Sunday, July 25, 2010

জিরো ক্রেডিট: ১

পড়শী ফাউন্ডেশনের যন্ত্রণার শেষ নেই, আমাকে সামাল দিতে এদের বড়ো বেগ পেতে হচ্ছে। আমার একের পর এক আইডিয়া বাস্তবায়নের পেছনে যে টাকা খরচ হচ্ছে এর যোগান দেয়াটা এদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে।

'ন্যানো ক্রেডিট' নিয়ে কিছু কাজ করেছিলাম [১] [২] [৩] [৪]। এখানে ইনভেস্ট হয়েছে সাড়ে চার হাজার টাকা, এক মাসের লিমিট আবার পাঁচ হাজার টাকা। এই মাসের লিমিট ইতিমধ্যে প্রায় খরচ হয়ে গেছে। এই খাতে হাতে রয়ে গিয়েছিল পাঁচশ টাকা। আমি ভেবে দেখলাম, এই টাকায় তো আর ন্যানো ক্রেডিট চলবে না। তো, 'জিরো ক্রেডিট' চালু করে দিলাম।
জিরো ক্রেডিট নামটা দেখে হোঁচট খাওয়ার কথা। জিরো তো জিরো, জিরো সংখ্যাটা নেয়ার জন্য কে মুখিয়ে থাকবে। থাকবে-থাকবে, কারণ এই টাকার অংকটা পাঁচশ। যেহেতু ফেরত দেয়ার বালাই নেই তাই 'জিরো ক্রেডিট'।

পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম, পড়শী ফাউন্ডেশন থেকে আমাকে কিছু ক্রাচ দেয়া হয়েছিল। বেশ কজনকেই ক্রাচ দেয়া হয়েছিল।

এদের মধ্যে একজন, জাহাঙ্গীর আলম নামের একটা পা নেই এমন এক ভিক্ষুককে দেখতাম রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করতে। তার সাথে যে ক্রাচটা দেখতাম ওটা ছিল নড়বড়ে। তাকে একটা ক্রাচ দেয়া হয়েছিল।
জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এই মানুষটা আগে হকারি করতেন, বাসে চানাচুর-টানাচুর বেচতেন। একদিন চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যান, পা কাটা পড়ে, কোমরেও চোট পান। আমি ভেবে দেখলাম, মানুষটার পুর্বে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা আছে।

আমি বললাম, আপনে যে ভিক্ষা করেন এইটায় তো ইজ্জত নাই।
মানুষটার সাফ উত্তর, কি করুম?
ব্যবসা করেন।
টেকা পামু কই?
টাকা পেলে ব্যবসা করবেন?
মানুষটার উৎসাহের শেষ নেই।
আমি আবারও বলি, আপনাকে পাঁচশ টাকার কাপড় কিনে দেয়া হবে। এটা আপনাকে ফেরত দিতে হবে না। আপনি আস্তে আস্তে পুঁজি বাড়িয়ে ব্যবসা করবেন। পারবেন না?
হ। খুব পারুম।

প্রথমে অবশ্য ভাবা হয়েছিল কলা-টলা বিক্রি করার জন্য কিন্তু পায়ের সমস্যার কারণে কলার ভারী টুকরি টানতে সমস্যা হবে বিধায় এটা বাদ দেয়া হয়েছিল। পরে তাই ঠিক হলো, কাপড়ের ব্যবসা।
নিয়মিত হাট করেন এমন একজনকে অনুরোধ করে পাঁচশ টাকার কাপড় এনে দেয়া হয়েছিল। কাপড় কিন্তু কম না! বাচ্চাদের কিছু ছোট প্যান্টের দাম পড়েছে সাড়ে তিন টাকা করে। ভাবা যায়! যেটা অন্তত দশ-বারো টাকায় বিক্রি করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যখন আমার কথা চালাচালি হচ্ছিল তখন এক মহিলা, ইনিও খানিক দূরে বসে ভিক্ষা করেন, পায়ে সমস্যা আছে। আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনে বলে ওই বেডারে ইত্যাদি ইত্যাদি?
আমি বিরক্ত হয়ে বলি, হ। তা আপনার সমস্যা কি! 
মহিলার কোন সমস্যা নেই। হাসে।
কাহিনী পরে জানা গেল, যখন জাহাঙ্গীর আলমকে কাপড়ের গাঁটরি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আসতে বলেছি।

ওমা, ওই মহিলা দেখি জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একই রিকশায় উঠতে চেষ্টা করছেন। আমি অবাক হয়ে বলি, আপনি কেন?
জাহাঙ্গীর আলমের লাজুক গলা, হে আমার পরিবার।
ওয়াল্লা, এই তাহলে কাহিনী। ইনি জাহাঙ্গীর আলমের ইস্তারি সাহেবা! বেশ-বেশ।

জাহাঙ্গীর আলমকে বিদায় করে দেয়ার পর যে মানুষটা হাট থেকে কাপড় কিনে এনে দিয়েছিলেন তিনি বলছিলেন, হে কাপড়ের গাট্টি লইয়া ভাইগা যাইব।
আমি বললাম, গেলে যাইব। কী হাতি-ঘোড়া নিয়া ভাগব!

তখন মনে ছিল না, এখন মনে মনে হাসছি। আর কিছু না-হোক অন্তত এই দু-জন আমার দু-চোখ যেদিকে যায় সেদিক পর্যন্ত আর যাই হোক ভিক্ষা করবেন না। রাস্তার পাশে বসে থাকা, কাটা পা নাড়াতে থাকা দু-জন ভিক্ষুক এখান থেকে উধাও হলো এটাই বা কম কী! অন্য কোথাও গিয়ে বসবে? বসুক না, সেটা সেখানকার লোকজনের সমস্যা; আমার কী! হা হা হা।

সহায়ক লিংক: 
১. মালতি রানি সাহা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_14.html 
২. মন মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_4248.html 
৩. রুবিনা আক্তার: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3561.html 
৪. জোহরা বেগম: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_18.html