Saturday, December 4, 2010

এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন

অন্য কারও কথা জানি না, ড. ইউনূসকে নিয়ে যে তোলপাড় চলছে এটা আমার ভাল লাগছে না, অন্য রকম এক কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্টের উৎস জানা নেই এমনও না!

ড. ইউনূস যে ভাবেই হোক আমাদের জন্য আন্তর্জাতিক একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। শুনতে খারাপ শোনায় কিন্তু এই গ্রহে কে চেনে বাংলাদেশকে? যাও চেনে, আমাদের রাজনীতিবিদদের কারণে মুখ দেখাবার যো নেই।
ড. ইউনূস সম্মানটা নিয়ে এসেছিলেন বটে যদিও এতে আমার ঘোর আপত্তি ছিল, এখনও আছে- অপাত্রে দান। আমার আনন্দের শেষ থাকত না যদি আইসিডিডিআরবিকে এই সম্মানটা দেয়া হতো। বছরে-পর-বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ-লক্ষ শিশুর প্রাণ রক্ষা করল সেই প্রতিষ্ঠানকে না-দিয়ে দেয়া হলো কিনা এক মহা সুদখোরকে। এই দেশে একজন মেথরও ট্যাক্স দেবে, দেবেন না কেবল ড. ইউনূস [৫]। যে মানুষটার প্রতিষ্ঠান ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ নেয় আবার সেই প্রতিষ্ঠান দারিদ্র বিমোচনের কথা বলে এটার চেয়ে বড়ো রসিকতা এই গ্রহে আর কী হতে পারে! মাত্র ২১ পার্সেন্ট সুদ পরিশোধ করে প্রস্টিটিউশন-আর্মস-ড্রাগস ব্যতীত কোন বৈধ ব্যবসা করা যায় এই নিয়ে 'লাশ-বানিজ্য-পদক' [১] লেখায় আমার প্রশ্ন ছিল। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ দিয়ে ব্যবসা? আউট অভ কোশ্চেন!

আমি প্রায়ই বেদনা নিয়ে লিখতাম, আমরা বড়ো দুর্ভাগা এই দেশে এমন মানুষের বড়ো অভাব যাকে আমরা অনুকরণীয় ভাবতে পারি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ড. ইউনূস আমার আদর্শ, আমি এই কাতারে তাঁকে ফেলতে পারলাম না যেখানে তিনি আমাদের জন্য এমন একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন। অন্তত আমি পারিনি, রাতকে দিন ভাবতে পারি না। কারও আমার মতে আসার আবশ্যকতা নাই কিন্তু আমি মনে করি লক্ষ-লক্ষ মানুষের অভিশাপ ড.ইউনূসকে তাড়া করবে। আমি জনে জনে এটা জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার কত এটা কেউ জানাতে পারেননি। এমনকি গ্রামীন ব্যাংকের অনেক শাখায়ও গিয়েছি, কেউ ঝেড়ে কাশেন নি। কেন? কারণ এদের স্বচ্ছতার বড়ো অভাব! এদের সুদের সঠিক হারটা আমি আজও জানি না।

আজ ড. ইউনূসকে নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় উঠেছে গোটা এই কর্মকান্ডে আমি বড়ো বিমর্ষ বোধ করছি। কী অভাগা একটা দেশ, আমার দাঁড়াবার জন্য এক চিলতে জায়গাও থাকল না! এই গ্রহের অন্য লোকজনের সামনে বুক চিতিয়ে, চোখে চোখ রেখে দাঁড়াবার মত সুযোগ থাকল না। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় বলি! এটা সত্য ড. ইউনূস আমার অপছন্দের একজন মানুষ, বিভিন্ন কারণে [২]। কিন্তু এই মানুষটা অভাগা এই দেশটার কী যে অপূরণীয় ক্ষতি করলেন এটা তিনি কল্পনাও করতে পারবেন না। একজন গুন্টার গ্রাস [৭] এবং ইউনূসের মধ্যে পার্থক্যটা সহজেই অনুমেয়। কারণ এই অভাগা দেশটার অনেকগুলো গুন্টার গ্রাস নাই।
তাঁকে নিয়ে ঠিক এই সময়টাতেই [৩] [৪] উল্লাস করার জন্য লিখেছি এমন না। আমার স্পষ্ট মনে আছে তাঁকে নিয়ে প্রথম লেখাটা লিখি ২০০৬ সালের প্রথম দিকে, 'লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস' [৫], দেশ যখন ভাসছে উচ্ছ্বাসে। তখন কঠিন একটা সময়, এমন সময়ে ড. ইউনূসকে নিয়ে লিখবে, ঘাড়ে কার কয়টা মাথা? লেখাটা যখন একটা ওয়েব সাইটে লিখি ওখানে লেখাটা লিখে তোপের মুখে পড়েছিলাম। অনেকে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, চোখ ধাঁধানো এই আলোর পেছনের অন্ধকারকে উপেক্ষা করাটা সমীচীন হবে না কারণ এই আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাস!

আসলে সত্য এবং সত্যের পেছনে মিথ্যার মধ্যে অনেক তফাত। ছোট্ট একটা নমুনা দেই। আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা খরচ করে সাইফুর রহমান সাহেব বাইপাস রেল বসালেন সিলেটের দিকে। তৎকালীন সবাই এটা বলে বলে মুখের ফেনায় প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললেন, তাদের সঙ্গে পত্র-পত্রিকাও সুর মেলাল, এতে করে নাকি ১ ঘন্টা সময় সাশ্রয় হবে। আমি ঘড়ি ধরে দেখেছিলাম, ১ ঘন্টা না, সব মিলিয়ে আট থেকে দশ মিনিট সময় নষ্ট হতো। ৫০ কোটি টাকা জলে ফেলে সাইফুর রহমান, ব্যা হুদা ঘটা করে উদ্বোধনও করে দিয়ে গেলেন। আজমপুর নামের ছোট্ট একটা রেল স্টেশন অথচ দুই মন্ত্রীর জন্য বিশাল দুই স্তম্ভ বানানো হলো। সাইফুর রহমান সাহেব ইহলোকে নাই, ব্যা হুদাও দলে নাই, ছোট্ট এই স্টেশনটাতে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা নাই কিন্তু এই ঢাউস আকারের স্তম্ভ ২টা আছে, পাশাপাশি। দেশব্যাপি সংঘাত কিন্তু স্তম্ভদের মধ্যে কোন সংঘাত নাই!
১ ঘন্টা সময়ের অপচয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে এ-ই!

তো, এখন গ্রামীন ব্যাংক যে ব্যাখ্যা দিয়েছে অন্যদের কথা জানি না আমার কাছে বড়ো খেলো মনে হয়েছে। আর তাদের এই সব বাতচিত, "...আমরা নোবেল পাওয়া ব্যাংক...", এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীন ব্যাংকের হেন-তেন এই সব বলা বালখিল্য আচরণ মনে হচ্ছে।

আমার বড়ো সাধ, দেশটায় একটু দাঁড়াব। এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন...।

সহায়ক লিংক
১. লাশ-বানিজ্য-পদক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. ওই আসে মহাপুরুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_04.html
৩. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
৪. ডেইলি স্টার: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_04.html
৫. লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
৬. মামা বাড়ির আবদার: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_12.html
৭. গুন্টার গ্রাস: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6914.html         

ডেইলি স্টার, ঠাকুর ঘর, কলা, পিৎসা...

ঠাকুর ঘরে...কলা খাই না, এই সব এখন আর চলে না। যুগটা আধুনিক, বাতচিতও আধুনিক। এখন হবে, বাবুর ঘরে...পিৎসা খাই না।

'চোর কে দাড়ি মে তিনকা'- এটার আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়াবে, চোরের দাড়িতে শলাকা। সহজটা মিলিয়ে করলে দাঁড়াবে 'চোরের মার বড়ো গলা'। 

ইউনূস সাহেবকে নিয়ে যে অভিযোগটা উত্থাপন করা হয়েছে এটা গতকাল প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়নি, আজ ছাপা হয়েছে। গতকাল কেন ছাপা হয়নি এই নিয়ে আমার এই লেখায় যা [১] লিখেছিলাম, এখন দেখছি এই মত পরিবর্তন করা আবশ্যক। কারণ ডেইলি স্টার এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে:
"The Daily Staris publishing this story a day late. For that, we owe an explanation to our readers. The news was extremely important in that it dealt with an institution and a person who brought the highest honour and accolade for Bangladesh. We seriously read the story that was released by a news agency. This newspaper wanted to verify the allegations and get an explanation from the organisation that stands accused. Moreover, this newspaper wanted to read the documents available and be sure about what has been levelled against the person and the organisation. What we have found is interesting. The allegations have been made and reported, not the answers."  [২]

ভাল-ভাল! এদের ব্যাখ্যা জেনে আমি পুরা থ! ইউনূস সাহেব নবেল লরিয়েট বলে তাঁর বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ থাকবে না! এই অভিযোগ বিষয়ে যেটা বলা চলে, এখানে এটা মূখ্য আলোচ্য বিষয় না ইউনূস সাহেব আদৌ অপরাধ করেছেন, কি করেননি। বিষয়টা হচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে যেসব চিঠি চালাচালি করা হয়েছে তাঁর সংযুক্তিও দেয়া হয়েছে। ইউনূস সাহেব কালো, না ভালো এটা না বললেও আন্তর্জাতিক এই খবরটা পত্রিকায় আসবে এটাই সাধারণ পাঠকের প্রত্যাশা। ডেইলি স্টার-প্রথম আলো-পিৎজা হাট-আক্কু চৌধুরী-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবগুলোই একই কারখানা থেকে বের হয়! ৮০০ পয়সা দিয়ে প্রথম আলো এই কারণে কেনা হয় না কেবল মতিউর রহমানের বাকোয়াজপনা শোনার জন্য।

আর ইউনূস সাহেব ঈশ্বর না যে তাঁর বিরুদ্ধে কোন কথা চলে না! ইউনূস কোন ছার, এই গ্রহে ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায়। সেই মামলা কোর্ট গ্রহণও করেন। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সমনও জারী হয় কিন্তু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় না বলে (ঈশ্বরের কোন আবাসিক ঠিকানা নাই বিধায়) আলোচ্য মামলা অচল হয়ে পড়ে।
"রুমানিয়ার এক আদালত, একজনের খুনের দায়ে পাভেল মির্চার ২০ বছরের সাজা হয়েছিল। কিন্তু ভদ্রলোক বেঁকে বসলেন, পাল্টা মামলা করলেন।
তিনি একা এই সাজা ভোগ করতে রাজি নন। তার এককথা, এই খুনের জন্য আমি একা দায়ি নই, সমান দায়ি ঈশ্বরও।
পাভেল মির্চার বক্তব্য, ব্যাপ্টিজমের সময় ঈশ্বরের সঙ্গে অন্য খ্রিষ্টানদের মতই আমারও চুক্তি হয়েছিল, তিনি আমাকে সমস্ত অশুভ কাজ থেকে বিরত রাখবেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শয়তান জয়ী হয়েছে। ঈশ্বর আমার সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করেছেন বিধায় ঈশ্বরের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলা করেছি।
ভয়াবহ সমস্যা দেখা দিল। বাদী মামলা করলে বিবাদীকে জানাতে হয়, সমন জারী করতে হয়। উকিলরা বিবাদী ঈশ্বরের নামে নোটিশ জারী করতে পারছিলেন না। তাদের বক্তব্য, অনেক চেষ্টা করেও আমরা ঈশ্বরের আবাসিক ঠিকানা খুঁজে পেলাম না বিধায় সমন জারী করা গেল না। ঠিকানা না-থাকার কারণে সমন জারী করা না গেলে, ঈশ্বরের বিচার করা যাবে কেমন করে? অতএব মামলা ডিসমিস।"

অনেকের কাছে এমন মামলা হাস্যকর-উদ্ভট মনে হতে পারে কিন্তু এখানেই হচ্ছে শেখাটুকু। কারও অভিযোগ ন্যায় কি অন্যায় সেটা পরের কথা কিন্তু তার অভিযোগ করার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়ার অধিকার কারও নাই।
কেন যথাসময়ে এরা খবরটা ছাপায়নি প্রথম আলো অবশ্য এই নিয়ে কোন ব্যাখ্যায় যায়নি কিন্তু ডেইলি স্টার ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই সব পন্ড করেছে। এরা সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছে, এদের কাজ নিশ্চিত সূত্র উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করা, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে দেয়া না। কারণ পত্রিকাওয়ালাদের কাজ জজগিরি করা না- আবার এটাও না, কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে লম্বা নাক গলিয়ে দেয়া। 
ডেইলি স্টারের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এমন, এরা জনে জনে, কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, ইয়ে বুঝলেন, এটা কাউকে বলবেন না যেন..., বুঝলেন...। 
ডেইলি স্টার কোন মানুষ হলে বলতাম, কাছে আসেন, এক কানে ফুঁ দেই, দেখবেন অন্য কান দিয়ে কেমন চমৎকার বুদ্বুদ বেরিয়ে আসছে...।

সহায়ক লিংক:
১. ল্যাজটা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
২. ডেইলি স্টার: http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=164574