Monday, September 6, 2010

স্কুল এবং 'ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তান'

ওঁর নাম জসীম। ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তানদের একজন- যাদের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নাই, আমি কোন ছার! অনেক আগে এঁদের নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, 'অমানুষ' [১]Hermaphrodite- যাদের প্রচলিত নাম হচ্ছে হিজড়া।

পূর্বেও লিখেছিলাম, লোকজনকে খাওয়াবার জন্য আমার কাছে কিছু ফান্ড ছিল। দু-দিন আগে এঁদের দাওয়াত ছিল। এর পেছনে কয়েকটা কারণও ছিল। এঁদের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত এখানে মুগ্ধতাও কাজ করেছে। স্টেশনের কাছে এই স্কুলটা [২] যখন চালু করি তখন ছেলেপেলেদের ধরা যাচ্ছিল না, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। প্রথম দিন এসেছিল মাত্র ৬ জন! এখন ছাব্বিশ ছাড়িয়ে গেছে। ফি-রোজ দুয়েকজন করে বাড়ছে।
স্টেশনের এই সব ছেলেপেলেদের জসীমরাই বকে-মেরে স্কুলে পাঠিয়েছেন। আমার আসা-যাওয়ার সময় এঁরা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইতেন, 'আইজ পুলাপাইন স্কুলে গেসে তো'?
কাউসার নামের স্কুলের একটা ছেলে আছে যার ঘুম কুম্ভকর্ণকেও হার মানায়। একে ঘুম থেকে জাগাতে গিয়ে এঁদের একজন কাউসারের কাঁথা ওভারব্রীজ থেকে নীচে ফেলে দিয়েছিলেন। কাউসারের স্কুলে না-আসা পর্যন্ত এঁরা ক্ষান্ত হননি।
এই কারণেও আমি ইশ্বরের এই সব ভালবাসার সন্তান নামের হিজড়াদের প্রতি ভারী কৃতজ্ঞ ছিলাম। এঁদের যখন বললাম, আপনাদের একবেলা খাওয়াতে চাচ্ছিলাম...। আমরা উল্লাস প্রকাশ করি হাতে কিল মেরে, এরা খানিকটা অন্যভাবে। বিচিত্র ভঙ্গিতে তালি বাজিয়ে। আমাকে একজন বললেন, আমাদের আরও কয়েকজন আছে, এদেরও বলি?
আমি সানন্দে বলি, আচ্ছা।
সব মিলিয়ে এঁরা হয়েছিলেন ১২ জন। আমি অবাক হই, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও কয়েকজন চলে এসেছিলেন! এমন না এঁরা একবেলা খেতে পান না কিন্তু এঁদের কাছে নিমন্ত্রণ এবং সবার সঙ্গে একত্র হওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দের।

বিকালে আমি তখন স্কুলে। স্কুলের ছেলেরা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছে, আমি চোখ ভরে দেখছি।

বাইরে হইচই! বেরিয়ে দেখি এরা সবাই দাঁড়িয়ে। আমার বুক কেঁপে উঠে, হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় এঁদের খাওয়ার সময় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি যদিও সমস্ত আয়োজন করা ছিল। তাহলে কি খাবার পছন্দসই হয়নি? এঁরা এই জন্য কি আমার জবাবদিহি চাইতে এসেছেন?
আমি ভয়ে ভয়ে জিগেস করি, কি হয়েছে?
সম্ভবত আগে থেকেই 'শুকতারা' নামের একজনের চোখে পানি টলমল করছিল। এক্ষণ 'শুকতারা' হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। 
ঘটনাটা হয়েছে এমন, এঁরা খাওয়ার পর কয়েকজন যখন কুমিল্লায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলেন তখন ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইছু মিয়া নামের একজন, ট্রেনের দরোজায় কেন দাঁড়িয়ে আছে এই সামান্য অপরাধে শুকতারাকে লাথি মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। এরপর বেদম পেটায়।
শুকতারা যখন তাঁর হাতের পেটানোর দাগগুলো দেখাচ্ছিলেন তখন আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি- অদম্য রাগে আমার শরীর কাঁপছিল। ঈশ্বর, একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে!
 জিআরপি ওসি স্টেশনের বাইরে। এঁরা জিআরপি থানায়ও গিয়েছিলেন কিন্তু এদের হাঁকিয়ে দেয়া হয়।

এঁরা আমার কাছে বড়ো আশা নিয়ে এসেছেন কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা কই? আমি চোখের পানি গোপন করে একজনের পর একজনের কাছে পাগলের মত ফোন করতে থাকি।
ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত জাতীয় দৈনিকের, প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজনরা চলে এসেছেন। আমি এখন আর আগের মত অবাক হই না। অনুমান করি, সমস্ত পত্রিকার লোকজন এই খবরটা এখান থেকে পাঠিয়েছেন কিন্তু কোন দৈনিকেই এই খবরটা আসেনি। দৈনিকগুলোর এই তুচ্ছ খবর ছাপাবার সময়, স্পেস কোথায়! আমাদের 'সো কলড' বিবেক!

নিতল অন্ধকারেও কোথাও-না-কোথায় আলো থাকেই, জিআরপি ওসি নামের সহৃদয় মানুষটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই মানুষটা কেবল এঁদের কাছে দুঃখ প্রকাশই করেননি, অভিযুক্ত ইছু মিয়াকে শাস্তি দেয়ারও ব্যবস্থা করেছেন। কেবল কঠিন তিরস্কার করেই ক্ষান্ত হননি, ইছু মিয়াকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইছু মিয়ার ঈদটা ভাল কাটবে না কারণ ব্যারাকে থেকে তার ঈদের উপরি আয় বন্ধ।

এটা হিজড়া নামের মানুষদের কেবল বিজয়ই না, আমাদের নগ্নতা ঢাকার একচিলতে কাপড়ও বটে। 'শুকতারা' নামের মানুষটার শরীরে মারের দাগ শুকাতে হয়তো খানিকটা সময় লাগবে। কিন্তু তাঁর যাওয়ার সময় আমি যে হাসি দেখেছি, আমি নিশ্চিত, তাঁর মনের দাগ খানিকটা শুকিয়েছে।
'শুকতারা' নামের মানুষটার ইতিহাস জেনে আমি হতভম্ব হই। এঁ একজন আর্মি অফিসারের সন্তান এবং আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এখনও কর্মরত। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি কিন্তু অন্য সূত্র ধরে নিশ্চিত হওয়া গেল শুকতারা মিথ্যা বলছেন না। নিজের মান বাঁচাতে যে আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এই অভাগা সন্তানকে ত্যাগ করেছেন তার নাম-ধাম এখানে দেয়াটাই সমীচীন ছিল। শুকতারার অনুরোধে দিলাম না, আমি শুকতারাকে কথা দিয়েছি।

এঁরা যখন সবাই একজোট হয়ে থানার দিকে যাচ্ছিলেন তখন আমি ট্রেনেথাকা এবং আশেপাশের মানুষদের অভিব্যক্তি লক্ষ করি। এদের প্রায় সবার চোখেই অপার কৌতুহল। ঢলঢলে মুখে, চকচকে চোখে যেমনটা আমরা চিড়িয়াখানার পশুদের দেখে অপার আনন্দ লাভ করি, অনেকটা তেমন। কেউ কেউ অযাচিত মন্তব্যও করছিলেন। যারা বিদ্রুপের বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলেন এদের অনেকেই আমার চেয়ে সুশ্রী, চকচকে কাপড়পরা, চোখ বন্ধ করে এও বলা চলে অনেকে আমার চেয়ে শিক্ষিতও।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমরা আসলে সেই আদিম মানুষই রয়ে গেছি। একপেট আবর্জনা ঢেকে রাখার অযথাই ব্যর্থ চেষ্টাই করি...।

সহায়ক লিংক:
১. অমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_30.html
২. অভাগাদের স্কুল: http://tinyurl.com/327aky3