Monday, August 9, 2010

কনক পুরুষ: ৬

তন্ময় তার রূমে ঢুকে রায় দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোর পুতুপুতু ভাব আমার একদম পছন্দ না। তোর মনে কু আছে।’
‘আচ্ছা যা, আমার মনে কু আছে। এখন একটা সিগারেট দে।’
তন্ময় প্যাকেট ছুঁড়ে বলল, ‘দাগ দেয়া সিগারেটগুলো কিন্তু চরস ভরা।’
‘মাই গড, বলিস কী! দাগ এলোমেলো হয়ে যায়নি তো আবার?’
‘একটা খেয়ে ফেললে তো আর পটল তুলবি না।’
জয় খুব সাবধানে একটা দাগ ছাড়া সিগারেট বের করে ধরাল। অখন্ড মনোযোগ রিঙ বানাতে চেষ্টা করল। তন্ময় চোখ ছোট করে বলল, ‘তুই হঠাৎ এলি যে। আর তো কখনও আসিসনি?’
‘ইচ্ছা করল, আসলাম। কেন বাংলাদেশে এমন কোন আইন পাশ হয়েছে তোর এখানে আসা যাবে না?’
‘আরে নাহ, আমি ভাবছিলাম, মাত্র বিয়ে করলি, বউ ছেড়ে বেরিয়ে এলি যে।'

'ছাগল, বিয়ে করলে লোকজন কী ঘর আর ছেড়ে বার হয় না!'

'সৌদিদের একটা জিনিস আমার খুব পছন্দ, জানিস। বিয়ের পর জামাই-বউ সাত ঘর ছেড়ে বেরোয় না। আনুষাঙ্গিক সবকিছু ওদের ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়। আমি হলে তাই করতাম।’
জয় হাসি চেপে বলল, 'কোত্থেকে এই সব আজগুবি খবর পাস!'
‘সত্যি। শোন, বউকে বিছানা ছাড়তেই দিতাম না। আমরা দুজন-দুজন দু’জনার। বিছানায়-’
‘আহ, তন্ময়!’


তন্ময় অবিকল কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ‘শালা, লজ্জায় মরে যাচ্ছে। ন্যাকামী, নাক নিপলে দুধ বেরোয়। বউয়ের সঙ্গে শুতে লজ্জা করে না, শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়।’
জয় লাল নীল হয়ে বাধো বাধো গলায় বলল, ‘ওসব কিছু আদৌ হয়নি আমাদের এখনও।’
‘কি-ক-কি বললি তুই!’
‘যা শুনেছিস তাই।’
‘এটা বিশ্বাস করতে বলছিস?’
‘হুঁ।’
‘তোর যন্ত্রপাতি ঠিক আছে তো? আমার ধারণা ঠিক নেই।’
‘তোকে বলে মহা ভুল করেছি, সব সময় কুৎসিত কথা। শুনতে ভাল লাগে না।’
তন্ময় অবিকল গরুর মত বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘এ রকম হলো কেন?’
‘আমি তোর সঙ্গে কথা বলব না।’
‘প্লীজ, বল না।’
জয় কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘বিয়ের রাতে ও বলল, “আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছোঁবেন না।” আমি সোফায় শুলাম। এই আর কি।’
‘এই!’
‘হুম। ওর সম্ভবত কিছু সমস্যা আছে। কিছুটা আঁচ করতে পারছি অবশ্য।’
‘জয়, লিখে রাখ, এক নম্বর গাধা পৃথিবীতে আর নাই। যা আছে সব দু’নম্বর। একটাই আছে, সে তুই। বললাম, লিখে রাখ।’
‘ক্যাঁচক্যাঁচ করিস না, লিখতে হবে না; যা তোরটাই ঠিক।’


জয় খানিকটা উদ্বিগ্ন ছিল, সমস্যা কি এটা তন্ময় জিজ্ঞস করে বসবে না তো আবার। না করাতে বেঁচে গেল। ও কখনোই বলতে পারত না। তন্ময় চা’র কথা বলতে ভেতরে গেলে জয় চারপাশে নজর দেয়ার সময় পেল। রাজ্যের জিনিসপত্রে ঠাসা, এগুলোর সম্ভবত সৃষ্টিছাড়া দাম। কিন্তু যে জিনিসটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। মেঝেতে সুন্দর একটা ডায়েরী গড়াগড়ি খাচ্ছে দেখে হাতে নিয়ে রেখে দিতে গিয়েও কি মনে করে পাতা ওল্টাতে লাগল। একজায়গায় চোখ আটকে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
‘বললে নিমিষেই হও
অপাপবিদ্ধ ভূমিষ্ঠ শিশু আমি।
বললে হোক আলোকিত-
চারদিক ফুলে ছেয়ে গেল সব।
বললে কি কুৎসিত আনন্দ
শিশুটি কাঁদল শিশির-অঝোরে।
বললে হাই চেপে: দূর হ,
নিজের লাশ কাঁদে বয়ে-
তুমিই সব, আমি কিছু না।’
জয় কবিতা-টবিতা বোঝে না তেমন। বুঝতে চেষ্টা করছে তন্ময় কি বিশেষ কোন কারণে এটা টুকে রেখেছে। এসবে ওকে মাথা ঘামাতে কখনও দেখেনি।
তন্ময় চারতলা ট্রলিতে করে দুনিয়ার সব খাবার নিয়ে এলো। একটা দৈত্য কুঁজো হয়ে ঠেলাগাড়ির মত একটা জিনিস ঠেলছে, দেখার মত ব্যাপার বটে। জয় হাসতে হাসতে বলল, ‘এত খাবার, ফেরি করতে বেরুবি নাকি!’
তন্ময় কিছু বলল না, কি যেন ভাবছে।
‘কিরে, কোন সমস্যা?’
তন্ময় গম্ভীর হয়ে বলল, ‘বুঝতে পারছি না। আমার মা’র স্বামী কি এক ভঙ্গিতে যেন আজ তাকাচ্ছে। দেখে হার্টবিট মিস হচ্ছে।’
‘ছি, তন্ময়, ছি! মা’র স্বামী এই সব কি!’
‘আরে এ বলে কী! হুশ কুত্তা, হুশ! তো যেটা বলছিলাম, মা’র স্বামী-।’
‘আমি উঠি, তন্ময়। ’
‘আহ, রাগ করছিস কেন। আচ্ছা যা, আমার বাব। তো ইনি দুপুরে ফিরে অফিসে আর যাননি, কি রকম অস্বাভাবিক আচরণ করছেন।’
‘অস্বাভাবিক আচরণ মানে?’
‘এই ধর। কি করে তোকে বোঝাই, হিন্দি ছবিতে আমরা দেখি না ভাল বাবারা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধু-বন্ধু খেলা খেলেন। ওই রকম একটা কিছু আর কি।’
‘এটাকে অস্বাভাবিক আচরণ বলছিস কেন!’
‘বলছি। তুই খাবারে হাত লাগা। যা পারা যায় শেষ করে ফেলতে হবে, নইলে নষ্ট হবে।’
জয় বলল, ‘এত খাওয়া সম্ভব নাকি? আর নষ্ট হবে কি, তুলে রাখলেই হয়।’
‘ধুর, বেঁচে যাওয়া খাবার তুলে রাখলে ভুঁইফোড় বড়লোকদের মান থাকে নাকি। ফেলে দিতে হয়।’
‘ফেলে দিবি?’
জয়ের মনে হলো শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অসহ্য রাগে ইচ্ছে করছে সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তন্ময় ওর বিবর্ণভাব লক্ষ করে বলল, ‘এটা শুনে তোর খুব রাগ হচ্ছে? মনে হচ্ছে না আমাকে খুন করে ফেললে আরাম পাবি?’
‘হ্যাঁ, হচ্ছে।’

‘এটাই সত্য, মিথ্যা বলতে আমার ভাল লাগে না।’

জয় কেবল এই কথাটার জন্যে মনে মনে ওকে ক্ষমা করে দিল। অবশ্য একে ক্ষমা না করেও উপায় নেই। বদরঙ বদমজা একটা জিনিস চিবাতে চিবাতে বলল, ‘হ্যা রে, তুই দশজনের চেয়ে অন্যরকম হলি কেন রে?’
‘অন্যরকম মানে কি, মানুষের মত মনে হয় না? এই, এই দেখ, এটা হাত। এটা পা। আর এইটা হলো গিয়ে- থাক, তুই আবার রেগে যাবি। তোর তো আবার শরীরে রাগের উথাল পাতাল ঢেউ।’
‘তোর সঙ্গে কথা বলাই সমস্যা। ভাল কথা, তোর ডায়েরিতে দেখলাম কিসব লিখে রেখেছিস, “বললে নিমিষেই হও”।’
‘লিখে রেখেছি বেশ করেছি, তো সমস্যাটা কি। চায়ে ক’চামচ চিনি দেব?’
‘কম কম করে এক চামচ দে।’
‘তুই শালা ডায়বেটিস রোগী নাকি।’
‘আবার আজেবাজে কথা বলছিস! ভাল করেই জানিস আমার ডায়বেটিস নেই।’

'থাকবে কোত্থেকে! তোর তো যন্ত্রই নেই। হা হা হা।’
জয় চুপ করে রইল। এর সঙ্গে কথা বলার মানে হয় না। কথা বললেই কথার পিঠে কথা বলবে। তন্ময় বিশাল মগে এমন ভঙ্গিতে লম্বা লম্বা চুমুক দিচ্ছে, মনে হচ্ছে চা না সরবত খাচ্ছে। অথচ একই রকম চায়ে জয় মুখ দিয়ে জিব পুড়িয়ে ফেলেছে। এর তাড়াহুড়া দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে আর বিলম্ব নেই। 'লাস্ট সাপার'-এর মত এটাও ‘লাস্ট টি’।


তন্ময় রকিং চেয়ারে পা উঠিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে দোল খেতে খেতে বলল, ‘আমার মা’র স্বামী- আহা, ওভাবে চোখ লাল করে তাকাসনে। আমার বাবার মনে হয় মাথার ঠিক নেই, বুঝলি। আমার সঙ্গে যে লোক গুণে গুণে কথা বলে নোটবুকে লিখে রাখে, কোন মাসে দু’একটা কথা বেশি বললে অন্য মাসে কম বলে পুষিয়ে নেয়। ওরিআল্লা, আমার চক্ষু তো চড়কগাছ। কী কান্ড, খাওয়ার পর থেকে অনর্গল কথা বলছে আমার সঙ্গে। কথা বলে মনে হয় খুব আরাম পাচ্ছে। নমুনা দেই:
‘বাবা বললেন, তন্ময়, দেশটা যাচ্ছে কোথায়।
আমি বললাম, কই, যাচ্ছে না তো কোথাও। আগের জায়গাতেই আছে।
বাবা দেশ কোথায় যাচ্ছে এ নিয়ে যে মাথা ঘামান এটা আমার জানা ছিল না। আর এ নিয়ে সুযোগ্য পুত্রের সঙ্গে ডিসকাস করবেন এটা অস্টম আশ্চর্য গোছের কিছু একটা। ওনার ধারণা ছেলের সঙ্গে বেশি মাখামাখি হলে বাবারা বাবা থাকবেন না, হাবা হয়ে যাবেন। তারপর বাবা বললেন, তা না, কিন্তু দেশটা যাচ্ছেটা কোথায়!
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, জ্বী, একবার বলেছি, আগের জায়গায়ই আছে। দেখ দেখি কান্ড, মাস তিনেকের কথা। আমার এক বন্ধু, বুঝলি, বহুদিন ছুটি পায় না। আমাকে অনুরোধ করল, আমি যেন টেলিগ্রাম করি, ছুটি পেতে সুবিধে হবে। ওর হাতে টেলিগ্রাম গিয়ে পৌঁছল তিনদিন পর। চিন্তা কর, অথচ অর্ডিনারি চিঠি চট্টগ্রাম পৌঁছে এক দিনে।
আমি বললাম, চিন্তা করার সময় কই। সহজ বুদ্ধি হলো: অর্ডিনারি চিঠির ভেতর টেলিগ্রাম ভরে পাঠিয়ে দেয়া। বাবা অবাক হলেন, চিঠি দিলেই হয়, এর ভেতর টেলিগ্রাম দেয়ার মানে কী।
অ, এইটা বুঝলে না। ধরো, তুমি চিঠিতে লিখলে আমার এখন-তখন অবস্থা। বাতাসের আগে আসো। যে চিঠিটা পাবে সে কি খুব একটা গুরুত্ব দেবে, না অন্যরা? কিন্তু চিঠি খুলে এই কথাটাই টেলিগ্রামে লেখা থাকলে। ঢিং । সেই লোক তোমার প্রিয়জন হলে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবে না? অবশ্য তুমি বেঁচে গেছ, তোমার তেমন কেউ নেই।

জানিস জয়, অন্য সময় এভাবে কথা বললে বাবা তুলকালাম করে ফেলতেন, কাঁচা ডিম মাথায় রাখলে সেদ্ধ হয়ে যেত। আজ কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বাসে রইলেন।’

জয় বিব্রত গলায় বলল, ‘বাবাকে নিয়ে কেউ-।’
‘জানি, জানি, তুই কি বলবি। বাবার সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে না, এই তো? তাদের বাবারা কি নিজ থেকে ছেলেকে একবার হ্যালো বলারও প্রয়োজন বোধ করে না। মাসের পর মাস দেশের বাইরে পড়ে থাকে! ছেলে কোথায় যাচ্ছে কি খাচ্ছে-।’
‘ভুল তো সবাই করে। তাই বলে তোর মত ড্রাগ নেয় না। এভাবে আত্মহত্যা করে না।’
‘আসলে তোকে ঠিক বোঝাতে পারব না। ড্রাগ নিলে কি পরিণতি হবে এটা যে জানতাম না এমন না। তখন কি মনে হত জানিস, আমি যেভাবে বেঁচে আছি এটা কোন বেঁচে থাকা নয়। এভাবে না মরে ওভাবে মরলাম, কি আসে যায়।’
‘যা হয়েছে হয়েছে, চিকিৎসা হলেই সেরে উঠবি।’
তন্ময় উদাস হয়ে বলল, ‘কি লাভ, এই তো ভাল।’
জয় এবার রাগী গলায় বলল, ‘মামদোবাজী করবি না। এ পৃথিবীতে নিজ থেকে আসিসনি, মরে যাওয়ার কোন অধিকার তোর নাই। তোর ওপর সৃষ্টিকর্তার, তোর বাবারও অধিকার আছে।’


তন্ময় রাগে এমন লাফিয়ে উঠল জয় ভয় পেয়ে আধ হাত পিছিয়ে গেল। তন্ময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘তুমি শালা এ দেশের প্রধানমন্ত্রী না প্রেসিডেন্ট, খুব যে ভাষণ দিচ্ছ। আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমি আসতে চাই কি না? হাত পা ধরে সাধছিলাম, পাঠাও-পাঠাও? কেউ বলেছিল, আমাকে তুমি যে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছ, এই হলো এর অবস্থা। অ্যাহ, অধিকার! ইচ্ছের বিরুদ্ধে এসেছি, ইচ্ছা হলে থাকব, না হলে থাকব না।’
‘প্লীজ, তুই-।’
‘শান্ত হব? আমার মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে তোর মাথাটা ফট করে-।’
‘আজই বলেছিস দু’তিনবার, ডিমের খোসার মত ভেঙে ফেলবি।’
বিদায় নেয়ার সময় জয় তন্ময়ের হাত ধরে আবেগঘন গলায় বলল, তন্ময়, একটা জিনিস চাইব, দিবি?’
‘কি পাগল, না জেনে প্রমিজ করব কি! তুই আমার ওইটা চাইলি, দিয়ে দিতে হবে? হা হা হা।’
‘ফর গড সেক, তন্ময়, কখনও তো সিরিয়াস হ’!’
‘ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে কি বলবে বলো, চান্দু।’
জয় গোঁয়ারের মত বলল, ‘তুই আগে প্রমিজ কর। ’
‘আচ্ছা, প্রমিজ করলাম। এবার বল।’
‘তোর চিকিৎসার ব্যাপারে যা করার আমি করব। তুই টুঁ-শব্দও করবি না।’
তন্ময় অন্যরকম গলায় বলল, ‘লাভ নেই রে, আমি শেষ।’
‘এসব বুঝি না, তুই কথা দিয়েছিস । আর শোন, ইভা বলেছে তোকে যেন অবশ্যই বলি ওর সঙ্গে দেখা করতে। কাল আয়।’
‘তুই থাকলে যাব, না কি না থাকলে যাব, এটা বলে যা। হা হা হা।'


*কনক পুরুষ, ৫: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_08.html 

**উপন্যাস, কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4sq