করা হয়। 
যে সার্জন আমার মার অপারেশন করেছিলেন তিনি এসেছিলেন। তার সঙ্গে সার্জারীর ছাত্ররা। গোল হয়ে এরা সবাই আমার মার বিছানা ঘিরে রেখেছে। আমরা দূর থেকে বুঝতে পারছিলাম, তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে একাগ্রচিত্তে তাঁর অপারেশনের খুঁটিনাটি দিকগুলো বলছিলেন। কোথায় কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, কোথায় ড্রেনেজ না-করে উপায় ছিল না, ইত্যাদি। একবার কেবল দেখলাম মানুষটা রেগে শিক্ষার্থীদের কাউকে কিছু একটা বলছেন। দূর থেকে আমি শুনতে পাইনি।
পরে আমার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ডাক্তার রেগে গেল কেন? তিনি বললেন, একজন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তখন ডাক্তার ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন, এই ছেলে, তুমি কি দেখো? এখানে এসেছো কি খেলা করতে! একটা থাপ্পড় দিয়ে নীচে ফেলে দিব। তখন ভাল করে দেখতে পারবে।
ডা. রাজন নামের মানুষটার কর্মকান্ড আমাকে মুগ্ধ করেছিল এটা বলার অবকাশ রাখে না।

কিন্তু...। কিন্তু এই ডাক্তার রাজনদের সংখ্যা খুব অল্প।
অল্পশিক্ষিত একজন ঝাড়ুদার, বয়স্ক ওই ওয়ার্ড বয় টাইপের মানুষটাকে দোষ দেই কোন মুখে! যেখানে এই শিক্ষিত মেডিকেল ছাত্রদের ততোধিক শিক্ষিত এদের শিক্ষকদের এই বোধটুকুই নাই যে এরা শেখাবার নাম করে এখানকার রোগিদের উপর কী অন্যায়ই না করছেন! এরা কী শেখাচ্ছেন তাঁদের ছাত্রদের? এদের নিজেদেরই যে শেখা শেষ হয়নি। মানবিকতা শেখার ইশকুলে ভর্তি হওয়া আবশ্যক...।

 *হাসপাতাল পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk 

সহায়ক সূত্র:
১. পেপার বিছানা: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_28.html
২. হাসপাতাল মহাপরিচালক...: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_26.html

2 comments:

নুহান said...

আপনার লেখা নিযে নতুন করে বলার কিছু নেই awesome কিন্তু পরের ছবিটা এই পোস্টে দেয়ার অর্থ বুঝলাম না?!?

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

পরের ছবিতে যে হাড়গোড়গুলো দেখা যাচ্ছে তা একজন মানবসন্তানের। এই অধ্যাপক নামের অপদার্থদের এই জ্ঞানটুকুই নাই যে একজন মৃতদেহের প্রতি এমন অসম্মান করা যায় না।
মৃতদেহের প্রতি অসম্মানে মৃতদেহের কিছুই যায় আসে কি না এটা আমি জানি না তবে এটা বিলক্ষণ জানি, জীবিত মানুষগুলো নগ্ন হয়ে পড়ে।

বেচারা, বয়স্ক এই মানুষগুলোকে নগ্ন দেখতে ভাল লাগছে না @নুহান