Saturday, January 22, 2011

ফরমালিন ভর্তি জার খুঁজছি

আগেও লিখেছিলাম, তিনটা স্কুলের মধ্যে [১] তিন নাম্বার স্কুলটা নিয়ে আমার আগ্রহ প্রবল কারণ এখানে কাজ করার রয়েছে বিপুল সুযোগ তেমনি আমার নিজের শেখার সুযোগও সীমাহীন। স্কুলগুলোর মধ্যে এই স্কুলটা [২] খানিকটা অন্য রকম। এখানে খুব দ্রুত শিক্ষার্থী পরিবর্তন হয়। ক-দিন আগে প্রায় ১৫জন আসা বন্ধ করে দিল। টিচারের খুব মন খারাপ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। টিচার বিষণ্ণ হলেও আমি আনন্দিত কারণ এরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি, এও কম কী!
অন্য দুইটা স্কুলে কেবল হরিজনদের বাচ্চারা বা অন্ধদের বাচ্চারাই পড়ে। কিন্তু এই স্কুলে যেসব বাচ্চারা আসে এদের কারও বাবা নেই তো কারও মা। কারও আবার বাবা-মা কেউই নেই! অনেক শিশুর নিম্নবিত্ত বাবা-মাদের বিচিত্র সব পেশা। এর মধ্যে স্টেশনে ভাত বিক্রি থেকে শুরু করে গাঁজা বিক্রি কোনটাই বাদ নেই। আরও কিছু পেশা আছে এটা নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না। আমার আজকের লেখার সঙ্গে এর খুব একটা যোগ নেই।

এই স্কুল থেকে আমি নিজে শিখেছি বিস্তর। যেমন একদিন এদের মধ্যে জরীপ চালালাম, বড় হয়ে কার কি হওয়ার ইচ্ছা? অনেকের পছন্দ বাসায় কাজ, টেম্পু চালানো। আমরা আসলে আমাদের দেখা বৃত্ত থেকে বের হতে পারি না।
আমি গলায় হতাশা নিয়ে বলেছিলাম, কেন তোমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে চাও না? এদের অবিশ্বাস ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে আমি ব্যাখ্যা দেই ড. আতিউর রহমান কেমন করে রাখাল থেকে একজন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হয়েছেন।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। এখান থেকে আমার বিস্তর শেখা নিয়ে অন্য কোন দিন লেখা যাবে। কিছু দিন ধরে এই স্কুলটা নিয়ে আমি অনেকখানি অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। যেখানে এই স্কুলটা চলছিল ওখানে আমাদেরকে কোন ভাড়া দিতে হতো না এটা সত্য কিন্তু আমি এখানে কাজ করে ঠিক আরাম পাচ্ছিলাম না। মাগনা গরুর দাঁত দেখার চেষ্টা করতে নেই এটা আমি জানি না এমন না, বিলক্ষণ জানি, তবুও। অন্য স্কুল দুটায় এই হ্যাপা নেই। একটা চলে ভাড়া ঘরে, অন্যটায় স্কুল ঘর করে দেয়া হয়েছিল।

যারা আমাদেরকে স্কুল চালাবার জন্যে জায়গা দিয়েছেন এরা হুটহাট করে একটা মিটিং দিয়ে বসেন, তখন স্কুল লাটে উঠে। অথচ এদের মিটিং-ফিটিং পূর্ব নির্ধারিত বলে এটা এই স্কুলের শিক্ষককে জানিয়ে দিলে ওই দিন আমরা স্কুল ছুটি দিয়ে দিতে পারি। এতে তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরা কখনই আমাদেরকে আগাম জানাননি! অথচ জানালে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত না। ছোট-ছোট বাচ্চাদেরকে যখন মিটিং-এর নামে এখান থেকে বের করে দেয়া হয় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ব্যতীত আমাদের করার কিছুই থাকে না। এখানে আরও কিছু জটিলতা আছে যেটা জনে জনে আলোচনা করা সমীচীন না। 
কোথাও, ভাড়ার ঘরে একটা ব্যবস্থা হয় কি না এটা বেশ কিছু দিন ধরে আমি চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ঠিকঠাক মতো হয়ে উঠছিল না!
বাচ্চাদেরকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া, কালও তাই হলো। শেষ অবধি এই সিদ্ধান্তটা নিতেই হয় এখানে আর স্কুল রাখা যাবে না। অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে, এখুনি। কিন্তু কোথায়? এটার উত্তর আমার জানা নেই। আছে কেবল জেদ। জেদ পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, এই স্কুলটা যদি আমি একদিনে দাঁড় করাতে পারি তাহলে একদিনে অন্য কোথাও স্থানান্তরও করতে পারব।

পায়ের নীচে সর্ষে- পাগলের মত ঘুরছি। কিছু-না-কিছু একটা হয়েই যাবে আমার এই ধারণায় বড়ো ধরনের ফাঁক ছিল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম এখন ফরমালিনের জয়-জয়কার। সব কিছু এখন ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা হয়, আমাদেরকেও। একেকটা লাশ, অবিকৃত।
একটা সরকারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সঙ্গে কথা বললাম, 'ভাড়া দিয়ে হলেও একটা ঘর পাই কিনা খুঁজছি, পেলেই চলে যাবে। আপনাদের স্কুল তো বিকালে ছুটি থাকে, আপাতত স্কুল চালাবার জন্য কেবল একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন? সভাপতি বললেন, 'ইউএনও সাহেবের সাথে কথা বলেন'।
আমি মনে মনে বললাম, চুভাই, তাহলে তুমি নিজের বউয়ের পতি হওয়ার পাশাপাশি সভাপতি হয়েছ কেন?
একে ধরি ওকে ধরি ফলাফল এক পরম শূণ্য- অবাক হচ্ছি বড়, কারও শোনার মত সময়টুকুও নাই! শ্লা, আমি ব্যতীত সবাই দেখি ভারী ব্যস্ত!

মাত্র ক-দিন আগে পৌরসভার নির্বাচন শেষ হলো। অরি আল্লা, তখন দেখি লোকজন জনসেবা করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন; পারলে গায়ের কাপড়ও খুলে দিয়ে দেন-নাংগা ঘুরে বেড়ান! 'ওই আসে জনসেবক' শত-শত মাইকে এই নিনাদে পারলে পাঁচ মাসে বাচ্চা হয়ে যায়। তখন আমাদের মাথার উপর জনসেবকদের লাখ-লাখ পোস্টার, এই পোস্টার নিঃস্ব, শীতার্তদের কী কাজে লাগেছে কে জানে! এরি নাম গণতন্ত্র! এরি নাম জনসেবা? জনসেবা জিনিসটা কী এটাই জানা হলো না এখনও।

ভাল লাগে না, ভাল লাগে না আমার; ইচ্ছা করে কাপড়-চোপড় খুলে ফরমালিনভর্তি একটা জারে ঢুকে পড়ি...।

সহায়ক সূত্র:
১. স্কুল...: http://tinyurl.com/39egrtn
২. স্কুল তিন: http://tinyurl.com/327aky3

No comments: