Saturday, November 13, 2010

কদমবুসি করি আপনাকে, প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে হাতের নাগালে পেলেই পায়ে ধরে সালাম করব, আমার লেখালেখির কসম। রাস্তাটা সুনসান, না ব্যস্ত তাতে আমার এই শপথের হেরফের হবে না। প্রয়োজনে হাজার-হাজার মানুষের সামনে, মধ্য রাস্তায় কদমবুসি করব। যানজট লাগলে লাগুক, তাতে কী!

এই মানুষটা একটা অভাবনীয় কান্ড করে ফেলেছেন! আমাদের দেশে এখন সাদাকে সাদা বলার লোকের বড়ো অভাব। আগে লেখক-টেখকরা এই কঠিন দায়িত্ব পালন করতেন, এঁরা এখন রঙিন চশমা চোখে দিয়ে শিল্পপতিদের পেছনে পেছনে অদৃশ্য ল্যাজ নাড়ান। উদাহরণের অভাব নেই।
আমার পরিচিত এক মানুষের ভাষায় এখন এই দেশের লেখকরা 'পুতিয়ে' গেছেন। আমি বলি, 'চুতিয়ে' গেছেন।

প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "...আপনারা অনেকেই নাজিরদের সঙ্গে টাকা-পয়সা লেনদেন করেন।...অনেকে বদলি হওয়ার সময় ডিমান্ড করেন, 'তোমরা তো আমাকে একটা কিছু দিবে, কোরআন শরিফ আর লাঠি না দিয়ে একটা ডিপ ফ্রিজ দিয়ে দিয়ো...'।" (প্রথম আলো, ১৩.১১.১০)

অনেকের কাছে প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত মনে হবে, সুশীলদের কাছে শিষ্টাচার বহির্ভূতও মনে হতে পারে। আহা সুশীল, সুশীল বলে কথা! এদের নাক যে আবার অনেক লম্বা। সুশীলরা সব সময় ধোপদুরস্ত হয়ে থাকেন। আমার ধারণা, বাথরুমও সারেন কোট-প্যান্ট লাগিয়ে।
চীনা প্রবাদ এখন অনেকটা অচল: "একটা বেড়ালের জন্য মামলা করার অর্থ একটা গাভী হারোনো তারপরও বেড়ালটা পাওয়া যাবে কি না এ নিয়ে নিশ্চিত করে বলা যায় না"।
আমাদের দেশে এখনও অনেক আইন ব্রিটিশদের করা। কিছু আইন তো বড়ো হাস্যকর, অমানবিক! আমরাও যেসব আইন করেছি তা কতটা কার্যকর এটা ভেবে দেখার সময় কোথায়? সম্প্রতি নতুন আইন চালু হয়ে না-থাকলে Child Rights and Juvenile' Article-এ বলা হচ্ছে:
3.13: The most recent and consolidated legislation related to children is the Children Act, 1974.
Section 35: Employing children for beginning, penalty maximum fine Tk. 300/ + and/ or 1 (one) year imprisonment.
Section 42/ 43: Encouraging exposing and seducing sexual intercourse or prostitution of girl child under 16, penalty up to 2 years imprisonment. 

এমনিতে কোন অপরাধ হলে কাউকে এসে অভিযোগ করতে হবে [১], আজব! আমাদের শেষ ভরসাস্থল আদালত কিন্তু এখানে যে কত ধরনের অন্যায় হচ্ছে এর কটার খবর আমরা রাখি? যে নকল উঠাতে সরকারি ফিস ১০০ টাকার নীচে এটা যদি কেউ আমাকে ১৫০০ টাকার নীচে এনে দিতে পারেন তাহলে আমি লেখালেখি ছেড়ে দেব।
একটা নোটিশ জারি করার জন্য এক-দুই দিন না, ৩৬৫ দিনও কম পড়ে যায়! ১ বছরেও একটা জেলা শহর থেকে ঢাকার একটা ঠিকানায় কোর্টের নোটিশ পৌঁছায় না কারণ ঢাকা গিয়ে স্পিড মানি নামের ঘুষ দিয়ে ওই নোটিশ জারী করতে হবে; এটাই নাকি অতি প্রচলিত অলিখিত নিয়ম! যে জজ সাহেব এর দায়িত্বে তিনি একবারও জানতে চান না, জিজ্ঞেস করেন না কেন একটা নোটিশ পৌঁছাতে বছরের পার বছর লাগে?
এখন যে প্রশ্নটা করা যায়, যিনি সরকারকে যথার্থ ফি দিয়ে এই মামলাটা করেছেন ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায়, তার কাজ কি পিয়নের? ঢাকায় গিয়ে ঘুষ দিয়ে এটা সমাধা করতে হবে? তাহলে কোর্টের পিয়নরা আছেন কোন কাজের জন্যে, ঘন্টা বাজাবার জন্য?

জজ সাহেবরা কোন ফেরেশতা না। আমরা এটাও দেখেছি একজন লেখককে শাস্তি দেয়ার জন্য জজ সাহেবরা সমিতির মত করে ফেলার চেষ্টা করেন [২]। ভাগ্যিস, শেষ পর্যন্ত এই হাস্যকর কাজটা আর করা হয়নি। 'জাস্টিস' [৩] নামের লেখায় আমি এই সব প্রসঙ্গে খানিকটা বলার চেষ্টা করেছিলাম। এমনিতে বিচারের এমন নমুনা [৪] যখন দেখি তখন বিচার নামের জিনিসটার প্রতি আর ভক্তি আর থাকে না।

অনেক আইনজীবী মক্কেলের সঙ্গে চুক্তি করেন এতো টাকা হলে তাকে জামিন পাইয়ে দেবেন। মাত্রাতিরিক্ত টাকার চুক্তি হলে মক্কেলের পক্ষে অন্যায্য রায়ও এনে দেবেন। আইনজীবীদের এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়? বড়ো সহজ হিসাব- এরা নাজিরদের মাধ্যমে জজ সাহেবদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোথাও কোথাও সরাসরি জজ সাহেবদের সঙ্গেও।
কিন্তু অন্য রকম দৃশ্যও আছে। একটি বহুজাতিক কোম্পানি বিপুল অংকের টাকা দিয়েও একজন জাজকে কেনা দূরের কথা একচুল নড়াতে পারেনি!
এমন অল্প মানুষদের জন্যই হয়তো এখনও আমরা এই বিশ্বাস বুকে লালন করি, আইনের হাত অনেক লম্বা...। 

জজ সাহেবদেরও অনেক সময় করার কিছু থাকে না। একটা জেলা শহরের উদাহরণ দেই। এখানে একেকজন জজের প্রতিদিনের কার্য তালিকায় আনুমানিক ৪০/ ৪৫টা মামলা থাকে। এই সময়ে তাঁর পক্ষে ৪০/ ৪৫টা মামলার মধ্যে কয়টার শুনানি করা সম্ভব?
এর উপর অবস্থা যদি দাঁড়ায় এমন, প্রধান তিন বিচারকের একজন বদলি হয়েছেন অথচ বদলি জজ এখনও আসেননি, এদিকে আবার একজন বিচারক গেছেন হজে। সবেধন নীলমনি একজন জজের পক্ষে প্রতিদিন ১০০টা মামলার চালানোর গতি কি? জাদুকর না হলে তারিখের পর তারিখ দেয়া ব্যতীত তাঁর তো কোন উপায় থাকার কথা না।

আমাদের সবচেয়ে ভরসার জায়গাটা আমরা কী করে রেখেছি? এই দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১১ লক্ষ! অনেক মামলা আছে ২১ বছরেও শুনানি হয়নি! ১৯৯০ সালে যে শিশুর কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল, কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, সেই শিশু আজ আর শিশু নাই অথচ ২০ বছরেও তার আপিলের শুনানি হয়নি।
রাহেলা [৫] নামের অভাগা মানুষটা কবে বিচার পাবে?
আমি আদলতে কোলে দুধের শিশু নিয়ে যে মহিলাদের দেখেছি পা ছড়িয়ে বসে থাকতে এঁদের পান্ডুর মুখ দেখলে আমার মত কঠিন মানুষেরও চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যায়!

প্রায় ১ মাস পূর্বে প্রধান বিচারপতি যখন নিম্ন আদালত পরিদর্শন করেন, বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, দৈনিক কার্যতালিকা খুঁটিয়ে দেখেন তখনই আমি আশায় বুক বেঁধেছিলাম, এই মানুষটা অন্য রকম। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এভাবে পুরো অবস্থাটা কখনই বুঝতে পারবেন না যে আদালতের অবস্থা কতটা ভয়াবহ। মাননীয় প্রধান বিচারককে অনুরোধ করি, পরিচয় না দিয়ে একবার একটা দিন আদালত চত্ত্বরে অতিবাহিত করুন, আমি সানন্দে আপনার গাইড হবো। আমি নিশ্চিত, আপনি সহ্য করতে পারবেন না, অসুস্থ বোধ করবেন।

সহায়ক লিংক:
১. বেচারা এতিম...: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_11.html 
২. জজ সাহেবদের সমিতিhttp://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_03.html 
৩. জাস্টিস: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_08.html  
৪. বিচারের নমুনা: http://www.ali-mahmed.com/2008/12/blog-post_08.html
৫. রাহেলা একটা চাবুকের নাম: http://www.ali-mahmed.com/2008/02/blog-post_27.html