Thursday, September 9, 2010

ভান-গুরু, ভাজনেষু-পদেষু হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদকে হাতের নাগালে পেলে পা ধরে কদমবুসি করতাম কারণ মানুষটা ভান নামের জিনিসটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন! এই দুরূহ কাজটা সবাই পারেন না, হুমায়ূন আহমেদের মত মানুষরাই পারেন। ভান নামের লেবেনচুষটাকে আবেগের মোড়কে জড়িয়ে আমাদের হাতে ধরিয়ে দেন। তাই এই লেখাটা আমি শ্রদ্ধাভাজনেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু হুমায়ূন আহমেদকে উৎসর্গ করছি। ভাজনেষু-পদেষু টাইপের জিনিসগুলো হুমায়ূন আহমেদের খুবই প্রিয়- তাঁর বইয়ের উৎসর্গে নিয়ম করে থাকে।

হুমায়ূন আহমেদ কালের কন্ঠে 'ঈদ আনন্দ সংখ্যা ২০১০' (৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০) [১] -এ ইমদাদুল হকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "১৯৭১ সালে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসার পর বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তই আমার জন্য আনন্দের। শাওনের সঙ্গে যখন ঝগড়া করি তখনো আনন্দ পাই। মনে হয় বেঁচে আছি বলেই তো ঝগড়া করতে পারছি। আমি যে আপনি কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তরে 'বেঁচে আছি' বলি, এটাই একটা কারণ।"

ওয়াল্লা! কী সোন্দর-কী সোন্দর! কী আবেগঘন বাতচিত- দুর্বলচিত্তের মানুষ হলে আমি কেঁদেই ফেলতাম! এই সাক্ষাৎকার পড়ে মনে হবে ১৯৭১ সালে হুমায়ূন আহমেদ বীরের মত লড়তে লড়তে একটুর জন্য বেঁচে গেছেন, পাক আর্মির নির্যাতন সেলে ছুঁরি পিছলে গেছে বলে গলা কাটা পড়েনি! যেমন মাসুদ রানার গায়ে গুলি চামড়া ছুঁয়ে চলে যায় অনেকটা এমন।
কিন্তু আমরা জানি, ১৯৭১ সালে যখন এই দেশের আপামর জনতা, মায় ১০ বছরের বালকও গ্রেনেড মেরে পাক-বাহিনীর বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছিল তখন হুমায়ূন আহমেদ ইঁদুরের মত পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তাঁর ভাই জাফর ইকবালসহ! কেবল তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে ইঁদুরের মত পালিয়েই বেড়াননি তিনি চাচ্ছিলেন ঝামেলা এড়াতে। যেটার অনেকটা আঁচ করা যায় তাঁর লেখায়:
"মাতাল হাওয়ায় (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫) হুমায়ূন আহমেদ নিজের সম্বন্ধে বলছেন, 'আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেমেস্ট্রির বইখাতা খুললাম। ধুলা ঝাড়লাম। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে...আবারও কেমিস্ট্রের বইখাতা বন্ধ। ...আসামি শেখ মুজিবর রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন। আবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এখন ভাসানী কোন ঝামেলা না করলেই হলো। এই মানুষটা বাড়া ভাত নষ্ট করতে পারদর্শী। হে আল্লাহ, তাকে সুমতি দাও। সব যেন ঠিক হয়ে যায়। দেশ শান্ত হোক।"

মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ সীমাহীন ফাজলামী করেছেন। তাঁর 'মাতাল হাওয়া' নিয়ে আমি যে লেখাটা লিখেছিলাম, 'মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ' [২], ওই লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, "আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, স্বাধীনতার এই উত্তাল সময়টায় হুমায়ূন আহমেদ নামের মানুষটার গাছাড়া, উদাসীন মনোভাব। যেখানে ১০ বছরের বালক গ্রেনেড মেরে পাকআর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছে সেখানে একজন তরতাজা, মতান্তরে ধামড়া মানুষ গা বাঁচিয়ে চলে কেমন করে! মানলাম, একেকজনের একেক ভূমিকা। সবাইকে যোদ্ধা হতে হবে এমনটা নাও হতে পারে। আহা, হুমায়ূন আহমেদ নামের কেমেস্ট্রির পুতুপুতু ছাত্রটা যদি একখানা পেট্রল বোমা বানিয়ে কাউকে ধরিয়ে দিত তাও তো একটা কাজের কাজ হতো। আর কিছু না পারলে নিদেনপক্ষে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে একখানা ৪ লাইনের কবিতা লিখতেন?" 

বেচারা, হুমায়ূন আহমেদ, তখন তিনি কেমিস্ট্রের বইখাতা নিয়ে তখন বড়ই চিন্তিত ছিলেন।
শর্ষীনার পীর তাঁকে এবং তাঁর ভাইকে লুকিয়ে থাকার জায়গা দেননি বলে হুমায়ূন আহমেদ অনেক কষ্ট বুকে পুষে রেখেছিলেন। এই নিয়ে তিনি ফেনিয়ে প্রচুর লেখা লিখেছেন, কাঁদতে কাঁদতে কপোল (!) ভিজিয়ে ফেলেছিলেন! এই করে করে, কী কষ্ট-কী কষ্ট, বুকের ভালভ নষ্ট!
বেচারা এই কষ্ট চেপে রাখতে না-পেরে রাজাকার মাওলানা (!) মান্নানের [৩] পত্রিকা 'ইনকিলাব', 'পুর্ণিমা'য় নিরবচ্ছিন্ন-নিয়ম করে লেখা শুরু করলেন। ননস্টপ লিখতে থাকলেন। এমন কি জাহানারা ইমাম বলে বলে হুমায়ূন আহমেদকে থামাতে পারেননি। বেচারা জাহানারা ইমাম, তিনি কেমন করে জানবেন হুমায়ূন আহমেদের অতি লোভের ন্যালনেলে, লকলকে জিভ কেমন লম্বা হয়!

তাঁর সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে আসি। হুমায়ূন আহমেদই কি এই দেশের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৯৭১ সালে বেঁচে গেছেন? সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে তিনি ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ কেন নিয়ে আসলেন? ওই যে ভান, 'ভানবাজী'!
তাঁর কথায় আমরা জানতে পারি মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ওটির ট্রলিতে হাত-পা ছড়িয়ে তিনি নাকি চিঁ চিঁ করছিলেন, "বাঁচব নারে, বাঁচব না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা কাজের লেখা না-লিখে শেষ শ্বাস ত্যাগ করব না"।
তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। তিনি আয়ু পেয়েছিলেন। ফিরে এসে অনেক বছর পর তার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে বইটা লিখলেন সেই বইটার দাম ৪০০ টাকা। প্রচুর পাঠক বইটার চড়ামূল্যের কারণে কিনতে পারেননি! অথচ ইচ্ছা করলে তিনি অন্তত এই বইটার মূল্য কমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ওপথ মাড়াননি। ন্যূনতম চেষ্টাও তাঁর ছিল না।
ওই যে লেখার শুরুতে বলেছিলাম, ভান-গুরু। এমনিতে ১৯৭১ সাল নিয়ে তাঁর আবেগ এতোটাই প্রবল যে তাঁর 'তহবন' ভিজে একাকার হয়ে যায়! অতি সিক্ত 'তহবন' দিয়ে যে আমরা খানিকটা চোখ মুছব সেই অবকাশটুকুও রাখেননি। এ অন্যায়, ভারী অন্যায়!

নাটক-ভান কেমন করে করতে হয় এটা তাঁর চেয়ে ভাল কে জানে [৪]! হুমায়ূন আহমেদ ভান নামের বলটাকে নিয়ে জাগলিং করেন আর আমরা গোল হয়ে দাড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখি। হুমায়ূন আহমেদ বলেন, 'তালিয়া'। আমরা সজোরে তালি বাজিয়ে বলি, জয় গুরু, জয় ভান-গুরু। 

সহায়ক লিংক:
১. হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার, কালের কন্ঠ: http://tinyurl.com/39t44ja
২. মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_6179.html 
৩. মাওলানা (!) মান্নান: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_18.html
৪. হুমায়ূন স্যারের নাটক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_2278.html