Saturday, October 30, 2010

'মসৃণ পানীয়'

সফট ড্রিঙ্কস নামের তরল জিনিসটার প্রতি আমার বরাবরই আগ্রহ কম। ভাল কথা, সফট ড্রিঙ্কস জিনিসটার নাম বাংলায় কি হয়? এমনিতে কোমল পানীয় লেখা হয় কিন্তু কোমল পানীয় কেন, 'মসৃণ পানীয়' বললে সমস্যা কোথায়?
আসলে এদের দেখে দেখে আমি বড়ো উদ্বুদ্ধ হয়েছি। মন্ত্রী সাহেবদের যেমন বাংলা নিয়ে কস্তাকস্তি করতে গিয়ে সফটওয়্যারকে 'নরোম তার' বানিয়ে দেন তেমনি আমাদের কিছু পত্রিকাওয়ালারাও বাংলা নিয়ে দুর্ধর্ষ কাজ করেন। 'মুঠোফোন' শব্দটা প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন আমি জানি না কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা এটা হরদম লিখেন। আচ্ছা, এটা এখন আর চালু নাই, আগে যে এক হাত লম্বা সিটিসেলের ফোন ছিল, এটা এখন থাকলে এবং এটাকে মুঠোফোন বলা হলে কী দাঁড়াত! এটাকে কেমন করে মুঠোতে আটকানো যেত এই নিয়ে খানিকটা চিন্তায় আছি। ল্যাপটপের বাংলা এরা কি করবেন এটা নিয়েও আমি খানিক চিন্তিত!

তো, এই 'মসৃণ পানীয়' নামের জিনিসটা বাইরে খাওয়া নিয়ে আমার প্রায়ই ঝামেলা হতো। চোখের নিমিষে বোতলে স্ট্র ঢুকিয়ে দেয়া হতো। স্ট্র নামের জিনিসটার সঙ্গে আমার সখ্যতা নাই। আমি রাগ চেপে বলতাম, কে বলেছে আপনাকে আমাকে না জিগেস করে স্ট্র ঢুকিয়ে দিতে। যথারীতি আমি আরও মুখ গম্ভীর করে বলতাম, নিয়ে যান এটা, এটা আমি খাব না।
কেউ বদলে না দিতে চাইলে, কোথাও সমস্যা হলেও আমার কথা প্রায় অবিকল থাকত, দাম রাখেন কিন্তু এই জিনিস আমি খাব না। হাতে ধরে স্ট্রটা নিয়ে এসে ফট করে বোতলে ঢুকিয়ে দিয়েছে, ব্যাটা কোথায় না কোথায় চুলকেছে।
একবার আমার এক বন্ধু চোখ লাল করে বলেছিল, তুই কি চামচ দিয়ে কোক খাবি? ওরে বুরবাক, চামচ দিয়ে খাব, নাকি চুকচুক করে এই  নিয়ে তোর সঙ্গে সদালাপ করার কোন ইচ্ছা আমার নাই! তুই খা, তোকে আটকাচ্ছে কে!
সভ্য সমাজে স্ট্র দিয়ে খাওয়ারই নিয়ম। স্ট্র দিয়ে অনেককে যে ভঙ্গিতে আয়েশ করে খেতে দেখি মনে হয় এও এক ধরনের স্টাইল। এই ভুবনে কতো ধরনের মানুষ, কত ধরনের তাদের স্টাইল, বিচিত্রসব স্টাইল [১]

আমার হাবিজাবি কাজের জন্যে ফি-রোজ স্টেশনে একটা চক্কর লাগানো হয়ই। আমার মনে হয়, অভিজ্ঞতার জন্য এই জায়গার কোন তুলনা নেই।

মাটিতে পড়ে থাকা স্ট্র উঠাবার আগ মুহূর্তে
ঘুরতে ঘুরতে এই ছেলেটিকে পেয়ে যাই। এ রেললাইন থেকে ফেলে দেয়া স্ট্র কুড়াচ্ছিল। রেলগাড়িতে ভ্রমণ করেননি এমন লুক(!) খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই অতি অল্প মানুষদের উদ্দেশ্যে বলি, রেলগাড়ির টাট্টিখানার কোন তলা থাকে না। জিনিসগুলো কোথায় যায় সেই বিষয়ে আর বিশদ আলাপে যাই না।
আমি ছবি তোলার চেষ্টা করার পূর্বেই এ উঠে আসে প্ল্যাটফরমে। এর সাথে সাথে আমিও হাঁটতে থাকি। নিরীহ মুখে করে জানতে চাই, এই স্ট্র জমানোর কারণ কি?
এ উত্তর দিল, এইটা দিয়া খেলুম।
আমার বিশ্বাস হয় না। এমন একটা ধামড়া ছেলে স্ট্র জমিয়ে খেলবে, কি খেলবে? আমি অদৃশ্য হাঁই তুলে বলি, ভাল-ভাল, যাও খেলা করো।

এবার ছেলেটি নিশ্চিন্তে হাঁটতে থাকে। নিরাপদ দূরত্বে আমিও। আমার অনুমান নির্ভূল। এক হোটেলে স্ট্র নিয়ে ঢুকল ঠিকই কিন্তু বের হলো খালি হাতে। বেশ-বেশ, এই রেস্টুরেন্টে একজন ঘর্মাক্ত মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকবেন। গলা ফাটিয়ে বলবেন, এ্যাই, একটা ঠান্ডা লয়া আয়।
আর কিছু বলার প্রয়োজন নাই। স্ট্র সহ একটা সফট ড্রিঙ্কস চলে আসবে। পোজ দেবেন কিনা জানি না তবে আয়েশ করে ঠান্ডাটা খাবেন। ঠান্ডা খেয়ে মাথায় ডান্ডা না-মেরেও ঢেকুরের উৎকট একটা শব্দ গলা দিয়ে বের করবেন। ভাগ্যিস, ওখানে আমি নেই নইলে মনে মনে বলতাম, তালিয়া...। 
এই স্ট্র দিয়ে কেউ ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে 'মসৃণ পানীয়' খাচ্ছে এটা আমি ভাবতে চাই না। এরা গা দোলানো চালু রাখুক, আমি নিজের গা গুলানো আটকাবার চেষ্টা করি।

প্লাস্টিকের একটা বোতল থেকে এই ব্যাগটা বানানো
*একজন পাঠক চমৎকার একটা মন্তব্য করেছেন রিসাইক্লিং টেকনোলজির বাংলাদেশি ভার্সন। ভালই তো, লালমুখো বাঁদররা করে এমন ভাবে আর আমরা করি এমন...। যেই দেশের যে চল...।

সহায়ক লিংক:
১. স্টাইল: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_27.html