Saturday, August 21, 2010

চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে।


চালু একটা কথা আছে, চোর-চোট্টায় দেশটা ভরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হবে চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে দেশের সবাই যেমন চোর না, তেমনি বিদেশেরও; এই নিয়ে কুতর্ক করার অবকাশ নাই।
আমাদের দেশে জায়গা কম, লোক বেশি। যা হওয়ার তাই হয়, দলে দলে আমাদের দেশের লোকজনেরা বিদেশে পাড়ি জমান। কে জানে, একদিন এমন আসবে এই দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা দেশে থাকবেন, অর্ধেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে অন্য দেশগুলোয়। আর বিদেশের লোকজনেরা? এরা তখন কিছু নিজের দেশে থাকবেন, কিছু মহাশূণ্যে।

আমরা যেখানেই যাই সেখানেই আমাদের ছাপ থেকে যায়। খাসলত যাবে কোথায়! অবশ্য আমরা যারা দেশে থাকি প্রবাসীদের প্রতি সমীহের দৃষ্টিতে তাকাই কারণ এঁরা বিদেশে থাকেন, বিদেশিদের কাছ থেকে রাশি রাশি জ্ঞানগর্ভ বিষয় দেখে শেখেন। নিয়ন্ত্রিত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, রেড ওয়াইন-হোয়াইট ওয়াইন এঁদের বুদ্ধি খোলতাই করে। আমরা হাঁ করে থাকি এদের কাছ থেকে শেখার জন্য।

'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' নামে নীলিমা ইব্রাহিমের অসাধারণ একটা বই আছে। মুক্তিযুদ্ধের বই 'ফ্রিডম' যখন লিখি তখন এই বই থেকে অল্প কিছু রেফারেন্সও ব্যবহার করেছিলাম, কারণটা ছিল ভিন্ন। যেখানেই সুযোগ এসেছে আমি বলার চেষ্টা করেছি, এই প্রজন্ম যেন অন্তত এই বইটা পড়ার চেষ্টা করে। কারণ এখানে আমাদের যুদ্ধের এমন কিছু অন্ধকার দিক এসেছে আজকাল যা চোখে পড়ে না। আমাদের যা অভ্যেস, সব কিছুতে আমরা কিছু-না-কিছু মিশিয়ে দিচ্ছি। ফল যা হওয়ার তাই হয়, জানতে পারি আমরা সত্য-অসত্যের মিশেলে ভাসা-ভাসা এক অবয়ব, বিকলাঙ্গ এক শিশু !

১৯৯৭ সালে 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইটির ভূমিকায় নীলিমা ইব্রাহিম লিখেছিলেন, "...সম্প্রতি আমার তরুণ প্রকাশক প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড নিয়ে 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' গ্রন্থের অখন্ড সংস্করণ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন..."।
'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইয়ের প্রকাশক, জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে এটাও আমার জানা, তিনি যখন বইটি প্রকাশ করেন তখন এই বইটি নামকরা প্রকাশনীর কেউই ছাপতে রাজি হননি! ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তিনি বইটি প্রকাশ করেছিলেন। এখানে ব্যবসায়িক চিন্তা খুব একটা কাজ করেছে বলে আমার মনে হয় না। আজ তিনি কতটা বদলেছেন আমি জানি না কিন্তু এটা সেই সময়কার কথা যখন নীলিমা ইব্রাহিমের ভাষায় তিনি 'তরুণ প্রকাশক'। তরুণ? কতটা তরুণ? অনুমান করি, বাইশ-চব্বিশ। এমন একটা বয়স যখন একজন যুবকের দু-চোখে থাকে কেবলই স্বপ্ন।

আমার জানামতে, জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক শয়ে-শয়ে বই বের করেছেন কিন্তু আমি নিশ্চিত, 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' প্রকাশের স্বপ্ন তাঁকে এখনও তাড়া করে।
আর ব্যবসায়িক চিন্তা থাকলে দোষ কী! একজন প্রকাশককেও বই ছাপাবার ব্যয় বহন করতে হয়, পরিবার চালাতে হয়; লাভের টাকায় অন্য আরেকটা বই ছাপাবার উদ্যোগ নিতে হয়।
'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে...' শুনতে চমৎকার লাগে কিন্তু লেখকদের কৌপিন পরে কেবল উবু হয়ে লিখলেই চলে না, পেটে দানাপানি দিতে হয়। কারণ লেখক রোবট না- কেবল রোবটেরই খাওয়ার এবং বাথরুমের চিন্তা নাই।

কানাডা প্রবাসী কিছু লোকজন এই বইটির নাট্যরূপ দিচ্ছেন। শুনলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। তবে একটা কিন্তু থেকেই যায়। জানা গেছে, এঁরা এই বইটির প্রকাশক এবং লেখকের অনুমতি নেননি। লেখক প্রয়াত কিন্তু তাঁর পরিবারের লোকজন রয়ে গেছেন, তাঁদের সঙ্গেও কোন ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি, অনুমতিও নেয়া হয়নি।
কেবল তাই না, এঁরা অনুমতির তোয়াক্কা করছেন না। প্রকাশকের লিখিত আপত্তি এবং লেখকের পরিবারের অনীহা থাকার পরও এই নিয়ে গা করছেন না! তাঁদের এই গা-ছাড়া ভাবের উৎস কি?

কানাডার মত একটা দেশে থেকে এটা তো আমাদের চেয়ে ভাল জানার কথা, কপিরাইট বলতে একটা বিষয় আছে। কারও অনুমতি ব্যতীত তাঁর লেখা ছাপানো যায় না, নাট্যরূপের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ নাট্যরূপ হচ্ছে সেই বিষয়, কখনও কখনও প্লাস্টিক সর্জারির মত লেখার গোটা আদলটাই বদলে যায়।
এখন কেউ কারও মুখ প্লাস্টিক সার্জারি করবে সেই মানুষটার অগোচরে, মানুষটাকে অজ্ঞান করে। এ কেবল অপরাধ না, এটা জঘন্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রচলিত আইন এই অপরাধ করতে অনুমতি দেয় না। তারচেয়ে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, এটা তো রগরগে প্রেমের উপন্যাস না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ দলিল। যখন যার খুশি এটার নাট্যরূপ দিয়ে মহড়া শুরু করে দেবেন। ইচ্ছা হলেই রক্ত চাই-রক্ত চাই টাইপের সংলাপ বসিয়ে দেবেন!

আইন, আইনের জায়গায় থাকুক। এই 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইটির ১৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, "...বঙ্গবন্ধুকে যখন বলেছিলাম উনি বল্লেন, 'না আপা, পিতৃপরিচয় যাদের নেই সবাইকে পাঠিয়ে দেন। মানুষের সন্তান মানুষের মত বড় হোক। তাছাড়া ওই দূষিত রক্ত আমি এদেশে রাখতে চাই না...'।"
হা ঈশ্বর, দূষিত রক্ত! এখন কি আর এই সব সত্যগুলো অবিকল থাকবে? খানিকটা যে পরিবর্তন হয়ে যাবে না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে?
যারা এই বইগুলোর নাট্যরূপ দেবেন, এরা যে এদের পছন্দমতো সংলাপ জুড়ে দেবেন না এর নিশ্চয়তাই বা কোথায়!

'নতুন দেশ' [১], এই সাইটে গিয়ে আমি একটা ধাক্কার মত খেলাম।

এখানে চমৎকার (!) একটা ছবি দেয়া আছে। গুরুতর মহড়াও চলছে। ড্রয়ংরুমে কী দুর্ধর্ষ মহড়া! যা হোক, মহড়া বলে কথা! সমস্যটা অন্যখানে। হতভম্ব হলাম যেটা দেখে, ওখানে লেখার শিরোনাম হচ্ছে,  মঞ্জুলী-ফেরদৌসের আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। বাহ, নীলিমা ইব্রাহিম থেকে মঞ্জুলী ফেরদৌস হয়ে গেছে! "মঞ্জুলী ফেরদৌসের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি'!"
ব্রাভো!
কালে কালে দেখব, লোকজন রবীন্দ্রসঙ্গীতও রচনা করা শুরু করে দিয়েছে। তাদের রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবার সুরও দেয়া হচ্ছে। আবার একজন মাথা দুলিয়ে দরদ দিয়ে গাইছেনও। হতে পারে না এমনটা, বেশ পারে।
সত্যি বলছি, অন্যদের কথা জানি না, এমনটা হলে আমি খুব একটা অবাক হবো না।   

নিয়ম করে এই সব চলেই আসছে।

ক-দিন আগে অমিত কুমার সরকার নামের একজন আমার একটা লেখা 'আমি কেউ না, আমি কিছু না' [২] একটা ওয়েবসাইটে নিজের নামে হুবহু ছাপিয়ে দিলেন, দাঁড়ি-কমাসহ!

একজন পাঠক চ্যালেঞ্জ করলে তিনি আবার জাঁক করে উত্তরও দিয়েছেন, তার সোর্স নাকি ডিসকভারি এবং নিজস্ব ডায়েরি। আমি ক্রোধ সংবরণ করে ওখানে সুবোধ বালকের মত একটা মন্তব্য করেছিলাম, 'আপনাকে এই লেখা লিখতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, না'?

অমিত কুমার সরকার নামের মানুষটা চোখের নিমিষে আমার যে লেখাটা কপি-পেস্ট করে দিলেন, তিনি কি কল্পনা করতে পারবেন, এই লেখাটা লিখতে আমাকে কী বিপুল তথ্য নাড়াচাড়া করতে হয়েছে? কত অসংখ্য বই পড়তে হয়েছে, কত বিনিদ্র রজনী কেটেছে?
একটা মানুষ অন্য একজন মানুষের এই কষ্টার্জিত অর্জন এক নিমিষে নিয়ে নেবেন? কিচ্ছু বলার নেই? একজন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সম্পদ অর্জন করবেন, অন্য একজন মানুষ গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবেন; ইচ্ছা হলেই ওই মানুষটার অর্জিত সম্পদ অবলীলায় নিয়ে নেবেন? আর আমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব! বাস্তবে কি এটা সম্ভব?

এদের দোষ দিয়ে লাভ কি, আমরা দেখে দেখে শিখি। নামকরা প্রিন্ট মিডিয়াগুলো আমাদেরকে হাত ধরে শেখায়। ওয়েব সাইট থেকে একটা লেখা পত্রিকায় হুবহু ছাপিয়ে লিখে দেয়, 'ওয়েবসাইট অবলম্বনে'। ভাবখানা এমন, ওয়েব সাইটের লেখা হচ্ছে গণিমতের মাল! গ্রামীন ফোন কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে [৩] চুরি শেখায়, শেখান হানিফ সংকেত [৪], আনিসুল হক [৫] গং। বেচারা আমাদের চুরি না-শিখে উপায় কী!

আইনের বাইরেও কথা থেকেই যায়। আমি মনে করি, এটা আমি পূর্বেও বলেছি, আমার কাছে আমার সমস্ত লেখালেখি হচ্ছে সন্তানসম। আমি কখনই চাইব না, আমার সন্তান অন্যের কোলে বড় হোক। সে কোলটা কতটা চকচকে, কতটা তুলতুলে তাতে আমার কী আসে যায়! আমি কখনই চাইব না আমাকে না-জানিয়ে আমার সন্তানকে কাটাছেঁড়া করা হোক, তাকে সো-কলড সুদর্শন বানানো হোক। নিজের দুবলা, কালো লিকলিকে সন্তান আমার কাছে দেবশিশু তুল্য।
আমি এটাও মনে করি, একজন লেখক একের পর এক শব্দের ইট বসিয়ে তাঁর নিজস্ব এক ভুবন সৃষ্টি করেন। পেছনে পড়ে থাকে তাঁর প্রিয়জনদের চোখের জল, বাচ্চার দুধ কিনতে না-পারার যন্ত্রণা, বিনিদ্র রজনী-রাত জাগা ভোর। 

'এই শব্দগুলো' নামের তাঁর সন্তানকে যখন কেউ ছিনিয়ে নেয়, আমি তাকে স্রেফ চোর বলব। ভুল বললাম, চোর না, ছিনতাইকারী বলব। শব্দের ছিনতাইকারী।
...   ...   ...
সেরীন ফেরদৌস, যিনি আবার 'নতুন দেশ' ই-পত্রিকার হর্তাকর্তা, ফেসবুকে তাঁর একটা মন্তব্য দেখলাম। তিনি বলতে চাচ্ছেন, বইয়ে স্বত্বের বিষয়টি বইয়ে লেখা নেই বিধায় এই চৌর্যবৃত্তিকে চৌর্যবৃত্তির পর্যায়ে ফেলার কোন অবকাশ নাই। তেমনি প্রয়োজন নাই অনুমতি নেয়ার।
হাস্যকর, অতি হাস্যকর! বইয়ে স্বত্বের বিষয়টি উল্লেখ না-থাকলে সমস্যা হবে প্রকাশক এবং লেখকের মধ্যে, অন্যদের কী! সেরিন ফেরদৌসের কি?
সন্তান কার এটা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী লড়বেন, কার ভাগে পড়বে এটাই বিচার্য বিষয়। নাকি জজ সাহেব এই সন্তানকে হিড়হিড় করে টেনে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
আর শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর পুত্রবধু কাজটি করছেন বলেই যে চৌর্যবৃত্তিটা আইনসম্মত হবে এটা কে বলল? স্বয়ং মুনির চৌধুরীও এই কাজটা করলে একই অপরাধে অভিযুক্ত হতেন। কী অদ্ভুত যুক্তি, একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেই তাঁকে কোন অন্যায়ের জন্য অভিযুক্ত করা যাবে না, নাকি? একজন কাদের সিদ্দিকী মুক্তিযোদ্ধা বলে কি তাঁর অজস্র অপরাধ, সাত খুন মাফ? আমাদের টাকায়, যে ব্রীজগুলো অর্ধসমাপ্ত রেখে অনায়াসে বিপুল টাকা বাগিয়ে নিলেন এই জঘন্য অপরাধ কী লঘু হয়ে যাবে?

*স্ক্রীনশট:
১. নতুন দেশ
২. সামহোয়্যারইন ব্লগ ডট নেট, অমিত কুমার সরকার
৩. আরিফ জেবতিকের ফেসবুক

**অমিত কুমার সরকারের বিষয়টা জানতে পারি ব্লগার শয়তানের 'এরম কৈরা লেখা চুরি করন ঠিক্না ঠিক্না' পোস্ট থেকে। এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছি, এই কারণে এই ব্লগার নামের লেখকের কাছে আমি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করি। 

সহায়ক লিংক:
১. নতুন দেশ: http://www.notundesh.com/binodon.html 
২. আমি কেউ না, আমি কিছু না: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_07.html 
৩. গ্রামীন ফোন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_06.html 
৪. হানিফ সংকেত: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_02.html 
৫. আনিসুল হক: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html