Saturday, January 29, 2011

মেহেরজান এবং কতিপয় বিলিয়ে দেয়া জান!

একটা ছবি বানাবার কিছু কলা-কৌশল থাকে যা সবার করায়ত্ত থাকে না। সবাই তো আর সমান বুদ্ধি নিয়ে জন্মায় না। সময় বদলেছে, বদলেছে ছবি বানাবার ভঙ্গি। 'একালের প্রলাপ' বইয়ে একটি চালু ছবি বানাবার কৌশল নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা হয়েছিল [১]। অবশ্য সলাজে এও বলি, আমি নিজে এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করিনি বা ছবি বানাবার চেষ্টা করিনি :), দেখতে দেখতে বেলা চলে গেল যে! এখন এই পদ্ধতি কাজ করবে বুঝি?
এখন আমাদের বিপুল সুযোগ, হাতের আস্তিনে লুকানো আছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, আমরা মুক্তিযুদ্ধকে এখন স্রেফ একটা পণ্য রূপে গণ্য করছি [২]। এখন মুক্তিযুদ্ধের আবেগ সর্বত্র মিশিয়ে দেয়া আবশ্যক। এখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের আবেগ মিশিয়ে দিচ্ছি খিচুড়িতেও [৩]! কালে কালে আর কিসে কিসে মেশাবো, কী কী দেখব এটার একটা তালিকা করা প্রয়োজন, এখনই।

'মেহেরজান' ছবিটা নিয়ে ব্লগপাড়া উত্তপ্ত। 'মেহেরজান' ছবিটা অতি দ্রুত ব্যবসা সফল করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ, ভারতীয় দাদা, চ্যানেল আই, প্রথম আলো এদের প্রয়োজন হবে এটা নিয়ে খুব অবাক হওয়ার কিছু নাই। কারণ আমার চোখে এই ছবিটা এবং 'বাবা কেন চাকর', 'সখী ভালবাসা কারে কয়' এগুলোর সঙ্গে খুব একটা তফাৎ নাই। যদিও এই ছবিটা সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে, 'A STORY OF WAR AND LOVE' ।  এইখানটায় জঘণ্য মিথ্যাচার করা হয়েছে। 'ওয়ার' শব্দটা এবং এর সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে গুলিয়ে ফেলার অপচেষ্টা করাটাই রুবাইয়াত হোসেনের নির্বোধ মস্তিস্কের ফসল। এখানে লক্ষণীয় আমি রুবাইয়াত হোসেনকে কিন্তু নির্বোধ বলছি না, বলছি তার মস্তিষ্ক, নির্বোধ মস্তিস্ক। তাকে নির্বোধ বলতে পারি না কারণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি নাকি কী কী যেন গবেষণা-টবেষণা করেছেন। এটাও একটা গবেষণার বিষয়, অতিরিক্ত গবেষণা করলে কী মস্তিকের রঙ ধুসর থেকে হলুদ হয়ে যায়!
তার গবেষণার কোন ছাপ এই ছবিতে আশা করাটাই বাতুলতা কারণ আমরা জানি না আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বেলুচ কোন সৈন্য এমন সপক্ষ ত্যাগ করেছিল কি না বা...। থাকুক এই প্রসঙ্গ, এই প্রসঙ্গ এ নিয়ে অন্যরা বিস্তর আলোচনা করেছেন।

একালের প্রলাপে লিখেছিলাম, ছবিকে হিট করার জন্য অনেক কৌশলের একটা: 
"...যেসব হলে ছবি চলবে তার দু-একটা হলকে বেছে নিতে হবে। ভাড়া করা কিছু লোক বিনামূল্যে এ ছবিটা দেখার দাবি জানিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করবে (হইচই করতে হলে গাড়ি ভাঙচুর করতে হয়, নিয়ম)। দেরিতে আসাই নিয়ম কিন্তু বিচিত্র কারণে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে লাঠি বা বেতচার্জ করবে। হুলস্থূল ব্যাপার। পত্রিকাগুলোতে এই নিউজটা ছাপা হবে। যে সব পত্রিকায় এ নিউজ ছাপানো হয়েছে সে সব পত্রিকার নাম, উদ্ধৃতি উল্লেখ করে আরেকটা বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে বলতে হবে, এ ছবি দেখার জন্যে দর্শক উম্মাদ হয়ে গেছে।..."। 

সেটা তো খানিকটা প্রাচীন পদ্ধতি, এখন আধুনিক পদ্ধতি জন্য প্রথম আলো আছে না! প্রথম আলো, এই পত্রিকায় আমাদের দেশের সেরা সন্তান গাজীউল হক, সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর জন্য প্রথম পাতায় জায়গা থাকে না; শহিদুল ইসলাম লালুর মৃত্যুর খবরটা আসে বিজ্ঞপ্তি আকারে [৪]। এখন সেই প্রথম আলোয় জায়গা কতো শস্তা! দিনের পর দিন মেহেরজান নিয়ে মতি ভাই গং মুখ হাঁ করেই রাখেন, হর্স মাউথ! কখনও জয়া বচ্চন, কখনও ভিক্টর ব্যানার্জীর প্রসঙ্গ ধরে এই পত্রিকায় সুদীর্ঘ আলোচনা হয়। ভিক্টরদাদার নানা নাকি নানার মত ছিলেন এটাও আমরা প্রথম আলোর বদান্যতায় জেনে যাই। কখনও-বা রুবাইয়াত হোসেনের জবানিতে।

কিন্তু মতি ভাইয়ের মুখ ব্যাদান প্রকট হয় এই দিনের পত্রিকা পড়ে। এটা যে এদিন ছাপা হবে এটাও ঘটা করে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাদেরকে জানানো হয়েছিল। এদিন 'মেহেরজান' নিয়ে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী এবং আরও তিনজনের একটা সমালোচনা ছাপা হয়। এটা আরেক বিস্ময়, চারজন মিলে একটা লেখা লেখেন কেমন করে? এটা প্রথম আলোর এক যুগান্ত আবিষ্কার! এরা নব নব আবিষ্কারে এতই অস্থির কোনও দিন-না দেখব এদের ছাপানো অক্ষরগুলো উল্টা। আহা মরিমরি!

কিন্তু আমি এইসব মানুষদের, এই সব লেখকদের জন্যও বেদনা বোধ করি এদের কী সামান্যতমও ঔচিত্য বোধ নাই যে চারজন মিলে একটা লেখা লিখতে হবে? মতি ভাইরা যেভাবে লাফাতে বলবেন সেরকম লাফাতে হবে কেন? মতি ভাই নিজের পায়ে লাফাক না। 
আমি কেন যেন এই মেহেরজান ছবিটা নিয়ে শব্দ ব্যয় করতে উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। আমার কাছে কেবল মনে হচ্ছিল এই ছবি নিয়ে লেখার অর্থ হচ্ছে স্রেফ শব্দের অপচয়! কিন্তু কখনও-না-কখনও বখিল-কৃপণের ধন যেমন অজান্তেই বেরিয়ে যায় তেমনি শব্দও। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করা এটা তো নতুন কিছু না। মতিউর রহমান গংরা তো মুখিয়েই থাকেন, এরা সব বদলাতে বদলাতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আবেগটাও বদলে দেবেন!

এই সমালোচনা ছাপা হওয়ার দিনই [৫] এই ছবির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনেরও একটি লেখা ছাপা হয়েছে [৬]। এইখানে আমার খানিকটা বলার আছে। কারও একটা লেখা বা মত প্রকাশের পূর্বেই অন্য একজন এর ব্যাখ্যা দেন কেমন করে? এটা একটা পত্রিকার নীতি হয় কেমন করে? এটাও মতি ভাইয়ের আরেক বিস্ময়কর আবিষ্কার! মানুষটা এতো বিস্ময় প্রসব করেন কেমন করে!

সহায়ক সূত্র:
১. একটি আদর্শ চলচিত্র: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_29.html
. মুক্তিযুদ্ধের আবেগ...পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html

৩. মুক্তিযুদ্ধ, খিচুড়ি: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_21.html
৪. শহিদুল ইসলাম লালু: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_28.html
৫. যৌথ প্রযোজনার সমালোচনা: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=12&date=2011-01-26
৬. রুবাইয়াত হোসেন: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=13&date=2011-01-26