Monday, July 25, 2011

শেখ সাদী, সেকাল-একাল!

­চকচকে কাপড়ই সমস্ত সুবিধার উৎস, এই নিয়ে শেখ সাদীর চমৎকার একটা ঘটনা আছে। বিস্তারিত বলে চর্বিতচর্বণ করি না। এটা একটা বাচ্চাও জানে।

আচ্ছা, শেখ সাদী ভদ্রলোক কী মারা গেছেন? জানি-জানি, এই উদ্ভট প্রশ্ন শুনে অনেকে এতো জোরে হাসছেন যে আমার কম্পিউটারের মনিটরের পর্দাও কেঁপে কেঁপে উঠছে! বাহ, এ কেমন উদ্ভট কথা!
আসলে আমার বক্তব্য অন্য, শেখ সাদীর মতো মানুষেরা কখনও মারা যান না, এঁরা অমর। আমার কথায়, কিছু মানুষ কখনও মরেন না এঁরা কেবল খোলস বদলান মাত্র! চকচকে কাপড় পরলে মর্যাদা পাওয়া যায়, সেই কবে শেখ সাদী এটা বলে পগার পার হয়েছেন অথচ
এতোটা সময় পরও তা অম্লান, অকাট্য!
ছবি ঋণ: দৈনিক যুগান্তর, ২৫ জুলাই, ২০১১

পত্রিকার এই ছবিটা দেখলেই মনটা অন্য রকম হয়ে যায়! আহা, কী চমৎকার! কী একেকজনের দায়িত্ববোধ! কী করিৎকর্মা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কী কর্মঠ আমাদের মিডিয়া!

ছবিটার কল্যাণে আমরা দেখছি যে মানুষগুলো জীবনের ঝুকি নিয়ে এই সার্কাস দেখাচ্ছে এদের কর্মকান্ড দেখে এদের প্রতি কী তীব্র ঘৃণাই না জাগে মনে। এরা দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। ছি-ছি-ছি!

ব্যাটাদের কত্তো বড়ো সাহস! টিকেট কাটবে না আবার বিনে পয়সায় ভ্রমণও করবে। আমাদের পুলিশ বাহিনী এদের তাড়া করবে না তো কে করবে?
ছাদে উঠা অপরাধ। এটা ঠেকাতে হবে এই নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই। তবে...কিন্তু...একটা কিন্তু রয়েই যায়।

এটা গতকালের ঘটনা। ঘটনাটা এমন, ময়মনসিংহের গৌরিপুরের শত-শত খেটেখাওয়া মানুষ বিভিন্ন উপায়ে ভৈরব এসেছিলেন। গন্তব্য ফেনীর পরশুরাম। ইন্টারসিটি মহানগর প্রভাতী ট্রেনের, ভৈরব থেকে প্রত্যেকে ৮০ টাকা খরচ করে টিকেট করেছিলেন।
ফেনীর পরশুরাম, ওখানে রবিবারে 'মানবহাট' বসবে। সাধারণ ট্রেনে গেলে ভাড়া বড়জোর ২০ টাকা। যেহেতু হাটটটা বসবে দুপুরে তাই কষ্টার্জিত একগাদা টাকা দিয়ে এঁরা টিকেট করেছিলেন যেন দুপুরের আগেই ওখানে পৌঁছতে পারেন।
'মানবহাট', এটা দাসপ্রথারই এক আধুনিক সংস্করণ! ওখানে কাজের নামে নির্দিষ্ট মেয়াদে ধনবান ব্যক্তিরা এঁদেরকে কিনে নেবেন। সহজ করে বললে, এরা ওখানে শ্রম বিক্রি করবেন- টাকার বিনিময়ে ধান কাটবেন, পাট কাটবেন। সুশীলদের ভাষায় বললে মাটিতে সোনা ফলাবেন।
ফসল ফলাবার নাম করে এই দেশের চাকা যারা বনবন করে ঘোরাচ্ছেন তাঁদের পোশাক অতি সাধারণ হবে এটা জানার জন্য তো রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তো, কেবল পোশাকের কারণে টিকেট থাকা সত্বেও এই শত-শত মানুষের অধিকাংশকেই আমাদের রেলের অতি দক্ষ কর্মচারীরা উঠতে দেননি। এদিকে ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে, নিরুপায় হয়ে এঁদের অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠে পড়েন।
আখাউড়া আসার পর এঁদেরকে পুলিশ কেবল নৃশংস ভঙ্গিতে নামিয়েই দেয়নি। লাঠিপেটা করেছে, কান ধরে উঠবসও করিয়েছে। মহানগর প্রভাতী, যে ট্রেনের এঁরা টিকেট কেটেছিলেন সেই ট্রেন এদের ফেলে চলে গেছে, এঁরা কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছেন।

এঁদের প্রতি যে অন্যায়টা করা হয়েছে শত-শত মানুষের চোখের সামনে খুব অল্প মানুষই এর প্রতিবাদ করেছেন। যাদের মধ্যে মনির হোসেন একজন। এই মানুষটা কর্মস্থল এই ষ্টেশনেই। একটা বুকস্টল চালান। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন তিনি ওখানে উপস্থিত ছিলেন।
video
পরে এঁরা, অন্তত পঞ্চাশ জন মানুষ তাঁদের টিকেট দেখিয়ে স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টকে কাকুতি মিনতি করে অন্য একটা লোকাল ট্রেনে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সময় গড়িয়ে তখন বিকেল। কর্নফুলি নামের ওই ট্রেনটার গন্তব্য ফেণী হয়ে চট্টগ্রাম। পৌঁছবে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে। অথচ এঁদের অনেকের কাছে বাড়তি এক টাকাও ছিল না। ছিল না ওই মানবহাটে বিক্রি হওয়ার নিশ্চয়তাও।

এই বীভৎস অন্যায়ের একটা শব্দও কোন জাতীয় দৈনিকে আসেনি। এসেছে কেবল 'যুগান্তরে' কিন্তু অন্য রকম করে! বিশাল আকারের এই ছবিটা দিয়ে যুগান্তরে তামাশা করা হয়েছে। "পুলিশের তাড়া খেয়ে"..."ওরা বিনা টিকেটে"..."জিআরপি পুলিশের কাছে বার্তা আসে"...হেনতেন! সে এক কুৎসিত রঙ্গ! এরা সবাই বিনা টিকেটের যাত্রী হলে যে আনুমানিক পঞ্চাশ জন টিকেটধারীকে পিটিয়ে ছাদ থেকে নামানো হলো ওই মানুষগুলো তখন কোথায় ছিলেন? এই ট্রেনের ছাদে, নাকি আকাশের ছাদে?
আর পুলিশের কাছে এদের ছাদে উঠার বার্তাটা মোবাইলের তার বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে আসে অথচ ট্রেনে ডাকাতির বার্তা বা মাদক পাচারের বার্তা তারের মাঝখানে জমে যায়! আফসোস, বড়ই আফসোস!

কেন মিডিয়া, অন্য দৈনিকগুলোয় এই অন্যায়ের একটা শব্দও এলো না? কারণ এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য আমাদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা-মমতা নেই। এঁদের প্রতি আছে আমাদের সীমাহীন তাচ্ছিল্য। এই সাদাসিধে মানুষগুলোর সঙ্গে তো আর মিডিয়ার কোন কাজ নেই। এঁরা যে আমাদের মত দু-পাতা 'নেকাপড়া' করেনি!

গুনে গুনে পয়সা নিয়েছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে এদের বসার ব্যবস্থা দূরের কথা, ট্রেনে ঢোকা দূরঅস্ত, বহন পর্যন্ত করতে রাজী হয়নি। আহা, এঁরা যে আর আমাদের মত দু-পাতা 'নেকাপড়া' করেনি। গাড়িতে উঠতে না দিলে কি আসে যায়! ইচ্ছে হলে লাথি মেরে ফেলে দিলেই আটকাচ্ছে কে?
অথচ এই অসহায় মানুষদের সংখ্যাই এই দেশে বিপুল। এঁদের খরচ করা টাকায় যে ব্রীজ-রাস্তা বানানো হয় মন্ত্রী বাহাদুররা দাবী করেন ওইসব নাকি তাদের তালুক বিক্রির টাকা। নইলে আমরা কী আর সাধে বলি, এই ব্রীজ ওমুক মন্ত্রী বানিয়েছেন, ওই রাস্তা তমুক আমলা বানিয়েছেন। এটা ভুলে যান আমাদের দেশের কবি-সাহিত্যিকও! [১]
এই দেশের সরকারী চাকুরেরা অবলীলায় বিস্মৃত হন, তাদের বেতনের টাকা আসে এঁদের কাছ থেকে। বড় বড় লাটসাহেবরা হচ্ছেন পাবলিক সার্ভেন্ট আর এই সব সাধারণ মানুষরাই পাবলিক। সে রেলের কর্মচারী হোন বা এই রাষ্ট্রের অসম্ভব ক্ষমতাধর মানুষই হোন। ডিয়ার সোনিয়া গান্ধীকে যে ২০০ ভরির সোনার পদক দেয়া হয়েছে তাও এঁদের পরোক্ষ ট্যাক্সের টাকায়।

সবই ঠিক ছিল কিন্তু হায় পোশাক!
শেখ সাদী আজ বেঁচে থাকলে বড়ই আনন্দিত হতেন। বেচারা, দেখে যেতে পারলেন না, বেচারা...। 

সহায়ক সূত্র:
১. দ্য কাউ ইজ আ...: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_3443.html 

7 comments:

Nuhan, Usa said...

যুগান্তরও একটা পত্রিকা, lol

Anonymous said...

Nuhan, lolz

শাহেদ said...

salute mr manir,,,,

Anonymous said...
This comment has been removed by a blog administrator.
Anonymous said...
This comment has been removed by a blog administrator.
Anonymous said...
This comment has been removed by a blog administrator.
Anonymous said...

স্যার, মন্তব্য ডিলিট করছেন কেন?আমি কি খারাপ লিখেছি? শুধূ লিখেছিলাম,এই রিপোটাররে একটা চটকনা দেয়া দর্কার।