Thursday, July 22, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, আজ থেকে

রমজান মিয়ার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল [১] তখন হাতে যে বই দেখেছিলাম তার বাচ্চার জন্য, আজ এখানে বাপ-ব্যাটাকে পেয়ে যাই।

আমার বিস্ময়ের সীমা নেই, এরা ঠিক-ঠিক কথা রেখেছেন। বলেছিলাম, একটা স্কুল-ঘরের ব্যবস্থা করার জন্য। সেই ব্যবস্থা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছিল একজন টিচার ঠিক করার জন্য। সেটাও হয়েছে। ভাল রকমই হয়েছে।
এখানে খানিকটা জটিলতা ছিল কারণ এঁরা যেখানে থাকেন এটা প্রায় দুর্গম একটা জায়গা! জায়গাটা চিনে আমার পক্ষে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিল। ডানে-বায়ে-সামনে-পেছনে অনেক হ্যাপা। আবারও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন 'বাইক-বয়'। তিনি ঝড়ের গতিতে বাইক উড়িয়ে নিয়ে যান, পেছনে আমি আপ্রাণ চেষ্টায় ঝুলে থাকি।

তো, টিচারের যে সমস্যাটা ছিল সেটা এমন, আমাদের এখান থেকে একজনের পক্ষে ওখানে গিয়ে পড়িয়ে আসাটা কঠিন। আসতে যেতেই ম্যালা টাকা খরচ হবে। 
সালমা নামের এঁদেরই একটা মেয়ে পড়ে ক্লাশ এইটে। যে পূর্বে থেকেই এখানকার দু-একজন বাচ্চাকে পড়িয়েছে। এই মেয়েটা পড়ালে বাড়তি সুবিধা যেটা পাওয়া যাবে, বাইরে থেকে টিচার আনার ঝামেলাটা থাকল না, এঁদের নিজেদের লোকজনরাই পড়াবে এবং এঁদেরই একটা পরিবারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা হলো।
টিচারকে আমি একটা গাইড-লাইনও দিয়ে এসেছি, পড়ার পাশাপাশি যেটা লক্ষ রাখবে বাচ্চাদের হাতের নোখ ছোট, দাঁত পরিষ্কার, খাওয়ার আগে হাত ধোয় কি না ইত্যাদি। এখানকার লোকজনের একটা কঠিন আবদার, বাচ্চারা আরবিও পড়বে। সমস্যা নাই, সপ্তাহে ২দিন আরবি পড়বে।

মাঝেমধ্যে গল্পও বলা হবে। আমার বানানো একটা গল্প আছে, যেটা আমি হরিজন পল্লীতে বাচ্চাদের শুনিয়েছি। সহজ-সরল একটা গল্প। এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার একটা রানি ছিল। রাজকুমার, তাদের একটা ছেলেও ছিল। রাজকুমার ছিল খুব দুষ্টু। সে স্কুলে যেত না। টিচার, বাবা-মার কথা শুনত না, মিথ্যা বলত, চুরি করত। একদিন ভগবান তার উপর খুব রাগ করলেন। রাজকুমারের গায়ের রঙ কালো হয়ে গেল, সে কাক হয়ে গেল। 
সে কাক হয়ে গেল, গল্পের এখানে আসলেই হরিজন পল্লীর বাচ্চারা শব্দ করে বলে, কা-কা-কা। এটা কেউ এদের শিখিয়ে দেয়নি, এরা নিজে থেকেই বলে। আমি হাসি চাপি।
তো, এখানেও এই গল্প দিয়েই শুরু হবে। হুবহু এটাই বলা হবে, কেবল ভগবানের জায়গায় আল্লাহ হবে। 

এখানে আপাতত ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল ২০ জন। ১৯ জনকে এখানেই পেয়েছি, ১জন আজ ছিল না। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান এঁরা, চোখে দেখতে পান না। আহারে-আহারে, একটা মানুষগুলোর দিনরাত নেই, কেবলই রাত! চারপাশে থইথই চাঁদের আলো অথচ সব নিকষ অন্ধকার।
এখানে এখন থাকেন প্রায় ২০টা পরিবার, সবাই পেশায় ভিক্ষুক। এঁদের কেউই চোখে দেখতে পান না কিন্তু তাঁদের সন্তানদের কোন সমস্যা নেই। কেবল একটা বাচ্চাকে পেয়েছি যে চোখে দেখতে পায় না। ব্রেইল পদ্ধতিতে আপাতত শেখাবার কোন ব্যবস্থা এখানে নাই কিন্তু ওই বাচ্চাটার বিপুল আগ্রহ। সে তার টিচারকে বাধ্য করেছে একটা বইয়ে তার নাম লিখে দিতে; এটা তার বই, কেউ হাত লাগাতে পারবে না :)।
এ আপাতত মুখস্ত পড়া পড়ুক। অন্তত স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সমানতালে চলার ভাবনাটা তার মধ্যে কাজ করুক।
(পেছনের টিনের ঘরটা এদের ইশকুল)। এঁদের যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে সেটা হচ্ছে, এঁরা কেউই চান না তাঁদের সন্তানরাও ভিক্ষুক পেশায় আসুক। এটা এঁদের স্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্ন এবং বাস্তবের মধ্যে ফারাক খুব একটা নাই। এও বিশ্বাস করি, সবাই স্বপ্ন দেখতে পারেন না, এঁরা পেরেছেন।

একদল স্বপ্নবাজদের কাছ থেকে তীব্র ভাল লাগা নিয়ে আমি যখন ফিরে আসছি মাঝপথে এই মানুষটাকে পাই, রাস্তার পাশে। এমন তো আমরা আকসার দেখি কিন্তু এই বৃদ্ধার মধ্যে এমন একটা হাহাকার, নিঃস্ব ভঙ্গি ছিল যে কষ্টটা আমাকে এখনও তাড়া করছে- সমস্ত ভাল লাগা উবে গেছে আমার। বুকে একটা ধাক্কার মতো এসে লাগে। কখনও কখনও নিজেকে বড়ো ক্ষুদ্র-নিঃস্ব-অসহায়-কাতর লাগে। আমার ভাল লাগছে না, ভাল লাগছে না আমার...

:কৃতজ্ঞতা:
আর্থিক সহায়তা: পড়শী ফাউন্ডেশন
লজিস্টিক সাপোর্ট: ফাহমি আজিজ

সহায়ক লিংক:
১. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html
২. হরিজন পল্লীর ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html