Sunday, February 6, 2011

কে অপরাধী, মিডিয়া নাকি প্রশাসন?

ছবি ঋণ: প্রথম আলো
হেনার মৃত্যু সংবাদে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে নিয়ে খুব গলাবাজি করেছিলাম [১] কিন্তু সবটাই কি মিডিয়ার দোষ? বিবিসি এবং এএফপি যেটা করেছে এখানে এদের খামখেয়ালি সুস্পষ্ট এবং ফাজলামিও। এমনিতে অন্য একটা সূত্র থেকে এদের তথ্যের বিভ্রান্তি নিয়ে মেইল করার পরও রা নেই! এদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরও এই নিয়ে গা করেনি!

এই মিডিয়ারা বারবার যে প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃতি দিচ্ছে তিনি হচ্ছেন ওখানকার এসপি। এএফপি এসপির বক্তব্য আমাদেরকে জানাচ্ছে, "Fifteen-year-old Hena Begum died in hospital on Monday after a village court in the southern Bangladesh district of Shariatpur sentenced her to 100 lashes, said local police chief A.K.M Shahidur Rahman.
...and three villagers including the wife of the man who Hena Begum had an illicit relationship with," Mr Rahman told AFP.
According to Mr Rahman, the teenage girl was "beaten mercilessly" by the family of the married man, who was also Hena's cousin, after the affair was discovered."  

এসপি প্রসঙ্গান্তরে বলছেন অ্যাফেয়ার-পরকীয়া। যে কেউ এই কথাটার সরল অর্থ করবে, হেনার সঙ্গে ধর্ষক মাহাবুবের অবৈধ-অন্যায় সম্পর্ক ছিল। ভাল-ভাল! থাকলে আর কী করা! পুলিশ বলে কথা তাও পুলিশ সুপার! পুলিশ সুপার এহেন বক্তব্য দিলে এবং মিডিয়া এটার উপর রিপোর্ট করলে মিডিয়াকে খুব একটা দোষ দেয়াটা অন্যায় হয় বৈকি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো এবং পাশাপাশি আমাদের দেশের অনেক মিডিয়াও এই এসপির বক্তব্য ছাপিয়েছে, মনের মাধুরী মিশিয়ে রিপোর্ট করেছে। তার উপর আবর্জনা সব তথ্য, কোনটায় হেনা মারা গেছে ছয় দিন পর, কোনটায় ৭ দিন পর। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যেদিন হেনাকে দোররা মারা হয় সে সেদিনই মারা যায়। তথ্যের কী দৈন্যতা!

হেনার এই সংবাদটা বিভিন্ন মিডিয়া যে কত রকম করে ছাপিয়েছে এটা দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায়! হলুদ সাংবাদিকতা আর কাকে বলে! এবং অধিকাংশ সংবাদই প্রায় হুবহু, কপি-পেস্টের কারণে একজন যে ভুলটা করেছে অন্যরা একই ভুল করেছে। আবার কেউ কেউ একগাদা টাকা দিয়ে এজেন্সি থেকে তথ্য কিনে একই ভুলের ফাঁদে পা দিয়েছে।

আজ ভাগ্যক্রমে শরীয়তপুরে একজনকে পেয়ে যাই যিনি খুব কাছ থেকে এই বিষয়ে কাজ করছেন। জটিলতা এড়াবার জন্য বিশদ পরিচয়ে যাই না। তাঁকে আমি অনুরোধ করেছিলাম, আপনাদের ওখানকার এসপি কীসব বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন, হেনার ওই ধর্ষকের সঙ্গে নাকি অন্য রকম সম্পর্ক ছিল। আপনি একটা কাজ করেন, হেনার যে ধর্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এই বিষয়ে এসপিকে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরটা আমাকে একটু জানান।
ওই মানুষটা অবিচল গলায় বলেন, "কেন, এসপির বক্তব্য নেব কেন? এসপি এই বিষয়ে কী জানেন? তিনি কী ওই গ্রামে থাকেন! তিনি কী হেনাদের প্রতিবেশী"?
আমি খানিকটা চিন্তায় পড়ে যাই, তাই তো? এসপি তো এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দূরের কথা ধারেকাছেও ছিলেন না, তাহলে? তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এটা কারও মুখে শুনেছেন। এরপর থেকে মিডিয়ার কাছে মুখ হাঁ করলে অনবরত এই কথাটাই ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বলে বেড়াচ্ছেন! যাক, এই বিষয় থাকুক। কেউ বললে তো আর মুখ চেপে ধরা যাবে না।

কিন্তু একজন দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তা এটা বলেন কেমন করে? কাউকে খুনি বলে রায় দেয়া [২] কী আদালতের কাজ নাকি আমাদের? তাঁর তো এই বিষয়ে বলার কথা না। তিনি কথা বলবেন আসামী ধরা নিয়ে, ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে, কোথাও প্রচলিত আইন ভাঙ্গা হচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে। যারা হেনার অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা বলছেন তারা কী করে এটা বিস্মৃত হলেন হেনার গালে কামড়ের দাগ ছিল [৪]। যে স্বইচ্ছায় দেহদান করবে তাঁর শরীরে কামড়ের দাগ থাকবে কেন আর সে চীৎকার করে সবাইকে জানাবেই বা কেন?

আমি আগের লেখায়ও লিখেছিলাম (Sailent features of the children act of 1974, Section 2 (F)-এ বলা হচ্ছে, "A child means a person under 16 years of age...")আমাদের দেশের আইনে হেনা শিশু। হেনার সম্মতি থাকলেও তাঁর সঙ্গে দৈহিক মিলন করা আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণ। এটা সত্য ধর্ষণ এবং তাঁকে হত্যা করাটা বদলে যাচ্ছে না কিন্তু এই গ্রহে রটে গেছে হেনা একজন স্বৈরিণী-ব্যাভিচারিণী। এই মেয়েটির ১৪ বছরের স্বোপার্জিত অর্জন এক নিমিষে ফুৎকারে উড়ে গেছে! আন্তর্জাতিক অন্য মিডিয়া কী ফলাও করেই না তা আমাদেরকে জানাচ্ছে। ডেইলি মেইলের শিরোনাম: "Whipped to death for having 'affair' with married man: Horrific fate of girl, 14, lashed 70 times after alleged rape by cousin" [৩]
অনুমান করি, এই পরকীয়া সংক্রান্ত বিষয়টার উৎস একই সংবাদ সংস্থা!

আমাদের পত্রিকার পন্ডিত সম্পাদক মহোদয়গণ জানেন কিনা জানি না, প্রায়শ যা হয়, ঢাকার বাইরে কোন ঘটনা ঘটলে ওখানকার অধিকাংশ পত্রিকার সাংবাদিক মহোদয়গণ নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বসে বসেই নিউজ পাঠান, কষ্ট করে পশ্চাদদেশ উত্তোলন করে আর ঘটনাস্থলে যান না! কোনও একজন ঘটনাস্থলে যান এবং তার তথ্যগুলোই খানিকটা এদিক-সেদিক করে অন্য সাংবাদিকরা নিজ নিজ পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেন। কারণ হচ্ছে অধিকাংশ পত্রিকাই মফস্বল সংবাদদাতাদের যথেষ্ঠ টাকা দেন না, প্রায় সাংবাদিক মহোদয়েরই সাইড বিজনেস আছে। দেখা গেল যিনি একটি চালু দৈনিকের সংবাদদাতা, যে খবরটা তার পত্রিকায় পাঠাচ্ছেন তিনিই খানিকটা বদলে বিডিনিউজে পাঠাচ্ছেন! ফল যা হওয়ার তাই হয়!

যাই হোক, কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার কথা জানতাম কিন্তু বাস্তবে এখন দেখলাম, কেন্নো খুড়তে গিয়ে তেলাপোকা বেরিয়ে এসেছে! ধর্ষকের পরিবার চেষ্টা করেছিল সাত লাখ টাকা হেনার পরিবারকে দিয়ে মিটমাট করার জন্য কিন্তু হেনার বাবা রাজি হননি। তিনি যদি রাজি হতেন তাহলে এখান থেকে বিশেষ একটি সংস্থার ২ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ হেনার পরিবার পেত ৫ লাখ আর ওই সংস্থা ২ লাখ!
আরও আছে! একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক ঘটনাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করে দেবেন এই শর্তে ধর্ষকের পরিবারের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা আগাম নিয়েছেন, বাকী টাকা কাজ উদ্ধার হওয়ার পর। গা শিউরানো সব ঘটনা!

মানুষ হিসাবে নিজেকে দাবী করতে আজ আমার বড়ো সংকোচ। কাপড় পরেও আজ নিজেকে সভ্য বলতেও কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকে। কোন একটা লেখায় আমি লিখেছিলাম ভাল দাম পেলে আমরা মাকেও বেচে দেব, তাঁর কিডনি-ফুসফুস-লিভার; কেবল দামটা ভাল হওয়া চাই। হেনা নামের মেয়েটির প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে এটা নিয়ে হেনার এখন আর কিছু যায় আসে না। সে মৃত কিন্তু আমরা জীবিত এই যা পার্থক্য!
আমি কেবল অপেক্ষায় আছি যারা এই অভাগা মানুষটার প্রতি যে অন্যায়টা করা হচ্ছে ঠিক এমন একটা ঘটনা এদের কোন প্রিয় মানুষের সঙ্গেও ঘটুক। কসম আমার লেখালেখির, তখন এরা কেমন করে কাঁদে এটা দেখার আমার বড়ো আগ্রহ; আমাদের মত হাউমাউ করে নাকি পশ্চিমাদের মত দাঁতে দাঁত চেপে?
চারদিকে সব শক্তিশালী বুদ্ধিমান মানুষেরা যারা একবার তাঁকে খুন করেছে, এখন মৃত হেনাকে দ্বিতীয়বার খুন করছে! কেবল এদের বুদ্ধির খেলা দেখব, একের পর এক
কিন্তু আমরা কতিপয় নির্বোধ অশক্ত হাতে হেনার প্রাণহীন হাত ধরে অনবরত বকেই যাব, হেনা, তুমি ঘুমাও, আমরা জেগে আছি...।

সহায়ক সূত্র:
১. হলুদ সাংবাদিকতা: http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_6336.html

২. খুনি এবং আদালত: http://www.ali-mahmed.com/2011/01/blog-post_24.html
৩. dailymail.co.uk: http://tinyurl.com/6ldaxh5
৪. বিডিনিউজ: http://tinyurl.com/5v9fq8a 

*আজ নিজের জাগতিক বেদনায় মনটা ভারী বিষণ্ণ। সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে একজন ফোন করেন, হেনার ধর্ষক গ্রেফতার হয়েছে এবং পুনরায় করা হেনার পোস্টমর্টেমে হেনার পক্ষে আলামত পাওয়া গেছে।
নিমিষেই আমার জাগতিক বেদনা মিলিয়ে যায়। কেবল মনে হয়, মেয়েটা আজ খানিকটা শান্তিতে ঘুমাবে...।
ডয়চে ভেলের সংবাদ: http://tinyurl.com/5whtk2v