Thursday, July 15, 2010

ন্যানো ক্রেডিট: ৩

রুবিনা আক্তার। বয়স আনুমানিক ৪৫। স্বামীর তাঁর খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না, ঘরে তার অন্য স্ত্রী। ৩ ছেলে, ৩ মেয়ে। ১ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

১ ছেলের বিয়েও দিয়েছিলেন। ওই ছেলেটা একটা চার দোকান চালাত। সুদের টাকার কারণে তার উপর প্রচন্ড চাপ ছিল। একদিন সে আত্মহত্যা করে।

রুবিনা আক্তারের এখন ২ ছেলে, ২ মেয়ে। ছোট-ছোট। এক রেল গেইটে বসে কলা, পেয়ারা বিক্রি করেন। যে আড়ত থেকে কলা আনেন তারা বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দাম ধরে, কিছুই বলার নেই; কারণ বাকীতে দিচ্ছে।

এই ভদ্রমহিলাকে দেয়া হয়েছে ১৫০০ টাকা। মাসে মাসে ২০০ টাকা দেয়া তাঁর জন্য সমস্যা হবে না বলেই জানালেন।
একজন আমাকে এই প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে বলছিল, 'আরে, হেরা টেকা লইয়া ভাইগা যাইব'। 
এটা এডিবির টাকা না যে সময় ফুরিয়ে আসছে, তড়িঘড়ি করে দিয়ে শেষ করতে হবে- লোক ধরে ধরে এনে দেয়া হচ্ছে! বুঝেশুনেই টাকা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া যারা বছরের পর বছর ধরে এখানে আছেন এরা সব ছেড়েছুঁড়ে দেশান্তরী হবেন, আজব! তর্কের খাতিরে ধরলাম, ভেগেই যাবে। তো? কোন হাতি-ঘোড়া নিয়ে ভাগবে? কেএফসির ১০ পিসের ভাজা মুরগী কিনতেই তো হাজার টাকা লাগে।
শালার পাবলিক!

আরেকটা বিষয় আমি লক্ষ করেছি, এদেরকে বলা হয়েছিল আরও বাড়িয়ে টাকা নিতে চায় কিনা কিন্তু কেউ সম্মত হননি।

সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট, ২http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_4248.html 

ন্যানো ক্রেডিট: ২

মানুষটার নাম মন মিয়া। বয়স আনুমানিক ৬৫। স্ত্রী তাঁকে ফেলে চলে গেছেন কারণটা এখানে বলাটা সমীচীন মনে করছি না। ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নাই। এখন এখানে থাকেন একা।

রাস্তায় বসে কলা বিক্রি করেন, লাভ খুব একটা মন্দ না কিন্তু তিনি যার কাছ থেকে ১০০০ টাকা নিয়েছিলেন তাকে প্রতিদিন দেন ২০ টাকা। তিনি সম্ভবত এভাবে হিসাবটা করেননি যে মাসে তাঁকে দিতে হচ্ছে ৬০০ টাকা!
হা ঈশ্বর, ১০০০ টাকার জন্য ৬০০ টাকা! তিনি যে লিখিত কাগজটা দিয়েছেন ওই কাগজটা নিজ চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাসই করতাম না।

হচ্ছেটা কী এই দেশে? মানুষ কী একেকজন চলমান দানব হয়ে যাচ্ছে? প্রার্থনাস্থলে উপচে পড়ছে ধার্মিক মানুষে। একজন আমাকে অন্য রকম একটা কথা বলেছিলেন, প্রতিদিন যে ভুলচুক করি তা উপরওয়ালার কছে মাফ চেয়ে নেই। প্রতিদিন কাটাকাটি হয়ে যায়। কী অদ্ভুত ভাবনা! 
আমার ধারণা, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এই ভাবনাটা লালন করেন বলেই দানব হতে দ্বিতীয়বার ভাবেন না। আমি মনোবিদ নই, চৌকশ মনোবিদ ভাল বলতে পারবেন, আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দানব মানবের মধ্যে লড়াইয়ে দানবটা কেন অনায়াসে জয়ী হচ্ছে। ফাঁকটা কোথায়? কোন ফাঁক দিয়ে দানবটা তার মাথা বের করে দিচ্ছে! 
কেন আমরা হরদম হেরে যাচ্ছি? কেন? একটাই মাত্র জীবন আমাদের, কী স্বল্প আমাদের জীবন! তারপরও কেন-কেন?

এই মানুষটাকে আজ ১০০০ টাকা দেয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হয়েছে প্রতিদিন তিনি ১০ টাকা করে দিয়ে দেবেন। এতে করে ৪ মাসের মধ্যেই তাঁর টাকাটা শোধ হয়ে যাবে।
এই 'ন্যানো ক্রেডিট' প্রজেক্টটা নিয়ে আমি বড়ো আশাবাদী। আমার ধারণা, এটা কালে কালে মহীরুহ হয়ে উঠবে।

সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_14.html 

কুত্তা জহির

জহিরের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার জন্মের ইতিহাস, ধর্মীয় আচার পালন, দলীয় পরিচিতি, এলাকার পরিচিতি ছাপিয়ে চলে আসে তার নাম, কুত্তা জহির। দুর্ধর্ষ না ছাই, জহির নিতান্ত ছাপোষা মানুষ। তার নামের পূর্বে এই উপাধি কিভাবে যোগ হলো, দুর্ধর্ষ কুত্তা জহির হয়ে গেল এ ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র।...    ...   ...
সে-দিন জহির মুখ ফেরাতেই জমে গেল। ইয়া তাগড়া একটা কুকুর। ঠিক তার পায়ের কাছে। আরেকটু হলেই চাপা দিয়েছিল আর কী! হুশ বলতে গিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। কুকুরটার ঘাড়ে কে যেন কোপ দিয়েছে। শরীরে ছোপ ছোপ রক্ত। এখনও রক্ত ঝরছে। ইস-স কী বীভৎস!
কুকুরটা সেই যে বসেছে উঠার নাম নেই। উঠে কোথাও হারিয়ে গেলে চলে গেলেই তো হয়। জহির হাফেজ সাহেবকে পাকড়াও করল। হাফেজ সাব দেখছেন?
হাফেজ সাহেব বিরক্ত হলেন: খেদান, খেদান এইডারে নাপাক জিনিষ।
হাফেজ সাব, ভাইরে, কুত্তাডা একটু দেহেন না, আহ দেখেনই না, কোপ দিয়ে ঘাড়টা প্রায় আলাদা করে ফেলছে।
হাফেজ সাহেব বিরক্তি গোপন না করেই এবার বললেন: দুর মিয়া, বেশি যন্ত্রণা করেন, এইডার একটু ধুলা আমার গায়ে পড়লে এই অবেলায় গোসল করতে হইব। হুশ-হুশ, থুবা আসতাগফিরুল্লা। এইডারে পশু হাসপাতালে দিয়া আসেন।
জহির এই রাগী গলায় বলল: আপনে নিয়া যান না, টাকা যা লাগে আমি দিমু।

হাফেজ হড়বড় করে বলেন, কি বেদাত কথাবার্তা আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ। নাফরমান বান্দা।
পাশেই একজন মনোযোগ সহকারে কথাবার্তা শুনছিলেন, তিনি বললেন: পশু হাসপাতালে নিলে চিকিৎসা হইত।
জহির আগ্রহী হলো: আপনি নিয়া যাইতে পারেন ভাই, যা খরচ লাগে আমি দিমু নে। লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল।


জহিরের বড় অস্থির লাগছে। আল্লাহর একি অবিচার, এখানে দেড় লক্ষ লোকের বাস এখানে। কুকুরটা তার ঘাড়েই কেন পরবে! হোয়াই?
জহির বিমর্ষমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাগ্যক্রমে একজন মানুষের ডাক্তারকে পেয়ে গেল। মুখ শুকিয়ে কুকুরটাকে দেখাল। মানুষের ডাক্তারের সঙ্গে জহিরের খানিকটা রসিকতার সম্পর্ক আছে।
তিনি হা হা করে হেসে বললেন: ভাইরে, আপনি তো বেশ লোক। যা হোক, শেষ পর্যন্ত কি কুত্তার ডাক্তার হতে বলছেন! হা হা হা। সমস্যাটা কি জানেন, কুকুরটা তো আপনার পোষা না, জোর করে তো পশু হাসপাতালে নিতে পারবেন না। শেষে র‌্যাবীস-ট্যাবীস বাধিয়ে বসবেন। আচ্ছা এক কাজ করেন, সিরিঞ্জে করে ডেটল পানি দূর থেকে কুকুরটার আহত স্থানে ছিটিয়ে দেন আর টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপসূল চার-পাচটা খুলে পাউরুটির ভেতরে করে খাওয়াতে পারেন কিনা দেখুন।


জহিরের চিকিত্সা পদ্ধতিটা বেশ মনে ধরল। সম্ভব, এটা ওর পক্ষে সম্ভব। সিরিঞ্জে ডেটল পানি ভরে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিল ছিটাবার জন্য। নিজে ক্যাপসূলে পাউডার ভরা পাউরুটির দায়িত্বে।
মানুষের হিংস্রতা নিয়ে কুকুরটির স্মৃতি ভারাক্রান্ত। প্রচুর কাঠখড় পোহাতে হলো পাউরুটি খাওয়াতে। দু-দিন এই চিকিৎসা চলল। পরে জহির ভুলেই গিয়েছিল কুকুরটির কথা।
ক-দিন পর তার এক বন্ধু বলল: জহির রে, তোর গেষ্ট আসছে কয়েকজন বান্ধবী নিয়ে। জহির দেখল সেই তাগড়া কুকুরটা সঙ্গে বেশ কটা মহিলা কুকুর। আনন্দে জহিরের চোখে পানি চলে এল। বন্ধুরাও আড়ালে তাকে কুত্তা জহির ডাকা শুরু করল।