Search

Loading...

Sunday, October 31, 2010

চল-চল-চল, গাছে ধরেছে ফল

আমরা এতো কষ্ট করে গাছ লাগিয়েছি, সযতনে পানি দিয়েছি, মমতায় লালন করেছি; এখন গাছ ভরে ফল ধরেছে। এতে অবাক হওয়ার কী আছে! ফলগুলো 'বিষফল' তাই? আহা, লাগাব বিষবৃক্ষ ধরবে কি রসালো কোন ফল?
প্রকারান্তরে ইভ টিজিং যে খুনের নামান্তর এটা কি আমরা অদ্য জানলাম? আমি জানি না, এর কোন সমীক্ষা করা হয়েছে কি না? অনুমান করি, এই দেশের লক্ষ-লক্ষ মেয়ে কেবল এই কারণেই অর্ধ-শিক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এসএসসি পাশ করার পূর্বেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিয়ে হওয়া আগ পর্যন্ত এর ভুবনটা থাকে এলোমেলো- মানসিক বিকারগ্রস্ত।

ইভ টিজিং নিয়ে দেশ এখন উত্তাল। দেশ উত্তাল নাকি মিডিয়া? এই ঘটনাগুলো মিডিয়া লাইম লাইটে নিয়ে না-আসলে কি আর আমরা উত্তাল হই? এখানেও কিছু হিসাব-কিতাব আছে, প্রথম পাতায় কোথায় খবরটা ছাপা হবে, কোন ভঙ্গির কান্নার ছবিটা ভাল আসবে। গোল টেবিল আলোচনায় কারা কারা থাকবেন।

এমনিতে এই খবরগুলোই হেলাফেলা ভঙ্গিতে মফস্বলের পাতায় ছাপা হলে আমরা চোখ বুলিয়েই সারা। যারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পত্রিকা পড়েন তাঁদের পক্ষেই সম্ভব কেবল এই খবরগুলো জানা। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের এতো সময় কোথায় মফস্বলের সংবাদ পড়ার। আর কি দায় পড়েছে এ নিয়ে মাথা ঘামাবার? কোন এক গন্ডগ্রামে কে কাকে চাপা দিল, কেন দিল...।

কই, ব্র্যাক ব্যাংকের অত্যাচারে, শত-শত মানুষের সামনে একজন বয়স্ক মানুষের মৃত্যু হয় এই খবরটা দেখি অনেক দৈনিকে ছাপার যোগ্যতা অর্জন করে না [১]। গ্রামীন ব্যাংকের অপমানে একজন কিশোরী আত্মহত্যা করে এই খবর মফস্বলের পাতায় আসে [২] কিন্তু আমাদের দেশের সো-কলড বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি কাড়ে না। এই কারণেই বলছিলাম ইভ টিজিং নিয়ে মিডিয়া উত্তাল তো আমরা উত্তাল।

এমন না এই ঘটনাগুলো সম্প্রতি ঘটছে। এটা চলে আসছে, চলেই আসছে। এটা চলে আসার জন্য ঝোপঝাড় কেটে রাস্তা আমরাই সুগম করে রেখেছি। এটা হুট করে হয়নি, এটার জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে, এর পেছনে কঠোর সাধনা আছে। আগে ছেলেপেলেরা বখাটেপনা করলে মুরুব্বিরা কান ধরে চটকনা লাগালেই অনেক বড়ো বড়ো সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। তারপরও সমস্যা না-মিটলে গ্রামে মুরুব্বিরা বসে সমাধান করে ফেলতেন।
এখন আর এটার চল নাই কারণ বখাটে কেন বখাটের বাবারও এই আচরণ-পদ্ধতি পছন্দ না। কারণ তাকেও এই সমাজে থাকতে হয়, পুতুপুতু ছেলে দিয়ে এখন আর চলে না, প্রয়োজন ক্ষমতাবান ছেলে। তারা মনে করছেন, অদৃশ্য এক ক্ষমতার বলয় প্রয়োজন কারণ এই সমাজব্যবস্থা এখন আর তাদেরকে যথেষ্ঠ নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ছেলেকে ক্ষমতাবান হতে হলে তাকে কোন-না-কোন একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জুড়ে যেতে হয়। কোন এক বড় ভাইয়ের বগলতলায় থাকতে হয়। তখন তাকে আর পায় কে, চরম বখাটেপনা করলেও কি আর হবে? ওসির সঙ্গে বসে যে বড় ভাই চা খান। এমপি সাহেবের একটা ফোন কলে দিন-রাত, রাত-দিন হয়ে যায়। উল্টো পুলিশ প্রতিবাদকারীকে কলার ধরে নিয়ে আসবে। বয়সের জন্য কোন ছাড় নাই, পুলিশ এমন আচরণ করবে ফিরে এসে নিজের বাড়িতে স্বইচ্ছায় কান ধরে উঠবস করবেন, কেন গিয়েছিলেন থানায়। তো, কার দায় পড়েছে, কার ঘাড়ে দুটা মাথা!
ফল যা হওয়ার তাই হয়, শত-শত মানুষের চোখের সামনে কোন মেয়েকে কেউ উত্যক্ত করলেও কেউ এখন আর এগিয়ে আসে না। জানে লাভ নাই। কেবল কালে কালে দেশে নপুংশকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

অন্য প্রসঙ্গ। হালের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমি যে স্কুল চালাই এটা দেখার জন্য একটা স্কুলের বেশ কিছু বাচ্চা এসেছে, এদের মধ্যে ফোর-ফাইভ পড়ুয়া বাচ্চাও আছে। আমাদের স্কুলে পড়াবার ধরাবাঁধা কোন নিয়ম নেই, যখন যেটা প্রয়োজন সেটাই পড়ানো-শেখাবার চেষ্টা করা হয়। আমি টিচারকে বললাম, বই বন্ধ থাকুক। সমস্ত বাচ্চাদের বললাম, এখন অন্য বিষয়। আচ্ছা, এক এক করে সবাই বলো তো তোমাদের দাদার নাম কি? অধিকাংশ বাচ্চাই দাদার নাম বলতে পারেনি। টিচার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি স্বাভাবিক কারণ এমনটাই আমার অনুমান ছিল। আমরা সবাই মিলে বাচ্চাদেরকে বড়ো করছি একেকটা রোবট করে। শেকড় থেকে ক্রমশ আমরা দূরে সরে যাচ্ছি- দাদার নাম জানার প্রয়োজন নাই। অচিরেই আমরা বাপের নামও ভুলে যাব।

এর জন্য আমাদের মিডিয়ারও অনেক লম্বা হাত আছে। উদাহরণ দেই, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গানের একটা অনুষ্ঠান হয়। এখানে একেক দিন একেক শিল্পী আসেন। ওদিন এসেছিলে বাপ্পা মজুমদার। শিল্পীর সঙ্গে একজন অনুষ্ঠানে বসার সুযোগ পান। ওদিন অল্পবয়সী যে মানুষটা এসেছিলেন, বাপ্পার সঙ্গে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি ২৫০০ এসএমএস করে এখানে এসেছেন। ২৫০০ এসএমএস, ভাবা যায়! অতি অল্প সময়ে এই বিপুল এসএমএস পাঠাবার জন্য এই মানুষটাকে ওনার অসংখ্য বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে এই 'এসএমএসযজ্ঞে' যোগ দিতে হয়েছিল এখানে আসার জন্য! তা এই গাধাটা পড়বে কখন? বাপ্পা মজুমদারসহ কেউ এই প্রশ্নটা করলেন না, একজন ছাত্রকে ২৫০০ এসএমএস করার জন্য কি বিপুল টাকাই না খরচ হয়েছে, লেখাপড়া শিকেয় উঠেছে। এমন অসংখ্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালু করে অসংখ্য অসুস্থ মানুষ তৈরি হচ্ছে। এই দেশে এখন নাদুস-নুদুস জোঁক হচ্ছে ফোন কোম্পানিগুলো। অধিকাংশ সেলিব্রেটিরা এদের কাছে আত্মা বন্ধক রেখেছেন।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে রাতারাতি অসংখ্য স্টার পয়দা হচ্ছে। হৃদয় খান [৩] নামের এক স্টারের এক অনুষ্ঠান দেখে আমার মনে হয়েছিল, ম্যানার-সহবত শেখার জন্য এর তো নতুন করে স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন।
হাসান নামের যে মানুষটা ঘান (!) করেন ওদিন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লাইভ ঘানের (!) অনুষ্ঠানে দেখলাম, যেসব শ্রোতা ফোন করছেন তাঁদেরকে তিনি অবলীলায় তুমি তুমি করে বলছেন। এই বেয়াদব স্টারেরও প্রয়োজন স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন করে...।

শ্লা, হরলিকস খেলে বাচ্চা লম্বা হয়! বাপ-মা পাঁচ ফুট বাচ্চা হবে আট ফুট! কী একেকটা বিজ্ঞাপন! ডানো খাওয়া বাচ্চাগুলো ছাতা নিয়ে এখন গাছের মগডাল থেকে লাফ দেয়, ক-দিন পর ছাদ থেকে লাফ দেবে [৪]
ফোন কোম্পানিগুলো পারলে বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর পরই হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেয়। এখন ছয় কোটি সিম, আমি আশা করছি অচিরেই এটা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। চুলায় বেড়াল ঘুমায়, তাতে কী- আমাদের মোবাইল ফোন থাকাটা জরুরি! এই দেশের জন্য এখন সবচাইতে মায়া হচ্ছে ফোন কোম্পানিগুলোর। এদের সঙ্গে কাঁদেন এই দেশের বুদ্ধিজীবীরা, কাঁদতে কাঁদতে দেশে অকাল বন্যা নিয়ে আসেন।

আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে, ডাব এবং সফট ড্রিঙ্কের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। রোবট বানাবার শিক্ষাটা আমরাই চালু রেখেছি, সানন্দে।
বাবা-মার চেয়ে টিভি বড়ো [৫]। ভাল টাকা দিলে অপি করিমের মত সেলিব্রেটিরা এটাও আমাদেরকে শিখিয়ে দেবেন।
ভাল টাকা পেলে আমরা উবু হয়ে পটিতেও বসার ভঙ্গি করব। টাকার অংকটাই আসল। প্রয়োজনে আমরা মাকেও বিক্রি করে দেব। বিক্রি করে দেব তাঁর ফুসফুস, কিডনি, লিভার।
তো, লাগাচ্ছি আমরা বিষবৃক্ষ গাছ এখন ফল ধরার মরসুম, ঝেপে ফল এসেছে এতে অবাক হওয়ার তো কিছু নাই।

সহায়ক লিংক:
১. ব্র্যাক: লাশ-পদক-বানিজ্য: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html 
২. গ্রামীন ব্যাংক, লাইফ...: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html 
৩. হৃদয় খান: http://www.ali-mahmed.com/2009/07/blog-post_21.html 
৪. শিশু হত্যার মারণাস্ত্র: http://www.ali-mahmed.com/2008/09/blog-post_22.html 
৫. অপি করিম, এই অসভ্য বিজ্ঞাপন: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_19.html               

Saturday, October 30, 2010

'মসৃণ পানীয়'

সফট ড্রিঙ্কস নামের তরল জিনিসটার প্রতি আমার বরাবরই আগ্রহ কম। ভাল কথা, সফট ড্রিঙ্কস জিনিসটার নাম বাংলায় কি হয়? এমনিতে কোমল পানীয় লেখা হয় কিন্তু কোমল পানীয় কেন, 'মসৃণ পানীয়' বললে সমস্যা কোথায়?
আসলে এদের দেখে দেখে আমি বড়ো উদ্বুদ্ধ হয়েছি। মন্ত্রী সাহেবদের যেমন বাংলা নিয়ে কস্তাকস্তি করতে গিয়ে সফটওয়্যারকে 'নরোম তার' বানিয়ে দেন তেমনি আমাদের কিছু পত্রিকাওয়ালারাও বাংলা নিয়ে দুর্ধর্ষ কাজ করেন। 'মুঠোফোন' শব্দটা প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন আমি জানি না কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা এটা হরদম লিখেন। আচ্ছা, এটা এখন আর চালু নাই, আগে যে এক হাত লম্বা সিটিসেলের ফোন ছিল, এটা এখন থাকলে এবং এটাকে মুঠোফোন বলা হলে কী দাঁড়াত! এটাকে কেমন করে মুঠোতে আটকানো যেত এই নিয়ে খানিকটা চিন্তায় আছি। ল্যাপটপের বাংলা এরা কি করবেন এটা নিয়েও আমি খানিক চিন্তিত!

তো, এই 'মসৃণ পানীয়' নামের জিনিসটা বাইরে খাওয়া নিয়ে আমার প্রায়ই ঝামেলা হতো। চোখের নিমিষে বোতলে স্ট্র ঢুকিয়ে দেয়া হতো। স্ট্র নামের জিনিসটার সঙ্গে আমার সখ্যতা নাই। আমি রাগ চেপে বলতাম, কে বলেছে আপনাকে আমাকে না জিগেস করে স্ট্র ঢুকিয়ে দিতে। যথারীতি আমি আরও মুখ গম্ভীর করে বলতাম, নিয়ে যান এটা, এটা আমি খাব না।
কেউ বদলে না দিতে চাইলে, কোথাও সমস্যা হলেও আমার কথা প্রায় অবিকল থাকত, দাম রাখেন কিন্তু এই জিনিস আমি খাব না। হাতে ধরে স্ট্রটা নিয়ে এসে ফট করে বোতলে ঢুকিয়ে দিয়েছে, ব্যাটা কোথায় না কোথায় চুলকেছে।
একবার আমার এক বন্ধু চোখ লাল করে বলেছিল, তুই কি চামচ দিয়ে কোক খাবি? ওরে বুরবাক, চামচ দিয়ে খাব, নাকি চুকচুক করে এই  নিয়ে তোর সঙ্গে সদালাপ করার কোন ইচ্ছা আমার নাই! তুই খা, তোকে আটকাচ্ছে কে!
সভ্য সমাজে স্ট্র দিয়ে খাওয়ারই নিয়ম। স্ট্র দিয়ে অনেককে যে ভঙ্গিতে আয়েশ করে খেতে দেখি মনে হয় এও এক ধরনের স্টাইল। এই ভুবনে কতো ধরনের মানুষ, কত ধরনের তাদের স্টাইল, বিচিত্রসব স্টাইল [১]

আমার হাবিজাবি কাজের জন্যে ফি-রোজ স্টেশনে একটা চক্কর লাগানো হয়ই। আমার মনে হয়, অভিজ্ঞতার জন্য এই জায়গার কোন তুলনা নেই।

মাটিতে পড়ে থাকা স্ট্র উঠাবার আগ মুহূর্তে
ঘুরতে ঘুরতে এই ছেলেটিকে পেয়ে যাই। এ রেললাইন থেকে ফেলে দেয়া স্ট্র কুড়াচ্ছিল। রেলগাড়িতে ভ্রমণ করেননি এমন লুক(!) খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই অতি অল্প মানুষদের উদ্দেশ্যে বলি, রেলগাড়ির টাট্টিখানার কোন তলা থাকে না। জিনিসগুলো কোথায় যায় সেই বিষয়ে আর বিশদ আলাপে যাই না।
আমি ছবি তোলার চেষ্টা করার পূর্বেই এ উঠে আসে প্ল্যাটফরমে। এর সাথে সাথে আমিও হাঁটতে থাকি। নিরীহ মুখে করে জানতে চাই, এই স্ট্র জমানোর কারণ কি?
এ উত্তর দিল, এইটা দিয়া খেলুম।
আমার বিশ্বাস হয় না। এমন একটা ধামড়া ছেলে স্ট্র জমিয়ে খেলবে, কি খেলবে? আমি অদৃশ্য হাঁই তুলে বলি, ভাল-ভাল, যাও খেলা করো।

এবার ছেলেটি নিশ্চিন্তে হাঁটতে থাকে। নিরাপদ দূরত্বে আমিও। আমার অনুমান নির্ভূল। এক হোটেলে স্ট্র নিয়ে ঢুকল ঠিকই কিন্তু বের হলো খালি হাতে। বেশ-বেশ, এই রেস্টুরেন্টে একজন ঘর্মাক্ত মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকবেন। গলা ফাটিয়ে বলবেন, এ্যাই, একটা ঠান্ডা লয়া আয়।
আর কিছু বলার প্রয়োজন নাই। স্ট্র সহ একটা সফট ড্রিঙ্কস চলে আসবে। পোজ দেবেন কিনা জানি না তবে আয়েশ করে ঠান্ডাটা খাবেন। ঠান্ডা খেয়ে মাথায় ডান্ডা না-মেরেও ঢেকুরের উৎকট একটা শব্দ গলা দিয়ে বের করবেন। ভাগ্যিস, ওখানে আমি নেই নইলে মনে মনে বলতাম, তালিয়া...। 
এই স্ট্র দিয়ে কেউ ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে 'মসৃণ পানীয়' খাচ্ছে এটা আমি ভাবতে চাই না। এরা গা দোলানো চালু রাখুক, আমি নিজের গা গুলানো আটকাবার চেষ্টা করি।

প্লাস্টিকের একটা বোতল থেকে এই ব্যাগটা বানানো
*একজন পাঠক চমৎকার একটা মন্তব্য করেছেন রিসাইক্লিং টেকনোলজির বাংলাদেশি ভার্সন। ভালই তো, লালমুখো বাঁদররা করে এমন ভাবে আর আমরা করি এমন...। যেই দেশের যে চল...।

সহায়ক লিংক:
১. স্টাইল: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_27.html    

Friday, October 29, 2010

লাশ, আমাদের বড়ো প্রয়োজন

ছবি ঋণ: প্রথম আলো
রূপগঞ্জ নিয়ে যে কান্ডটা ঘটে গেল এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে জোর আলোচনা চলছে। আমার এই লেখার মূল উপজীব্য এটা না আর্মিদের জন্য এভাবে জমি কেনা ঠিক, কি বেঠিক; সেটা অন্যত্র লেখার প্রসঙ্গ।

অন্যায় হচ্ছে একটা চেইন, অনেকগুলো আংটা একটার সঙ্গে অন্যটা জড়িয়ে থাকে। এখানেও যা হওয়ার তাই হয়েছে, তে অবাক হ্ওয়ার কিছু নাই।
এটা কী রাতারাতি হয়েছে? রাতের আধারে কি এখানে সেনা ছাউনি গজিয়েছে? এটাও কি সদ্য ঘটল, একজনের জমি বিক্রি করার জন্য সেনাবাহিনীর অনুমতি নিতে হবে?
রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার বলেছেন, "...জমি কেনাবেচা না করার জন্য মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন সেনাসদস্যরা। ...জমি কিনতে বা বিক্রি করতে তাদেঁর অনুমতি নিতে হতো। সেনাসদস্যরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভেতর বসে থাকতেন। তাঁরা গ্রামের লোকজনকে দলিল করতে দিতেন না। কেউ দলিল করলেও তাকে টিপ সই দিতে দিতেন না..."।
দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক বলেন, "...জমি কেনাবেচায় সেনাসদস্যরা বাঁধা দিতেন। ভয়ে দলিল লেখকরাও ওই এলাকার দলিল করতে চাইতেন না"। [১] (প্রথম আলো: ২৫.১০.২০১০)

এমন অজস্র উদ্বৃতি দেয়া সম্ভব। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় দিনের-পর-দিন ধরে সেনাসদস্যরা এখানে তাঁদের সেনা আইন চালু রেখেছিলেন। দেশে কি মার্শাল ল চলছে যে ক্যান্টনমেন্টের আইন সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছে? এএইচএস ওয়েবসাইটে যে নকশা এঁরা দেখিয়েছেন- ভাগ্যিস, ওখানে মাকিংটা করা ছিল, নইলে যে সমগ্র বাংলাদেশ বোঝাতো। তখন আমাদের কি উপায় হতো?
রূপগঞ্জের মানুষদের এতো অল্পতে অস্থির হলে চলে! পাহাড়ি নামের এই আদিমানুষদের গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে- কই, আদিমানুষরা তো অস্থির হচ্ছে না। ২০০৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে রুমায় সেনানিবাসের জন্য যে ৭৫০০ একর জমি নেয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল এর লেটেস্ট খবর কি? ৭৫০০ একরে কি হবে নাকি এর পরিমাণ আরও বাড়বে? কারণ জমি চাওয়া হয়েছিল, ৯৫৬০ একর।
তারচে ভাল হয়, সমগ্র বাংলাদেশকে সেনানিবাসের জন্য অধিগ্রহন করা হোক এবং আমরাও সবাই আর্মিতে ভর্তি হয়ে যাই, তাহলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়। নাপিতদেরও ব্যবসা রমরমা হলো মাথায় বাটি বসিয়ে 'বাটিছাঁট'।

সেনাসদস্যদের নিয়ে যেতে সামরিক হেলিকপ্টার উড়ে চলে এসেছে। কোত্থেকে যে হেলিকপ্টারগুলো বের হয়ে আসে! ওহো, সামরিক হেলিকপ্টার, তাই বলুন! অসামরিক লোকজনের জন্য তো আর এটা না। অসামরিক লোকজনের প্রয়োজন হলে দু-একটা উদাহরণ বাদ দিলে হেলিকপ্টারের টায়ার পাংচার হয়ে যায়, না? আরে কি বলতে কী বলি, হেলিকপ্টটার কি রিকশা যে টায়ার পাংচার হবে?
একজন মারা গেছে। কিভাবে মরল এটা আমাদের জেনে কাজ নেই। হয়তো সেনাবাহিনীর লোকজনের অস্ত্রের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে গিয়েছিল। মানুষকে বাদ নিয়ে অস্ত্রের সঙ্গে কস্তাকস্তি করাটা সূখের বিষয় না। এদিকে সেনাবাহিনী বলছে দুর্ঘটনাবশত কয়েকটা গুলি বেরিয়ে গেছে।
আমি বলি কি, এখুনি ওই অস্ত্র নষ্ট করে ফেলা হোক কারণ যে অস্ত্র নিজে নিজে গুলি করা শিখে যায় এমন অস্ত্র রাখার কোন মানে নেই। 'সেফটি ক্যাচ' আমরা না চিনতে পারি, লিখতে ভুল করতে পারি; যারা অবগত তাদের তো না জানার কোন কারণ নাই।
এখন পর্যন্ত তিনজন নিখোঁজ। এই তিনজন অসামরিক বলেই এদের খোঁজার প্রয়োজন নাই। পূর্বেও আমরা দেখেছি, অসামরিক লোকজনের লাশ ভেসে যায়, ভরসা রুস্তম হামজা নামের দুই বুড়া হাবড়া। ফলে আমরা লাশ পাই না, পাই ছাগলের সঙ্গে রশি, ফ্রি।  [২]

এখন যেটা সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, চার হাজার গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ আরেক বিচিত্র! চার হাজার মানুষকে আসামি করা হয় কেমন করে? চার হাজার মানুষের নাম-ধাম লেখা হয় কেমন করে? লেখার জন্য চুক্তিভিক্তিতে লোক নিয়োগ দেয়া হয়? নাকি অজ্ঞাতনামা লিখে দিলেই হয়? এরা তো কেবল চার হাজার সংখ্যা না, এঁদের একেকজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটা পরিবার। তার মানে হাজার-হাজার মানুষের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। নিরীহ যারা তাদের কোন ভয় নেই এমন আশ্বাসবাণী শুনতে ভালই লাগে।
যেমন এটাও শুনতে ভাল লাগে যখন পত্রিকায় আসে, অমুক নতুন ওসি সন্ত্রাসীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন, আগের ওসি সাহেবের মাসোহারা ১ লাখ হলে ওনারটা হয়ে যায় ১ লাখ ২০ হাজার। মূর্তিমান আতঙ্ক যে...!
এদিকে এদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেয়া হচ্ছে। হালে সেনাবাহিনীও মামলা করেছে। এঁরা পূর্বে বলেছে, দুর্ঘটনাবশত কয়েকটা গুলি বেরিয়ে গেছে; এখন বলছে, কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছে! পুর্বে বলেছে, অস্থায়ি ক্যাম্প এখন বলছে, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প!

কিন্তু আমার মনে যে প্রশ্নটা আসছে, এই সাব-রেজিস্ট্রার এই তথ্যটা এখন বলছেন কেন? তিনি তাঁর উর্ধতন কর্মকর্তা বা মন্ত্রণালয়ে জানালেন না কেন? নিরীহ কৃষকদের কাগজে চুল পরিমাণ সমস্যা থাকলে তাঁরা দেখি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হয়ে যান। খুশি না করলে কলমই ধরেন না! আর দলিল লেখক ভাইজানরা, তাঁরা কি পূর্বে মুখে স্কচ টেপ লাগিয়ে বসে ছিলেন?
ওয়েল, এই সব তথ্য আমরা এখন জানলাম কেন? আমাদের চোখ হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়া রূপগঞ্জের এই সমস্ত তথ্য কি কেবল এখনই জানল? এই তথ্যটা পত্রিকায় এখনই কি ফলাও করে ছাপাবার মত যোগ্যতা অর্জন করল? যোগ্যতা অর্জন করার জন্য একটা তথ্যের কি লাগে, তথ্যটা কি ফলের মত পেকে টসটসে হতে হয়? এই ঘটনা ঘটার পূর্বে এই দেশের মিডিয়ার সমস্ত লোকজনরা কোথায় ছিলেন? নাকি অপেক্ষায় ছিলেন নিউজের জন্যে? একটা চমৎকার নিউজ...। যেটা পাবলিক খাবে ভাল?
মফস্বল সাংবাদিক নামের লোকজনরা কি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পূর্বে এটা নিয়ে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন? না পাঠিয়ে থাকলে পত্রিকাওয়ালাদের যেটা এখুনি করা প্রয়োজন রূপগঞ্জের সমস্ত সাংবাদিকদের কারণ দর্শানো, কেন এই সমস্ত অনাচার নিয়ে পূর্বে রিপোর্ট করা হলো না। রূপগঞ্জের সাংবাদিকরা স্কুলের বাচ্চা হলে বলতাম, অফিসে ডেকে নিয়ে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতে। নাকি রিপোর্ট করা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু ছাপানো হয়নি, সর্দি মুছে ফেলে দেয়া হয়েছে?

হতে পারে এমন কারণ আমাদের দেশের মিডিয়া-পত্রিকাওয়ালাদের মফস্বলের সাংবাদিকদের প্রতি আছে তাচ্ছিল্য। এখানেও আছে ব্রাক্ষ্ণন-শূদ্রের খেলা। আমাদের পত্রিকাওয়ালা ব্যস্ত থাকেন ঢাকার সংবাদ ছাপাবার জন্য। কোন নেতা ভাঙ্গা রেকর্ডের মত গান গেয়েই যাচ্ছেন, কোন নেতা সংসদে কোন কালারের শাড়ি পরে এসেছেন এই সব খবর ছাপিয়ে জায়গা কোথায়? এই সব খবরের জন্যে আমরা পাঠকরা যে মুখিয়ে থাকি। আবার এই মফস্বল সাংবাদিকদেরও সংবাদ ছাপাবার জন্য নাকি ধরাধরি করতে হয়। সুরেশ তেলের কথা মুখে মুখে- যে যত ভাল তেলবাজ তার সংবাদের ততই গুরুত্ব।

আচ্ছা, পত্রিকাওয়ালাদের কি গোয়েন্দা বিভাগ টাইপের কোন শাখা আছে কি? এরা কি জানেন, এদের মফস্বলের সাংবাদিকদের হালচাল? অধিকাংশ মফস্বলের সাংবাদিক এখন তথ্য খোঁজেন না, তথ্য তাকে খুঁজে ফেরে। আমি যে ঘুষকে স্পীড মানি বলি, এখানে এটার চালু নাম হচ্ছে 'কনভেন্স'। ভাই, আমার নিউজটা...সাথে কনভেন্সের নামে মফস্বলের সাংবাদিকের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় খাম। সেই খামে কি থাকে এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়া লাগে না।
আর বেচারা মফস্বল সাংবাদিকরা যাবেনটা কোথায়! অধিকাংশ পত্রিকাই এঁদের বেঁচে থাকার মত যথেষ্ঠ টাকা দেন না। প্রায় প্রত্যেকেরই সাইড বিজনেস নামে হাবিজাবি কিছু-না-কিছু একটা আছেই। দোকানের চেয়ারে বসে বসে নিউজ একটা পাঠিয়ে দিলে দেখতে যাচ্ছেটা কে, আটকাচ্ছে কে!
ফল যা হওয়ার তাই হয়, মিডিয়া নামের আমাদের চোখটা ঘোলাটে হয়ে আসে। ঘোলাটে চোখে আমরা সব দেখি ছায়া-ছায়া, তমোময়! এ চোখ আমাদের কী কাজে লাগে কে জানে! হ্যাঁ, এই পরিস্থিতি পালটে যায় যখন পরিস্থিতি চরমে, কয়েকটা লাশ পড়ে। তখন নড়েচড়ে বসে মিডিয়া, নাড়ায় আমাদের।

দিন-মাস-বছর ধরে চার চারটি সেনাক্যাম্প অথচ কেউ কিচ্ছু জানে না! না মিডিয়া, না প্রশাসন, না জনপ্রতিনিধি! এঁরা কি তখন কুহতুর পর্বতে ধ্যান করা জন্য দেশের বাইরে ছিলেন? ওয়াল্লা, এখন দেখি সবাই মুখ হাঁ করে রেখেছেন, এঁরা যে বোবা না এটা প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এখন কত্তো কত্তো কথা...!

আসলে আমাদের লাশ বড়ো প্রয়োজন, নইলে আমরা আবার নড়াচড়া করতে পারি না, জোশ আসে না...।

সহায়ক লিংক:
১. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=2&date=2010-10-25
২. ছাগলের সঙ্গে রশি, ফ্রি: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_15.html  

Wednesday, October 27, 2010

পশুটার গায়ের গন্ধ

পূর্বের কোন লেখায় আমি লিখেছিলাম, "আমাদের সবার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটা শিশু এবং একটা পশু। এদের মধ্যে মারামারি লেগেই থাকে হরদম। কখন যে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে এটা বলা মুশকিল"।
এই পশুটাকে কাবু করার জন্য আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। আমরা আমাদের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান ব্যয় করি এর পেছনে, এটা অবশ্য অন্ধকারে অচেনা ঢিল ছোঁড়ারই নামান্তর!
আমাদের বলতে আমি সাধারণদের বোঝাচ্ছি। সাধু-টাধুদের এই হ্যাপা নেই কারণ এদের মধ্যে আবার লুকিয়ে থাকবে কে, এরা নিজেরাই তো থাকেন লুকিয়ে, লোকচক্ষুর অন্তরালে! 

স্টেশনের স্কুলটা [১] নিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হয় কারণ এখানকার কিছু শিক্ষার্থী আছে যাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আমি ঝুলে থাকি, যতদিন পর্যন্ত চেষ্টা করা যায়। টিচারের পক্ষে এদেরকে সামাল দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে, নিয়ম করে আমাকেও থাকতে হয়। তিনটা স্কুলের মধ্যে কেবল এই স্কুলটাতেই শেখাবার বেলায় সরাসরি যুক্ত থাকতে হয়। সত্যি বলতে কি, আমার খারাপ লাগে না; সময়টা উপভোগ করি।
আরেকটা কারণ আছে, এই স্কুলে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯২! যদিও প্রতিদিন উপস্থিতির সংখ্যা অনেক কম, গড় হবে সম্ভবত ৪০। একজনের জন্য খানিকটা কঠিন হয়ে যায়, কেবল সংখ্যার কারণে না, একেকজনের পড়া একেক রকম। কেউ অ-আ; তো কেউ সানডে-মানডে।  

এর নাম খোকন। এই ছবিটা ওর স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়কার। তখন আমি এদের সবার ছবি উঠিয়ে একটা ডাটাবেইজের মত বানাচ্ছিলাম। কেবল এদের নাম-ধামই না, কার আচরণ কেমন, কার জন্য আলাদা করে কোনটা করা প্রয়োজন, কে নেশা করে, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত ইত্যাদি।
খোকন নামের এই ছেলের বিরুদ্ধে এখানকার শিক্ষক আমাকে বেশ কবার বলেছেন, একে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। গতকাল এ শিক্ষকের প্রতি এমন অভব্য-অসভ্য আচরণ করেছে যেটা আমি নিজের চোখেই দেখলাম।
মাত্র এদের স্কুল ড্রেস দেয়া শুরু হয়েছিল আজই এ স্কুল ড্রেস গায়ে দিয়ে এসেছে। আমি একে বললাম, স্কুল ড্রেস রেখে স্কুল থেকে চলে যাও, আর স্কুলের আসবে না। এ স্কুল ড্রেস দিয়ে চলে গেল। আমার মতে, একে স্কুল থেকে বের করে দেয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত। একজন-দুজনের জন্য গোটা স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা চলে না। এটা আমি করতে পারি না তাহলে অন্য অনেক বাচ্চার সঙ্গে অন্যায় করা হয়।
ঘটনা খুবই সহজ-সরল কিন্তু..., একটা কিন্তু থেকে যায়...। ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম বলেই হয়তো তখন এটা লক্ষ করিনি!
পরে মাথায় আটকে গেল। একটা ছেলে খালি গায়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আমার চোখে কেবল এই দৃশ্যটা স্থির ছবির মত জমাট বেঁধে আছে। আর কিচ্ছু না...।

গতকাল আমার জরুরি লেখাটা, 'রূপগঞ্জ' নিয়ে লেখার কথা কিন্তু লিখতে ইচ্ছা করছিল না, একদম না। বছরের-পর-বছর ধরে আমি প্রায় প্রতিদিনই কিছু-না-কিছু লিখি। বাইরে কোথাও গেলে, বা অসুস্থ, অথবা অসম্ভব মনখারাপ না-থাকলে এর ব্যত্যয় হয় না। বিগত দুই বছরে আমাকে অনেক প্রতিকূলতা সামাল দিতে হয়েছে কিন্তু নিয়ম করে লেখা হয়েছে। অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা আমার লেখাকে কাবু করতে পারেনি। মাথার উপর ভয়াবহ বিপদ নিয়ে আমি লিখে গেছি কারণ যখন লিখি তখন জাগতিক বেদনা আমাকে স্পর্শ করতে পারে না কিন্তু গতকালের দিনটা ছিল অন্য রকম। কেবল এই দৃশ্যটা, একটা ছেলে খালি গায়ে...।
একে স্কুল থেকে বের করা নিয়ে আমি বিচলিত না, আমার ধারণা এটা সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু...।

এটা আমি কি করলাম? আমি তো এটাও বলতে পারতাম, তুমি কাল স্কুলে এসে ড্রেসটা জমা দিয়ে যাবে। আর একটা স্কুল ড্রেস একজন না-দিলেই কি? আকাশ তো আর খানিকটা নীচে নেমে আসত না!

লেখা গেল নরকে! রাত বাজে এগারোটা, আমি স্টেশনের দিকে হাঁটা ধরি। আমি জানি, এ গাড়িতে পানি বিক্রি করে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এর কোন হদিশ বের করতে পারি না। এ কোথায় আছে কেউ কোন খোঁজ দিতে পারল না।
আমি রাতে একে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেই। আজ সকালে তিনবার স্টেশনে চক্কর লাগিয়েও এর নাগাল পাওয়া গেল না। চতুর্থবার একে পেয়ে যাই।
আমি কোন ভনিতা না করেই বলি, কাল তুমি খুব খারাপ আচরণ করেছ, তোমাকে স্কুলে রাখা হবে না এটাই সিদ্ধান্ত কিন্তু কাল আমি তোমার ড্রেস রেখে দিয়েছি, তুমি খালি গায়ে স্কুল থেকে গেছ এর জন্য আমার মন খারাপ, খুব খারাপ। আমি এই অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত, তোমাকে এটা বলার জন্য কাল রাত থেকে তোমাকে খুঁজছি। আর তোমার জন্য আমি কয়েকটা কাপড় নিয়ে এসেছি এখান থেকে যেটা পছন্দ হয় তুমি বেছে নিতে পারো।

খোকন এটা বেছে নিয়ে গায়ে দেয়। নিজে থেকেই বলে, স্যার, আমারে কি সুন্দর লাগতাছে?
ঝাপসা চোখে আমি বিড়বিড় করে বলি, হ, সুন্দর, খুব সুন্দর। দাঁড়াও তুমার একটা ছবি তুইলা দেখাই। এই দেখো, কেমন, সুন্দর হইছে না?

চলে আসার সময় খোকন ইতস্তত করে বলে, আমার টেকা কি পামু না, স্যার?
আমার মনে পড়ে এ টিচারের কাছে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছিল। ঝাপসা খোকনের দিকে তাকিয়ে আমি বলি, অবশ্যই পাবা। এটা তো তোমার টাকা। তোমার যেদিন প্রয়োজন হবে নিয়ে যাবা। দেইখো, আজেবাজে খরচ করবা না কিন্তু। তুমি না সমুসার ব্যবসা করতে চাইছিলা। এই ব্যবসাটা শুরু করো, আরও টাকা লাগলে বইলো, একটা ব্যবস্থা হইব।

খোকনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছি। যথারীতি আমার সঙ্গে পশুটাও। পশুটা অচেনা কিন্তু এর গায়ের গন্ধটা যে বড়ো চেনা। এর কাছ থেকে নিস্কৃতি নেই। পশুটার এখন নিস্তেজ চোখ কিন্তু আমি জানি অপেক্ষা করতে এর কোন ক্লান্তি নেই, এর কোন তাড়া নেই। সময়ে এ ঠিক ঠিক লাফিয়ে পড়বে, সর্বশক্তিতে...।

সহায়ক লিংক:
১. স্কুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3        

Monday, October 25, 2010

কথার বেলুন!

প্রত্যেকটা স্কুলে [১] বাচ্চাদের জন্যে কিছু নিয়ম-কানুন লিখিত আকারে ঝোলানো থাকে। প্রায় একই ধরনের কথাবার্তা: হাতের নোখ ছোট থাকবে, খাওয়ার আগে হাত ধুতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্কুল ভেদে খানিকটা পরিবর্তন হয়। যেমন, স্টেশনের স্কুলে বাড়তি যোগ হয়, ট্রেনের ছাদে উঠা যাবে না; আবার হরিজন পল্লীর স্কুলে, রেললাইনে হাঁটা যাবে না।
বাধ্য হয়ে এখন হরিজন পল্লীর স্কুলে বাড়তি একটা যোগ করতে হয়েছে, বেলুন(!) নিয়ে স্কুলে আসা যাবে না। এর ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র।

যেদিন ডা. গুলজার হোসেনকে স্কুলের বাচ্চাদেরকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম, চিকিৎসার জন্য [২]। সেদিন হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের কাছে বিচিত্র ধরনের কিছু বেলুন(!) পাওয়া গেল। ডাক্তার সাহেব সম্ভবত হকচকিয়ে গিয়েছিলেন কারণ এগুলো পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী (আমার ধারণা আমার লেখার অধিকাংশ পাঠক প্রাপ্তবয়স্ক। তাই বিস্তারিত বলার চেষ্টা করলাম না। অধিকাংশ বললাম এই কারণে, কখনও-সখনও কিছু পাঠকের কথা শুনে মনে হয় এরা কখন বড়ো হবে? এতে খানিকটা নিশ্চিত হয়েছি কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকও আছেন তাদের জন্য বলি, ব্যাটা বড়ো হও, তখন বলব নে।)।

ডাক্তার সাহেব যতই বলেন, এটা ফেলো, মুখে দিয়ো না। কে শোনে কার কথা! এ ফেলবে না। মাস্টার মশাইয়ের চোখ রাঙানিও কাজে আসছে না। মহা মুশকিল!
লোকজন আমাকে তেমন একটা পছন্দ না-করলেও বাচ্চারা কেন জানি না আমাকে খানিকটা পছন্দ করে। কেন করে আমি জানি না, জানার চেষ্টায় আছি! আমি একে বললাম, এইটা ফালায়া আসো, মুখে দিতাছো, পেটে কিন্তু বড়ো বড়ো সাপ হইব।
এ খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেছে, কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। অনেক ভেবে-টেবে বলল, স্যার, তুমি কিন্তুক হামারে বেলুন আইনা দিবা? (এদের একসেন্টে খানিকটা ঝামেলা আছে)। আমারও :)!
আমি বললাম, আচ্ছা। এখন এটা ফেলে আসো। এ ফেলে আসে। আমি মাস্টার মশাইকে কেবল মুখেই বলে আসি না, লিখেও দিয়ে আসি, স্কুলে বেলুন(!)...।

আমি খানিকটা লজ্জিতও হলাম। খেলার জন্য এদের বেশ কিছু খেলার সামগ্রী দেয়া হয়েছে কিন্তু তালিকায় বেলুন ছিল না। এটা কেন মাথায় আসেনি এটাই ভেবে কূল পাচ্ছি না। একটা বেলুন একটা শিশুর কাছে কতটা আগ্রহের বিষয় এটা তো সইজেই অনুমেয়। এই অনুমানটা আমি কেন করতে পারলাম না!
তাই আজ ছিল এদের বেলুন উড়াবার দিন।
আমি পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম:
"স্বাস্থ্যসচিব হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছেন, এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত [৩]
ভাল-ভাল। যেদিন (২৭.০৯.১০) এটা পত্রিকায় পড়েছি সেদিন কেবল হাসিই চাপিনি, হাতে-নাতে পরীক্ষাও করেছি। এই নিয়ে হরিজনপল্লীর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও করেছি। আলাপের বিশদে যাই না, কেবল বলি, আমাদের স্বাস্থ্যসচিব সাহেবের মুখের হাসি যে মিলিয়ে যাবে এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই"।

ওখানে লিখেছিলাম, বিশদে যাই না...। এখানেও বিশদে যাব না। অল্প কথায় বলি, হরিজন পল্লীতে এই বিষয়ে সচেতন করার কোন উদ্যোগ কারও নাই। হরিজন পল্লীর লোকজনরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন এখানে লিখলে আমার কী-বোর্ড সাবান দিয়ে ধুতে হবে। বলার পর আবার এটাও বলতে ভুলছেন না, বাবু, আপনি কিন্তুক মনে কষ্ট লিয়েন না, হামরা সুইপার আছে তো...।
ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ফি-বছর নিয়ম করে বাচ্চা! এখন আমাদের লোকসংখ্যা কত? ১৬ কোটি কি ছাড়িয়ে গেছে? আফসোস, আমাদের দেশে ৬ মাসে বাচ্চা হওয়ার কোন সুযোগ নেই নইলে আমরা অনায়াসে ভারত-চীনকে ছাড়িয়ে যেতে পারতাম। আরেক সুপার পাওয়ার হয়ে উঠতাম।
"এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত..."। এটা অবিশ্বাস করার কোন কারণ দেখি না যে দেশের শিশুদের হাতের নাগালে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী চলে এসেছে...!

সহায়ক লিংক: 

১. আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/39egrtn
২. স্কুল, রোবট এবং মানুষের গল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_23.html
৩. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=3&date=2010-09-27 

Saturday, October 23, 2010

স্কুল, রোবট এবং মানুষের গল্প

আমাদের ইশকুল [১], এই স্কুলগুলোর একটা বিষয়ে আমার তীব্র কষ্ট ছিল! বাচ্চাগুলো ডাক্তার দেখাতে পারছিলাম না! এই বিষয়ে একজন ডাক্তার অনেকখানি সহায়তা করেন কিন্তু তিনি সপ্তাহে একদিনের জন্য ঢাকা থেকে আসেন।
সব মিলিয়ে এখন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১২৫ জন। এদের সবাইকে তো আর নিয়ে এসে দেখানো সম্ভব না। কেবল খুব বেশি অসুস্থ হলে তাঁর কাছে এনে দেখানো হতো।

আমার ইচ্ছা ছিল কোন একজন ডাক্তারকে স্কুলগুলোয় নিয়ে বাচ্চাগুলোকে দেখানো কিন্তু কোন ডাক্তারকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি! একজন ডাক্তারকে, কিভাবে স্কুলগুলো চলছে বিতং করে বলা, অনেক তৈলমর্দন, অনেক ধরাধরি করার পরও তিনি একটা স্কুলের জন্য এক হাজার টাকা চাইলেন!
অন্য একজন ডাক্তার। ইনি আবার হুজুর টাইপের মানুষ, গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে প্রায়ই ধর্মউদ্ধার করার জন্য বেরিয়ে পড়েন। এই ভদ্রলোককেও স্কুলগুলো সম্বন্ধে বিস্তারিত বলার পর আমি বললাম, আপনি আমাকে কেবল আধ ঘন্টা সময় দেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাব, পৌঁছেও দিয়ে যাব। আপনি বাইরে গেলে যে ফি নেন তাও দেব। 
তিনি ঝিম মেরে থেকে বললেন, হুঁ, আপনার কাজ তো ভাল।
আমি মনে মনে বললাম, যাক, আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। এরপর তিনি বললেন, আচ্ছা, আপনি এক সপ্তাহ পরে আসেন।

আমি এইবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। ওয়াল্লা, ঘটনা কি? ইনি কি সন্দেহ করছেন আমি সিআইএ-র-মোসাদের এজেন্ট? নাকি এরিমধ্যে খোঁজ-খবর নেবেন, আমি কোন জামা গায়ে দেই; আ মীন, কোন দল করি? কসম, আমি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেলাম।
গেলাম এক সপ্তাহ পরে। তিনি এবার আমাকে বললেন, সামনে আমার এফসিপিএস পরীক্ষা, এখন তো সময় বের করা মুশকিল।
আমি আবারও কাতর হয়ে বলি, আমাকে কেবল আধ ঘন্টা সময় দেন...। উত্তর নেতিবাচক। আমার ভেতরের তীব্র ক্রোধ পাক খেয়ে উঠে। আমার ভেতরের পশুটার গায়ের তীব্র গন্ধ আমি টের পাই। একে আমি বড়ো ভয় পাই, এ আমার হাতের তালুর মতই চেনা। পূর্বেও আমি এর অনর্থের নমুনা দেখেছি। নিজেকে সামলানো বড়ো কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে পশুটা লেজ গুটায়, আমি উঠে চলে আসি।
আমি কখন জনান্তিকে এটা বলেছি নিজেও জানি না, তোর এফসিএস পরীক্ষা খারাপ হোক, 'লাড্ডা' মার।

এরা কিন্তু সবাই সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার। আমাদের দেশের এই সব ডাক্তার সাহেবদের পেছনটা কী অপ্রয়োজনীয় ভারী? এরা যে সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতে বছরের-পর-বছর ধরে পাশ দিয়ে ডাক্তার হয়েছেন। যে সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতে বাপের টাকা খরচ করেছেন তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি টাকা খরচ হয়েছে সরকারের। সরকারের এই টাকার যে উৎস তাঁর একটা বড়ো অংশ আসে এই সব হতদরিদ্রদের পরোক্ষ ট্যাক্সের টাকায়।

যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি, কোথাও-না-কোথাও প্রাণ বাঁচাবার জন্য একটা গাছ থাকবে, থাকবেই, থাকতেই হবে। এই সেদিন লেখালেখির নামে কী-বোর্ডের উপর অত্যাচার করছি। একটা ফোন আসে, আমি ডাক্তার গুলজার, আপনি কি ওমুক? আমি বলি, হ্যাঁ। ওপাশের মানুষটা এবার বলেন, আমি আপনার সম্বন্ধে... ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
মানুষটার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। নজরুল ইসলামের অসুখের বিষয়টি আমি তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারি [২]চোখ-কান খোলা একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলেও আরাম। আমার মুগ্ধতা ছাড়িয়ে যায় যখন এই মানুষটাকে স্কুলের বাচ্চাদের দেখে দেয়ার বিষয়ে বলার পর এই মানুষটা একবাক্যে রাজী হয়ে যান। আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকি। সময়টা এমন আজকাল নিজেকেও বিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু আজকের দিনটা আমার জন্য চমৎকার একটা দিন। এই ডাক্তার নামের মানুষটাকে নিয়ে সারাটা দিন পায়ে চাকা লাগিয়ে ঘুরতে থাকি, স্কুল থেকে স্কুলে। সমস্ত বাচ্চাদের প্রথমিক চিকিৎসাটা হয়। অন্তত সবগুলো বাচ্চাকে ক্রিমির ওষুধটা খাওয়ানো গেছে। সরকারের লোকজনরা শুনলে লজ্জা পাবেন, এখানকার অধিকাংশ বাচ্চাই এর পূর্বে আর কখনও ক্রিমির ওষুধ খায়নি, নামই শোনেনি! অবশ্য এটা আমার কথা, স্যারদের কথা না। স্যাররা যখন বলেন তখন তাঁদের কথা বিশ্বাস না করে উপায় কী! এই যেমন, স্বাস্থ্যসচিব হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছেন, এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত
ভাল-ভাল। যেদিন (২৭.০৯.১০) এটা পত্রিকায় পড়েছি সেদিন কেবল হাসিই চাপিনি, হাতে-নাতে পরীক্ষাও করেছি। এই নিয়ে হরিজনপল্লীর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও করেছি। আলাপের বিশদে যাই না, কেবল বলি, আমাদের স্বাস্থ্যসচিব সাহেবের মুখের হাসি যে মিলিয়ে যাবে এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই।

স্বাস্থ্যসচিব থাকুন আমাদের স্বাস্থ্য নিয়ে, জটিলসব বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে আমাদের লাভ নাই। তো, এই ডাক্তার নামের মানুষটি যে কেবল বিনে পয়সায় তিনটা স্কুলের বাচ্চাদের দেখে দিয়েছেন এটুকুই না, প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোও জোগাড় করেছেন!
মানুষটার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা না-করায় কী আসে যায়, এই বাচ্চাদের ব্লেসিং তাঁকে তাড়া করুক, অবিরাম।
অন্ধপল্লীতে: ডা. গুলজার হোসেন
স্টেশনের স্কুলে: ডা. গুলজার হোসেন
হরিজন পল্লীতে: ডা. গুলজান হোসেন
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/39egrtn
কবি নজরুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_21.html

Thursday, October 21, 2010

কবি নজরুল সিফিলিসে আক্রান্ত, এই বিষয়ক মূর্খতা

ছবি ঋণ: আফতাব আহমদ
কাজী নজরুলের এই রোগ নিয়ে আলোচনায় দুই ধরনের মূর্খ আছেন। অশিক্ষিত মূর্খ এবং শিক্ষিত মূর্খ। অশিক্ষিত মূর্খরা বলে বেড়াতেন ইংরেজরা বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে নজরুলকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে কারণ তিনি ইংরেজদের জন্য একটা ভয়াবহ সমস্যা ছিলেন।

শিক্ষিত মূর্খরা চালু করলেন, নজরুল সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন, 'নিউরো-সিফিলিস'। নিউরো সিফিলিসের শেষ পর্যায় হচ্ছে ব্রেনকে আক্রান্ত করা। যেটা কবির হয়েছিল বলে বলা হতো!
অনেকে এর সূত্র ধরে কবির সৃষ্টিকে খাটো করার প্রয়াস পেতেন। সৃষ্টি-স্রষ্টাকে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নাই- সৃষ্টির জন্য স্রষ্টা ধোয়া তুলসি পাতা হয়ে যান না তেমনি স্রষ্টার জন্য সৃষ্টিও নর্দমায় ভেসে যায় না। তদুপরি এমনটা যদি হয়ে থাকত তাহলে না হয় এই নিয়ে তর্কাতর্কি চলতে থাকত কিন্তু মিথ্যাকে কেন বারবার সত্য বলা হবে?
দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে কবি নজরুলের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে এই অন্যায়ের শোধ আমরা দেব কেমন করে? এতে কবি নজরুলের কিছুই যায় আসে না কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি আমাদের উপর এই অন্যায়টা বর্তায়।
এই লেখাটা লেখার পূর্বে ব্লগস্ফিয়ারে আমি পাগলের মত চক্কর লাগিয়েছি অনেক সাইটে নজরুলকে নিয়ে কুতর্ক করতে দেখলাম। অসংখ্য মন্তব্য থেকে কেবল একটা মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করি। তিনি লিখেছেন, 'নজরুল দেখি একটা বদমাইশ'। আমি এই নিকের পেছনের মানুষটাকে চিনি। ইনি বহু পূর্বেই পিএইচডি সমাপ্ত করেছেন।

নজরুল বদমাইশ হলে কেউ কেউ তো বদমাইশেরও বাপ, ওস্তাদেরও ওস্তাদ! নিয়ম মেনে পতিতালয়ে গমন করা যেমন আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ না তেমনি মেয়ের বান্ধবীকে বৈধ বিয়ে করলেও। কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র। এঁরা 'তেলিবেলি' মানুষ না, অসম্ভব শক্তিশালীসব মানুষ। যারা তাঁদের লেখার মাধ্যমে কমবয়সী পাঠকের অপরিণত মন নিয়ে খেলা করছেন, বছরের-পর-বছর ধরে।

আমাদের যে মূল শক্তি অপরের প্রতি বিশ্বাস এটা তিনি নড়বড়ে করে দিয়েছেন। অতি প্রিয় বন্ধুর স্ত্রীর হাত ধরলেই যদি আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায় ছলে-বলে-কৌশলে, প্রকারান্তরে বিয়ে নামের বৈধতার মোড়কে,  তাকে নিজের করে পাওয়ার; এটাও প্রচলিত আইনের আওতায় অপরাধ না কিন্তু ওই যে বললাম বিশ্বাস। তাহলে আমরা দাঁড়াব কোথায়, পায়ের নীচে যে মাটি থাকে না!
আমাদের সম্পর্কের মাঝে সূক্ষ একটা আবরণ থাকে, আ থিন লেয়ার; মায়ের সঙ্গে সন্তানেরও একটা সূক্ষ আবরণ আছে। মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছি বলেই আমরা ধামড়া সন্তান তাঁর সামনে নগ্ন হয়ে যাই না; ওই যে বললাম সূক্ষ আবরণ।
আমরা তো শেকড়হীন ইয়াংকি না, আমাদের শেকড় ছড়িয়ে আছে বহু দূরে। বিশ্বাস-শ্রদ্ধায় জড়াজড়ি করে।

আজ থেকে ১৪/ ১৫ বছর পূর্বে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি আমাকে এই তথ্যটা জানিয়েছিলেন, নজরুল নিউরো-সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কেবল এটুকুই না, তিনি এটাও আমাকে জানিয়েছিলেন, রোগের নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে মেডিকেল কলেজে ছাত্রদেরকে এটা পড়ানো হয়, নজরুলের প্রসঙ্গ চলে আসে।
একজন ডাক্তার যখন বলছেন, এটা তাদেরকে পড়ানো হয় এখানে আমি অবিশ্বাস করার কিছু দেখিনি! কিন্তু পড়ানো হয়...? এর মানে দাঁড়াচ্ছে, পূর্বেও পড়ানো হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে, আগামীতেও হবে? যেমন আর্কিমিডিসের সূত্র নিয়ম করে পড়ানো হবেই, অনেকটা এমন?
আজ আমার মনে হচ্ছে, এই ডাক্তার হয় কদর্য একজন মানুষ, বোমা ফাটানো নিয়ে জজ মিয়ার যেমন আষাঢ়ে গল্প আমরা শুনেছি তেমনি একটা আষাঢ়ে গল্প তিনিও ফেঁদেছিলেন। আর তিনি সত্যবাদী হয়ে থাকলে তাঁর শিক্ষক নামের অধ্যাপক স্যাররা ছিলেন নিরেট গবেট!

আর একজন অধ্যাপক হলেই তিনি এই গ্রহের সমস্ত জ্ঞানের পাতা চিবিয়ে বসে আছেন এমনটা আমি মনে করি না।

এটা সত্য এরা বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদেরকে শেখান কিন্তু এদেরও যে শেখার অনেক কিছু বাকী থেকে যায় এর উদাহরণে এই একটা ছবিই যথেষ্ঠ! এখানে গবেট অধ্যাপক স্যাররা একজন মানুষের হাড়-গোড় পরীক্ষা করছেন। তারা অবলীলায় বিস্মৃত হয়েছেন এটা কোনো পশুর হাড় না, মানুষের হাড়! মৃত মানুষদের প্রতি যে ন্যূনতম সম্মান দেখাতে হয় এটাই এরা এখনও শেখেননি!
এই সব 'পরফেসর' সাহেবদের জন্য [১] একটা ইশকুল খুললে মন্দ হয় না!

নজরুল যে নিউরো সিফিলিসে ভুগছিলেন না, ভুগছিলেন Pick's disease-এ এটা আমি প্রথমে জানতে পারি ডা. গুলজার হোসেন-এর কাছ থেকে। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তিনি আমাকে একটা ভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
আমি পূর্বে কোন একটা লেখায় লিখেছিলাম, "কবি নজরুল যে অসুখে ভুগছিলেন তা জনসমক্ষে আলোচনা করাটা বিব্রতকর"। এটা লেখার জন্যে আমি কবির কাছে হাঁটু ভেঙ্গে মার্জনা প্রার্থনা করি।

কবি নজরুলের এই উপসর্গ নিয়ে 'newworldencyclopedia' সাইট [২] থেকে জানা যাচ্ছে:
"...In 1952, he was transferred to a mental hospital in Ranchi. With the efforts of a large group of admirers who called themselves the "Nazrul Treatment Society" as well as prominent supporters such as the Indian politician Syama Prasad Mookerjee, the poet travelled to London  for treatment. Eminent physicians in London and later Vienna stated that he had received poor medical care. Dr. Hans Hoff, a leading neurosurgeon in Vienna, diagnosed Nazrul as suffering from Pick's Disease. His condition judged to be incurable, Nazrul returned to India in December 1953. ..." 

উইকি বলছে [৩]:
"...the treatment society sent Nazrul and Promila to London, then to Vienna  for treatment. Examining doctors said he had received poor care, and Dr. Hans Hoff, a leading neurosurgeon in Vienna, diagnosed that Nazrul was suffering from Pick's disease. His condition judged to be incurable, Nazrul returned to Calcutta on 15 December 1953. ..." 

Pick's disease রোগটার নামটা এসেছে Arnold Pick-এর নাম থেকে। এই প্রসঙ্গে আমরা helpguide [৪] থেকে জানতে পারি: 
"...According to Arnold Pick, who first described the disease in 1892, Pick's disease causes an irreversible decline in a person's functioning over a period of years. Although it is commonly confused with the much more prevalent Alzheimer's disease, Pick's disease is a rare disorder that causes the frontal and temporal lobes of the brain, which control speech and personality, to slowly atrophy. It is therefore classified as a frontotemporal dementia, or FTD. ..." 

কবিকে নিয়ে যখন কোন প্রতিবেদন লেখা হয় সেখানেও নিরন্তর অন্যায় করা হয়েছে। যেমন bdnews24.com- এ তাঁকে নিয়ে হা বিতং করে বিশাল লেখা আছে, সেই লেখায় কী নেই! সেখানে এটাও লেখা হয়েছে:
"...তাঁকে ততদিনে সিফিলিস রোগাক্রান্ত, পাগল ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়ে গেছে..." [৫] 
বেশ-বেশ, তারপর? এই বিশেষণ লিখেই দায়িত্ব শেষ! এদেরই কি জ্ঞানপাপি বলে?

আমি খানিকটা সময় চোখ বন্ধ করে এটা ভেবে শিউরে উঠি, কবির পরিবারের লোকজনরা এই অনর্থক অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়িয়েছেন, অনিচ্ছায়, দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে।
মৃত একজন মানুষের প্রতি আমাদের এই অন্যায় নগ্ন করে দেয় আমাদেরকে। ঈশ্বর, এক টুকরো কাপড় খুঁজছি হন্যে হয়ে...!
...
আমরা খুবই আবেগপ্রবণ জাতি! হঠাৎ হঠাৎ করে আমাদের আবেগ চাগিয়ে উঠে, বিশেষ বিশেষ দিনে আমাদের চোখের জলে কপাল(!) ভিজে যায়! কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের সো-কলড বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ভায়ারা মুখে ফেনা তুলে ফেলেন; ওদিকে নজরুলের স্মৃতিস্তম্ভে পাশে আমরা পাকা ডাস্টবিন বানাই, তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ পেশাবের ফেনা দিয়ে ভরে যায় [৬], এতে আমাদের কোন লাজ নাই। কবি নজরুল, বেচারা, মরে বেঁচে গেলেন...!

সহায়ক লিংক:
১. 'পরফেসর' স্যাররা...: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_09.html 
২. newworldencyclopedia: http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Kazi_Nazrul_Islam
৩. wikipedia: http://en.wikipedia.org/wiki/Kazi_Nazrul_Islam
৪. helpguide: http://helpguide.org/elder/picks_disease.htm
৫. bdnews24.com: http://arts.bdnews24.com/?p=3029
৬. নজরুল, আপনি মরে বেঁচে গেলেন: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post.html 

Wednesday, October 20, 2010

বৈদেশ পর্ব: ষোলো

জার্মানিতে আরেকটা বিষয় আমাকে খানিকটা জটিলতায় ফেলে দিয়েছিল। ওখানে যার সঙ্গেই আমার পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তিনি একটা করে কার্ড ধরিয়ে দেন, যার চালু নাম বিজনেস কার্ড বা ভিজিটিং কার্ড। একের পর এক কার্ড জমা হতে থাকে, আমার ওয়ালেট উপচে পড়ে! সময়টা বড়ো দৌড়ের উপর- কে কোন কার্ড দিচ্ছে, কার নাম কি এটা আমার দুর্বল মস্তিষ্ক মনে রাখতে ব্যর্থ হয়। আমার মত অভাজনের জন্য এটা অতি আনন্দের সংবাদ কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন কেউ আমার কাছে আমার কার্ড চাইলেন, তখন।

আমার তো কোন কার্ড নাই। আমার কার্ড থাকবে কি করে? আমি কোনো মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত না- আমি যে নটা সাতটা অফিস নামের কারাগারের কোন কয়েদিও না। তারচেয়ে বড়ো কথা আমার যে জাঁক করে বলার মত তেমন কিছুই নাই। লেখক নাম দিয়ে কার্ড করা যায় কি না এটা আমি জানি না। এখানেও সমস্যা আছে, লেখক হওয়ার জন্য তো কোথাও কোন সনদ ইস্যু হয় না। তাছাড়া আমার মত যারা দু-কলম গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করে তাদেরকে লেখক বলাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত এ নিয়ে বেদম তর্কাতর্কি চলতেই পারে। তাহলে কি লেখা যেতে পারে? আমি যেটা লিখি, 'তিন টাকা দামের কলমবাজ'? 

জার্মানি থেকে ফেরার পর ভাবছিলাম, আচ্ছা কার্ডে 'সদ্য জার্মানি ফেরত' এটা কি লাগানো যেতে পারে?

আরে দাঁড়ান-দাঁড়ান, এখনই কী-বোর্ডের উপর ঝাপিয়ে পড়বেন না আমি বেচারাকে আচ্ছা করে 'শব্দ-ধোলাই' দেয়ার নিমিত্তে।
আনিসুল হক গংরা যদি ঘটা করে এটা জাতীয় দৈনিকে ছাপাতে পারেন, 'সদ্য আমেরিকা ফেরত', তাহলে আমি লাগালে দোষ কোথায়? এটাও যে একটা পদবী এটা পূর্বে আমার জানাই ছিল না! মিডিয়ার লোকজনরা আমাদেরকে শেখান, আমরা শিখি। তাহলে আমি কেন এটা লাগাতে পারব না 'সদ্য জার্মানি ফেরত'?
কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়ে যায়। এটা নিয়ে গবেষণার অবকাশ থেকে যায় ফেরার ঠিক কত দিন পর্যন্ত এই টাইটেলটা ব্যবহার করা যায়? নাকি আমৃত্যু?

আনিসুল হক মহোদয়কে জিগেস করা যেতে পারে, স্যার, এই টাইটেল বহাল থাকার সময় কত দিন? মানে কত দিন পর্যন্ত এই 'সদ্য' পদ্য হয়ে যায় না!
ভাল কথা, আনিসুল হক তার নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেন [১], এই বিজ্ঞাপনও কি নিজেই দিয়েছিলেন? এমনটাই তো হওয়ার কথা। আর কোনো বিশেষণ খুঁজে পাওয়া গেল না, না? এই যেমন, 'শপিং মলের ফিতা কাটাকাটি', বা 'ডিম ভাজাভাজি' (এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওঁর ডিম ভাজাভাজি দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম কারণ আমি নিজে পানি গরম করা ব্যতীত আর কিছু পারি না)?

আনিসুল হক নাকচ করে দিলে, 'সদ্য জার্মানি ফেরত' এটা ধোপে না টিকলে উপায় কী! আচ্ছা, আইন উপদেষ্টা এটা লাগালে কেমন হয়, এল.এল.বি অমুক? না মানে আমি বছরখানেক ল-কলেজে 'কেলাশ' করেছি তো, আইন পড়তে ভাল লাগেনি বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আরে, দাঁড়ান-দাঁড়ান, আমাকে শুইয়ে ফেলার অভিপ্রায়ে এখনই আবার কী-বোর্ডে নিয়ে কস্তাকস্তি শুরু করে দেবেন না। কি বললেন, বছরখানেক ক্লাশ করে এমনটা লাগাবার নিয়ম নেই। তাই নাকি!          
আপনারা সব জেনে বসে আছেন বুঝি! এটা একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ভিজিটিং কার্ড। কার্ডটার হুবহু স্ক্যান করে দিলাম কেবল নীতিগত কারণে ফোন নাম্বার এবং ইমেইল বাদ দিয়ে দিলাম। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার এই কার্ডে দেখা যাচ্ছে তিনি M.Phil এবং Ph.D এই দুইটা ডিগ্রিই ব্যবহার করেছেন। তবে আমরা এটাও জানতে পারছি Self-withdrawn after one year.
তাহলে কার্ডে আমার নামের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা এলএলবি অমুক এটা লিখতে সমস্যা কোথায়! অবশ্য ব্রাকেটে Self-withdrawn after one year. বা নিয়ার এবাউট... এটা অবশ্যই উল্লেখ থাকবে।  :) 

*এই লেখাটা যখন লিখছি তখন চ্যানেল আইয়ে ইমদাদুল হক মিলনকে দেখছি কেকা ফেরদৌসির এক রান্নার অনুষ্ঠানে। আমাদের দেশের লেখকদের কেবল বাকী আছে বাথরুম উদ্বোধন করা [২]। ইনশাল্লাহ, এটাও দেখার ভাগ্য একদিন আমাদের হবে। মিলন এবং আমার দুজনেরই দীর্ঘ জীবন পাওয়াটা জরুরি।
কেকা ফেরদৌসির রান্নার অনুষ্ঠান দেখে মনে হয় এই মহিলার চেয়ে রান্না বিশারদ সম্ভবত এই গ্রহে আর নাই। কালো চশমা লাগিয়ে দেশ-বিদেশে এই মহিলা যেমন দাবড়ে বেড়ান এবং নিজে নিজেই অনর্গল বকে যান; অন্যের কথা বলার সুযোগ কোথায় এই সব আমাদের না-দেখে ছাড়াছাড়ি নাই। এর রহস্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন একজন ডাক্তার সাহেব বললেন, ইনি নাকি চ্যানেল আইনের হর্তকর্তা সাগর সাহেবের বোন! তাই তো বলি, বলিহারি!
বকবক-বকবক, তারপর বকবক, আবারও বকবক এমন ক্ষেত্রে আমি 'হর্স-মাউথ' শব্দটা ব্যবহার করি। মহিলা ঘোড়ার ইংরাজি কি এটা এখন মনে পড়ছে না। :(

*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5 

সহায়ক লিংক:
১. আনিসুল হকের বিজ্ঞাপন...: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html 
২. বাথরুম উদ্বোধন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html  

Tuesday, October 19, 2010

বৈদেশ পর্ব: পনেরো

জার্মানি যাত্রায় কিছু বিষয় আমাকে বেশ খানিকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। প্রথমটা হচ্ছে, ওখানে যাওয়ার পূর্ব থেকেই আমাকে বলা হচ্ছিল, ওখানে আমার পরিচিত কারা কারা আছে তাদের নাম দেয়ার জন্য- তাদের জন্য আমন্ত্রণপত্র তৈরি করার কারণে এটা প্রয়োজন। এদের এটাও জানা ছিল, আমি যাদের সঙ্গে লেখালেখির নামে ব্লগিং করেছি- সহযোদ্ধা; জার্মানিতে থাকেন এমন মানুষের সংখ্যা কম না। কিন্তু আমি অনেকখানি বিভ্রান্ত ছিলাম কারণ বলার মত এমন কোন নাম আমার মাথায় আসছিল না।

কেন? আমার যাওয়া নিয়ে অনেক ধরনের নাটক-জটিলতা হয়েছিল, এর বিশদে যেতে এখন আর ইচ্ছা করছে না। আমি কোন এক লেখায় লিখেছিলাম, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দলবাজি করেন [১] আমরা কোন ছার! এদেরই তো ছাত্র আমরা- যেমন গুরু তেমনি তাঁদের শিষ্য। আমাদের দেশে দলবাজি করেন না এমন মানুষের প্রায় নাই-ই বললে চলে। যারা আছেন এদের মত অভাগা আর কেউ নাই। এখানেও দলবাজি হবে না এমনটা কী হয়, পাগল! মানুষ যেমন বাজার থেকে সদাই কেনার পূর্বে টিপেটুপে দেখে কেনেন তেমনি লোকজনরাও তখন আমাকে পরখ করা শুরু করলেন, আমি কোন দিকে কাত হয়ে আছি। জনে জনে আমাকে জ্ঞান দিলে লাগলেন আমার কি করা উচিত, কি করা উচিত না!
বিভিন্ন শ্রেণী, মিডিয়া এরা নিশ্চিত হলেন আমি তাদের কাতারে পড়ি না। অতএব 'বুশ স্টাইল'- হয় তুমি আমার দলে নইলে আমার ঘোর শত্রু! আমাদের দেশ থেকে দল বড়ো, দল থেকে ব্যক্তি! এখনও আমার যাওয়ার অপরাধে থিসিস করা চালু আছে- বেশ কিছু ডক্টর প্রসব হবে!

অল্প সময়ে কত নাটক যে দেখলাম, যে মানুষটা লিখে জানান, বস, আসার সময় ইংল্যান্ড হয়া আইসেন আপনাকে নিয়া ব্যাপক...ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মানুষটাকেই যখন দেখি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কারণে আমাকে নিয়ে কুৎসিত লেখা দেয়া হয়, ওখানে সদর্পে পঞ্চতারকা প্রদান করেন, উল্লাস করেন। আমি জেনে সুখি হই, কত ধরনের মুখোশ থাকে এদের ড্রয়ারে!
মুখোশ নিয়ে নিশ্চয়ই তাক লাগানো একটা নাটক লিখবেন আশা করি। সেই নাটক টিভিতে প্রচারিত হলে শত কাজেও মিস করব না এটা নিজেই নিজেকে কথা দিচ্ছি।

তারপরও জার্মানিতে থাকেন এমন দু-চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কারও মধ্যে পেছনটা উত্তোলন করার মত শক্তির আভাষ পাওয়া গেল না। মেইলে আমার হোটেলের ঠিকানা-ফোন নাম্বারও ছিল। যদিও আমি নিজের সুবিধা এবং সময়ের স্বল্পতার কারণে হোটেলে থাকতাম না কিন্তু হোটেলের ডেস্কে ঠিকই খোঁজ নিয়েছি আমার জন্য কোন ম্যাসেজ আছে কি না? উত্তর নেগেটিভ।

আমার ধারণা ছিল, আমার তরফ থেকে সাড়া না পেয়ে কর্তৃপক্ষ হয়তো ভুলে গেছে কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর আবারও একই প্রসঙ্গ। আমার কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছিল এই অনুষ্ঠানে কেউ যোগ দেবেন কি না? অন্য ভাষার অনেকেই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে নিজ দেশ থেকে উড়ে চলে এসেছেন অথচ জার্মানি থেকেও বাংলা ভাষায় কথা বলা কোন মানুষ আসবেন না এটা সম্ভবত এরা মানতে পারছিলেন না! একই প্রসঙ্গ বারবার আসায় আমার বিরক্তি লাগে।

কী বিচিত্র আমরা- ততোধিক বিচিত্র আমাদের আচরণ! বাংলা ভাষার জন্য বিশেষ দিনে কাঁদতে কাঁদতে কপাল (!) ভিজিয়ে ফেলি! এমনিতে প্রবাসে যারা থাকেন এঁদের অনেকের আবেগ আবার খানিক বেশি। এরা 'মহুয়া মঞ্জুলী ফেরদৌসের আমি বীরাঙ্গনা বলছি' [২] নামে বাংলা ভাষা উদ্ধার করেন। কেউ কেউ বারোটা বাজিয়ে, দেশের বিস্তর দুর্নাম করে, দেশটাকে নগ্ন করে প্রবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে প্রার্থনা করেন; সাদা চামড়ার দক্ষিণায় বেঁচে-বর্তে থাকেন। ওখান থেকে পারলে দেশটাকে বঙ্গোপসাগরে চুবিয়ে শুদ্ধ করে ফেলেন!
কেউ কেউ চমৎকার ডকুমেন্টারি বানান, ওখানে দেখান মাদ্রাসা, দেখান বন্যায় জবুথুবু এই দেশের অসহায় মানুষগুলোকে; রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে। এরা দেখান এ দেশের মাকে- নগ্ন পা, দুই কোলে দুইটা অপুষ্ট বাচ্চা। এতে প্রবাসীদের কাছে আমাদের শির বড়ো উঁচু হয়! কী একেকজন দেশপ্রেমিক! দেশের ঝান্ডা তো এদেরই হাতে!

আমার জানা মতে, অন-লাইনে লেখালেখি নিয়ে এতো বড়ো পরিসরে বাংলা ভাষা আর কোথাও যায়নি এবং এখানে এই প্রথম বাংলা ভাষা যুক্ত হয়েছিল। ওখানে, বিভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষদের কাছে কোন মানুষটা গিয়েছিল এটা মূখ্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশ-বাংলা ভাষা। একটা দেশের পতাকা কোন বাঁশে লাগানো হলো এই নিয়ে কুতর্ক চলে কিন্তু এতে পতাকার কিছু যায় আসে না, পতাকা সগর্বে পতপত করে উড়তে থাকে। যেমন ওখানে উড়ছিল বাংলাদেশের পতাকাটা। ওখানে পতাকার বাঁশটা কে ধরে রেখেছে তাতে কী আসে যায়!

সামহোয়্যারে এটা নিয়ে যে পোস্টটা দেয়া হয়েছিল [৩], ওখানে আমি লিখেছিলাম:
"ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ছয় হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। লাটভিয়ায় ‘লিভোনিয়ান’ ভাষায় কথা বলেন এমন একজনই মাত্র জীবিত ছিলেন, তিনি মারা গেলে সেই ভাষারও মৃত্যু হবে। এটা ২০০৯ সালের কথা, এরিমধ্যে তিনি মারা গেছেন কিনা আমি জানি না।
আলাস্কার ‘আইয়াক’ ভাষা জানা শেষ ব্যক্তিটি মারা যান ২০০৮ সালে। তাঁর সঙ্গেই মৃত্যু হয় ‘আইয়াক’ ভাষার।

৮৫ বছর বয়সী 'বার সর' ছিলেন ভারতীয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮০টি আদিবাস গোষ্ঠীর সবচেয়ে বৃদ্ধ সদস্য এবং ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন এই আদি ভাষা জানা সর্বশেষ ব্যাক্তি!
যে আড়াই হাজার ভাষা এই গ্রহ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে আমাদের বাংলা ভাষাও থাকতে পারত কিন্তু আমাদের অপার সৌভাগ্য, আমাদের বাংলা ভাষা যে কেবল টিকেই আছে এমন না, আছে সদর্পে, সীমাহীন গৌরবে!
বাংলা নামের আমাদের মায়ের ভাষা- এটা তো আর আমরা এমনি এমনি পাইনি, কেউ আমাদেরকে এটা মুফতে-দানে দেয়নি। এর জন্য আমরা কেবল দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরেই লড়াই করিনি; লড়াই করেছি যুগের-পর-যুগ ধরে!
এই দেশের অসংখ্য সেরা সন্তান তাঁদের রক্ত অকাতরে বিলিয়ে গেছেন আমাদের ভাষার জন্য। আমাদের লেখার কালির সঙ্গে মিশে আছে তাঁদের স্বর্গীয় রক্ত। জান্তব স্বপ্ন নামের সেই মানুষগুলোর অনেকেই আজ নেই কিন্তু তাঁদের মায়াভরা সুশীতল ছায়া ছড়িয়ে আছে আমাদের মাথার উপর। তাঁদের ছায়ার পাশে যখন আমার মত অভাজন দাঁড়াই তখন নিজেকে কী ক্ষুদ্র, লজ্জিতই না মনে হয়। নতচোখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে তখন কোন উপায় থাকে না- তাঁদের চোখে চোখ রাখি কেমন করে?


আমরা যারা ওয়েবসাইটে লেখালেখি করি তাঁদের প্রতি প্রিন্ট মিডিয়ায় কী তাচ্ছিল্য! যেন এরা একেকজন চলমান জ্ঞানের ভান্ডার হয়ে বসে আছেন। এঁরা হাঁটেন পা ফাঁক করে, বড়ো সাবধানে- জ্ঞান গড়িয়ে পড়বে এই ভয়ে।
আজ এটা আমাদের সবার বিজয়, ওয়েবসাইটে আমাদের লেখালেখির সুবাদে আন্তর্জাতিক একটা পরিমন্ডলে এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা দাঁড়িয়েছে দানবীয় শক্তি নিয়ে।
এই বিজয় মিছিলে আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আমিও একজন, তাঁদের পাশে থাকতে পারার এই ভাললাগা আমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, কক্ষণও না।

আমি হয়তো ভাল করে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি কিন্তু আমার আন্তরিক বিশ্বাস, অন্য একজন অসাধারণ-চমৎকার করে পারবেন। আমি স্বপ্ন দেখি, আমি হয়তো থাকব না কিন্তু আমার স্বপ্নটা থেকে যাবে। আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে সত্যিকারের একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। যে যোদ্ধা বাংলা ভাষা নামের তরবারী দিয়ে সমস্ত অন্ধকার ফালাফালা করবে, কাঁপিয়ে দেবে এই গ্রহটাকে।
আমি সেই মানুষটার অপেক্ষায় আছি...।"

*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5 

সহায়ক লিংক:
১. দলবাজি: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html 
২. আবেগ-বিবেক: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_21.html 
৩. সামহোয়্যার...: http://www.somewhereinblog.net/blog/noticeblog/29183988  

জীবনটাই যখন নিলামে: ৯

লোপার চোখে ত্রাস, তুমি নাকি সৈয়দ সাহেবকে জুতা দিয়ে পিটিয়েছ?
ক্ক-কাকে?
সৈয়দ সাহেবকে।
ওইটা ফকিরন্নীর পোলা। সৈয়দ বংশের কলংক।
ফকিরন্নীর পোলা না আমিরের পোলা এটা তো আমি জানতে চাইনি। জুতা দিয়ে পিটিয়েছ কেন?
রাব্বি হাঁই তুলল, পাগল! জুতা দিয়ে পেটাব কেন! আমি কেবল বললাম ওইটা একটা ফকিন্নির পোলা। আচ্ছা, তুমি এই হাস্যকর খবর কোত্থেকে পেলে?
লোপা বিরক্তি নিয়ে বলল, সেটা আলোচনার বিষয় না, তুমি এটা করেছ কিনা জানতে চেয়েছি?
পাগল!
পাগল না ছাগল এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে এই আলোচনায় যেতে যাচ্ছি না।
পাগল না হলে কেউ এমন আজগুবি প্রশ্ন করে!
কথা ঘুরাবে না।


রাব্বি অবাক হতেও ভুলে যাচ্ছে সৈয়দ বাসের নামের এই মানুষটার মাথায় ষাড়ের বিষ্ঠা ছাড়া কি আর কিছুই নাই! জনে জনে কেমন করে এটা বলে বেড়াচ্ছে, এ্যা-এ্যা, আমাকে না, আমাকে না জুতা দিয়ে মেরেছে, ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা। অন্তত ঘুরিয়ে বলতে পারল না। রাব্বির মুখ এবার হাসি-হাসি, কোন জুতা দিয়ে পিটিয়েছি? চটি, না বুট জুতা, নাকি নাগরা?
ফাজলামো করবে না বলছি। খবরদার-খবরদার।
আচ্ছা যাও। তা কোথায় পিটিয়েছি?
অফিসে।
অফিসে সবার সামনে এই কান্ড করা কী সম্ভব?
সম্ভব-অসম্ভব নিয়ে তো কথা হচ্ছে না।
আজিব, কেউ দেখল না। ওই ফকিন্নির পোলা বলল আর হয়ে গেল, আজিব! হারামজাদা সবাইকে এটাই বুঝিয়েছে, বুঝলে।
তাইলে তোমার নামে থানায় জিডি করল কেন?
জিডির কপি আমার হাতে আছে। দেখাও কোথায় লেখা আছে একে জুতা দিয়ে পেটানো হয়েছে?
বেশ, লেখা নাই। কিন্তু অহেতুক তোমার নামে কেউ থানায় জিডি করবে কেন?
রাব্বির গলায় উষ্মা, আহ, বললাম না জিডির কপি আছে আমার কাছে। ওখানে লেখা আছে, বানচোত অভিযোগ করেছে, আমি নাকি তাকে প্রাণনাশের-জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছি। আরে বানচোত, কিভাবে তোকে প্রাণে মারার চেষ্টা করেছি এটা লিখবি না, গলায় চিপা দিয়েছি, নাকি ছাদ থেকে ফেলে দিতে গিয়েছি? এটা না বললে আইন বুঝবে কেমন করে!
লোপা বরাবরের মতই বিরক্ত হলো, রাব্বি, তোমাকে এটা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তোমার মুখে এই সব ভাষা শুনতে ভাল লাগে না। আমি জানতে চাইছিলাম উনি তোমার নামে জিডি করলেন কেন?
এইটা আমাকে না জিজ্ঞেস করে ওই বানচোতকে জিজ্ঞেস কর।
তুমি মুখ আবার খারাপ করছ কেন, আশ্চর্য!
মুখ খারাপ করব না তো কবিতা বলব? ‘বানচোত-বানচোত, করছো তুমি কী, এই দেখো না কত্তো সুন্দর কবিতা লিখেছি’।
মুখ খারাপ করবে না। খবরদার বলছি, খবরদার।
আচ্ছা যাও মুখ খারাপ করব না। ছাপার অক্ষরে বলি তাহলে, আসতে আজ্ঞা হউক, বসতে আজ্ঞা হউক।  সৈয়দ সাহেবকে বসতে পিঁড়ি দিতে আজ্ঞা হউক।
তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছ!
আরে না। শোন, মিথ্যা জিডি করে আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে। সত্য হলে তো এটা নিয়ে তদন্ত হত, থানা থেকে আমাকে ডাকত। উল্টো আমি আরও নিজ থেকে থানায় যোগাযোগ করেছি। ওদের বলেছি বিষয়টা তদন্ত করে দেখতে কিন্তু থানাওয়ালারা উল্টা বলছে, যে জিডি করেছে সে নিজে তদন্ত না চাইলে আমরা অযথা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না।
এবার লোপা খানিকটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল, যাক, শুনে খানিকটা ভাল লাগছে।
রাব্বি এবার খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, না, এতটা নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নাই।
কেন?
আরে বান-।

আহ, রাব্বি!
সরি।
কি বলছিলে?
ও থানায় জিডি করার পাশাপাশি র‌্যাবকেও জানিয়েছে। র‌্যাব তাদের অফিসে আমাকে ডাকিয়েছে।


লোপা ভীত চোখে তাকিয়ে আছে।
রাব্বি বলল, আহ, অমন করছ কেন?
লোপা সত্যি কথাই বলল, ভয় লাগছে।
ভয়ের কী আছে।
তোমার ভয় করছে না?
না। আমি তো কোন অন্যায় করিনি। শুধু শুধু ভয় পাব কেন!
রাব্বি, র‌্যাবের নাম শুনেই আমার বুকটা কেমন করছে!
আরে না, এরাও তো আমাদের মত মানুষ। সত্যটা বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে।
তারপরও।
তার আর কোন পর নাই।
কবে যাচ্ছ দেখা করতে?
কাল। ১২টায়।
বেরুবে কটায়?
হাতে সময় নিয়ে যাই। সময় ১২টায় যখন। অবশ্যই শার্প।
রাব্বি, তুমি কি সাথে একজন লইয়ারকে নিয়ে যাবে?
ধুর, হিন্দি সিনামা নাকি!
প্লিজ, অন্তত সাথে কাউকে নিয়ে যাও।
আরে না।
প্লিজ রাব্বি।
আহ-।
প্লিজ।
শোন, ডাকিয়েছে আমাকে, সাথে কাউকে নিয়ে গেলে এরা হয়তো অন্য রকম অর্থ করবে। আমার মনে তো কোন কু নাই, আমি কোন অন্যায় করিনি। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে ওখানে যাই এটাই ভাল হবে।
লোপা চোখে এক অজানা আতংক নিয়ে তাকিয়ে রইল।

Sunday, October 17, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৮

কাঁটায় কাঁটায় ন-টা। রাব্বি নিজের চেয়ারে ভাল করে বসতেও পারেনি। হেড অফিসের লোকজন ঝড়ের গতিতে রাব্বির রুমে ঢুকে পড়ল। তখনও রাব্বি বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! এরা নিমিষেই তার অফিস-রুমটা তছনছ করে ফেলল। এরা যখন ওর ড্রয়ারের চাবি চাইল সে হাসি মুখে এগিয়ে দিল।
ওর ড্রয়ার থেকে যখন বিপুল অংকের টাকা উদ্ধার হলো ও শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তখনও মুখের হাসি পুরোটা মিলিয়ে যায়নি! ওর ড্রয়ারে এতো টাকা থাকবে কেন? ড্রয়ারে তো কখনও টাকাপয়সা রাখে না, খুচরো পয়সাও না। ওর এই অভ্যাসটাই নাই। যা থাকে ওর ওয়ালেটে। এর মানে কী!

হেড-অফিসের লোকজনরা একেকটা টাকা গুনে দেখল, নাম্বার লিখল। একের পর এক নাম্বার বসিয়ে ফর্দ তৈরি করল। সঙ্গে নিয়ে আসা পূর্বের একটা শিটের নাম্বারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল। রাব্বিকে সই করতে বলল। রাব্বি যন্ত্রের মত সই করল।
চীফ হিসাবে সৈয়দ সাহেবও সই করলেন। রাব্বি চেয়ে চেয়ে দেখল। এই বিপুল আয়োজনে ওর করার কিছুই ছিল না কেবল যন্ত্রের মত তাকিয়ে থাকা ব্যতীত। কেউ তাকে কোন প্রশ্ন করল না, কোন ব্যাখ্যা দাবি করল না।
১ ঘন্টা পর হেড অফিসে একবার কেবল ওকে ডাকিয়ে নিয়ে টার্মিনেশন লেটারটা ধরিয়ে দেয়া হলো। রিসিভ কপিতে ওর সই রাখা হলো।
রাব্বি অবিশ্বাসের চোখে টার্মিনেশন লেটারটার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা ইস্যু করা হয়েছে হেড অফিস থেকেই, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে। হায় খোদা, মাত্র ১ ঘন্টাও হয়নি, কখন এরা বসল, কখন সিদ্ধান্ত নিল! এর মানেটা কি দাঁড়াল, সিদ্ধান্তটা কি আগেই নেয়া, এটা কি আগেই টাইপ করে রাখা হয়েছিল? তাই হবে। নইলে এতো দ্রুত সব কিছু গুছিয়ে আনা সম্ভব না। কিন্তু।


সমস্তটা দিন অফিসে ঝিম মেরে বসে রইল। কারও সাথে কোন কথা বলল না। অফিসেরও কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে আসল না। গোটা অফিস চাউর হয়ে গেছে, রাব্বির কাছ থেকে বিপুল টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং কঠিন প্রমাণ পাওয়া গেছে, সে একজনকে দেয়া অন্যায় সুবিধার বিনিময়ে এই টাকাটা অবৈধভাবে নিয়েছে। ওর ল্যাপটপেও আপত্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে, অকাট্য প্রমাণ।
রাব্বির দমবন্ধ হয়ে আসছে। চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এরা সব কেমন করে অবলীলায় বিশ্বাস করে বসল ও এমনটা করতে পারে! পৃথিবীর ভয়ংকর অপরাধিকেও তার বক্তব্য বলার সুযোগ দেয়া হয়। এরা কেন এমন অমানুষের মত আচরণ করছে। বছরের পর বছর ধরে যাদের সংগে চাকুরি করেছে তাদের কাছ থেকে একটা ফোন কলও পাওয়ার যোগ্যতা ও হারিয়েছে। হা ঈশ্বর, মানুষ এতোটা নিষ্ঠুর হয় কেমন করেন!


কেবল মুনিম ভয়ে ভয়ে একটু পরপর উঁকি দিয়েছে। একবার অনেক সাহস করে বলেছে: স্যার একটু চা দেই।
চা খেতে রাব্বির কোন ইচ্ছাই ছিল না কিন্তু মুনিমের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য মাথা নাড়ল। এই প্রথম মুনিমের চা বিস্বাদ লাগল। এক ঢোক খেয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। আজকের চাটা কেমন বিস্বাদ লাগছে! রাব্বি একের পর এক সিগারেট টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলেছে। দুপুরে খেতেও গেল না।
আবারও মুনিমের যন্ত্রণা। রাব্বি কিচ্ছু বলেনি অথচ গাধাটা প্যাকেট লাঞ্চ রেখে গেছে। প্যাকেটের জায়গায় প্যাকেট পড়ে রইল। ও ছুঁয়েও দেখল না। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি সব গুলিয়ে গেছে। নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তালামারা ড্রয়ারে টাকা আসবে কোত্থেকে, তাও বিরাট অংকের টাকা? চাবি অবশ্য যে কেউ হাতিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ল্যাপটপের ওই আপত্তিকর ফাইল, তথ্য কেমন করে আসল? ওদের প্রত্যেকের নিজস্ব পাসওয়ার্ড আছে। তাহলে?


এইবার রাব্বি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। মুনিম কেবল উঁকি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আহ, কেন তুমি বারবার বিরক্ত করছ!
স্যার, একটু কথা আছিল।
এখন কোন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না, তুমি যাও এখান থেকে।
স্যার, আপনারে চাকরি থিক্যা বাইর কইরা দিব এইটা আপনি এখন জানলেন! আমরা সকালেই জাইনা গেছি। সৈয়দ স্যার এইটা নিয়া কার সঙ্গে জানি ফোনে কথা বলতাছিল।
সৈয়দ সাহেব তাহলে এর পেছনে আছেন?
জ্বী স্যার।
রাব্বির কথা বলতে ভাল লাগছে না। মুনিম বিদায় হলে ও বাঁচে। এটা ও খানিকটা আঁচ করতে পারছিল কিন্তু মেলাতে পারছে না।
মুনিম ফিসফিস করে কী যেন বলল। রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, কি বলছ!
মুনিম গলা আরও নামিয়ে বলল, স্যার, শামসির স্যারও এর সঙ্গে আছেন।
রাব্বি চেঁচিয়ে বলল, ক্কি, কি বললা তুমি। ফাজলামি করো, থাপ্পড় দিয়া দাঁতসব ফালায়া দেব। ফাজিল কোথাকার!
স্যার, মিথ্যা বললে আপনের জুতা দিয়া পিটাইয়েন। আমার বাচ্চার কসম, আমি মিথ্যা বলতাছি না।
মুনিম, তুমি জানো, তুমি কী বলছ!
জাইনাই বলতাছি, স্যার।
আহ-।
স্যার, কাইল আপনে বিকালের আগেই বাইর হয়া গেছিলেন। আমি ভাবলাম আপনে রুমে আছেন। চা নিয়ে ঢুকলাম। দেখি, শামসির স্যার আপনার চেয়ারে বসা, আপনার ড্রয়ারে কি জানি ঘাটাঘাটি করতাছে। আমারে দেইখা চোরের মত হাত সরাইয়া ফেলল। চিক্কুর দিয়া কইল, এই স্টুপিড রুমে না জিগাইয়া ডুকলি কেন রে হারামজাদা। স্যার, আপনেই কন, অন্যদের রুমে আমি কি না জিগাইয়া ঢুকি? খালি আপনার রুমে না জিগায়া ঢুকি, আপনে কখনও কিছু মনে করেন না এই লাইগা।


রাব্বি মাথা ফেলে দিল। হে প্রভু, হে পরম করুণাময়, এটা শোনার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল ছিল। এখন সব হিসাব মিলে যাচ্ছে। তাই হবে, কেবল শামসিরের পক্ষেই সম্ভব। শামসিরই ওর পাসওয়ার্ড জানে। নিয়ম নাই কিন্তু সীমাহীন হৃদ্যতার কারণে ওরা পরস্পরের পাসওয়ার্ড সেই কবে থেকেই জানে। কেবল এই ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডই না, চাপে থাকলে একজন অন্যজনের মেইলও চেক করে। প্রয়োজনে রিপ্লাইও দেয়।
শেষ পর্যন্ত শামসির, তুই-ও!

একজন মানুষ এতো কাছ থেকে ছুঁরি মারতে পারে কেমন করে? এই পৃথিবীতে কেন বন্ধু, কেন রোদ, কেন বৃষ্টি? কেন-কেন-কেন? রাব্বি ভেবেছিল কোম্পানির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সাধ্যমত লড়বে। কিন্তু এই ইচ্ছাটা এখন আর তিলমাত্র নাই। মনে হচ্ছে যেন হাত থেকে ব্রক্ষ্মাস্ত্র খসে  পড়েছে।

মুনিম শান্ত গলায় বলল, স্যার, দুপুরে যখন খাইতে বাইরে গেলাম। একটা ইটের আধলা নিয়া আসছি। আমার তো আর কেউ নাই। সাত বছরের একটাই মাইয়া। আপনে খালি কথা দেন এই মাইয়াডারে দেখবেন। বেশি কিছু করতে হইব না ওরে খালি তিনবেলা চাইরটা ভাত দিবেন। আর কিছু লাগব না। আমি এক্ষণ গিয়া ইটটা দিয়া এই দুই জানোয়ারের মাথা দুই ভাগ কইরা দিয়া আসি।
রাব্বির বুক থেকে জগদ্দল পাথরটা নেমে গেল। এখন মনে হচ্ছে ওর আর হারাবার কিছু নেই। বাঁধভাঙ্গা আবেগ গোপন করে বলল, পাগলামি করবে না, খবরদার। খবরদার বললাম, খবরদার। তাছাড়া আমার নিজের যে জেল হবে না এইটার কি ঠিক আছে। যাও, আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও।


রাব্বি অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে শামসিরকে খুঁজে বের করল। তাকে সৈয়দের রুমে পাওয়া গেল। রাব্বি শামসিরের নতচোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, কেউ কেউ ক্যারিয়ারের জন্য তার মাকে অন্যের বিছানায় তুলে দেয়। তুই তাদের একজন।
শামসির টুঁ-শব্দও করল না।
রাব্বি এবার বলল, শামসির তুই একটু বাইরে যা।  সৈয়দ স্যারের সাথে একটু কথা আছে।
শামসির নড়ল না।
রাব্বি এবার কাতর গলায় সৈয়দকে বলল, বস, আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলে চলে যাব। প্লিজ, শামসিরকে বলুন একটু আমাদের একা ছেড়ে দিতে। আমার ভুলের জন্য আপনার মনে যে কষ্ট হয়েছে এর জন্য আমি একটু কথা বলতে চাই।
শামসির তবু্‌ও অনড়।
সৈয়দ বললেন, সমস্যা তো নাই, বলুন না কি বলবেন?
রাব্বি গলায় তীব্র কাতরতা ফুটিয়ে বলল, প্লিজ, বস, এই একটা ফেভার করুন। লাস্ট ফেভার।
এইবার সৈয়দ মৃদু গলায় বললেন, শামসির, আপনি একটু পরে আসুন।
শামসির তীব্র অনিচ্ছায় কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে, রাব্বি দরোজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। এবার মুখ খুলল, একেকটা শব্দ আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করছে, এরিমধ্যে কেবল একবার নীচু হয়ে সোজা হলো, আর সৈয়দ-। বস- শুয়োরের বাচ্চা, অনেক ভয় দেখিয়েছিস। জানিস না, একজন মানুষকে এতোটা ভয় দেখাতে নাই যেন তার ভয় কেটে যায়। কুত্তার বাচ্চা, তুই পশুরও অধম, পশুর জন্যে জঙ্গলের আইন, কেবল জঙ্গলের আইন। তুই না খুব গর্ব করে বলতি তোর গায়ে হাত দিতে পারে এমন কোন মানুষ আজ পর্যন্ত জন্ম নেয়নি, বলতি না? এই নে, এটা আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য ছোট্ট উপহার-। যত দিন বেঁচে থাকবি এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবি।

সৈয়দ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, এটা কি করলেন আ-আপনি! আপনি সিক নাকি!
রাব্বি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, সিক আমি না, তুই, তুই মাদারচোদ। ড্রাইভারের খাবার নিজের বলে বাড়িতে নিয়ে যাস আবার ডাক্তারি কপচাচ্ছিস।
রাব্বি লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে পড়ল। পেছনে পড়ে রইল ভাঙ্গাচোরা একজন মানুষ।

Saturday, October 16, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৭

রাব্বি অফিসে এসে গুম মেরে বসে আছে। নিজের রুম থেকে বের হয়নি। আজকাল অফিসে মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মুনিম প্রায় নিঃশব্দে চা-র কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখল। সাথে ঝকঝক করছে এমন একটা কাঁচের গ্লাসে পানি। চায়ে চুমুক দিয়ে বরাবরের মত রাব্বির সেই একই অনুভূতি হলো। ওর ধারণা, মুনিমের চা হচ্ছে পৃথিবীর সেরা চা। লোপাও চমৎকার চা বানায় কিন্তু মুনিমের ধারেকাছেও নেই। অজান্তেই রাব্বির মুখ থেকে তৃপ্তির অস্ফুট শব্দ বের হলো।
মুনিম ভয়ে ভয়ে বলল, স্যার, চা ভাল হয় নাই?
না, ভাল হয় নাই।
কি করুম স্যার, কন। অন্যদিন যেমন বানাই আজও তেমনি বানাইলাম।
আরে না, ভাল হয় নাই কেন বললাম, জানো। খুব, খুবই ভালো হয়েছে। আচ্ছা মুনিম, তুমি অফিসের সবার জন্য কি একই চা বানাও?


রাব্বির এই প্রশ্নটা অনেক দিন থেকে করবে করবে করেও করা হয়নি। কারণ আছে। বেশ ক-দিন ভুলে শামসিরের চা ও চুমুক দিয়ে ফেলেছিল, ওই চা-টা আহামরি কিছু ছিল না।
মুনিম থেমে থেমে বলল, জানি না, স্যার। তয় আপনার চা-টা যখন বানাই মন থিক্যা।
বলো কি!
স্যার, এই অফিসে আপনেই একজন স্যার যে আমাদের মতো ছোট মানুষদের দাম দেন।
ধুর।
আপনারে আইজ বলি, আপনারে নিয়া এই অফিসের অন্য পিয়ন, ড্রাইভার কি কয় জানেন? অনেক অফিসে অনেক সাহেব দেখছি কিন্তু রাব্বি স্যারের মত দেখি নাই। তিনি সবার ভাল-মন্দ জিগান। সবার সাথে হাত মিলান। তাইনের লগে হাত মিলায়া যেই সুখ এইটা কোন তুলনা নাই।
রাব্বির কেমন লজ্জা-লজ্জা লাগছে। বিব্রত গলায় বলল, আচ্ছা, এখন তুমি যাও।
মুনিম বেরিয়ে যেতে যেতে ইতস্তত করছে দেখে রাব্বি বলল, তুমি কি কিছু বলবে?
না স্যার।
আচ্ছা ঠিকাছে।


মুনিম প্রায় দরোজার কাছে গেয়ে ফিরে আসল।
মুনিম, কিছু বলতে চাইলে বলো?
স্যার, একটা কথা বলি, রাগ করবেন না তো?
কেন, কথাটা কি রাগ করার মত?
স্যার, ছোট মুখে বড়ো কথা হইলে মাফ কইরা দিয়েন।
আচ্ছা যাও, আগেই মাফ করে দিলাম। এখন বলো।
আপনি এই অফিসের সবাইরে বিশ্বাস কইরেন না। খুব কাছের মানুষরেও না।
রাব্বি অবাক, এটা কেন বললে?
স্যার, আপনে আগেই বলছেন রাগ করবেন না।
তা বলেছি। কিন্তু এইসব কি বলছ!
স্যার, আপনার ভালার জন্যই কইলাম। আর কিছু জিগায়েন না। যাই স্যার।


রাব্বি অবাক হয়ে ভাবছে, এটা সত্য ও সবার ভালো-মন্দ খোঁজ করে, এটা ওর সহজাত অভ্যাস। আশ্চর্য, এই সামান্য বিষয়টা এরা মনে করে বসে থাকে! এটা নিয়ে আবার আলোচনাও হয়! এতো অল্পতে মানুষজন মুগ্ধ হয়ে পড়ে। আশ্চর্য!
এখন এটা ছাড়িয়ে ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মুনিম এমনটা কেন বলল! নিশ্চয়ই ও কিছু জানে। অযথা একটা বিষয় বলে মুনিম ওকে বিভ্রান্ত করবে এটা ও বিশ্বাস করে না। মুনিম কোন এক বিচিত্র কারণে ওকে পছন্দ করে এটায় কোন সন্দেহ নেই।
রাব্বি গুছিয়ে মেইলটা লিখল। এম.ডি বরাবর মেইলটা পাঠিয়ে দিল। বুকের ভেতর থেকে একটা অজানা ভয় পাক খেয়ে উঠল। তীর বেরিয়ে গেছে, এখন এটা নিয়ে ওর করার কিছুই না। ওর সব কিছু এখন খড়গের উপর ঝুলছে। হয় খুব ভালো কিছু ঘটবে, নয় সব কিছু ভেঙ্গে পড়বে।


হইচই করে শামসির ঢুকল। শামসির কেবল ওর কলিগই না, অসম্ভব ভালও বন্ধুও।
আরে-আরে, আমাদের রাব্বি মিয়া দেখি ল্যাপটপের উপর উঠে বসে আছে। বিষয় কী? কোন প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছিস নাকি?
নারে।
তো, কাহিনি কী!
এম.ডি-কে একটা মেইল করলাম।
ওরি বাবা, ডরাইছি। তোর দেখি হট-লাইন। একেবারে এম.ডি। বাপ, একটু ঝেড়ে কাশো।
‘ব্যাকবোন’।
মানে!
কেন, তুই জানিস না?
মনে পড়ছে না।
আরে, মনে নাই তোর, আমাদের জন্য একটা সুযোগ রাখা হয়েছিল। অফিসিয়াল কোন বিষয়ে যে-কারো বিরুদ্ধে রং-ডুয়িং কিছু ঘটলে তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল অভিযোগ করা যাবে।
হুম। মনে পড়েছে। তো?
একটা অভিযোগ করলাম।
কার বিরুদ্ধে?
সৈয়দ বাসের।
বলিস কী?
হুঁ।
করেছিস কী!
কি আর করা, যা করার করে ফেলেছি।
শামসিরের চোখে আতংক, কি এমন সমস্যা হলো যে তুই ফট করে এম, ডিকে মেইল করে বসলি।
শুনলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে!
মাথা খারাপ হলে দেখা যাবে। তুই সমস্যাটা বল।


রাব্বি ড্রয়ার খুলে বিলের কপিগুলো বের করল। একে একে কাগজগুলো গুছিয়ে শামসিরের হাতে দিল।
শামসির বিলের কপিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সময় নিয়ে।
রাব্বি চেয়ারে দোল খেতে খেতে বলল, কি বুঝলি?
সবই বুঝলাম, কিন্তু-।
কি?
শামসির এবার রাগি গলায় বলল, কোম্পানির টাকা জাহান্নামে যাক, তোর সমস্যা কী!
কী বলিস! কোম্পানির টাকা সৈয়দ খেয়ে ফেললে আমার সমস্যা নাই।
তোর সমস্যা কী, তোর টাকা তো আর না। নাকি তোর বাপের টাকা!
রাব্বি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দেখে শামসির তাড়াহুড়া করে বলল, ভাল কথা, তুই একবার আমার সাথে এই বিষয়ে কথাও বললি না।
সরি রে, আমার আসলে মাথা কাজ করছিল না।
তুই জানিস না সৈয়দের হাত কত লম্বা, জানিস না?
হুঁ।
তারপরও!
হুঁ।
মেইলটা কি পাঠিয়ে দিয়েছিস, নাকি পাঠাসনি?
না, পাঠিয়ে দিয়েছি।
ক্রাইস্ট, ঠিক বলছিস?
হুঁ।
শামসির আর কিছু না লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল। যাওয়ার সময় বিষণ্ন গলায় বলল, তুই ভুল করেছিস, বিরাট ভুল।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, হুঁ!


রাব্বির মনটা আরও বিষণ্ন হলো। শামসির যে কেবল ওর ভাল বন্ধু এটুকুই না, এমন খুব বিষয় আছে যা ওরা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে না। এমনও দেখা গেছে পুরো অফিস একদিকে ও এবং রাব্বি আরেক দিকে। আজ পর্যন্ত এমন কোন বিষয় নাই দুজনের মতের মিল হয়নি। অথচ আজ শামসিরের আচরণ ওর কাছে কেমন দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। রাব্বি খানিকটা বিভ্রান্ত, এই কাজটা ঠিক হলো নাকি বেঠিক এটা শামসিনের আচরণে স্পষ্ট হয়নি। এটাই ওকে ভাবাচ্ছে...।

* জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6