Sunday, March 13, 2011

অপেক্ষা...

আবুল কাশেম নামের এই মানুষটা গাড়িতে বুট-বাদাম ফেরি করেন। তাঁর স্ত্রী এবং এক সন্তান মৃত্যু হয়েছে থ্যালেসেমিয়া নামের দুরারোগ্য অসুখে। তাঁর মেয়েটিও একই রোগে ভুগছে। ওকে দেড় মাস অন্তর রক্ত দিতে হয়। প্রতিবার খরচ পড়ে প্রায় দু হাজার টাকা। এই মানুষটা সামান্য একটা ব্যবসা করে কেমন করে এই খরচটা চালান এটা এখনও আমার বোধগম্য হয় না!

এই ছবিতে কাশেম ভাইয়ের সঙ্গে যে ছেলেটির ছবি দেখা যাচ্ছে এর নাম শুভ। এ হচ্ছে সবার ছোট।

শুভকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসার পর জানা গেল, এও থ্যালেসেমিয়ায় আক্রান্ত! এখনও একে রক্ত দেয়া শুরু হয়নি কিন্তু অচিরেই এর প্রয়োজন পড়বে।
কাশেম ভাইয়ের মেয়েটির একটা অপারেশন প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু এটাও সত্য অপারেশন করলেও তাঁর মেয়েটিকে বাঁচানো যাবে না- রক্ত দেয়ার সময়টা খানিক বাড়বে এবং খানিকটা ভাল থাকবে। কিন্তু তাকে বাঁচানো যাবে না।

আমার মাথা খানিক এলোমেলো ছিল বলেই সম্ভবত ভুলটা করে বসি। সন্তানের জন্য এই বাবা নামের অসহায়-দরিদ্র মানুষটার লড়াই দেখে দুম করে বলে বসি, আপনার সন্তানের অপারেশন করতে হলে ব্যবস্থা হবে। আপনি এটা কখনও ভাববেন না বাবা হিসাবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বলার পরই আমি বাস্তবতার মুখোমুখি হই, এই অপারেশন করতে অন্তত বিশ হাজার টাকা লাগবে। এই টাকার তো কোন ব্যবস্থা নাই।

আমি জানি না কেমন কেমন করে ভাগ্যের মমতার হাত আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখে। অন্যের জন্য কিছু চেয়ে পাইনি এমনটা আমার মনে পড়ে না! আমার এই সব বোকামির কোনো-না-কোনো উপায় ঠিক-ঠিক বের হয়, আমিও কথা না-রাখার লজ্জার হাত থেকে বেঁচে যাই। এবারও তাই হলো! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আখাউড়া হাসপাতালের সদাশয় একজন ডাক্তার এগিয়ে আসেন। তিনি নিজ দায়িত্বে, তাঁর সিনিয়রদের অনুরোধ করে কুমিল্লায় এই অপারেশন করার সমস্ত ব্যবস্থা করে দেন।
এখন কেবল কাশেম ভাইয়ের সম্মতির জন্য অপেক্ষা। 

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা, এরচেয়ে কঠিন আর কোন কাজ এই গ্রহে আছে বলে আমার জানা নাই, তাও নিজ সন্তানের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা! প্রিয় মানুষের শব [১] নিয়ে অপেক্ষার রাত কতটা দীর্ঘ হয় এটা আমি জানি। কিন্তু নিজ সন্তানের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা কেমন করে করতে হয় এটা আমি জানি না, জানতেও চাইব না। কেবল চাইব তার পূর্বেই যেন আমার মৃত্যু হয়।
কী ঝলসানো, তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি! মানুষটাকে অন্ধকারে রাখাটা আমার কাছে সমীচীন মনে হয়নি। কাশেম ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে আমাকে এটাও বলতে হয়, অপারেশন করেও তাঁর সন্তানকে বাঁচানো যাবে না। মানুষটা কিছুই বললেন না, কিচ্ছু না! বললে ভাল হতো।
এরপর থেকে আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়, ইচ্ছামৃত্যুর অধিকার থাকা উচিত, আইনের কাছ থেকে এবং ঈশ্বরের কাছ থেকেও...।

সহায়ক সূত্র:
১. শব নিয়ে অপেক্ষা...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_21.html