Friday, August 20, 2010

তিতলি তুমিও: ১

কল্লোল অসময়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। দুপুরে ঘুমানোর তেমন অভ্যাস নেই। কেমন গাছাড়া ভাব। বিকট হাই তুলে খানিকটা লজ্জিত হল, অবিকল কুকুরের ঘেউ শব্দের মত শোনাল। হাই উঠলে কেমন দেখায় আয়নায় দেখতে পারলে বেশ হত। এ ঘরে কোন আয়না নেই।

সাড়ে পাঁচটা বাজে। বাইরে আলো মরে আসছে। আশ্চর্য, এতটা সময় ঘুমিয়েছে! এমন সময়ের অপচয় উন্নত দেশের লোকজনরা সম্ভবত কল্পনাও করতে পারে না। দূর সম্পর্কের ফুফাত ভাই সেবার সুইডেন থেকে দেশে এসেছিলেন বেড়াতে। তিনি বাইরে থেকে আমদানী করা লাল মুখ আরও লাল করে বলেছিলেন: ডিসগামটিং, এইসবের মানে কী বল দেখি!
কি ব্যাপার, অলি ভাই?
দুপুরে কী এ দেশের পনেরো কোটি লোক ঘুমায়! যাকেই ফোন করি, ঘুমাচ্ছে। অফিসে করলে, সাহেব নাই কই? বাসায়। আরে এই দেশে কোন শালা সাহেব রে! বাসায় খোঁজ করলে সাহেব ঘুমুচ্ছেন, ডেকে দেয়ার নাকি প্রশ্নই আসে না। এইসব কী, হোয়াট ইজ দিস? সময়ের কোন দাম নাই, সময় কী বাদামের খোসা! এ দেশের পাবলিকের কবে জ্ঞান হবে, টাইম ইজ টাইম, নট ইয়্যুর মাইন। এমন জানলে দেশেই আসতাম না, শ্লা।


কল্লোল অলি ভাইয়ের ইংরাজী জ্ঞান দেখে চমৎকৃত। অনেক ক’টা বছর বাইরে থেকে এই অবস্থা! এই লোকের ইংরাজী জ্ঞান দেখি একটা দেশের প্রাইম মিনিস্টারের প্রায় সমান। আগে প্রাইম মিনিস্টার ইংরাজিতে ভাষণ দিলে, কী এক বিচিত্র কারণে ইংরাজীটা হিব্রু হয়ে যেত। ইদানিং অবশ্য তাঁর উন্নতি হয়েছে।
কল্লোল মনে মনে অসম্ভব বিরক্ত হচ্ছিল, লাল্লু খুব লেকচার দিচ্ছ দেশে ফিরে। বাইরে যাওয়ার পূর্বে মাথায় লুঙ্গি বেধে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকতে, ভুলে গেছ।
কল্লোল বিরক্তি চেপে বলেছিল: অলি ভাই, দেশের লোকজন সব ঘুমিয়ে থাকলে কি আর করা।

গাধা- গাধা, গাধারাই কেবল দুপুরে ঘুমায়, অলি ভাই বললেন অপ্রসন্ন গলায়।
কি বলছেন অলি ভাই, এই তো সেদিন চিড়িয়াখানায় গেলাম। অনেকক্ষণ ছিলাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। কই, দেখলাম না তো গাধা বাবাজীরা ঘুমুচ্ছে। খাচ্ছে-দাচ্ছে, দিব্যি লেজ নাড়াচ্ছে। অলি ভাই, লেজ মানে বুঝতে পারছেন তো? ইয়ে, আপনি তো আবার দেশের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন। লেজের ভাল বাংলা হচ্ছে গিয়ে পুচ্ছ-লাঙ্গুল। সরি, আপনার তো আবার বাংলার চেয়ে ইংরেজি জ্ঞান ভাল। ইংরাজিতে হচ্ছে, টেইল।
অলি ভাই লাল মুখের সঙ্গে মিলিয়ে বিচিত্র উপায়ে চোখও টকটকে লাল করে ফেললেন।
কল্লোল ভয় চেপে বলেছিল: সরি অলি ভাই, ঠাট্টা করলাম।
ইউ ব্লাডি রিলেটিভ, আই শ্যুট য়্যু, আনটিল য়্যু নেভার ডেড।
যাওয়ার বেলায় অলি ভাই একদিন বিদায় নিতে আসলেন। বিষণ্ন হয়ে বললেন, কল্লোল রে, ওদিনের ব্যাপারে মনে কষ্ট রাখিস না। চলে যাচ্ছি। কবে না কবে আবার তোর সঙ্গে দেখা হয়। বুঝলি, মানুষের তো রাগ হতেই পারে। আমি তো আর মহামানব না।
জ্বী, অলি ভাই, মানব, গুহা মানবের রাগ-টাগ তো হতেই পারে কিন্তু মহামানবের রাগ জিনিসটা ঠিক মিশ খাচ্ছে না।
বুঝলাম না, কী বললি।
সহজ কথাটা বুঝলেন না। বাংলা অভিধান মতে, মহামানব অর্থ হচ্ছে,  সমগ্র মনুষ্য জাতি। আপনি বললেন, আমি তো আর মহামানব না কি দাঁড়াল আমি তো আর 'সমগ্র মনুষ্য জাতি' না।
অলি ভাই নিমিষে লাফিয়ে উঠলেন, ইউ ব্লাডি রিলেটিভ ...।


মৌ ঠক করে চা’র কাপ নামিয়ে কানের পাশে প্রাণপণে চেঁচিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, চা-আ।’
কল্লোল উল্টিয়ে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। কঠিন করে ধমক দিল, ‘ফাজিল ছোকরি, আমি কী বেটোভেন, না কালা! এই মহিলা উল্লুক, এইসব কী শকার-বকার।’
‘ইশ-শ, ফুল সাউন্ডে যখন গান শুনিস, তখন বুঝি কিছু  হয় না। তোর কান তো আবার গন্ডারের চামড়ার। কিসব জঘন্য গান, 'অ-য়ে অয়ে'। ছি, এইসব ইংরেজি গান কেউ শোনে, শুধু তুই শুনিস।’
‘খুব যে বুড়ির মত কথা বলছিস। তোর ভবিষ্যৎ একেবারেই ঝরঝরে, অকালে পেকে টসটস করার ফল।’
‘আ-চ্ছা। তোর চা ঠান্ডা হচ্ছে। আচ্ছা ভাইয়া, ফ্রিজ থেকে বরফ ঠান্ডা কোক কাউকে এনে দিলে; ধর, সে খেতে দেরি করছে। তখন কি বলতে হবে, নিন ভাইসাব, আপনার কোক গরম হচ্ছে?’


কল্লোল চায়ে চুমুক দিয়ে থু থু করে মুখ আঁধার করে ফেলল। মা চায়ে চিনি দিয়ে শরবত বানিয়ে ফেলেছেন। লক্ষবার বলার পরও মা যন্ত্রের মত ওর চায়ে একগাদা চিনি ঢেলে দেন। মা কেন এমন করেন, এটা কী ইচ্ছা করে করেন! ওদের এই টানাটানির সংসারে দিনের পর দিন চিনির এই অপচয়, এর কোন অর্থ হয়! ওর গা কেমন গুলাচ্ছে, ক’চামচ চিনি দিয়েছেন কে জানে! সম্ভবত চার-পাঁচ চামচের কম না। বমি এসে যাচ্ছে।
‘ভাইয়া, চা খাবি না, ওরকম করছিস যে?
‘চা খাব কিরে, বল শরবত খাব কি না!’
‘মাকে আবার চা বানাতে বললে খুব রাগ করবেন। আমি বানিয়ে নিয়ে আসি?’
‘পাগল, তুই বানাবি কিরে, তুই কি চা করতে পারিস!’
‘পারি না, তাতে কি, মাকে কতবার দেখেছি চা করতে।’
‘খবরদার, চুলোর কাছে গেলে এক কিকে দাঁত ফেলে দিব।’
‘কোন দাঁতটা, যেটা নড়ছে?’
‘আরে তুই দেখি মহা অভদ্র রে।’
মৌ এ মুহূর্তে কোন শ্রেনীর ভদ্র এ নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না। নডনড়ে দাঁতটা এক চোখ বন্ধ করে বেদম নাড়াচ্ছে। দাঁতে জিব ছুঁয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া, দেখ-দেখ, জিহ্বা দিয়ে কেমন এপাশ ওপাশ করছি। তুই পারবি?’
‘কী কান্ড, বিনে পয়সায় মারাত্নক সার্কাস। তুই এক কাজ কর, জুয়েল আইচের সহকারী হযে যা।’
‘জানিস, ওদিন না টিভিতে দেখে চিনতেই পারছিলাম না। চমৎকার গোঁফ কেটে ফেলায় কী বিশ্রী দেখাচ্ছিল।’
‘ইয়ে মৌ, সিগারেট ফুরিয়ে গেছে; কি করি বল তো। বাবা কি বাসায়?’
‘একটু আগে তো দেখলাম।’
‘মাই লিটল সুইট হার্ট, বাবাকে লুকিয়ে চট করে একটা সিগারেট এনে দে।’
মৌ রেশমের মত চুল সবেগে এপাশ ওপাশ করে বলল, ‘না- না, আমি চুরি করতে পারব না।’
‘ধুর,বাবার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট আনলে চুরি হয় বুঝি।’
‘না-না।’
‘ইস, এ দেখি মাদার তেরেসা। আরে তুই তো আস্ত চোর।’
‘ভাইয়া, আজে-বাজে কথা বললে ভাল হবে না কিন্তু, আমি কিন্তু ...।’
‘কি, কি করবি তুই।’
‘আমি কিন্তু শেষে কেঁদে ফেলব।’
কল্লোল হাসি গোপন করে বলল, ‘মিথ্যা বললাম? এই তো সেদিন তুই আমার শার্টের পকেটে হাত দিলি।’
‘যা, মিথ্যুক কোথাকার।’


মৌ আজকাল ছড়া লেখে। প্রায় সবগুলোই কল্লোলকে নিয়ে। দিয়ে দিলেই হয় কিন্তু তা করবে না। চুপিসারে মানিব্যাগে ঢুকিয়ে দেবে। ওদিনের ছড়াটা ছিল এরকম:
              “ ভাইয়ার সাতদিন গোসল নাই 
তা ধিন ধিন-
 মাগো, কী গন্ধ কী গন্ধ
 মাথা চিনচিন।”
কল্লোল মৌ’র দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আবারও ছড়া লিখেছিস?’
মৌ’র মুখ নিচু হতে হতে হাঁটুতে ঠেকল। লাল-নীল হয়ে বলল,‘হুঁ।’
‘মাইগড, তুই দেখি মহিলা ছড়াকার হয়ে যাচ্ছিস রে। বল-বল, শুনি কি লিখেছিস। ভাল হলে পুরস্কার পাবি। নগদ আট আনা দেব।’
‘উহুঁ,’ মৌ গা দুলিয়ে বলল।
‘আহা বল না, লজ্জা কি।’
‘এখন বলব না।’
‘না বললে নাই, তোর মুখে ছাই। আমিও তোকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছি:

“ মৌ একদিন সকালে
 ঘুম থেকে উঠে দেখে,
 পেকে গেছে অকালে।
নড়বড়ে দাঁত তার করে ঝনঝন-
 পচা সব ছড়া লেখে
 বুদ্ধিতে ঠনঠন।”
মৌ নিখুঁত ভঙ্গিতে বালিশ ছুড়ে আধ হাত জিব দেখিয়ে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল। কল্লোলের সিগারেটের জন্য সুতীব্র ইচ্ছা হচ্ছে। জঘন্য এ জিনিসটার জন্য এ আকুতির কোন মানে হয়! ড. জনসন নামের ভদ্রলোক, সিগারেট নিয়ে চমৎকার লিখেছেন: সিগারেট হচ্ছে তামাক, চমৎকার কাগজে এটাকে মুড়িয়ে দেয়া হয়। এর একপাশে থাকে ধোঁয়া, অন্যপাশে নির্ঘাত এক নির্বোধ।
নিজেকে সেরা নির্বোধ মনে হয়। কাজটা অর্থহীন জানার পরও বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে গেলে, না মনে করে উপায় কী!
কল্লোল বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা করল, আগামীকাল থেকে সিগারেট ছেড়ে দেবে। ভুরু কুচঁকে ভাবল, আগামীকাল, আজ নয় কেন? কল্লোল মহা ভারতের সিরিয়ালে দেখা ভীস্ম ( দেবব্রত)-এর মত দু’হাত উপরে তুলে জলদ গম্ভীর গলায় প্রতিজ্ঞা করল: সিগ্রেট নেহি ছু’ঙ্গা, ইয়ে মেরা আখন্ড প্রাতিজ্ঞা হ্যায়, এ- এ-এ। প্রতিজ্ঞা শেষ হওয়ামাত্র মৌ চোখ বড় বড় করে বলল, ‘অমা, ওভাবে আঁ আঁ করছিস যে, ভাইয়া তুই কি টারজান হয়ে গেলি!’
কল্লোল অহংকার অহংকার ভাব নিয়ে বলল, ‘আরে যা যা, টারজান-ফারজান। প্রতিজ্ঞা করলাম একটা, মারাত্নক প্রতিজ্ঞা।’
‘কি প্রতিজ্ঞা করেছিস?’
‘সব কথা শোন চাই। ভাগ এখান থেকে, ষ্টুপিড।’


মৌ কানের পাশে হাত নিয়ে পরীদের পাখা নাড়ানো ভঙ্গি করল। জিবও বেরিয়ে এসেছে অনেকটা। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, ‘কে শোনে তোর কথা। বাবাকে লুকিয়ে একটা সিগারেট এনেছি। নিবি, না ফেলে দেব। আমার সময় নেই, তাড়াতাড়ি বল।’
‘আরে না না, ফেলে দিবি কি, মাথা খারাপ। দে-দে।’
মৌ সিগারেট দিয়ে বলল, ‘বাবা তোকে দেখা করতে বলেছেন। একটু পর যেতে বললেন।’
‘বাবা কি জন্য ডেকেছেন, জানিস কিছু?’
‘আমি কি জানি, আমি কি বাবা!’
‘আহা-হা, রেগে যাচ্ছিস কেন। মানে বলছিলাম কি, বাবার মুখটা এখন কেমন। এই ধর, দাঁত বের করে রেখেছেন, নাকি খুব রেগে আছেন।’
‘এত সব জানি না। কী কথা, বাবা কি দাঁত বের করে রেখেছেন!’
‘ভাগ এখান থেকে সিগারেট চোর। আবার বড় বড় কথা।’
মৌ বেরিয়ে যেতে যেতে কাঠ-কাঠ গলায় বলল, ‘দাঁড়া, সব বাবাকে বলে দিচ্ছি।’


কল্লোল কিছুক্ষণ সিগারেট না ধরিয়ে হাতে রেখে নাড়াচাড়া করল। অন্যমনস্ক এমন একটা কপট ভাব করে, মুখে না লাগিয়ে হাতে ধরেই সিগারেট জ্বালাল। সাপ ভঙ্গিতে ক্রমশ উঠে যাওয়া ধোঁয়া নাকে যেতেই, ফুসফুস কেমন হু হু করছে, শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। জাষ্ট এক টান দিয়ে ফেলে দিলেই তো হয়? এরপর না খেলেই হবে। মুখ ভরে ধোঁয়া ছাড়ার পরপরই মনে হল, মহাপুরুষ বা পাগল ব্যতীত অন্য কেউ ধরানোর পর আস্ত সিগারেট ফেলে দিতে পারে না। কি যেন নাম ভদ্রলোকের? ওঁকে জিজ্ঞোস করা হয়েছিল: পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ কোনটা? ইনি নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, সিগারেট ছেড়ে দেয়া। পাল্টা প্রশ্ন হল, আপনি তো চেইন স্মোকার, ছাড়ছেন না কেন? ভদ্রলোক ভারী অবাক হলেন, ছাড়িনি কে বলল, কয়েকশো বার ছেড়েছি।
কল্লোল বাবার ঘরে উঁকি দিল। বাবা মহা আনন্দে পা নাচাচ্ছেন। ‘বাবা ডেকেছ?’
‘হু, বস।’
কল্লোল আর্দ্র দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল। বাবার শরীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। গাল-টাল ভেঙে কী অবস্থা! গোটা শরীরটাই কেমন ভাঙাচোরা দেখাচ্ছে।
কল্লোল গলার হাহাকার ভাব লুকাতে পারল না, ‘বাবা, কী অবস্থা হয়েছে তোমার শরীরের!’
‘পাগল, বয়স হয়েছে না। আংগুর আর আংগুর নাই রে, শুকিয়ে কিসমিস। হা হা হা।’
‘বাবা, তুমি থরো-চেকআপ করাও। হেলাফেলা করা ঠিক হচ্ছে না।’
‘ধুর, শুধু শুধু একগাদা টাকা খরচ। অসুখ-টসুখ হলে দেখা যাবে।’
‘না বাবা, না, কালই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।’
‘এখন না, পরে দেখা যাবেখন। তা তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?’
এ প্রসঙ্গ কল্লোলের একদম ভাল লাগে না। এদেশে পড়াশোনার কোন মানে হয় না, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের অপচয়। থেমে থেমে বলল, ‘হাহ, আর লেখাপড়া। এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে পাশ করে কি করব? এদেশে কোটি কোটি লোক বেকার।
‘আহাম্মক, তাই বলে মূর্খ থাকবি!’
‘অঘাচন্ডী হলে মন্দ হত না। রিকশা চালিয়ে অনায়াসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় করতে পারতাম। বেকার থাকার চেয়ে এটা অনেক ভাল।’
‘তুই নাকি টিউশনী করছিস কোথায়?’
‘এই আর কি, করছি একটা।’
‘কতদিন হল?’
‘কই আর, মাস দুয়েক হবে।’
নঈম সাহেব এবার করুন ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই বুড়োকে এটা বলার প্রয়োজন মনে করলি না!’
‘সরি বাবা, ইচ্ছে করেই বলি নি। আমার মনে হচ্ছিল, তুমি নিষেধ করবে। এটা ভেবে আর বলি নি। তাছাড়া ছাত্রের বাবা একটা চামার। এমন একটা ভাব দেখায়, আমাকে যে টাকাগুলো দিচ্ছে, এগুলো জলে ফেলছে। প্রথম মাসে আমার ধারণা হল, শেষ পর্যন্ত পড়ানো হবে না।’
‘কী বলিস, নিষেধ করব কেন। টাকা আয় করছিস। তোর হাত খরচ চলে যাচ্ছে। বেশ তো, মন্দ কি।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাঈম সাহেব গলা নামিয়ে বললেন, ‘খবরদার, ওখান থেকে এক পয়সাও ঐ মহিলাকে দিবি না।’
কল্লোল বাবার ষড়যন্ত্র দেখে হাসি গোপন করল। বাবা বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। পড়ানোর প্রায় সব টাকাই মাকে দিয়ে দিয়েছে। মাও ইতস্তত করে খাটো গলায় বলেছিলেন: এই কল্লোল, শোন, তুই যে আমাকে টাকা দিলি, সাবধান, তোর বাবা যেন টের না পায়।
কেন মা, কল্লোল হকচকিয়ে গিয়েছিল।
বলিস কি, যন্ত্রণার একশেষ। তুই নিজ থেকেই টাকা দিলি কিন্তু তোর বাবা এমন এক ভাব দেখাবে আমি ছিনিয়ে নিয়েছি। মুখে কিন্তু কিছুই বলবে না। ভেতরে ভেতরে লোকটা আস্ত একটা মিচকে শয়তান। নিজের অজান্তেই কল্লোলের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল: মা তুমি বাবাকে নিয়ে অযথা এসব বলছ, বাবার মন এত ছোট না।
মা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন: দু’পয়সা রোজগার করে খুব লায়েক হয়েছিস।


কল্লোল নিঃশব্দে সরে পড়েছিল। মা যেভাবে রাগে চিড়বিড় করছিলেন, কী ভঙ্গিতেই না তাকাচ্ছিলেন!
নঈম সাহেব এবার আমুদে ভঙ্গিতে বললেন, ‘কী আশ্চর্য, যে জন্য তোকে ডেকেছি। ভুলেই বসে ছিলাম। মৌ আমার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিল।’
কল্লোল সশব্দে গলা পরিস্কার করে মিনমিন করল, ‘বাবা, থুথু ফেলে আসি।’
‘চুপ করে বসে থাক।’
‘বাবা থুথু-। ’
‘চোপ রাও, তো যেটা বলছিলাম, মৌ-।’
কল্লোল দাঁত পিষে বলল, ‘মৌ বলেছে না, দাঁড়াও, ওকে দেখাচ্ছি মজা। হাত পায়ের সব নাট-বল্টু খুলে ফেলব, ও টেরটিও পাবে না।’
‘ও বলবে কি, আমি তো আর শিশু না। ওকে ঘুরঘুর করতে দেখে আমার সন্দেহ হল। সেটা কথা না, তোকে ডেকেছি অন্য কারণে। তুই স্রেফ বিষ খাচ্ছিস। আর ওকে পাঠিয়ে এভাবে সিগারেট নেয়াটাও ঠিক না। এতে ওর উপর খারাপ প্রভাব পড়বে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অজান্তেই ও মিথ্যা বলা শিখবে। খুব জরুরি হলে তুই নিজে-।' বাবা অনাবশ্যক কাশি কাশতে লাগলেন।
‘সরি বাবা, মৌকে আর পাঠাব না। আচ্ছা আমি তাহলে উঠি। ইয়ে বাবা, বাইরে বৃষ্টি, ইয়ে, ইয়ে একটা নিয়ে যাই।’
তিনি হুংকার দিলেন, ‘কী! গণতন্ত্রের অপব্যবহার। তুই দেখি মহা সুযোগ সন্ধানী রে। খবরদার-খবরদার, তাই বলে স্টিম ইঞ্জিনের মত ভক ভক করে...একদম মেরে হাড্ডি গুড়িয়ে করে ফেলব।'
নঈম সাহেবের এই নিমিষেই অগ্নিমূর্তি ধারণ, শরীরের একটা অংশ এ ছলনা উন্মুক্ত করে দিল, চোখ হাসি-হাসি।

সহায়ক লিংক:
১. তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8